#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ০৭
🌿🌿🌿
গাজিপুরে পৌঁছেই, সে তাড়াহুড়ো করে কিয়ারার বাসার দিক চলে। হৃদয় ধুকধুক করছে, প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হচ্ছে সে কিয়ারাকে দেখতে পাবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখতে পায়—শূন্যতা। কিয়ারা নেই।
লোকটার চোখে ক্ষুদ্র হতাশার ছায়া। তারপর সেখান থেকে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে ফিরে গেল। তারপর সেখানে গিয়ে দলের ছেলেদের থেকে জানতে পারল, কিয়ারা এসেছিল ওর খোঁজে , হয়তো অনেক আশা নিয়ে ভাইয়ের থেকে লুকিয়ে চুপিচুপি ওর সাথে দেখা করতে। কিন্তু সে সময়ে মাহাদ কোথাও ছিল না।
কিছুক্ষণের জন্য সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রোদ-ছায়ার খেলায় কিয়ারার মুখ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। মনে মনে বলছে, “তুমি এসেছিলে, আর আমাকে খুঁজে পাওনি… আমি তোমাকে না বলেই ঢাকায় চলে গিয়েছিলাম।”
মুহূর্তগুলো যেন থমকে গেছে—ঢাকা থেকে গাজিপুর, দূরত্ব, সময়ের ফাঁক, সব মিলিয়ে দু’জনের মধ্যে এক ধরনের নিঃশব্দ যোগাযোগের অভাব তৈরি করছে।
লোকটা বুঝতে পারল, কিয়ারা আস্তে আস্তে ওর জন্য কি কি ত্যাগ করেছে, আর সে কখনোই চাইবে না যেন এই ক্ষুদ্র সময়ের ফাঁক আবার জন্ম নেয়।
তখনই সে ঠিক করে— সে আর অপেক্ষা করবে না। কিয়ারার খোঁজে সে নিজেই সব ব্যবস্থা করবে, যাতে আর কোনো ফাঁক, আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি না থাকে।
মাহাদ গাজিপুরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, কিয়ারার বাসার সামনে। চোখে এক অদ্ভুত তীব্রতা—মুক্তি নয়, শুধুই উন্মাদনা।
“রায়া… তুমি কি সত্যিই চলে গেলে?” সে একাকী বলে, যেন বাতাস তার কথাগুলো ছুঁয়ে নিতে পারে।
হাত দুইটি শক্ত করে মুঠো বানায়। অন্তরে গর্জন করছে—এতো কাছাকাছি থেকেও সে কিয়ারাকে ছুঁতে পারল না। মনে হচ্ছে, দুনিয়ার সব দূরত্বই এখন কিয়ারার সাথে ওর সম্পর্কের বাধা।
মাহাদ হঠাৎ গাড়ির দরজা জোরে ধাক্কা দেয়। ধুলো উড়ে যায়। সে জানে, তার ধৈর্য শেষের পথে। এক্ষুনি তার রায়া কে সামনে চাই!...
নিজের ভিতরের উন্মাদ বেপরোয়া আবেগ সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
“আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো রায়া… যেখানেই থাকো!” মাহাদ গর্জন করে বলে। কথাগুলো শুধু শব্দ নয়, এক ধরনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ—অভিযোগ, ভালোবাসা, আসক্তি সব মিলিয়ে।
তার দৃষ্টি আবার ঘরের জানালায়। নিঃশব্দ, শান্ত, তবে হৃদয়জ্বালা সেই অভাবের অনুভূতি—যেখানে কিয়ারার হাসি, কণ্ঠ, স্পর্শ সব হারিয়ে গেছে।
মুহূর্তের মধ্যে মাহাদ গাড়িতে ফিরে আসে। ইঞ্জিন জ্বালায়, আর ড্রাইভ শুরু করে—কোনো ঠিকানা নয়, শুধু কিয়ারার খোঁজ। প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি রাস্তার আলো তাকে কিয়ারার দিকে টেনে নিচ্ছে, আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—“আজ রাতের পর আর কোনো ফাঁক থাকবে না। আমি খুঁজে বের করব। তুমি থাকো বা না থাকো, আমি পৌঁছাব।”
শহরের লাইটগুলো উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু মাহাদের চোখে শুধু একটাই ছবি—রায়া। উন্মাদনা, ভালোবাসা, আসক্তি—সব মিলিয়ে তার হৃদয় যেন জ্বলে উঠছে।
মাহাদের ফোনের স্ক্রিনে হালকা আলো ঝলমল করছে। সে এক মিনিট থামল, তারপর মনোযোগ দিল।
“উত্তরা… আমার রায়া?” সে ফিসফিস করে বলল, গলার ভেতর দিয়ে যেন একরাশ উত্তেজনা ও উদ্বেগ জেগে উঠল।
মনে পড়ল—কায়রার বিয়ের সময়ে সে নিজেই তার লোক দিয়ে কিয়ারার বাড়িতে ক্যামেরা সেন্সর লাগিয়েছিল। এখনই সেই তথ্য তাকে কিয়ারার অবস্থানের প্রমাণ দিচ্ছে।
মাহাদের নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে যায়। হাত জোরে ধরে, যেন নিজের ভিতরের আবেগকে কিছুটা সামলাতে চায়।
“তুমি ওখানে… তুমি সত্যিই ওখানে আছ?” সে বলল, চোখে সেই তীব্র উন্মাদনার ছাপ।
গাড়িতে ফিরে, ইঞ্জিন জ্বালিয়ে মাহাদ রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি লাইট—সব কিছু যেন তাকে কিয়ারার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করে, “আজ রাতে আর কোনো দূরত্ব থাকবে আমি তোমার কাছে পৌঁছাবোই, রায়া।”
তার চোখে শুধু কিয়ারার ছবি। সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্য আর তার নিজের অন্তর জ্বালা—সব মিলিয়ে তার হৃদয় যেন আগুনে দগ্ধ।
মুহূর্তে মাহাদের পায়ে শক্তি এসে গেছে। সে জানে, এখন আর আরাম নয়, শুধু একটাই লক্ষ্য—কিয়ারার সামনে পৌঁছানো।
রাস্তার বাতাস তার মুখে ধাক্কা দেয়। মনে মনে ভাবছে, কিয়ারা যদি জানতে পারে সে এভাবে আসে… তবে কি তার চোখে ভয়, নাকি আশার ঝলক?....
মাহাদ জানে—আজ রাতের পর আর কোনো ফাঁক থাকবে না। কিয়ারার খোঁজে সে সব বাধা পেরিয়ে যাবে।
— — —
উত্তরার দুইতলা পুরনো কিন্তু জমকালো বাড়িটা যেন জীবনের স্পন্দনে ভরে গেছে। দোতলার বারান্দা থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় উঠোনে লাইটের মালা ঝুলছে, বড় চাচার হাসির শব্দ, খালাতো ভাইবোনদের ঠাট্টা, আর রান্নাঘর থেকে আসা গরম মাংসের গন্ধ—সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ।
“দেখো কে এসেছে! আমাদের কিয়ারা!” — দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নামতেই বড় চাচী জোরে বলে উঠলেন।
সবাই কিয়ারাকে ঘিরে ধরে। নামিরা ওর গাল টিপে বলে, “এই মেয়েটা তো আরও সুন্দর হয়ে গেছে!”
তারপর জিজ্ঞেস করে, ওর এক্সাম কেমন হয়েছে ?..”
আর কিয়ারা কেবল মিষ্টি করে হাসে।
তার হাসির পেছনে একটা নীরবতা লুকানো থাকে—যে নীরবতার নাম মাহাদ।
ভেতরে ভেতরে মনটা ভারী হয়ে আসে, কিন্তু বাইরে থেকে ও আগের মতোই প্রাণবন্ত থাকার চেষ্টা করে।
ঃ- হ্যাঁ… সবাই ওকে নিয়েই ব্যস্ত, আমিও যে আছি সেটা যেন সবাই ভুলেই গেছে।
কিরণ ওর পিছন থেকে এসে বলে উঠল।
ছোট চাচী পাশ থেকে বলে ওঠেন….
ঃ- কে বলেছে তোকে ভুলে গেছি??... আমরা তো আমাদের দুই মেয়েকেই ভীষণ মিস্ করেছি।
ঃ- আচ্ছা তোরা এখন ফ্রেশ হয়ে আয়। আমরা দুপুরের খাবার খাইনি এখনো, তোদের নিয়ে একসাথে খাবো বলে। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়।
বড় চাচী বললেন ওদের দুজনকে উদ্দেশ্যে করে।
কিয়ারা ও কিরণ উনার কথায় মাথা নাড়িয়ে উপরে চলে গেল।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই কিয়ারার চোখে জলের ধোঁয়া এসে জমে।
শেলফের ওপরে রাখা ছোট্ট একটা ফটো ফ্রেমে মাহাদের তোলা ছবি—যেটা ও লুকিয়ে রেখেছিল।
ফটো ফ্রেমটায় সযত্নে আঙুল বুলিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“আপনি জানেন, আমি গিয়েছিলাম আপনার কাছে… কিন্তু আপনি ছিলেন না…”
বাইরে তখন ভাই-বোনেদেল হাসির শব্দ, কেউ গান চালিয়েছে পুরনো হিন্দি ক্লাসিক।
এই কোলাহলের মাঝেও কিয়ারার ভেতরটা একদম ফাঁকা—শূন্য।
হঠাৎ বারান্দা দিয়ে এক দমকা হাওয়া এসে জানালার পর্দা উড়িয়ে দেয়।
কিয়ারার মন কেমন যেন ছটফট করে ওঠে—মনে হয় কেউ যেন ওর নাম ধরে ডাকল হাওয়ার ভেতর থেকে…
“রায়া…”
ওর বুকের ভেতর ধক করে ওঠে, কিন্তু বাইরে কেউ নেই।
দূরের আলো, আর কানের কাছে বাজতে থাকা সেই নাম—মাহাদ—মিশে যায় দুপুরের নিস্তব্ধতায়।
— — —
দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আড্ডায় মেতে উঠেছে ভাই বোনেরা।
ঃ- কিরা তোর জানের জান বান্ধবীরা আসছে নাকি!... শুনে আসলাম মায়ের কাছে থেকে।
কিরণ মিটিমিটি হেসে কিয়ারা কে বলে উঠলো।
কিয়ারা ওর কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল…
ঃ- কারা আসছে??....
ঃ- আরে আরিয়া রা বেরাতে আসছে। ওদের ও তো তোদের সাথে এক্সাম শেষ হয়েছে তাই।
পাশ থেকে নামিরা বলে উঠলো।
কিয়ারা একথা শুনে কটমট করে কিরণের দিকে তাকালো। তারপর দাঁত কিরমিরিয়ে বলল…
ঃ- একটা লাত্থি মাইরা উগান্ডা পাঠাইয়া দিমু। তোরে কেডা কইছে ওরা আমার জানের জান??... লাত্থি খাসনা অনেক দিন হইসে তাই এমন করতাছোস?..
ঃ- আরে ও মজা করেছে। তোকে রাগাতে বলেছে, আর তুইও রেগে গেলি।
নামিরা আপু কিয়ারা কে শান্ত করতে বলে উঠে।
ঃ- আরে আপু ওর কথা বাদ দাও তো। টমেটো খোর কোথাকার।
কিরণ ভেংচি কেটে বললো।
কিয়ারা ওর কথা শুনে সোফা থেকে উঠে দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। তারপর ফিরে এসে সোফায় বসে বলল…
ঃ- এবার তোর কথায় আমি একটুও মাইন্ড করিনি। আমার তো টমেটোর কথা মনেই ছিলনা।
বলেই হাতে থাকা টমেটো যে ভীষণ তৃপ্তি নিয়ে কামড় বসিয়ে দিল।
ঃ- কি ব্যাপার হ্যাঁ!... তুই এমন কি নিয়ে ভাবছিল?... যে তোর এতো স্বাদের টমেটো খাওয়ার কথাই ভুলে যাচ্ছিস।
কাউকে মনে ধরেছে নাকি??... বল…বল!?...
নামিরা আপু প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে বলে উঠল। কিরণ ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি করে হাসছে। আসল ঘটনা টা তো ও জানে। যে একবারে শুধু মনেই ধরেনি, সোজা বিয়ে করে আরও কোথাও ধরাধরি কমপ্লিট। তাই মুখ টিপে হাসছে কিরণ।
কিয়ারা ওকে এভাবে চুপি চুপি হাসতে দেখে চোখ রাঙানি দিল। সেটা আবার নামিরা আপু দেখে ফেলল।
ঃ- এই কিরা এই, তুই ওকে চোখ রাঙানি দিচ্ছিস কেন??... তারমানে নিশ্চয়ই কিছু ঘটনা আছে। এই কিরণ তোর পেটে কিয়ারা যা জমা রেখেছে, সবকিছু পাই টু পাই বের করে দে তো। আমিও শুনি কে সেই মহান ব্যক্তি টাহ।
এবার কি হবে?.. নামিরা তো কিরণ বেচারি কে চেপে ধরেছে সত্যি কথা জানতে। কারণ ও ভালো করেই জানে কিয়ারা নিজে থেকে না বললে ওর মুখ থেকে কিচ্ছু বের করা যাবে না। তাই সোজা ওর লকার কিরণ কে চেপে ধরেছে। কারণ কিয়ারা নিজের সবকিছুর লকার ভেবে কিরণের কাছেই সব শেয়ার করে। আর এই মহামূল্যবান তথ্যটা এ বাড়ির সকলের জানা আছে।
এদিকে এখন অবস্থা বেগতিক দেখে কিরণ কোনো রকমে এক দৌড় মেরে ওখান থেকে উঠে উপরে চলে যায়।
কারণ না বললে নামিরা আপু ওকে ছাড়বে না, আর বলে দিলে কিয়ারা ওকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিবে। তাই দুজনের হাত থেকে রক্ষা পেতেই এভাবে পালিয়ে গেল।
এদিকে ওকে এভাবে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখে নামিরা হতভম্ব হয়ে বসে রইল। কিয়ারা ওকে একবার দেখে নিজেও উপরে চলে গেল।
— — —
সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর সবাই একসাথে ড্রইং রুমে বসেছে। প্রায় অনেক দিন পর ওরা আসাতে ওদের বাবা-চাচারাও তাড়াতাড়ি অফিস থেকে চলে এসেছে।
অনেক দিন পর পরিবারের সদস্যরা একসাথে হয়েছে। ওদের ফুফাতো ভাই বোন গুলোও চলে এসেছে সন্ধ্যায়। সবাই উপস্থিত আছে কিন্তু চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলে গুলো নেই। কিয়ান ভাইয়া তো আসেইনি, আর কায়রান ভাইয়া ওদের কে দিয়ে দুপুরে খেয়েই আবার গাজীপুরে ফিরে গিয়েছেন। আর একজন যে সেই সুদূর কানাডায় পাড়ি দিয়েছিল।
হ্যাঁ নীলাভ চৌধুরী , কিয়ারার বড় চাচার ছেলে। কিরণের বড় ভাই।
একজন জ্ঞানপিপাসু, আত্মবিশ্বাসী, পরিবারের কথায় খুব সহজে বাঁকতে না পারে।
নীলাভ কলেজ শেষ হওয়ার পর হায়ার স্টাডির জন্য বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু পরিবারের কেউ, বিশেষ করে বাবা-মা ও চাচা চাচী কেউই এতে রাজি নয়।
তারা ভেবেছিল—ছেলেটা এখনও ছোট, এতদূরে পাঠানো ঠিক হবে না, দেশে অনেক সুযোগ আছে।
কিন্তু নীলাভ তাতে হাল ছাড়ে না।
সে পড়াশোনার গুরুত্ব বোঝায়, যুক্তি দেয়, অনুরোধ করে, বোঝানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সবাই মানতে চায় না।
শেষপর্যন্ত জোরজবরদস্তি করেই সে নিজের পথে এগোতে বাধ্য হয়।
সেদিন টা ছিল একটা বিষন্ন বিকেল।
নীলাভ ভাইয়া কক্ষের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
সন্ধ্যার আলো, হালকা বৃষ্টির শব্দ আর শহরের দূরের গাড়ির আলো—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত উদাস পরিবেশ তৈরি করেছিল।
তার হাতে ব্যাগ, ভেতরে নতুন বই আর নোটবুক। কিন্তু চোখে ঝলকানো উত্তেজনা আর মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
“আমি যাচ্ছি,” নীলাভ মৃদু আওয়াজে বলল নিজের সাথে, যেন কারো শুনার ভয় নেই।
কিন্তু ভেতরে মনটা উথালপাথাল। সে জানত, পরিবারের সবাই এতে রাজি নয়।
ডাইনিং রুম থেকে বাবা মৃদু আওয়াজ দিলেন, “নীলাভ, তুমি কি সত্যি যাচ্ছো? এতদূরে, একা?”
মা কণ্ঠ মিলিয়ে বললেন,
ঃ- নীলাভ একটু ভেবে নে, ওতো দূরে তুই থাকবি কিভাবে?.. দেশের অনেক সুযোগ আছে, কেন এত জেদ করছিস??...
নীলাভ সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা, কিন্তু ভেতরে এক ফোঁটা দুঃখ।
ঃ- আমি জানি, তোমাদের জন্য এটা কঠিন। কিন্তু আমার পড়াশোনার জন্য, এটা একমাত্র সুযোগ। আমি নিজেই আমার পথ বেছে নেব।
দূরের বাতাস বইছিল জানালার বাইরে। বাবা, মা আর বড় চাচা , বড় চাচী সবাই চুপচাপ।
নীলাভ বুঝতে পারল, আজ রাতে কোনো সমাধান হবে না। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল—নিজের ইচ্ছায়, নিজের পথে এগোবে।
পরদিন ভোর, সমস্ত বাড়ি ঘুমে। নীলাভ সাইলেন্টলি ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজা খুলল।
শুধু চুপচাপ স্টেয়ারের দিকে তাকিয়ে নেমে গেল।
চুপচাপ, যেন কোনো শব্দ না হয়।
হৃদয় জুড়ে উত্তেজনা, আর মুখে এক অদ্ভুত হাসি—সে জানে, এবার নতুন অধ্যায়ের শুরু।
ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে, গাড়ি অন, ইঞ্জিনে হালকা গর্জন।
নীলাভ উঠে বসল, শেষবার পিছন ফিরে দেখল—পরিবারের জানালা, যেখানে বাবা-মা আর ভাই-বোনের মুখ এখনও অন্ধকারে মিশে আছে।
একটা গভীর নিশ্বাস। তারপর গিয়েছিল ভবিষ্যতের দিকে—নিজের স্বপ্নের পথে।
তারপর ধীরে ধীরে সবাই ভাইয়ার জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ ভাইয়া তো নিজের জেদ বজায় রেখে চলেই গিয়েছিল।
বড় চাচা পুরনো দিনের গল্প বলছেন, পাশে চাচী দোয়াত থেকে চা ঢালছেন কাপের পর কাপ। কিয়ারার হঠাৎ করেই মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ চৌধুরী বাড়িতে কিয়ারা যদি কারো কাছে সবথেকে বেশি আদরের হয়ে থাকে, তবে সেটা ছিল নীলাভ ভাইয়া। আর সেই মানুষটি যখন ওদের সবাইকে ছেড়ে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য ওতো দূরে চলে গেল। তারপর থেকে কিয়ারা আজ পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করেনি নীলাভের সাথে। যখন নীলাভ ভাইয়া চলে গেল, তখন কিয়ারা আরও অবুঝ ছিল। তাই সেদিনের সেই কষ্টটা ভুলতে পারেনি।
ঃ- এই যে কিয়ারা, মনে আছে তুই ছোটবেলায় কেমন করে আমাদের বাগান থেকে কাঁচা আম চুরি করতে?” —
চাচী মজা করে বলেন।
সবাই হেসে ওঠে।
কিয়ারা মাথা নিচু করে মিষ্টি হেসে বলে,
ঃ- চুরি না চাচীমা, তখন তো ছোট ছিলাম। কাঁচা আমে টক ছিল, তাই খেতে খুবই ভালো লাগতো।
নামিরা আপু পেছন থেকে বলে, ঃ- এই যে বড় হয়েছে, এখনো টক ভালোবাসে! গাজীপুরে গিয়েও নিশ্চয় কারো টক-মিষ্টি কথায় হার মেনেছে!”
কিয়ারা লজ্জা পেয়ে বলে,
ঃ- আরে না আপু, এমন কিছু না…।
কিন্তু হাসির ভেতরেই একটু ঝাপসা হয়ে আসে চোখটা।
মা পাশে বসে কিয়ারার চুলে হাত বুলিয়ে দেন।
ঃ- তুই একটু শুকিয়ে গেছিস রে কিয়ারা, ঠিকমতো খাস না কেন?..
ঃ- না মা, ঠিকই খাই,” — বলে কিয়ারা — পরিক্ষার টেনশনে একটু এমন লাগছে।
ছোট চাচী তখন বলে ওঠেন,
ঃ- আগে তোকে একটুও বসে থাকতে দেখতাম না, এখন দেখি অনেক শান্ত হয়ে গেছিস। বড়দের মতো হয়ে গেছিস রে। মেয়ে আমাদের বড় হয়ে যাচ্ছে দেখছি।
কিয়ারা হেসে চা তুলে নেয়। কিন্তু ওর চোখে তখন ভাসে সেই চুপচাপ নিজস্ব লোকটা—ওর কথাহীন উপস্থিতি, ওর সেই গভীর দৃষ্টি।
সবাই যখন হাসছে, কিয়ারার মন তখন অন্য কোথাও।
সবাই খেয়াল করে না, কিন্তু মা বুঝে ফেলেন।
চুপিচুপি পাশে এসে বলেন,
ঃ- মন খারাপ নাকি, কিয়ারা?.. কি হয়েছে তোর?.. আসার পর থেকেই খেয়াল করছি কেমন চুপচাপ হয়ে আছিস।
কিয়ারা মাথা নেড়ে বলে,
ঃ- না আম্মু, কেবল মনে পড়ে গেলো গাজীপুর শহরটার কথা…।
মা হালকা হেসে বলেন,
ঃ- গাজীপুর তো আবার ডেকে নেবে তোকে, তাও মন খারাপ করছিস কেন??...
কিয়ারা এক মুহূর্ত থেমে মৃদু স্বরে বলে,
ঃ- হয়তো… কেউ ডেকেও রাখবে…।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ