#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ১৯
🌿🌿🌿
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসার পর কিয়ারার বাবা চোখে সতর্কতা, মন ভরা চিন্তা। তিনি কিরণের পাশে ধীর গতি দিয়ে বললেন,
ঃ- কিয়ারা এখন আমাদের কাছে নিরাপদ থাকবে। আমরা তাকে খান ম্যানশনে নেব না। সেখানে সবাই এখন ওকে ভালো চোখে দেখবে না। এখন পরিস্থিতি অতটা নিয়ন্ত্রণে নেই।
কিরণ চোখ বড় করে দেখল,
ঃ- চাচ্চু… তাহলে কোথায়?...
নেহাল চৌধুরী মাথা নাড়লেন,
ঃ- এখানের ফ্ল্যাটে। ওখানটা পুরোপুরি নিরাপদ, আর কিয়ারা ওর নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারবে। সেখানে আমরা নিশ্চয়তা দিতে পারব।
কিয়ারাকে আস্তে আস্তে গাড়িতে বসানো হলো। চোখে এখনও ব্যথা, কান্না, আর হালকা ভয়। কিরণ পাশে বসে ওর হাত ধরে বলল,
ঃ- শান্ত হ, কিয়ারা। আমরা ঠিক আছি। আমাদের ফ্ল্যাটে যাচ্ছি এখন, তুই চিন্তা করিস না সব ঠিক হবে, ইনশাআল্লাহ।
গাড়ি ছুটতে লাগল। রাস্তা পেরোতে পেরোতে কিয়ারার শরীর ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল, কিরণ বারবার কণ্ঠে বলছে,
ঃ- আর চিন্তা করিস না, তুই একা নও। আমরা সব সময় তোর পাশে আছি। একদম ঘাবড়ানোর কিছু নেই।
ফ্ল্যাটে পৌঁছুতে পৌঁছতেই ভাই দরজা খুলল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল।
কিয়ারার বাবা নেহাল চৌধুরী কণ্ঠ নরম করে বললেন,
ঃ- এখানেই থাকবে তুমি এখন। তোমার যথেষ্ট খেয়াল রাখা হবে। কেউ অনধিকার প্রবেশ করতে পারবে না।
কিয়ারা ধীরে ধীরে ফ্ল্যাটে ঢুকল। তার চোখে হালকা ভয়, কিন্তু একই সঙ্গে স্বস্তি। কিরণ পাশে বসে বলল,
ঃ- চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
ওর মা পাশে এসে দাঁড়াল। কিয়ারার মাথায় হাত রেখে বলল,
ঃ- আমরা আছি, কিয়ারা। তুই একা নস , চিন্তা করিস না।
ফ্ল্যাটে আলো নরম, পরিবেশ শান্ত। কয়েক দিন পর কিয়ারা গভীর নিঃশ্বাস নিল, রক্তিম কান্নার ঢেউ একটু কমে গেল।
নেহাল চৌধুরী সেদিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন,
ঃ- এখানেই থাকবে। যতদিন প্রয়োজন, আমরা তোমার সঙ্গে থাকব।
এভাবে কিয়ারাকে খান ম্যানশন না নিয়ে ভাইয়ের ফ্ল্যাটে আনা হলো—নিরাপত্তা, শান্তি আর পরিবারের তৎপরতার এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
কিয়ারা কে ওর রুমে নিয়ে বিছানায় বসালো কিরণ।
হঠাৎ কিয়ারার বাবা ধীরে ওর দিকে এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বললেন…
ঃ- তুমি যে এতোটা বড় হয়ে গিয়েছিলে সেটা বুঝতে পারিনি। এতো কিছু তোমার সাথে ঘটে গিয়েছে, অথচ তুমি কাউকে কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি। বেশ, তুমি যা ভালো বুঝেছো তাই করেছো। আমি আর তোমাকে কিছুই বলবো না। ডাক্তার জানিয়েছেন তুমি নাকি মা হতে চলেছো ।
কিয়ারা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে, গলা শুকিয়ে গেছে। তার হাত কেঁপে কেঁপে উঠছে, বুক ধ্বনিতে ভরা ভয়।
ঃ- কী… কি বলছো আব্বু?!
কিয়ারার কণ্ঠ কম্পমান, চিৎকারে নয়, বরং ভয়ে।
নেহাল চৌধুরী কণ্ঠ কঠোর করে, চোখে রাগের আগুন,
ঃ- হ্যাঁ, কিয়ারা! তুমি মা হতে চলেছো। আমরা এতক্ষণ চুপচাপ ছিলাম, কিন্তু এটা সহজে মানা যায় না। তুমি কি ভেবেছিলে আমাদের সম্মান আর শান্তি এমনভাবে ভাঙবে?,.. ডাক্তার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন।
কিয়ারার মা নীলাশা চৌধুরী কণ্ঠে ক্রোধ, চোখে দুঃখ, মেয়ের জন্য কষ্ট হচ্ছে আবার রাগ ও লাগছে।
ঃ- আমরা তোর জন্য চাইনি এমন কিছু। তুমি কীভাবে এই অবস্থায় পৌঁছালে, তুই কি বুঝতে পারছিস আমাদের পরিস্থিতি??..
কিয়ারা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
ঃ- আমি… আমি কিছুই করতে চাইনি। ভূল হয়ে গিয়েছে আম্মু, খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছি।
সব কিছু শেষ হয়ে গেছে আম্মু… ওই লোকটা আমাকে ঠকিয়েছে…।
নেহাল চৌধুরী চিৎকার করে বললেন,
ঃ- ঠকানো বা না ঠকানো—এটা তোমার সিদ্ধান্ত আর কাজের ফল। তুমি কি ভেবেছিলে, আমরা সব সহ্য করব?...
এমন সময়ে কিয়ান এসে দাঁড়ালো, দুঃখ আর ক্রোধে কণ্ঠ কম্পমান,
ঃ- কিয়ারা… আমি চাইনি এমন হোক। তোকে আমি বারবার সতর্ক করেছিলাম, এমন একটা কাজ তুই কিভাবে করলি?... আমাদের মানসম্মান সবকিছু নিলামে তুলে দিলি। তোর আজকের কাজের জন্য না জানি কায়রা কে ও বাড়ির লোকজন কত কথা শোনাচ্ছেন।
কিয়ারা মাথা নাড়ল, কান্না আর আতঙ্ক মিশিয়ে বলল,
ঃ- না… আমি শুধু সত্য বলেছি… আমি এমন কিছু করতে চাইনি…।
বাবা-মায়ের রাগ, হতাশা, আর কষ্ট—সব একসাথে ঘরে ভাসছে। কিয়ারা কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় ঢলে পড়ে, কিরণ তার পাশে এসে হাত ধরে বলল,
ঃ- কিয়ারা… আমরা আছি। শুধু শান্ত হ। আল্লাহ চাইলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঘরের বাতাস চাপা, উত্তেজনাপূর্ণ, আর কিয়ারার জন্য নতুন অধ্যায় শুরু—রাগ, আতঙ্ক, অপরাধবোধ, আর তার গর্ভের জন্য নিরাপত্তা সব মিলিয়ে।
ফ্ল্যাটের ঘরটা চাপা, উত্তেজনায় ভরা। কিয়ারার বাবা-মা, বড় ভাই এবং কিরণ, সবাই কিয়ারার দিকে তাকিয়ে। চোখে রাগ, মুখে উদ্বেগ।
নেহাল চৌধুরী কণ্ঠ শক্ত করে বললেন,
ঃ- কিয়ারা, এখনই এটা ঠিক করার সঠিক সময়। তুমি প্রেগন্যান্ট—আমরা চাই তোমাকে এবর্শন করাতে। এটা আমাদের এবং তোমার জন্য সঠিক।
মায়ের কণ্ঠে কাঁপন, অথচ সেদিকে এক ধরনের জোর—
ঃ- আমরা তোর জন্য চিন্তা করছি। এটা সহজ হবে না, কিন্তু আমাদের পরিবারের সম্মান আর তোর ভবিষ্যৎ এখন প্রধান। এভাবে জীবন টা নষ্ট করিস না। যা করার তাতো করেই ফেলেছিস।
কিয়ান রাগ আর দুঃখ অনুভব করছে, অপরদিকে আদরের ছোট বোনের এমন পরিস্থিতিতে ভীষণ কষ্টও পাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বলল…
ঃ- কিয়ারা… তুই বুঝতে পারছিস, এটা আমাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ। সমাজের মানুষের অবজ্ঞা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা তুই সহ্য করতে পারবি না। ওরা তোকে কথা দিয়েই জীবিত মেরে ফেলবে।
কিয়ারা চোখ বড় করে, গলা শুকিয়ে গিয়েছে ওর, প্রচন্ড করুন ভাবে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
ঃ- না… আমি এটা চাই না… আমি… আমি এটি করতে পারব না। এটা আমার সন্তান, আমার সিদ্ধান্ত। আমি এমন পাপ করতে পারবো না, আল্লাহ এর জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন না। আর কেউ না জানুক, আমি আর আমার আল্লাহ তো জানি যে, এই সন্তান নাজায়েজ নয় । আমার সন্তান জারজ নয় ভাইয়া। আমার সন্তান পবিত্র, আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। তোমরা দয়া করে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করো না। তোমরাও এমন করলে আমি কার কাছে যাবো??...
কিরণ পাশে এসে হাত ধরে বলল,
ঃ- কিয়ারা, তোর ইচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ জোর করতে পারবে না। আমরা তোর পাশে আছি। তোর সন্তানের কিচ্ছু হবে না।
কিয়ারা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল,
ঃ- আমি কিছুতেই এবর্শন করব না… আমি শিশুটাকে রাখতে চাই। আমি চাই না কেউ আমার ওপর জোর জবরদস্তি করুক। আল্লাহ দয়া করুন আল্লাহ!...
বাবার চোখে রাগের সঙ্গে হতাশা, মায়ের কণ্ঠে ব্যথা—তবুও তারা বুঝতে লাগলেন, কিয়ারা এখনই শক্তভাবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
বড় ভাই, কিয়ান নিজের কপালে হাত রেখে, ধীর গলায় বলল,
ঃ- ঠিক আছে… আমরা বুঝেছি। তুমি যেটা চাও, আমরা তা সম্মান করি। শুধু নিরাপদ থাকো, কিয়ারা।”
ঘরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। কিয়ারা কাঁদতে কাঁদতে কিরণের কাঁধে মাথা রেখে শ্বাস নিল। পরিবার বুঝতে পারল—যদিও রাগ আর উদ্বেগ আছে, তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কিয়ারার সিদ্ধান্ত ও নিরাপত্তা।
ফ্ল্যাটের নীরবতা কেটে গেল কিয়ারার মায়ের কাঁদতে কাঁদতে কণ্ঠে। চোখ লাল, গলা ভেঙে গেছে। সে ধীরে বলল,
ঃ- কিয়ারা… তুই বুঝে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস তো?... মাহাদ… ও তোকে অস্বীকার করেছে। তোদের বিয়ের কোনো ডকুমেন্ট নেই। পুরো সমাজ, আমাদের প্রতিবেশীরা—সকলেই এটা জানবে। এবং তারা কখনও… কখনও এই বাচ্চাকে মেনে নেবে না।
কিয়ারার চোখ বড় হয়ে গেল। শ্বাস থেমে গেল। কান্না আরও জোরে ফেটে পড়ল।
ঃ- আম্মু… আমি… আমি… কি বলছো?... আমি… আমি কি করব?.. আমি পারবো না ওকে মারতে, এমন কথা বলো না আম্মু।
—কিয়ারার কণ্ঠে আতঙ্ক, ভয় আর দুঃখের মিলন।
মা হাত কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
ঃ- মা যে আমাদের সমাজ, আমাদের পরিবার… তারা তোমাকে কলঙ্কিনী বলবে। তারা কখনও তোমার অবস্থাকে স্বীকার করবে না। তুমি একা… একা থাকবে। শুধু নিজের জন্যই নয়, এই শিশুর জন্যও।
কিরণ পাশে এসে হাত ধরে বলল,
ঃ- কিয়ারা… চাচী মনি যাই বলুক, আমরা তোর পাশে আছি। সমাজের কথা পরে ভাবা যাবে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তুই এবং শিশুটি নিরাপদে থাকা।
কিয়ারা কেঁদে কেঁদে মাথা নত করে বলল,
ঃ- আমি জানি… কিন্তু… আম্মু, এটা কীভাবে হবে? মানুষ কি কখনও মেনে নেবে?”
মায়ের চোখে কাঁদা ঝলমল করছে, কণ্ঠ কম্পমান,
ঃ- সম্ভব নয়, কিয়ারা। সমাজ এমনই। কিন্তু তুই একা নও, আমরা আছি। কিন্তু সত্যি, মানুষ এই শিশুকে কখনও সহজে মেনে নেবে না।
ঘরটা এখন সম্পূর্ণ আবেগ, হতাশা, ক্রোধ আর ভবিষ্যতের ভয় মিশ্রণে ভরা। কিয়ারার কান্না, মায়ের কান্না, বাবা ভাইয়ের দুশ্চিন্তা, বোনের দুঃখ—সব মিলিয়ে এক ভারী, চাপা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
ড্রয়িংরুমে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। কেউ কিছু বলছে না। শুধু কিয়ারার হালকা কান্নার শব্দটা বারবার ছুরি হয়ে বাতাস কেটে যাচ্ছে।
কিয়ারা মাথা নিচু করে বসে আছে—চোখে ফোলা কান্না, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
ওর মা চুপচাপ দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। হঠাৎই চোখ মুছে বললেন গলাটা ধরে ফেলে,
ঃ- এই মেয়েটাকে নিয়ে আমি কেমন করে মুখ দেখাবো সমাজে? মাহাদ অস্বীকার করে দিয়েছে, বিয়ের কোনো প্রমাণও আমাদের হাতে নেই… বাইরে সবাই জানে এখনো কিয়ারা অবিবাহিতা। ওর এই বাচ্চাকে সমাজ কী নামে ডাকে জানো? জারজ সন্তান, ওকে সবাই কলঙ্কিনী বলবে।
কিয়ারা মাথা তুলে তাকালো, চোখদুটো লাল হয়ে আছে, তবু গলা দৃঢ় —
ঃ- আমি আমার সন্তানকে মারতে পারবো না আম্মু! কিছুতেই পারবো না। ও আমার কিছু না থাকলেও… এই বাচ্চা আমার নিজের।ও জারজ নয় আম্মু।
বাবা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। ঘরজুড়ে বাতাস জমে উঠছিল।
অবশেষে ভারী গলায় বললেন,
ঃ- তাহলে তোমাকে দূরে পাঠিয়ে দিতে হবে, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিয়ারা থাকবে না এখানে। যতদিন ওর সন্তান জন্ম না নেয়, ততদিন ওকে বাইরে থাকতে হবে… যেন সমাজের কু-নজর আমাদের ঘর পর্যন্ত না পৌঁছায়। এমন জায়গায় পাঠাতে হবে, যেখানে কেউ ওকে চেনে না। আর তখন কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না।
সবাই স্তব্ধ। কিয়ারার মুখে এক মুহূর্তে কোনো রঙ নেই। শুধু ঠোঁট কাঁপছে, চোখে জল টলমল করছে—
কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করলো না।
বাপের চোখে সিদ্ধান্ত—শব্দ কম, ঠিক সেই ধরনের দৃঢ়তা যা আর পিছনে ফিরে বলে না। তিনি কাগজপত্রের টেবিলের ওপর হাত রেখে ধীরে বললেন,
ঃ- নীলাভ আছে কানাডায় — ওর কাছে পাঠাব আমরা। ও সেখানে ঠিক আছে, কাজ করে ভালো আছে। কেউ জানতে পারবে না। সেখানে ওর নাম-গৌরব নষ্ট হবে না, সমাজের কু-নজর থাকবে দূরে। ও আর সন্তান দুজনেই নিরাপদে থাকবে।
কিয়ানের চোখে হয়রানি, কিন্তু ওর কণ্ঠ ধীরে শান্ত হয়ে আসে—
ঃ- আব্বু , ঠিক আছে। কিয়ারাকে নিরাপদ জায়গায় পাঠাই। ওর সন্তানকে আমরা সবাই মেনে নেব। কিন্তু ওকে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে যাব, একা পাঠানো যাবে না, তুমি অমত করবে না ।
কিয়ারা রীতিমতো স্থব্ধ—হৃদয় ভেঙে ছিন্ন। কান্না ধীরে ধীরে চেপে ধরে, বুকে এখন নির্ঘাত এক অদ্ভুত শান্তি ও ভয়—নিরাপদ হবে, কিন্তু বহুদূরে। কিয়ারা লজ্জা নয়, কেবল এক ভয়ানক ত্যাগের স্বাদ পেতে লাগলো। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে উচ্চারিত হলো,
ঃ- আমি… অমত করছি না—আমি চেয়েছিলাম এখানে থাকতেই। কিন্তু… যদি এটি আমার শিশুর জন্য নিরাপদ হয়, আমি রাজি। আমি এখান থেকে অনেক দূরে চলে যাব, অনেক দূরে।
ঃ- আমি, ঐ বেঈমানের বিয়ের আগেই এই স্থান, এই দেশ ছাড়তে চাই আব্বু। এখানে থাকলে আমি অন্তর বিষক্রিয়ায় মরে যাবো আব্বু। আমাকে তাড়াতাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করো।
কিয়ারা প্রচন্ড কষ্টে, বুকের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বলে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে গলা বসে গিয়েছে। তাও ওর চোখের পানি যেন ফুরাচ্ছে না।
ওর বাবা নেহাল চৌধুরী মাথা নিচু করে বললেন,
ঃ- তুমি লড়াই করতে চাও—ভাল। কিন্তু এখন না। এখানে নয়। ওখানে থাকলে শিশুর ভবিষ্যত রক্ষা পাবে, সমাজের চাপ কমে যাবে।
কিয়ান অচেতনভাবে কিয়ারার পাশে এসে কণ্ঠে ধীরে বলল,
ঃ- আমি ওর সঙ্গে যাব—ফ্লাইটের ব্যবস্থা, পাসপোর্ট, ভিসা — সব আমি করব। তুই শুধু বিশ্রাম নে, কিয়ারা। আমি তোর বিকল্প হই।
পরিকল্পনা দ্রুত নকশা হল—বাবা চাচাতো ভাই নীলাভকে ফোন করল। নীলাভ, যে কয় বছর ধরেই কানাডায় আছে, পড়াশোনা শেষ করে ওখানেই কোম্পানিতে জয়েন করেছে, একেবারে অবাক লাগল, কিন্তু কিয়ারা ছোট থেকেই ওর আদুরে হওয়ায় সবকিছু সহজেই মেনে নিল। ফোনে নীলাভ বলল,
ঃ- আমি ওর যত্ন নেব। আর কেউ জানতে পারবে না। ওকে নিরাপদ একটা ফ্ল্যাটে রাখব। ওর ভালোর জন্য যা যা করতে হবে, সবকিছু করবো আমি। তুমি একদম চিন্তা করবে না চাচ্চু।
পরের কয়েকটা ঘণ্টা ছিল একঘেঁয়েমি ছাড়া—পাসপোর্ট খুঁজে বের করা, হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সার্টিফিকেটের অনুলিপি, বাবার ব্যাংক থেকে অগ্রিম অর্থ হস্তান্তর, কিয়ারা রং পাসপোর্ট ফটো আপডেট করা, আর দ্রুত কনস্যুলেটের অ্যাপয়েন্টমেন্টে নাম লেখানো—সবই নিঃশব্দে, তীব্র তৎপরতায়।
বিদায়ের মুহূর্তটি ছিল আদৌ নীরব নয়—কিন্তু শব্দগুলো এখন কম এবং চোখগুলোর বক্তৃতাই দৃঢ়। কিয়ারা ব্যাগে শুধু অল্প কিছু জিনিস ভরে নিল—একদল তরতাজা জামা, শিশুর জন্য এক জোড়া ছোট খেলনা, আর মায়ের দিয়ে দেওয়া ছোট্ট সুতা-আলনা, যেন ভবিষ্যতে ওকে মাটির সঙ্গে জোড়া রাখে। কিরণ ওর কাঁধে হাত দিয়েই বলল,
ঃ- চিন্তা করিস না। ওখানে নীলাভ ভাইয়া তোর খেয়াল রাখবে। তোর পাশে থাকবে সবসময়। কেউ কিছু জানতে পারবে না।
বাবা, যাঁর চোখে রাগের আগুন আজ নেমে এসেছে সহানুভূতিতে, কিয়ারার হাতে কিছু ক্যাস টাকা দিলেন—“
ঃ- এইটা নাও, প্রয়োজন হলে খরচ করো। ওকে ডাক্তার দেখাতে বলবে। যখন যা প্রয়োজন হবে আমাকে নাহয় ভাইকে জানাবে।
তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু চোখে দৃঢ় সংকল্প—
ঃ- “আমি যা করব, সেটা তোমার নিরাপত্তার জন্যই। আমাকে ভুল বুঝিস না মা।
নীলাভের নামাশায় ফোনে বারবার নিশ্চয়তা আসবে—“আমি নীলাভ, আমি ঠিক রাখব।” কিন্তু ওই মুহূর্তটুকু ছিল শুধু কিয়ারা, কিরণ, বাবা—একটা ছোট্ট দল যা মহাসূক্ষ্ম পরিকল্পনা করে চলেছে, যাতে কেউ কিয়ারার সন্তানকে কলঙ্কের চোখে না দেখে।
— — —
এদিকে বিয়ের ভিড় জমে গেছে। আলিশান খান ম্যানশনে অতিথিরা হাসি খেলে ঘুরছে, সবাই সাজসজ্জা, ছবি এবং শুভেচ্ছা নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু কিয়ারা… কিয়ারা সবেমাত্র উপস্থিত হলো, শেষবারের মতো মুখোমুখি হতে অপেক্ষা করছে।
কেবল বাবা, মা, এবং বড় ভাই জানে—আজই ওর ফ্লাইট। সবাই যে কিছুই জানে না, সেই ভয়, সেই চাপ কিয়ারাকে নিঃশব্দে ছিঁড়ে দিচ্ছে।
খান ম্যানশনের লিভিং রুমে বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী—সবাই কিয়ারার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু চোখে নেই কোনো সহানুভূতি। কেউ কেউ হেসে বলছে,
ঃ- দেখে তো, কীভাবে এই সব ঘটনা ঘটেছে! বড়লোক ছেলে দেখেই নিজেকে এক ঝটকায় বিবাহিত বানিয়ে ফেলেছিল, লোভী মেয়ে মানুষ কোথাকার।
“ওর অবস্থা নিয়ে ভাবতেই ভয় লাগে।”
কিয়ারার বুক ধনুকের মতো চাপা, চোখে জল। সে জানে—আজ কেউ বুঝবে না, ওর গোপন সিদ্ধান্ত, ওর সন্তান, ওর ভবিষ্যৎ। শুধু নিঃশব্দ।
মায়ের কণ্ঠ কাছেই, বাবা পাশে—
ঃ- শান্ত থাকো। কেউ কিছু জানবে না। আমরা দেখব সব ঠিকভাবে। ওদের কথায় মনে কষ্ট নিওনা।
বড় ভাই কিয়ান ও মাথা নেড়ে বলল,
ঃ- আব্বু ঠিকই বলছে। ওর নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত হও।
কিয়ারা ধীরে ধীরে দাঁড়াল, চোখে কাঁদা ঝলমল, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা।
ঃ- আমি… আমি প্রস্তুত।
একই সময় অতিথিরা ওর দিকে তাকিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে, কনিষ্ঠ প্রতিক্রিয়ায় হাসছে, কেউ কটাক্ষ করছে। কিয়ারার মনে একরকম তীব্র আঘাত, কিন্তু সে জানে—সবার চোখে ঘৃণা থাকলেও, এটাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
— — —
++“ফ্ল্যাশব্যাকে”++
….খান ম্যানশনে আসার আগের মুহূর্তে ….
কিয়ারা ধীরে ধীরে হালকা শ্বাস নিল। ফ্লাইটের জন্য সব প্রস্তুত, আর এই গোপন যাত্রা শুরু হচ্ছে—শুধু ওর বাবা-মা এবং বড় ভাই কিয়ান আর খুব কাছের বোন কিরণ জানে এই বাস্তবতা।
ফ্ল্যাটের ঘরটি নীরব। কিয়ারা জানে—আজই সে চলে যাবে, আর এই মুহূর্তটাই শেষ দেখা মাহাদের চোখে তার জন্য। তাই সে ঠিক করল, অন্তত আজ মাহাদের চোখে নিজেকে সুন্দর দেখাবে।
কিরণ ছোট্ট বোনের মতো সাজালো ওকে , ময়ূরের রঙের হালকা শাড়ি, গায়ে নরম কাঁচের কাজ, চুল সামান্য ঢেউ খেলানো, চোখে হালকা স্মোকি আইশ্যাডো—সবই এমনভাবে যে মাহাদের চোখে কিছুটা আগের আকর্ষণ ফুটে ওঠে।
বড় ভাই চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে, কিয়ারার প্রতিটি কাজ দেখছে। কিরণ ছোট্ট হাসি দিয়ে বলল,
ঃ- দেখ, কিয়ারা, তুই যেভাবেই সাজিস, তাতেই তুই সুন্দর। নিজের জন্যই এটা করছিস, আর বিদেশে গিয়ে আমাকে ভুলে যাস না যেন।
কিয়ারা হালকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল। ভেতরে মনে হচ্ছে—কিছুটা শক্তি, কিছুটা বিদায়ের দুঃখ। সে জানে, আজ এই সৌন্দর্য শুধু মাহাদের জন্য নয়, নিজের জন্যও—নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, সে কখনো হারায়নি।
ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার আগে কিয়ারা একটি চুপচাপ মুহূর্তে প্রতিফলন দেখে—চলচ্চিত্রের মতো তার চোখে জল, ঠোঁটের কোণে হাসি। মনে মনে ভাবল,
ঃ- বেঈমান মাহাদ, তুমি যা ভাবছো, সেটা এখনো মনে রেখো—আমি এখনও নিজের মতোই আছি।”
ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সে বাবার দিকে হালকা হাত নাড়ল। বাবা শুধু মাথা নাড়লেন, চোখে শক্তি।
কিরণ পাশ থেকে ফিসফিস করল,
ঃ- চল, কিয়ারা। নতুন পথ শুরু হবে। একটা নতুন জায়গা, নতুন জীবন তোর অপেক্ষায় রয়েছে।
কিয়ারা ধীরে ধীরে বেরুলো… ভুবনমহীনি দারুণ সাজে, সাহসী চাহনিতে, কান্না আর শক্তি একসাথে। খান ম্যানশনের উদ্দেশ্যে, যেটা নতুন পথের প্রথম ধাপ, যেখানে সে নতুন জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ