#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ০৫
🌿🌿🌿
রাত তখন প্রায় একটা।
ঘর নিস্তব্ধ, কিয়ারার চোখের পাতা শুকিয়ে গেছে কান্নায়।
দরজা বন্ধ, লাইট অফ, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে আসছে চাঁদের আলো—
সেই আলোয় কিয়ারার মুখটা আরও ক্লান্ত, আরও ভাঙা লাগছে।
মোবাইলটা বালিশের পাশে পড়ে আছে,
আঙ্গুল কাঁপতে কাঁপতে কিয়ারা নাম্বার ডায়াল করে— মি. খান…”
দূর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ আসে, একটু রুক্ষ কিন্তু চিনচিনে উদ্বেগে ভরা,
ঃ- রায়া… কী হয়েছে?... তুমি কাঁদছো?..?!..
ওর গলায় কান্না আটকে যায়,
ঃ- ভাইয়া… ভাইয়া সব জেনে গেছে… আমাকে জিজ্ঞেস করছিলো…আমাকে.. ..”
কণ্ঠ থেমে যায়, হাপুস নয়নে কান্না।
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর ঠান্ডা, দৃঢ় কণ্ঠে লোকটা বলে উঠলো…
ঃ- এই…এই..খবরদার কাঁদবে না। আমি আসছি!...
একটা শ্বাসের শব্দ আসে, তারপর— কল কেটে যায়।
কিয়ারা হতভম্ব হয়ে বসে থাকে।
বাইরে বাতাসে জানালার পর্দা উড়ছে, হালকা বৃষ্টি পড়ছে।
ও ভেবেছে এতো রাতে লোকটা নিশ্চয়ই ওতো রিস্ক নিয়ে এখানে আসবে না। ওকে শান্তনা দিতেই হয়তো বলেছে।
কিন্তু ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই…
ব্যালকনিতে ঝুপ করে একটা শব্দ হলো— যেন কেউ নিচে নেমে এলো!
ও চমকে ওঠে।
এক মুহূর্ত পরে, ঘরের ছায়ার ভেতর থেকে একটা ভারী কণ্ঠ—
ঃ- কাঁদতে বারণ করেছিলাম না আমি??...
কিয়ারা ঘুরে তাকায়—
চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে মাহাদ। কালো শার্ট, ভেজা চুল, চোখে একরাশ রাগ আর আবেগ মিশ্রিত ভালোবাসা।
ঃ- আপনি!... আপনি সত্যিই এখানে চলে এসেছেন??!..…”
কিয়ারার গলা কেঁপে যায়।
ঃ- তুমি কাঁদছিলে , আর আমার পক্ষে সেটা সহ্য করে ওখানে বসে থাকা ইম্পসিবল ছিল।
লোকটা ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসে।
ঃ- তোমাকে কিছু বলেছে?...
কিয়ারা মাথা নিচু করে বলে,
ঃ- ভাইয়া হয়তো আমাদের সন্দেহ করছে। এরপর…এরপর সবাই জানবে …” তখন কী হবে?...
লোকটা এগিয়ে এসে ওর মুখের ওপর হাত রাখে,
ঃ- হুঁস, চুপ। কেউ কিছু জানবে না। আমি আছি তো, আর জানলেও বা কি??... যতো দ্রুত সবাই জানবে, ততো তাড়াতাড়ি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যেতে পারবো।
তার কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা, এমন উষ্ণতা — কিয়ারা চোখ তুলে তাকাতেই তার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে কিছু।
তিনি ওর চোখ থেকে অশ্রুবিন্দু মুছে দেয়, তারপর আস্তে বলে,
ঃ- তুমি আমার স্ত্রী…আমার অধিকার, তোমাকে কেউ আঘাত দিতে পারবে না, আমি সেটা একদমই বরদাস্ত করবো না, শুনলে তুমি?..?..
কিয়ারা চোখে জল নিয়ে বলে,
ঃ- কিন্তু এভাবে আসলেন কেন?.. ভাইয়া বাসায় আছে আজকে, দেখে ফেললে অঘটন ঘটে যাবে…।
ঃ- তাতে কী আসে যায়?”
তার গলায় রুক্ষ কোমলতা,
ঃ- আমি কাউকে ভয় পাই না, রায়া। শুধুমাত্র তোমার জন্য আমাকে এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে তোমার কাছে আসতে হয়।
ওর চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো লোকটা। কিয়ারা এর বিপরীতে আর কিছুই বলতে পারলো না।
ওরা দু’জন নিঃশব্দে বসে থাকে জানালার পাশে—
বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে নরম আলো,
দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছে একই ছন্দে।
ভালোবাসা, ভয় আর প্রতিশ্রুতির নিঃশব্দ এক রাত..
যে রাতে অন্ধকারও হার মেনে যায় তাদের নিঃশব্দ সংযোগে।
লোকটা বৃষ্টিতে পুরো ভিজে গিয়েছে। কিয়ারার সেটা সবে মাত্র খেয়াল হলো। কিন্তু এখন কি করবে?.. ভাইয়া বাসায় না থাকলে নাহয় তার কোনো পোশাক এনে লোকটা কে দেওয়া যেতো এখন কি করবে ও??... বাইরে পুরো শহর নিস্তব্ধ, কেবল দূরের বাতির ঝলকানি চোখে লাগে। কিয়ারার কণ্ঠে সেই ভেজা, ভগ্ন হৃদয়, এক ফিসফিস—মি. খান…”
লোকটার পা ফিসফিস করে সামনে বাড়ে। সে জানে, একবার এক ধাপ এগোলেই, আর কোনো ফিরে আসার পথ নেই। হাত বাড়িয়ে কিয়ারার চুল সরিয়ে চোখে তাকায়।
ঃ- আমি এখানেই আছি… শুধু তোমার জন্য, বলো কি বলবে…
সে ফিসফিস করে। কিয়ারার চোখে চোখ রেখে লোকটা ধীরে ধীরে তার গালে চুম্বন করে। হালকা, কিন্তু সেই স্পর্শে যেন দুনিয়ার সব বেদনা মুছে যাচ্ছে।
কিয়ারা অচেতনভাবে তার কাছে ঝুঁকে আসে। লোকটার হাত তখন ওর কাঁধ, ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে—ধীরে ধীরে ছোঁয়া বাড়তে থাকে। সে চাইলেই সরে যেতে পারত, কিন্তু সে যেতে চায় না। শরীরের প্রতিটা স্নায়ু যেন লোকটার ছোঁয়ায় উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি ধীরে ধীরে কিয়ারার গলার কাছে মুখ ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল…
ঃ- আমি চাই তুমি জানো, তুমি কতটা আমার। আমি তোমাকে এমনভাবে চাই, যা কেউ জানে না।
কিয়ারা কাঁপে, শ্বাস থেমে আসে, তারপর হালকা হেসে ফেলে—হাসিটা ভয় আর আনন্দের এক অনন্য মিশেল। লোকটা তখন হাত ধরেই কিয়ারাকে কাছে টেনে নেয়। তাদের নিঃশ্বাস মিলিত হয়, চোখের মৃদু আলোতে দুই হৃদয় এক হয়ে যায়।
লোকটার ঠোঁট ধীরে ধীরে কিয়ারার কপালে, গলায়, কাঁধে ঘুরে যায়। কিয়ারা তখন হালকা হাহাকার করে, কিন্তু কোনো প্রতিরোধ নেই। লোকটার প্রতিটি স্পর্শ তাকে আরও ঘনিষ্ঠ করে, আরও কাছে টেনে আনে।
এক মুহূর্তে—ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, পৃথিবীর সব শব্দ দূরে সরে যায়। শুধু তাদের হৃদয়ের ধকধক, ছোঁয়া, ফিসফিস।
তিনি হঠাৎ কিয়ারার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন
ঃ- এই রাত, এই মুহূর্ত… শুধু আমার জন্য। দুনিয়ার কেউ জানুক বা না জানুক, আমি শুধু তোমায় চাই। নিজের করে চাই, সবটা চাই।
কিয়ারা চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে লোকটার ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গনে ঢুকে পড়ে। বাইরের জগত ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়, আর এই ঘর—এই রাত—হয় তাদের নিজস্ব, এক নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রতিক, এক অন্যরকম অনুভুতির জগত।
লোকটার আলিঙ্গনে কিয়ারা তখন পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। হাতগুলো তার কাঁধে, গলায়, চুলে, উন্মাদ লোকটার স্পর্শ তখন আস্তে আস্তে গভীর হচ্ছে। কিয়ারা হালকা কাঁপছে, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ নেই।
লোকটা কানের কাছে ফিসফিস করে বলল …
ঃ- আমি চাই, তুমি শুধু আমার কাছে থাকো… আমৃত্যু আমার হয়ে থাকো।
কিয়ারা চোখ বন্ধ করে বলে,
ঃ- আমি… আমি তো আপনারই, আমৃত্যু আপনার হয়ে থাকবো।
লোকটা ধীরে ধীরে তার ঠোঁট কিয়ারার গালে, কপালে ঘুরিয়ে দেয়। প্রতিটি স্পর্শে কিয়ারার শরীর আরও কাছে টানে, আরও উষ্ণ করে।
কিয়ারা নিঃশ্বাস আটকে, ছোট্ট হাহাকার ফিসফিসে মিশিয়ে দেয়। লোকটার হাত তখন কোমরের চারপাশে ঘুরে যায়, তাকে আরও শক্ত করে নিজের কাছে টানে।
বাইরের শহরের শব্দ ফিসফিস হয়ে দূরে চলে যায়। গ্যালারির অন্ধকারে শুধু তারা দুজন—একটা নিঃশব্দ, গভীর ভালোবাসার ঘর।
লোকটা ধীরে ধীরে কিয়ারার চুলের মধ্যে হাত দিয়ে তার মাথা নিজের কাঁধে টেনে নেয়।
ঃ- এই মুহূর্ত… শুধু আমার”
সে ফিসফিস করে।
কিয়ারা হেসে ফেলে, চোখ বন্ধ রেখেই..
ঃ- হ্যাঁ… শুধু আপনারই।
আলোর নরম ছায়ায়, নিঃশব্দে, দুই হৃদয় এক হয়ে যায়—একটা নিঃশব্দ রাত, মিষ্টি ভালোবাসার জগতে।
— — —
পর্দার ফাঁক দিয়ে রোদের হালকা রেখা এসে পড়ছে কিয়ারার মুখে। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে ঘুম, ঠোঁটে কেমন যেন এক লাজুক ক্লান্ত হাসি।
বালিশের পাশেই লোকটার হাত ছুঁয়ে আছে তার চুলে। সারা রাতের মৃদু ছোঁয়া, কান্না, আর একে অপরের নিঃশব্দ ভালোবাসার পর তাদের শরীর আর মনের মধ্যে এখনো গরম নিঃশ্বাসের ছাপ রয়ে গেছে।
ঘরের ভেতর নরম সুবাস—লোকটার পারফিউম আর ওর শরীরের গন্ধ মিশে একটা ঘোর তৈরি করেছে।
কিয়ারা চোখ খুলে পাশ ফিরে দেখে লোকটা এখনো তার পাশে,কাত হয়ে গালে হাত দিয়ে ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
কিয়ারা ফিসফিস করে বলল…
ঃ- আপনি…এভাবে তাকিয়ে কি দেখছেন ?..!"
তিনি আধা ঘুমন্ত চোখ খুলে একটু হাসে, কিয়ারার গালে হাত রাখে,
ঃ- তোমাকে দেখছি, আমার রায়া, আমার হুঁরপরি!.. মনে হচ্ছে আমার ছোঁয়ায় তোমার সৌন্দর্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। হুঁ..হুঁ…, এজন্যেই লোকে বলে স্বামীর ছোঁয়া পেলে মেয়েদের সৌন্দর্য বাড়ে।
কিয়ারা লজ্জায় লোকটার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। তারপর চোখমুখ কুঁচকে বলল…
ঃ- প্লিজ এমন করবেন না, আপনি সকাল সকাল আবার শুরু করেছেন!...
লোকটা নিচু গলায় হেসে ভ্রু কুঁচকে বলল…
ঃ- তোমার লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা আমার কাছে বড্ড বেশি প্রিয় যে, তাই এমন করছি। আচ্ছা আর বলছি না। এখন উঠতে হবে তো। আমাকে যেতে হবে না??... নাকি এখন তুমি তোমার ভাইয়া কে আর ভয় পাচ্ছো না।
এই কথা শুনে কিয়ারা তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো । তারপর তিনি উঠে বসে, জানলার দিকে তাকায়। বাইরে পাখির ডাক, সূর্যের আলো, অথচ ঘরের ভেতর এখনো আগের রাতের উষ্ণতা টিকে আছে।
কিয়ারা তাড়াতাড়ি চাদর গায়ে জড়িয়ে, চুল ঠিক করে খোঁপা করছে।
লোকটা ধীরে ধীরে ওর কাছে এসে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে—
ঃ- “রাতের মতোই তোমার শরীরের মাতাল করা গন্ধ এখনো আমার মধ্যে লেগে আছে…। উমমম্..!.. ইচ্ছে করছে টুপ করে খেয়ে ফেলি।
কিয়ারা প্রচন্ড লজ্জা পেয়ে ফিসফিস করে বলল…
ঃ- এবার একটু দয়া করে চুপ করুন, অসভ্য লোক। আর বাসায় শুধু আপনি আর আমি নেই, আরো মানুষ আছে সেটা ভুলে যাবেন না।
ঠিক তখন দরজার বাইরে কিয়ারার ভাইয়ের কণ্ঠ—
ঃ- কিয়ারা, উঠেছিস?... কিরণ অপেক্ষা করছে।
দুজনেই স্থির হয়ে যায়! কিয়ারা এক নিঃশ্বাসে মাহাদকে ঠেলে আলমারির ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা টেনে দেয়। মাহাদ ভেতর থেকে কিয়ারার হাত ধরে ফিসফিস করে বলে,
ঃ- আমি এখানেই আছি।
কিয়ারার গাল লাল হয়ে ওঠে।
সে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
ঃ- হ্যাঁ ভাই, উঠছি… একটু পরে নাস্তা করবো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
ভাই চলে গেলে কিয়ারা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আলমারির দরজা খোলে।
তিনি বেরিয়ে এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল….
ঃ- অবশেষে এটাই দেখার বাকি ছিল, আমাকে এই আফনান মাহাদ খান কে নিজের দু দু বার করে বিয়ে করা বউয়ের কাছে এসে, তার ভাইয়ের ভয়ে আলমিরার মধ্যে লুকোতে হয়েছে।
কিয়ারা লোকটার বলার ধরন দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসে,
ঃ- আর একটু কষ্ট করুন, এমন একদিন আসবে , যখন আপনাকে আর লুকিয়ে লুকিয়ে বউয়ের কাছে আসতে হবে না।
আর কারো ভয়ে কোথাও লুকোতেও হবে না।
লোকটা ওর কথা শুনে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল…
ঃ- প্রমিস দিচ্ছি… আজ রাতে আবার আসব…না।
একটু থেমে, চোখ নামিয়ে যোগ করে বলল…
ঃ- তবে… তোমার কাছে না এসে বোধদয় থাকতে পারব না।
— — —
ঘরের এক কোণে টেবিলে এখনো শুকিয়ে যাওয়া ভেজা শার্ট, আর… লোকটা দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে কিয়ারার ওড়না কোমরে পেঁচিয়ে লুঙ্গির মতো পরা অবস্থায়!
কিয়ারা বিছানায় বসে থেকে তাকিয়ে দেখছে । লোকটার এমন করুন অবস্থা দেখে ও যেন হাসি চেপে রাখতে পারছে না।
লোকটা ওকে মুখ চেপে হাসতে দেখে গম্ভীর গলায় বলল…
ঃ- খবরদার, একদম হাসবে না। তোমার জন্য আমাকে এখন লুঙ্গি পড়তে হচ্ছে, তাও আবার কিনা ওড়না দিয়ে!!... সামনে যে আরোও কতকিছু করতে হবে কে জানে!...
কিয়ারা লোকটার কথা শুনে হাসি চেপে রেখে বলল…
ঃ- ভাইয়া বাসায় ছিল, তাহলে আমি কাপড় কোথা থেকে আনতাম বলুন?...
তারপর আবার কিয়ারা ফিসফিস করে বলল…
ঃ- আর আমি কি আপনাকে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আমার কাছে আসতে বলেছিলাম!?...
লোকটা ওর কাছে এসে বলল…
ঃ- তুমি যেভাবে গত রাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে, মনে হয় এই ওড়নাটার গন্ধও তোমার মতো…।
তারপর একটু থেমে, মুচকি হেসে,
ঃ-তাই ভাবলাম, শরীরের সাথে লেপ্টে রাখি। এবার বেশ ভালো লাগছে। এই ওড়না টা আমি নিয়ে যাচ্ছি। তুমি যখন কাছে না থাকবে তখন এটা আমায় তোমার কথা মনে করিয়ে দেবে।
কিয়ারার গাল টকটকে লাল হয়ে যায়। একটা অজানা অনুভূতিতে অন্তরে শিহরণ খেলে যায়। লোকটা ওকে কতটা ভালোবাসে!..
ও তার হাত থেকে ওড়নার একপাশ টেনে নেয়, তারপর বলল….
ঃ- আপনি একটা উন্মাদ লোক, এখন তাড়াতাড়ি ফিরে যান ভাইয়া দেখে ফেললে আমায় মেরে ফেলবে।
লোকটা ওর শেষের কথাটা শুনে বেশ গম্ভীর মুখে ফিসফিস করে বলল…
ঃ- খবরদার কখনো এমন কথা বলবে না। জন্ম মৃত্যু আল্লাহর হুকুমে, তাই বলে তুমি কথায় কথায় সেটা বলতে পারো না। এটা আমার একদম পছন্দ নয়।
তার ঠোঁট কিয়ারার কানে ছুঁয়ে যায়—
ঘরের ভেতর আবারও এক নিঃশব্দ গরম আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে কিরণের ডাক ভেসে এলো—
ঃ- কিয়ারা! নিচে আয়, নাস্তা রেডি.. এতক্ষণ লাগে?.. কলেজে যাবি না নাকি??!...
কিয়ারা চমকে মাহাদকে ঠেলে ব্যালকনিতে নিয়ে যায় ।
লোকটা হেসে বলল…
ঃ- ওড়না কিন্তু আমি রাখব…”।
কিয়ারা মুখ বাঁকিয়ে বললো
ঃ- আচ্ছা ঠিক আছে এবার যান এখান থেকে। উফফফ ধরা পড়ে যাবো তো।
লোকটা ব্যালকনি থেকে নিচে নেমে গেল, কিয়ারা বেশ অবাক হয়ে লোকটার চলে যাওয়া দেখলো।
ঘরে আসতেই ফোনের নোটিফিকেশন বেজে উঠল। কিয়ারা ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে দেখলো ম্যাসেজ এসেছে।
“বৃষ্টিতে ভিজে এসেছিলাম, এখন তোমার প্রেমে ভিজে ফিরে যাচ্ছি।”
কিয়ারা ম্যাসেজ টা পড়ে লজ্জায় হেসে উঠলো। তারপর তড়িঘড়ি করে কলেজের জন্য রেডি তে শুরু করলো।
ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল আটটা ছুঁয়েছে।
ঘরে এখনো হালকা বৃষ্টির গন্ধ, জানালার পাশে রাখা একজোড়া চা-কাপ শুকিয়ে গেছে, আর টেবিলের কোণে পড়ে আছে মাহাদের রেখে যাওয়া সেই ছোট্ট কাগজটা—
“তুমি যদি হাসো, তবে পুরো পৃথিবীকে হার মানানো যায়।”
কিয়ারা ধীরে ধীরে সেই কাগজটা তুলে বুকের কাছে চেপে ধরে। চোখে অদ্ভুত এক মিশ্রতা—লজ্জা, সুখ, আর খানিকটা ভয়।
রাতের ঘটনাগুলো যেন এখনো তার ত্বকে, তার গালে, তার চুলে লেগে আছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে সে। গলায় হালকা স্কার্ফ জড়ায়—যেন কোনো অজানা দাগ, কোনো গোপন গল্প লুকিয়ে রাখছে।
চোখে কাজল টেনে নিজের দিকে তাকায়—মাথা নাড়ে একটু, হাসে নিজেরই দিকে,
“তুই তো পুরো বদলে গেছিস কিয়ারা…”
ঠিক তখনই ড্রেসিং টেবিলের পাশে রাখা ফোনে একটা মেসেজ ভেসে ওঠে —
“ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে সাবধানে যাবে। রাস্তার দিকে আমার লোক থাকবে।”
তোমার মি. খান..
হালকা কাঁপা আঙুলে ফোনটা বুকের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে কিয়ারা বলে,
ঃ- আপনার এই কেয়ারটাই তো আমার অশান্তির মধ্যেও একটুকরো শান্তি।
তারপর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
ড্রইং রুমে ভাই বসে আছে খবরের কাগজ হাতে, গম্ভীর মুখে। ভাইয়া আজকে এখনো বাসায় দেখে কিয়ারা বেশ অবাক হয়ে গেল। কিয়ান চোখ তুলে তাকায় একবার—কিয়ারার মুখে একটু নার্ভাস হাসি।
ঃ- আজ এত সাজগোজ?..
কিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে হালকা ঠাট্টা করে বলে।
কিয়ারা জোর করে হাসে,
ঃ- কলেজে আজ একটা প্রেজেন্টেশন আছে, তাই একটু…।
কিয়ান মাথা নাড়ে, কিন্তু তার চোখে কিছু একটা পড়ে।
দৃষ্টিতে শুকিয়ে যাওয়া একটা কালচে দাগ, হয়তো মাহাদের হাতের ছোঁয়া, কিয়ারার গলার পাশে হালকা ছায়া হয়ে আছে।
কিয়ানের চোখে প্রশ্ন, কিন্তু মুখে কিছুই বলে না।
কিয়ারা তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
বাইরে তখন হালকা রোদ, রাস্তায় ভেজা গন্ধ, আর বাতাসে রাতের মায়ার শেষ নিঃশ্বাস।
গেটের বাইরে এসে কিরণ কে নিয়ে রিকশায় উঠে বসল। কলেজের দিকে যেতে যেতে কিয়ারার দৃষ্টি হঠাৎ থেমে যায়, দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে।
কালো কাচের ভেতর দিয়ে কেবল একজোড়া চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি খেলে যায়।
কিয়ান ওদের পিছনে আসছিল। তাই ও সেই দৃশ্যটা দেখে ফেলে—
চোখে হালকা কঠোরতা, ঠোঁটে একটুখানি সংযত রাগ।
আর ওদিকে মাহাদের চোখে শুধু একটিই কথা—
“তুমি এখন আমার, সম্পুর্ন আমার রায়া।”
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ