ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (২য় খন্ড)

২২তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম🌿 

#দ্বিতীয়_খণ্ড 
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন 
পর্বঃ- ২২
🌿🌿🌿
টরোন্টোর সকালটা যেন আজ একটু বেশি নিস্তব্ধ।
জানালার কাচে তুষারের সাদা পরত জমেছে, আর সেই কাচের ওপারে বসে আছে কিয়ারা। সাদা উলের সোয়েটার, নরম স্কার্ফে জড়ানো, মুখে ক্লান্তি কিন্তু চোখে গভীর চিন্তার ছায়া।
এক হাতে উষ্ণ কফির কাপ, অন্য হাতটা আলতোভাবে রাখা নিজের পেটে —
যেন সেখানে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট প্রাণটাকে সে প্রতিদিন নতুন করে আশ্বাস দেয়,
 “সব ঠিক হয়ে যাবে… একদিন।”
তার নিঃশ্বাসে ধোঁয়া ভেসে ওঠে, জানালার কাচে মিলিয়ে যায়। বাইরে নরম তুষার পড়ছে, ভেতরে ঘরের কোণে নরম লাইটের আলো — এক অদ্ভুত শান্তি আর নিঃসঙ্গতার মিশ্রণ।
টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটি চিঠি —
চিঠিটা খুলে দেখা যায়নি অনেকদিন।
সেটা মাহাদেরই লেখা… কিছু পুরনো শব্দ, যা সে পড়তে চায় না, কিন্তু ভুলতেও পারে না।
তার ফোনটা হালকা কম্পন তোলে,
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নামটা — “Unknown Number”।
কিয়ারার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে… সে একটু থেমে যায়, তারপর ধীরে ফোনটা কেটে দেয়।
চোখ বন্ধ করেই নিচু স্বরে বলে,
ঃ- কখনো ফিরে যাবো না , মাহাদ… তাহলে আমি আবার ভেঙে যাব।
বাইরে তখন বরফ পড়া আরো জোরে বেড়েছে,
একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ দূর থেকে ভেসে আসে, আর তুষারের সাদা ঢেউয়ে মিলিয়ে যায় তার নিঃশব্দ কান্না।
কিয়ারা উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, নিজের পেটটা আলতো করে ছুঁয়ে বলে,
ঃ- তোমার বাবা দূরে… কিন্তু মাম্মাম আছি, ছোট্ট সোনামনি। তোমাকে ঘিরেই মাম্মামের পৃথিবী। তোমার বাবা তো জানেই না যে তার অস্তিত্ব বহন করেছি আমি। তার আর আমাদের প্রয়োজন নেই যে মাম্মা!.. তিনি হয়তো নতুন সংসার, পছন্দের বউ নিয়ে বেশ ব্যস্ত। আল্লাহ তাকে সবসময় খুশি রাখুন। 
কিয়ারার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরে পরছে। 
ঘরের ঘড়িতে টিক টিক শব্দ হচ্ছে, আর সেই শব্দের ফাঁকে শোনা যায় এক অদ্ভুত শূন্যতা —
 যেন কোথাও থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে,
“Raya…”
কিন্তু সেটা বাস্তব না স্মৃতি, সে নিজেও বুঝতে পারে না।
— — —
এখানে এসেছে প্রায় এক মাস পার হয়ে গিয়েছে। কিয়ান এখানে আসার দু'দিন পরেই বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছে। হসপিটাল থেকে বেশি ছুটি পায়নি, তারপর আবার হসপিটাল টা খানেদের, যাতে কেউ ভুল করেও বুঝতে না পারে যে, কিয়ান কিয়ারা কে বাংলাদেশ থেকে দূরে পৃথিবীর অপর প্রান্তে নিয়ে এসেছে। এজন্য আরো দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ ফিরে গিয়েছে। 
এখানে যে কিয়ারা ভালো নেই, তেমনটা নয় কিন্তু বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। তখন প্রচন্ড মন খারাপ হয়ে যায়। অবশ্য দু'দিন পর পরই বাবা মা এর সাথে কথা হয়। তারা ছাড়া কেউই সঠিক ভাবে ও কোথায় আছে সেটা সঠিক জানে না। বাড়ির বাকিরা বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিল নাকি ওর কথা, কিন্তু বাবা মা খুব কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন। আর একদিকে ভালোই হয়েছে, কারণ কিয়ারা নিজেও চাইছে না যে, ও কোথায় আছে সেটা সঠিক খবর কেউ জানুক। 
এখানে আসার পর প্রথম দুই দিন প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল কিয়ারা। তবে দু ভাইয়ের যত্নে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে গিয়েছে। তারপর নীলাভ ভাইয়া কে কিয়ান ভাইয়া ওর সাথে ঘটে যাওয়া সব কিছু একে একে বিস্তারিত জানিয়েছে। সবকিছু শুনে নীলাভ ভাইয়া প্রথমে ওর উপর প্রচন্ড রেগে গিয়েছিল, যে কেন ও প্রথমে বিয়ের বিষয়টি সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।
 কিন্তু কিয়ারার শরীরের বেহাল অবস্থা দেখে আর বেশিক্ষণ রেগে থাকতে পারেনি। তারপর আবার আদরের ছোট বোন কে অনেক বছর পর কাছে পেয়েছে। তাই আর অসুস্থ বোনের সাথে রাগারাগী করেনি। নীলাভ ভাইয়া সারাদিন অফিসে থাকে আর তখন কিয়ারা একা বাসায় থাকে, যেটা ওর একটুও ভালো লাগে না। 
তারপর পাশের ফ্ল্যাটের একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে কিছুদিন আগে, সেই মেয়েটা এসে ওকে সময় দেয়। মেয়েটাও বাংলাদেশী কিন্তু পড়াশোনা করতে এখানে এসেছিল, তারপর এখানেই থেকে গিয়েছে। শুনেছে মেয়েটির ভাইয়াও এখানে থাকে, এখানের একটা হসপিটালের ডক্টর। দু ভাইবোন থাকে এখানে। 
কিয়ারার মেয়েটা কে খুব ভালো লেগেছে। মেয়েটির নাম সাবিহা সুলতানা!.
 প্রচন্ড রকমের মিশুক প্রকৃতির মেয়েটি। ঐ মেয়েটির সঙ্গ পেয়ে এখন একটু হলেও কিয়ারা কিরণ কে কম মিস্ করে। 
এসব ভাবতে ভাবতেই ড্রইং রুমের দিকে থেকে কিয়ারা কে ডেকে উঠল নীলাভ ভাইয়া। এই ফ্লাটে তিনটি বেডরুম , একটা ড্রইং রুম, দুটো ব্যালকনি, দুটো এটাচ্ বাথরুম , আর একটা কিচেন রুম রয়েছে। ছোটখাটো একটা ফ্যামিলির থাকার জন্য বেস্ট অপশন। কিয়ারা রান্নাবান্না তেমন পারে না, আর কোনো জোরজবরদস্তিও নেই।
 নীলাভ ভাইয়া ও আসার আগে নাকি একাই রান্নাবান্না করে খেতো। কিন্তু কিয়ারা আসার পরে একজন লেডি শেফ রেখে দিয়েছে। যে কিয়ারার যখন যা খেতে ইচ্ছে করে সেগুলো রান্না করে খাওয়ায়‌‌। তারপর আবার পাশের ফ্ল্যাটের সাবিহা তো আছেই, নিজ ইচ্ছাতেই কিয়ারা কে প্রায়শই বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি আইটেম রান্না করে নিয়ে এনে খাওয়ায়। মেয়েটার রান্নার হাত বেশ ভালোই বলা চলে। 
কিয়ারা আস্তে ধীরে ব্যালকনি থেকে বেরিয়ে এসে ড্রইং রুমের দিকে এগিয়ে যায়। নীলাভ ভাইয়া হয়তো খাবার খেতে ডাকছে ওকে। টাইম টু টাইম না খেলে তিনি আবার খুব রেগে যান। কিয়ারা ভাই কে রাগাতে চায়না, তাই প্রতিদিন টাইম টু টাইম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করে। এসব ভাবতে ভাবতেই ড্রইং রুমের দিকে এগিয়ে গেল। 
— — — 
সন্ধ্যা নেমে এসেছে খান ম্যানশনে।
পুরো বাড়িটা আজ অদ্ভুত নীরব।
বিয়ের পর থেকে আলিশা একপ্রকার বন্দি হয়ে আছে এই বিশাল ম্যানশনের চার দেওয়ালে।
সবাই তাকে নববধূ বলে সম্বোধন করলেও, সে জানে — এই সম্পর্কের ভিতরে কিছু একটা গলদ আছে।
সেদিনের বিয়ের পর মাহাদ কোথায় গিয়েছিল, কেউ জানে না।
তিন দিন কেটে গেছে — আজ হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে,
 “ মাহাদ স্যার ফিরে এসেছেন…”
আলিশার বুকটা ধক করে ওঠে।
তার হাতের চুড়িগুলো কাঁপতে থাকে, চোখ দুটো দরজার দিকে স্থির।
মুহূর্তে করিডোর জুড়ে ভারী পায়ের শব্দ।
কালো স্যুটে, ঠান্ডা মুখে, শক্ত গলায় মাহাদ খান ম্যানশনে প্রবেশ করল।
তার মুখে একটুও হাসি নেই।
চোখের কোণে ঘুম নয়, বরং ঘূর্ণিঝড়ের মতো ক্লান্তি আর রাগ।
চারপাশের সবাই চুপচাপ নত হয়ে সালাম করল — কিন্তু মাহাদের দৃষ্টি কাউকেই ছুঁল না।
ওর চোখ একবারও আলিশার দিকে গেল না।
অদ্ভুত! যেন সে নেইই এখানে।
তবুও আলিশার বুক কেমন করে উঠল—
ঃ- এই মানুষটা… সত্যিই আমার স্বামী?... আমি তার নতুন বউ, অথচ আমার প্রতি তার একটুও আকর্ষণ নেই??... কেন?... 
ওর বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নগুলো একসাথে আঘাত করল।
কিন্তু ঠোঁট নড়ল না, শুধু হাতটা শক্ত করে চেপে রাখল।
মাহাদ সোজা উপরে উঠে গেল নিজের রুমে।
আলিশা অজান্তেই পেছন পেছন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল —
যেন চোখের সামনে দিয়ে এক অচেনা মানুষ পেরিয়ে গেল,
যে মানুষটার নাম তার সঙ্গে বাঁধা,
কিন্তু যার ভেতর এখন আর ভালোবাসার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই।
খান ম্যানশনের বিশাল বারান্দায় হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু মাহাদের রক্ত যেন ফুটছে।
সবার চোখের আড়ালেই সে উঠে আসে নিজের বেডরুমে—
যে রুমে এখন আলিশা নামে এক মেয়ের উপস্থিতি আছে,
যে মেয়ে তার ঘর, তার বিছানা, এমনকি তার জিনিসপত্র পর্যন্ত ভাগ করে নিচ্ছে — অথচ ওর কোনো অধিকার নেই।
দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বুকের ভেতরটা ধপ করে ওঠে।
সাদা পর্দার হালকা দোল, আর ঘরের এক কোণে সাজানো—
সাজঘরের টেবিলের ওপর আলিশার চুড়ি, ওড়না, আর হালকা পারফিউমের গন্ধে ভরে থাকা বাতাস।
মুহূর্তে মাহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
চোখের মণি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
হাতের আঙুলে থাকা রিংটাও মুঠোয় পিষে ধরে।
ঃ- এই ঘর… এই বিছানা… এখানে অন্য কারও অধিকার। 
চোখে একফোঁটা রক্তিম ঝিলিক।
সে হঠাৎ টেবিলের ওপর থাকা মেকআপ বক্সটা ছুঁড়ে মারে দেওয়ালে—
চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সব!
পারফিউমের বোতলটা ফেটে যায়, গন্ধটা আরও ঘন হয়ে ওঠে,
যেন সেই সুবাসও তাকে বিদ্রুপ করছে।
ঃ- আমার বেডরুমে... আমার রাজত্বে অন্য কেউ অধিকার দেখাবে??..?..
দরজার পাশে রাখা পর্দা ধরে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে মাহাদ।
বিছানার উপর আলিশার ওড়না ছুঁয়ে যায় ওর পায়ে —
ওটা তুলে নেয়, কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে, তারপর মুঠোয় চেপে ফেলে দেয় মেঝেতে।
তার নিঃশ্বাস ভারী, বুক ওঠানামা করছে তীব্র রাগে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলে—
ঃ- তুমি বোকা হয়ে যাচ্ছ মাহাদ… তুমি দুর্বল হয়ে যাচ্ছ...!
এক মেয়ের ছোঁয়া, এক সুবাসে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছো?.. 
তারপর নিজের হাতের ঘড়িটা খুলে আয়নায় ছুঁড়ে মারে—
আয়নাটা ভেঙে গিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়,
আর প্রতিটা টুকরোয় ভেসে ওঠে মাহাদের ছিন্নভিন্ন মুখের প্রতিফলন।
চোখের কোণে একফোঁটা ঘাম নাকি অশ্রু— বোঝা যায় না।
কিন্তু ওর গলাটা কাঁপছে।
ঃ- রায়া... তুমি কী করেছো আমার সাথে...।  
নামটা ঠোঁট থেকে বেরিয়েই মাহাদের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
ওর দৃষ্টি আবার ঘুরে যায় আলিশার দিকে—
যে এখন এই ঘরের ভিতরে ওর নামে বন্দি এক স্ত্রী,
কিন্তু ওর চোখে শুধু কিয়ারার ছায়া।
সে রুম থেকে বেরিয়ে যায়—
ভাঙা আয়না, ছেঁড়া পর্দা, ছড়িয়ে থাকা গয়না আর কাচের টুকরোর মধ্যে রেখে যায় একটাই প্রমাণ—
একটা মানুষ যখন ভালোবাসার ত্যাগ স্বীকার করে জ্বলে ওঠে, তখন তার ভিতরের আগুন পুরো পৃথিবী পুড়িয়ে দিতে পারে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মাহাদের বুক ওঠানামা করছে।
নীলরঙা চোখের মণি লালচে রঙের হয়ে গিয়েছে, হাতের আঙুলে রক্তিম শিরা ফুলে উঠেছে।
বিছানার উপর আলিশার ওড়নাটা ছুঁয়ে যাওয়া মাত্রই তার ভেতরে যেন আগুন ধরে গেল।
ধাম!!
এক ঝটকায় দরজাটা খুলে দেয়—
চিৎকারটা এমনভাবে বেরিয়ে আসে, যেন পুরো ম্যানশনটা কেঁপে ওঠে।
ঃ- কে অনুমতি দিয়েছে আমার ঘরে ওকে ঢোকানোর?..?.. 
কে সাহস দেখিয়েছে আমার রুমে আলিশা নামের ওই মেয়েকে বসাতে?..?... 
নিচতলার সবাই চমকে উঠে তাকিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে।
স্টাফ রা ভয়ে থমকে যায়, কেউ কথা বলতে সাহস পায় না।
আলিশা দরজার ভেতর দাঁড়িয়ে, ফ্যাকাসে মুখে কাঁপছে — হাতে এখনো শাড়ির আঁচলটা।
মাহাদ এগিয়ে যায়— প্রতিটা পদক্ষেপ যেন বজ্রপাতের মতো ভারী।
চোখের ভেতর আগুন জ্বলছে।
ঃ- আমার ঘরে… আমার জায়গায়... কেউ ঢুকবে, আর আমি চুপ করে থাকবো?.?.. 
এই ঘরটা আমার নিঃশ্বাসের মতো— ওখানে অন্যকারো ছায়াও পড়বে না বুঝলে?.?.. 
বৃদ্ধ দাদাভাইয়ের কণ্ঠে শান্ত স্বরে বোঝানোর চেষ্টা,
ঃ- মাহাদ, আলিশা এখন তোমার স্ত্রী... ওর থাকা স্বাভাবিক। 
ঃ- স্ত্রী?! কে বলেছে ও আমার স্ত্রী?!.. মাহাদের কণ্ঠে তীব্র বজ্রধ্বনি।
ঃ- যে বিয়েতে আমি নিজের ইচ্ছায় রাজি হয়নি, সেখানে কাকে স্ত্রী বলছো তোমরা?... মানি না ওকে আমার স্ত্রী হিসেবে। 
সবাই স্তব্ধ, রাগে ক্ষোভে আলিশার চোখে পানি জমে যায়, তবুও কিছু বলতে পারে না— কেবল ঠোঁট কাঁপে।
মাহাদ চারদিকে তাকায়—
তারপর আঙুল তুলে নির্দেশ দেয় স্টাফ মালা কে ,
ঃ- ওকে এখান থেকে সরাও। এখনই! 
কেউ নড়ে না। সবার মুখ নিস্তব্ধ।
মাহাদ রাগে চিৎকার করে ওঠে,
ঃ- আমি বলেছি, সরাও ওকে! আমি কাউকে বলিনি আমার ঘরে ঢোকাতে।
যে-ই করুক… আজ থেকে কেউ আমার আদেশ অমান্য করলে, এই ম্যানশনেই থাকতে পারবে না!.. 
বাতাস ভারী হয়ে যায়।
আলিশার চোখে জল গড়িয়ে পড়ে, ও ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়ায়।
চুপচাপ, কেবল চুড়ির টুংটাং শব্দটা ভেসে আসে।
মাহাদ তখনো স্থির দাঁড়িয়ে—
বুকের ভেতরে যেন কোনো ঝড় তাণ্ডব করছে, কিন্তু মুখে ঠান্ডা আগুন।
ওর চোখে একবার কিয়ারার মুখ ভেসে ওঠে, তারপর সেটা মিলিয়ে যায় অসহায় ছায়ার সাথে।
ঃ- আমার ঘরে... অন্য কারও জায়গা নেই। কারও নয়... কখনো নয়। 
মাহাদ ঘুরে দাঁড়ায়, দরজাটা জোরে বন্ধ করে দেয়।
ভেতরে কেবল একটাই শব্দ — ভাঙা নিঃশ্বাস আর বুক ফাটার আওয়াজ।
খান ম্যানশনের করিডোর নিস্তব্ধ।
রাতের চিৎকারের প্রতিধ্বনি যেন এখনো দেয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
চোখেমুখে ক্লান্তির ছায়া, আর মুখে এক অদ্ভুত ভার — যেন সবাই বোঝে কিছু একটা চিরতরে ভেঙে গেছে।
আলিশা তখন দাঁড়িয়ে আছে দরজার পাশে, মাথা নিচু।
চোখ দুটো লালচে, কাঁধে শাড়ির আঁচলটা কুঁচকে আছে।
কেউ তার পাশে দাঁড়াতে সাহস করছে না।
দাদাভাই আস্তে করে সোফা থেকে উঠলেন, হালকা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন—
ঃ- ওকে… ওকে অন্য রুমে নিয়ে যাও।”
একটা মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর ম্যানশনের এক স্টাফ নিশা এগিয়ে এলো, চুপচাপ মাথা নুইয়ে।
ঃ- ম্যাডাম, চলুন...।
আলিশা একবার পেছনে তাকায়—
দরজার ওপাশে মাহাদের ঘর, বন্ধ দরজা, নিঃশব্দ দেয়ালের আড়ালে সেই মানুষটা আছে…
যার নামেই ওর পরিচয় কিন্তু ওর জীবনে কোনো জায়গা নেই।
তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়ালো।
করিডোরে পায়ের আওয়াজ টুং টাং করে বাজছে,
চুড়ির শব্দে মিলছে ওর নিঃশব্দ কান্না।
মাহাদের দাদাভাই চুপচাপ বসে চোখ মুছে নিলেন।
ওর মায়ের ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কিছু বলতে পারছেন না।
পুরো ম্যানশন যেন জমে গেছে— এক টুকরো শোক ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে ঘরে।
তৃতীয় তলাতেই থাকবে আলিশা জেদ করছে। তাই স্টাফ একটা গেস্ট রুমের দরজা খুলে দিলো , এক নতুন ঘরের—
মাঝারি আকারের, শান্ত, কিন্তু নিঃসঙ্গ।
দেয়ালে হালকা সোনালী রঙ, কোণায় একটা ছোট্ট ফুলদানিতে শুকনো ফুল।
আলিশা ভেতরে ঢুকলো।স্টাফ দরজা বন্ধ করে দিলো নিঃশব্দে।
আলিশা পেছন ফিরে তাকাল—
নতুন এই ঘরটা যেন তার ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি।
সবকিছু ঠিকঠাক, কিন্তু প্রাণহীন।
ও বিছানার কিনারায় বসে পড়লো,
চোখের জলে শাড়ির পাড় ভিজে গেল,
আর ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল—
ঃ- আমি তো শুধু ভালোবেসেছিলাম…। তোমাকে পাওয়ার জন্যেই তো এতো কিছু করেছি, সেটা কি অন্যায় হয়েছে??..!..
বাইরে বাতাসের হালকা শব্দ, জানালার পর্দা একটু দুলে উঠলো,
আর দূর থেকে শোনা গেল মাহাদের ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার ভারী শব্দ।
— — —
রাতের খাবারের টেবিলে সবাই বসেছে।
আলিশা নীরবে বসে আছে, মাহাদও এসেছে, কিন্তু তাদের মাঝে এক অদৃশ্য দেয়াল।
চামচের ঠকঠক শব্দও কেমন যেন কাঁপছে।
হঠাৎ মাহাদের কণ্ঠ শুনে সবাই চমকে ওঠে—
ঃ- কাজের লোকজনদের বলো, কাল সকাল থেকে বাড়ির রুলস পরিবর্তন হবে।
সেই ঠান্ডা গলা শুনে আলিশার গলা শুকিয়ে যায়।
সে চুপ করে তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে—
ঃ- এই মানুষটা… সত্যিই আমার স্বামী?..?.. 
নাকি কেউ অন্য কেউ ওর মুখোশ পরে এসেছে?...?...
খাবার খাওয়া শেষ হতেই মাহাদ হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়,
সিঁড়ির কাছে এসে একবার থামে,
দৃষ্টি ফেলে আলিশার দিকে — চোখে এমন এক রহস্য, যা ভয় ধরিয়ে দেয়।
তারপর নিঃশব্দে বলে—
ঃ- নিজের ঘরে থাকো, দরজা ভালো করে বন্ধ করো। এখন থেকে কারও ওপর ভরসা কোরো না। 
বলেই চলে যায় সে।
আলিশা একা বসে থাকে,
চোখের পানি পড়ে যায় গালে,
আর মনে মনে ভাবে—
ঃ- যাকে পেয়েছি, সে মানুষটা কে?..
আমার?... আমি তো এমনটা চাইনি, তাহলে কি আমি জোরজবরদস্তি করে ভূল করলাম??..!... 
---চলবে--- 
ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন