ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (২য় খন্ড)

১৪তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿

#দ্বিতীয়_খণ্ড 
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন 
পর্বঃ- ১৪
🌿🌿🌿
রাতটা গভীর। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে কিয়ারার মুখে পড়ছে। পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে—তবুও এই ঘরটা যেন শ্বাসরুদ্ধ লাগে আজ।
আলিশা রা চলে যাওয়ার পর থেকে কেউ কিয়ারাকে কথা বলতে দেখেনি। সবাই ভেবেছে, ও ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু দরজার ওপাশে কিয়ারা নিজের দুনিয়াটা ভেঙে চুরমার করে ফেলছে।
সে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিলো, তারপর হোঁচট খেতে খেতে মেঝেতে বসে পড়ল।
দুই হাত মুখে চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।
ঃ- সবাই নিজেদের মতো বাঁচে… আমিই বোধহয় ভুল জায়গায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম…। 
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছে।
বিছানার পাশে রাখা টেবিলে ফোনটা হাতে নিল কিয়ারা। তারপর সেটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল।
একটু পর কাঁপা হাতে মাহাদের একটা ফটো বের করে নিলো। আঙুল বুলিয়ে বলল,
ঃ- আপনি জানেন মাহাদ, আমি আপনার মুখটা ভুলতে পারি না… অথচ আপনি আজ যেন চেনেনই না আমাকে…। 
তারপরই চোখে ভেসে উঠল এক টুকরো স্মৃতি—
(ফ্ল্যাশব্যাক)
সেই দিন, বৃষ্টির বিকেল। মাহাদ হালকা ভিজে কিয়ারার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
ঃ- আমার রায়া…আমার হুঁরপরি… তুমি হাসলে মনে হয়, আমার পৃথিবীটা রংধনু হয়ে যায়।
তখন কিয়ারা লজ্জা পেয়ে বলেছিল,
ঃ- আপনি এমন কথা বলবেন না, আমার লজ্জা লাগে খুব।
আর তখন উন্মাদ লোকটা ঠোট কামড়ে হেসে বলেছিল,
ঃ- তোমার লাজে রাঙা মুখশ্রী যে, আমার বড্ড বেশী প্রিয়!... রায়া…আমার হুঁরপরি!..
সেই মুহূর্তটা যেন কিয়ারার বুকের ভেতর গেঁথে আছে।
বাস্তবে ফিরে এলো, সে চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে বলে,
ঃ- আপনি এমন করে মুখ ফিরিয়ে নিবেন সেটা আমি ভাবিনি… একটুও ভাবিনি যে।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
বাইরে তখন হঠাৎ করে বজ্রপাত হলো। বৃষ্টির শব্দ ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল, যেন প্রকৃতিও তার কান্নার সাক্ষী।
সে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল, ফোনটা বুকে চেপে।
তার চুল এলোমেলো, ঠোঁট কাঁপছে।
মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
"আমি চেয়েছিলাম শুধু তোমার একটুখানি নজর… কিন্তু তুমি তো তোমার পুরো পৃথিবীটা দূরে সরিয়ে দিলে…"
চোখের পানি ফোনের স্ক্রিনে ছড়িয়ে পড়ল। বাইরে ঝড়ের শব্দে ভেসে গেল কিয়ারার মৃদু কণ্ঠ—
“মাহাদ…”
অন্ধকার ঘরটা যেন তার কান্নার সঙ্গী হয়ে নিঃশব্দে কাঁপতে লাগল।
— — —
রাত প্রায় শেষের দিকে। খান ম্যানশনের চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। কেবল ছাদের ওপর থেকে হালকা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ।
মাহাদ নিজের ঘরে বসে আছে—বিছানার কিনারায়। সামনে খোলা একটা ল্যাম্প টেবিল, তার আলোটা অন্ধকার ঘরে হালকা কমলা ছায়া ফেলছে।
তার চোখে লালচে রেখা, যেন ঘুম নয়, কষ্টই সেখানে বাসা বেঁধেছে।
এক হাতে গ্লাস ধরা, অর্ধেক জল। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
সে বারবার নিজের ফোনটা অন করছে, আবার বন্ধ করছে।
হোয়াটসঅ্যাপে কিয়ারার নাম—দেখে থেমে যায়, তারপর স্ক্রিন অফ করে ফেলে।
“কেন আমি এমন করছি…” নিজেকেই বলে ফেলে সে, কণ্ঠটা কর্কশ।
তারপর মুষ্টিবদ্ধ করে টেবিলের ওপর ঘুষি মারে—একটা শব্দ, তারপর নিস্তব্ধতা।
তার বুকের ভেতরটা যেন আগুনে জ্বলছে।
সে জানে, আলিশার পরিবারের সাথে সম্পর্ক মানে শুধু একটা প্রপোজাল নয়—এর পেছনে কিছু আছে, অজানা, অন্ধকার কিছু। কিন্তু তবুও সে চুপ।
কারণ দাদাভাই এর চোখের সেই ক্লান্ত দৃষ্টি, বাবার মাথা নিচু করা মুখ… সব মিলিয়ে সে নিজের সিদ্ধান্তের ওপর তালা মেরে ফেলেছে।
ঃ- আমি কারো কথা শুনে নিজেকে বদলে ফেলব না… কিন্তু এখন আমি কিছু করতেও পারবো না।
তার চোখের কোণ বেয়ে একটা জল গড়িয়ে পড়ল।
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
মাহাদ গলা পরিষ্কার করে বলল,
“কে?”
ওপাশ থেকে তার মা’এর কণ্ঠ,
ঃ- মাহাদ, একটু খেয়ে নাও আব্বু। সারাদিন কিছু খাওনি তুমি, আর এখন রাত প্রায় শেষ পর্যায়ে, এখনো কিছু খাওনি তুমি।
ঃ- পরে খাবো আম্মু… এখন ক্ষিদে নেই যে!..
কণ্ঠটা শক্ত, অথচ তার ভিতরটা একেবারে ভেঙে পড়ছে।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর সে ধীরে ধীরে জানালার পাশে গেল।
বাইরে দূরে রাতের আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে।
সে নিজের হাত দুটো জানালার গ্রিলে রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে ভেসে উঠল কিয়ারার মুখ— হাসিমুখ, তারপর কষ্টে ভরা চোখ…
মাথার ভেতর ভেসে উঠল তার শেষ দেখা, যখন কিয়ারা নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল খান ম্যানশন থেকে।
মাহাদ নিজের বুকের ওপর হাত রাখল—চেপে ধরল যেন কিছু থামাতে চায়।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
“তুমি ভালো থেকো রায়া… আমার কলিজা, আমার হুঁরপরি… তোমার সব কষ্ট আমার হোক।‌ আমি যদি আবার কখনো তোমার সামনে আসি, সেটা আমি থাকব না… থাকবে এক অচেনা আমি। তুমি যেন কষ্ট পেওনা কলিজা আমার!.. তোমার চোখের একফোঁটা পানিও যে আমার সহ্য হয়না। 
বাইরে হঠাৎ বাতাস বইল, পর্দা উড়ে এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল।
আর সেই মুহূর্তে, ল্যাম্পের আলোটা হঠাৎ নিভে গেল—
ঘরটা পুরো অন্ধকারে ডুবে গেল, ঠিক যেমন তার ভেতরটা আগেই ডুবে গেছে।
— — —
কয়েকটা দিন কেটে গেছে খান ম্যানশনের মিলাদের পর।
সব কিছু ধীরে ধীরে আগের মতো হয়ে উঠছে, কিন্তু কারো ভেতরটা আগের মতো নেই।
কিয়ারা যেন আগের সেই প্রাণচঞ্চল মেয়েটা আর নেই— যেদিন থেকে খবর পেলো যে, আলিশার জন্য মাহাদের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 
তার হাসিটা আছে, কিন্তু তাতে উষ্ণতা নেই; চোখে আলো আছে, কিন্তু গভীরে কুয়াশা জমে আছে।
এক বিকেলে, কিয়ারার ঘরে সূর্যের নরম আলো পড়েছে।
সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে—
চুলগুলো খোলা, বাতাসে হালকা দুলছে।
তার হাতে এক কাপ চা, কিন্তু ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই।
দূর থেকে ভেসে আসছে কোনো বিয়ের হালকা ঢোলের শব্দ—
মনে হচ্ছে আশেপাশে কারো বাগদান বা মেহেদি অনুষ্ঠান চলছে।
চোখ বন্ধ করতেই, কিয়ারার কানে বাজল মাহাদের কণ্ঠ —
“তুমি ভালো থেকো কিয়ারা…”
সেই রাতে যেভাবে সে পেছন ফিরে তাকালও না, যেন ওর অস্তিত্বই নেই।
কিয়ারার বুকটা হঠাৎ জ্বলে উঠল।
চোখ বেয়ে নেমে এল একটা নীরব অশ্রু।
ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা।
ওর মা ভেতরে ঢুকলেন, মুখে একরকম হাসি, কিন্তু চোখে আনন্দের ঝিলিক।
ঃ- কিয়ারা মা, একটা খবর আছে তোদের জন্য…। 
কিয়ারা চায়ের কাপটা নামিয়ে বলল,
 ঃ- আবার কি খবর আম্মু??...
ওর মা বললেন,
ঃ- আলিশা রা আজকে বিকেলে আসবে। একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে।
কিয়ারা মাথা তুলল, কণ্ঠে হালকা কৌতূহল—
ঃ- ব্যাপারটা কী?... 
ওর মা মিষ্টি হেসে বললেন,
ঃ- সেদিন না বলে গেল যে, মাহাদের বাবা আলিশার জন্য প্রস্তাব রেখেছেন!..… আলিশার বিয়ে ঠিক হচ্ছে মনে হয়। ওরা মাহাদের বাবার প্রস্তাবে রাজী হয়েছে। 
কিয়ারার মুখের হাসিটা ঠিক সেই মুহূর্তে থেমে গেল।
চোখের পলকে তার চারপাশের আলো যেন ম্লান হয়ে গেল।
মনে হল, বুকের ভেতর কেউ একটা ছুড়ি গেঁথে ধরল—
যে নামটা শুনতে সে মরিয়া, সেই নামটাই যেন এখন তাকে ছিঁড়ে ফেলছে।
আর ওর মা হয়তো বুঝতেও পারছেন না , যেই খবর টা তিনি আনন্দের সাথে জানাচ্ছেন!..?.. সেটা উনার প্রাণপ্রিয় আদরের মেয়ের কলিজায় ছুড়ি রুপে বিদ্ধ হচ্ছে। একথা জানলে হয়তো তিনি ওকে কখনোই এই খবরটি জানাতেন না। হায় আফসোস!..
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা।
আলিশা ,আরিফা আর তাদের বাবা-মা কিয়ারার বাসায় এলেন।
সবাই বসার ঘরে, চা-নাশতার আয়োজন।
হাসি-আড্ডায় ভরে গেছে ঘর।
কিয়ারা দূর থেকে সব দেখছে।
আলিশা পরেছে হালকা রঙের জামদানি, মুখে আত্মতৃপ্তির হাসি।
ওর মা’কে বলতে শুনল,
ঃ- খান সাহেব নিজে এসেছেন আমাদের বাসায়, মাহাদের জন্য আলিশা কে চেয়েছেন। আমরা আর অমত করতে পারিনি। তাই তার প্রস্তাবে রাজী হয়েছি।‌
কিয়ারার শরীরটা এক মুহূর্তে কেঁপে উঠল।
চোখ বড় হয়ে গেল—
চারপাশের শব্দ, মানুষের কথা, হাসি—সব যেন দূরে চলে গেল।
শুধু কানে বাজতে থাকল একটা শব্দ—
“মাহাদ... আলিশাপুর জন্য…??..
তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।
ভেতরে কিছু যেন ভেঙে গেল শব্দ করে, কিন্তু বাইরে কেবল নীরবতা।
আলিশা এগিয়ে এসে কিয়ারাকে জড়িয়ে ধরল,
ঃ- কিয়ারা যে,ভাবছিস?.. আমি এখন খান পরিবারের হবু বউ।‌ আমি আর কায়রা একসাথে, আমার ভাবতেই কি যে আনন্দ হচ্ছে। 
কিয়ারা হালকা হেসে বলল, 
ঃ- মাশাআল্লাহ… অনেক ভালো খবর।
কণ্ঠটা স্থির, কিন্তু চোখ দুটো শূন্য।
আলিশা হাসতে হাসতে বলল,
ঃ- আর তুই তো আমার প্রিয় বোন, বিয়েতে তোর হাতে আমার মেহেদি পড়ব।‌ 
আর সেই প্রান প্রিয় বোনের কলিজাতেই খুব যত্ন নিয়ে একের পর এক সংবাদে ক্ষত বিক্ষত করছে। 
কিয়ারা কিছু বলল না, শুধু মাথা নাড়ল।
তার বুকের ভেতরটা যেন জমে গেল, ঠান্ডা হয়ে গেল পুরো শরীর।
সবাই যখন আড্ডায় মেতে উঠল, কিয়ারা ধীরে ধীরে ড্রইং রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আলমারির সামনে গিয়ে হেলান দিয়ে বসে পড়ল মেঝেতে।
চোখের জল আর আটকানো গেল না।
মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরতে থাকল—
ঃ- আপনি এমনটা কিভাবে পারলেন মাহাদ?... যাকে চোখে চোখে খুঁজেছি, সেই চোখেই আজ অন্যের নাম?... কৈফিয়ত দিতে হবে আপনাকে মাহাদ?... আমাকে নিয়ে এভাবে খেলার জন্য মাসুল দিতে হবে আপনাকে । 
চোখের জল গাল বেয়ে পড়তে লাগল, বুকের ভেতর কান্না চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা…
বাইরে তখন ঘরে হাসির শব্দ, আর ভেতরে নিঃশব্দ আর্তনাদ।
কিয়ারা কাঁপা হাতে নিজের ডায়েরিটা খুলল,
সাদা পাতায় কালো অক্ষরে লিখল—
“আজ আমার ভালোবাসার মৃত্যুদিন।”
পাতাটা বন্ধ করতেই বাতাসে একটা হালকা শব্দ উঠল, জানালার পর্দা উড়ে এসে চোখের জল মুছে দিল —
যেন প্রকৃতিই তার কষ্ট অনুভব করছে।
— — —
খান ম্যানশন আজ যেন এক উৎসবের প্রাসাদ। চারপাশে আলো, ফুল, মানুষের ভিড়। চন্দন আর গোলাপের গন্ধ মিশে গেছে বাতাসে, কোথাও মেহেদির সুর, কোথাও হাসির কলরব।
অবশেষে এসেই গেল সেই মূহুর্ত, সেটা কারো কাছে আনন্দের, আবার কারো কাছে নিজেকে হারিয়ে ফেলার প্রথম ধাপ।‌ আজ হলো আলিশা ও মাহাদ এর এঙ্গেজমেন্ট। 
আলিশা রঙিন পোশাকে উজ্জল তারাদের মতোই জ্বলজ্বল করছে—
চোখে কাজল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক,
মুখে আত্মতৃপ্তি আর বিজয়ের ছায়া।
সবাই বলছে, কী সুন্দর মানিয়েছে দু’জনকে, যেন জোড়া বাঁধা।”
কিন্তু কেউ জানে না, এই জোড়া বাঁধার আড়ালে কতজনের শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আছে।
অন্যদিকে, মাহাদ…
প্রতিবারের মতোই কালো রঙে রঙিন। কালো শেরওয়ানি, চোখে গাঢ় ক্লান্তি,
মুখে অদ্ভুত নীরবতা।
সবাই ভাবছে ও খুশি, কিন্তু
ওর ভেতরে যেন ঝড় উঠেছে—
প্রতিটি নিঃশ্বাসে কিয়ারার নাম ধ্বনিত হচ্ছে, তবু ঠোঁট সিল করা।
মাহাদের পাশে দাড়িয়ে দাদাভাই, মুচকি হাসছেন,
বললেন— 
ঃ- আজ তো আমার ছানা টা বড় হয়ে গেল। এবার তার অন্য একজনের দায়িত্ব নেয়ার উপযুক্ত সময় হয়েছে।
মাহাদ হালকা হেসে মাথা নাড়ল,
কিন্তু চোখের কোণে বিষন্নতা জমে উঠল। ও চুপিচুপি অন্যদিকে তাকাল..
আর সেখানেই দেখা গেল কিয়ারাকে।
সে দাঁড়িয়ে আছে পেছনের সারিতে,
একটা হালকা গোলাপি শাড়ি পরে,
চোখে কাজল আছে কিন্তু তাতে নেই কোনো উজ্জ্বলতা।
ঠোঁটে হালকা হাসি, ঠিক যেন কোনো অভিনয়। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যেন শোকের ছায়া ঘুরছে।
আলিশা কিয়ারাকে দেখে এগিয়ে এলো—
ঃ- দেখ, কিয়ারা, আজ আমার এনগেজমেন্ট! অবশেষে আজ আমি ভীষণ খুশি। 
কিয়ারা নিজের ভিতরের যন্ত্রণা লুকিয়ে হেসে বলল,
ঃ- মাশাল্লাহ, তোমাদের জন্য দোয়া রইল।
কণ্ঠটা শান্ত, অথচ তাতে কেমন এক গলা ভারী কষ্ট।
আলিশা খুশিতে ঘুরতে ঘুরতে মাহাদের দিকে গেল,
আর তখনই এক মুহূর্তের জন্য মাহাদের চোখ পড়ল কিয়ারার দিকে।
দু’জনের চোখ মিলল…
সময় থেমে গেল।
শব্দ হারিয়ে গেল।
মাহাদ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল কিয়ারার চোখে—
সেই চোখ, যেখানে ও একসময় নিজের পৃথিবী দেখেছিল।
আর কিয়ারার চোখে আজ শুধু প্রশ্ন—
আপনি এমন করতে পারলেন মাহাদ?... 
এক মুহূর্ত পরই মাহাদ মুখ ঘুরিয়ে নিল, ঠোঁটে এক জোর করা হাসি টেনে নিল।
কিয়ারার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চারপাশে হাততালির শব্দ উঠল—
“Congratulations!”
কিন্তু কিয়ারার কাছে সেই শব্দগুলো কানে নয়, বুকের ভেতর কাঁটা হয়ে বিঁধতে লাগল।
অবশেষে আংটি পরানোর মুহূর্ত এল।
আলিশা নিজের হাত বাড়িয়ে দিল,
মাহাদ ধীরে ধীরে আংটি তুলল,
আর সেই আংটি পরানোর আগেই—
ওর চোখে আবার এক ঝলক পড়ল কিয়ারার মুখে।
চোখ দুটো যেন কাঁদছে, যেন কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু নীরবে।
মাহাদের হাত এক মুহূর্ত থেমে গেল,
সবার চোখের আড়ালে ওর বুকের ভেতর যুদ্ধ শুরু হলো—
দায়িত্ব নাকি ভালোবাসা, পরিবার নাকি হৃদয়।
ঠিক তখন, দাদাভাই কাঁধে হাত রাখলেন—
ঃ- কি হল মাহাদ?... থেমে গেলি কেন?..পরিয়ে দে!...
মাহাদ মুখে হাসি এনে, চোখ নামিয়ে আংটি পরিয়ে দিল আলিশার হাতে।
ঘরে হাততালির ঝড় উঠল।
আর কিয়ারার চোখের কোণে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু,
যা সে তৎক্ষণাৎ কেউ দেখে ফেলার আগেই হাতের পিঠে মুছে ফেলল।
পাশ থেকে কিরণ ওকে জরিয়ে ধরলো। এছাড়া আর কীইবা করার আছে এই মুহূর্তে?!... 
মাহাদ আংটি পরিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
একজন ফটোগ্রাফার বলল— “Sir, একটু ক্লোজ পোজ দিন, একটু হাসুন।”
মাহাদ জোর করে হাসল,
কিন্তু কিয়ারা অনুভব করল, সেই হাসিটা যেন ওর নিজের বুকে ছুরি চালিয়ে দিচ্ছে।
সবাই যখন ব্যস্ত ফটো তুলতে,
কিয়ারা চুপচাপ পেছন ঘুরে বেরিয়ে গেল। করিডোরে আলো নিভু নিভু,
বাইরে নরম বৃষ্টি পড়ছে।
সে ধীরে ধীরে হাঁটছে, চোখে ঝাপসা পানি, প্রতিটি পায়ের শব্দ যেন হৃদয় ভাঙার আওয়াজ।
সে গিয়ে দাঁড়াল ছাদের সেই দোলনাটার কাছে, যেখান থেকে একদিন মাহাদ বলেছিল—
“আমি আছি, রায়া। যাই হোক না কেন, আমি আছি। 
আর আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে অথচ সাথে তিনি নেই, কিয়ারা নিজেকে বলল—
“তুমি ছিলে… কিন্তু এখন তুমি নেই।”
পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ—
“তুমি এখানেই থাকবে জানতাম…”
কিয়ারা ঘুরে দাঁড়াল।
“মাহাদ!.. 
চোখে অন্ধকার, মুখে ক্লান্তি।
কিয়ারা কিছু বলল না।
ওর চোখে জল, মুখে নিঃশব্দ অভিমান। মাহাদ এগিয়ে এল, কিন্তু কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
ওদের মাঝে শুধু নিঃশব্দ বৃষ্টি।
শেষে কিয়ারা ধীরে বলল,
ঃ- বেশ আয়োজন হয়েছে আপনার বিয়ের উপলক্ষে… আজ আপনারই দিন, তাই শুভকামনা। এই 
বলেই কান্না চেপে রেখে ওখান চলে গেল,
আর মাহাদ দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই,
ওর ভেজা পায়ের ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে—
যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক নিঃশব্দ বিদায়।
— — — 
নীচে এখনও অতিথিরা হাসাহাসি করছেন, ফটো তোলা আর আলাপে ব্যস্ত। আলো ঝলমল — কিন্তু উপরের সারি একেবারেই আলাদা। তখন আবেগের তাড়নায় লোকটা কে কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করেই চলে গিয়েছিল। কিন্তু এখন তাকে বলতে হবে যে, কেন ওর অনুভূতি নিয়ে খেলল?.. 
কেন এভাবে ওকে ভেঙে দিলো?... যে জোড়া লাগানোর মতো আর কিছুই রইলো না। আজ এই মুহুর্তের আগ পর্যন্তও ও ভেবেছিল, লোকটা নিশ্চয়ই রাজী হবেন না। তিনি তো ওকে ভালোবেসেন , ও তার বিবাহিত স্ত্রী ‌। কিন্তু লোকটা ওর সব আশা ভরসা, বিশ্বাস ভালোবাসা সবকিছু এক নিমিষেই নিলামে তুলে দিলেন। এর কৈফিয়ত তাকে দিতেই হবে।‌
---চলবে--- 
ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন