#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ২৭
🌿🌿🌿
পাঁচটা বছর!... কেটে গিয়েছে পাঁচ টা বছর।
সময় যেন নিঃশব্দে অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। কিয়ারা এখন দুই সন্তানের মমতাময়ী জননী। সেই ছোট্ট মাহিরা আর ছোট্ট মিরান এখন টুকটুকে পাঁচ বছরের দুষ্টু যমজ, ঠিক তাদের বাবার মতোই একরোখা, আর মায়ের মতোই প্রাণচঞ্চল।
কানাডার ঠান্ডা শহরে এসে কিয়ারা নিজের ভাঙা পৃথিবীটাকে জোড়া লাগাতে শিখেছে…
কিন্তু কিছু ক্ষত কখনও সারে না—শুধু সময়ের পরত পড়ে যায়।
আজ বাংলাদেশে ফেরার দিন। দীর্ঘ পাঁচ টা বছর ছয় মাস পর আজ কিয়ারা নিজের দেশ, নিজের মাটিতে ফেরার সাহস করেছে। এখন ওর নিজের মাটিতে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। এই পাঁচটি বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে, আগের সেই অবুঝ অভিমানী, বেখেয়ালী কিয়ারা টি আর নেই। এখন সে ভীষণ বুঝদার, যে সন্তানদের খেয়ালে সর্বদা নিযুক্ত।
বিমানবন্দরের জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে কিয়ারা দেখছে সেই মাটিকে, যে মাটি একদিন তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল—
তবু অজান্তেই বুকের ভেতর একটা কম্পন, একটা অচেনা টান জেগে উঠছে।
মিরান জানালায় মুখ চেপে বলল,
ঃ- মাম্মাম, এটাই কি তোমার দেশ?..?..
কিয়ারা ছেলের কথা শুনে মৃদু হাসল ঃ- হ্যাঁ সোনা, এটাই আমার দেশ... আর এখন থেকে আমাদের দেশ।
মাহিরা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, ঠিক যেন তার ছোট্ট ফুলটি।
অবশেষে বিমান এসে ল্যান্ড করে বাংলাদেশের হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
বিমানের দরজা খুলতেই গরম বাতাসের সাথে একরাশ স্মৃতি এসে ধাক্কা খেলো কিয়ারার মুখে।
পাঁচ বছর পর — সবকিছু যেন এক নিমিষে ফিরে এল মনে, কিন্তু মুখে কেবল একটা শান্ত হাসি।
— — —
অন্যদিকে — খান ম্যানশন
মাহাদ খান এখন অনেক বেশি নীরব, অনেক বেশি পরিণত।
ব্যবসার রাজ্য আরও বিস্তৃত, কিন্তু চার বছর ধরে এখানকার এমপি পদে নিযুক্ত রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক সময়ের ধারায় চলে যাচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের ভিতরটা আগের মতোই ফাঁকা।
আজ সকালে মিতালী খান হালকা গলায় বলেছিলেন,
ঃ- মাহাদ, বিকেলে তোমার সেই পুরোনো ফ্রেন্ড রিদিতা ফিরছে বিদেশ থেকে, তোমরা একসাথে বাহিরে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছিলে… তুমি ওকে পিক করলে ও খুশি হবে। ওকে একটু গিয়ে একবার নিয়ে এসো।
মাহাদ তখন কফির কাপে তাকিয়ে শুধু বলেছিল,
ঃ- হ্যাঁ , আমাকে ই-মেল করেছিল, ঠিক আছে আম্মু সময় পেলে আমিই যাবো।
কে জানতো, সেই “পুরোনো ফ্রেন্ড”টাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য খুঁজে ফিরে আনবে?...
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিড়, কোলাহল, গাড়ির হর্নে মুখর চারপাশ।
মাহাদের সাদা পাঞ্জাবিতে, গাঢ় সানগ্লাস, আর ঠোঁটে অন্যমনস্ক একরোখা ভাব—
ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাহুল নিচু গলায় বলল,
ঃ- ভাই, ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে।
ওর চোখ ঘড়িতে,
কোনো মুখে নয়।
ঠিক তখনই টার্মিনালের কাঁচের দরজা খুলে গেল—
একটা হালকা নীল ড্রেস, গলায় সাদা স্কার্ফ, এক হাতে ট্রলি ব্যাগ অন্য হাতে একটা বাচ্চা ছেলের হাত ধরে এগিয়ে আসছে রিদিতা। মাহাদ প্রায় কয়েক বছর পর দেখলো রিদিতা কে। আর ওর সাথে বাচ্চাটি কে দেখে বুঝতে পারলো ওটা রিদিতার ছেলে। আজ ওর হয়তো একটা ফুটফুটে সন্তান থাকতো, নিজের ভাগ্যকে তাচ্ছিল্য করে হেঁসে উঠল মাহাদ।
রিদিতা মাহাদ কে দেখে ছেলে কে নিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়েছে।
রিদিতা এসেই মাহাদ কে জড়িয়ে ধরলো। মাহাদ গম্ভীর হয়ে ওকে সরিয়ে দিল।
ঃ- হেই মাহাদ, প্রায় কয়েক বছর পর আমাদের দেখা হল। তোমার দিনকাল কেমন চলছে??..
ঃ- আল্লাহ যেমন রেখেছেন। এটা কে তোমার ছেলে??..
মাহাদ রিদিতার সাথে বাচ্চাটি কে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল।
ঃ- হ্যাঁ, আমার ছেলে রাফি!.. বাবা আঙ্কেল কে হ্যালো বলো?!..
রিদিতা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠলো।
ঃ- হ্যালো আঙ্কেল!..
রাফি হাত নাড়িয়ে মাহাদ কে হ্যালো বললো।
মাহাদ একটু হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। হঠাৎ করেই ওর চোখ গেল কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ছেলেমেয়েদের দিকে। মাহাদ ভ্রু কুঁচকে ওদিকে তাকিয়ে রইল।
কিয়ান, কায়রান ,নামিরা, কিরণ, মিশাল, মেহরাব সবাই এয়ার পোর্টে এসেছে। দীর্ঘ কয়েক বছর পর প্রিয় বোনকে দেখতে পাবে ওরা। আর নীলাভ ভাইয়া!.. তাকে তো সেই আট বছর আগে দেখেছিল ওরা, তাই ভাই বোন ফিরে আসার খুশিতে চৌধুরী বাড়ির সকল ছেলেমেয়ে ওদের ওয়েল কাম জানাতে এয়ার পোর্টে উপস্থিত হয়েছে।
ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে মাহাদ। ওরা কাকে রিসিভ করতে এসেছে??.. বাহিরে থেকে কে আসবে??.. তবে কি… আর কিছু ভাবতে পারলো না মাহাদ খান, অদূরে থেকে এগিয়ে আসছে সম্পূর্ন কালো রঙের বোরকায় আবৃত এক রমনী। রমনীর সাথে ফর্মাল পোশাকে একটা ছেলে এগিয়ে আসছে। আর সেই রমনীর দুই পাশে দুটি ফুটফুটে ছেলে মেয়ে রমনীর দু’হাত ধরে এগিয়ে আসছে।
ছোট্ট মেয়েটি দৌড়াতে দৌড়াতে হাসছে, ছেলেটি মায়ের আঙুল শক্ত করে ধরে আছে।
মুহূর্তটায় সময় থমকে গেল।
মাহাদের বুকের ভিতর যেন কেউ খামচে মেরে ধরলো—
চোখে বিশ্বাসই হচ্ছে না...
ওটা কি সত্যিই কিয়ারা…?.. ওর সেই হারিয়ে যাওয়া রায়া??.!..
তার বুকের মধ্যে জমে থাকা পাঁচ বছরের হাহাকার এক নিমেষে ছিন্নভিন্ন করে গেল সেই পরিচিত অবয়ব টা।
কিয়ারার চোখও এক ঝলক ওর উপর পড়লো—
কিন্তু সে কিছু বললো না।
চোখে শুধু এক অদ্ভুত শান্তি, আর পেছনে ফেলে আসা হাজার প্রশ্নের ভার।
দূর থেকে বিচক্ষণ মিরান মাকে জিজ্ঞেস করল,
ঃ- মাম্মা, ওই আঙ্কেল টা কেন এভাবে দেখছে আমাদের??...
কিয়ারা ছেলের কথা শুনে হাসল, শিশুটার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
ঃ- আমি তো জানি না বাবা... হয়তোবা আমাদের মধ্যে নিজের কাউকে খোঁজার চেষ্টা করছে।
তবে ছোট্ট মিরান মায়ের এতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা কথার কিছুই বুঝতে পারলো না। তাই মাকে আর কোনো প্রশ্ন করলো না। তবে দুষ্টু মাহিরা কি আর চুপচাপ থাকতে পারে?!
সে নীলাভ মামা কে এটা ওটা দেখিয়ে কৌতুহল নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করেই চলেছে। আর নীলাভ হাসি মুখে আদরের ভাগ্নির সকল কৌতুহল মেটাচ্ছে।
বাইরের হাওয়া তখন কেমন জানি ভারি হয়ে গেছে।
আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে, আলো ছায়ার খেলা চলছে ঠিক যেমন তাদের দুজনের চোখে।
এয়ারপোর্টের ভিড় থেকে বেরিয়ে আসতেই হালকা বাতাসে ঢাকা শহরের ধোঁয়া আর কোলাহল কিয়ারার মুখে এসে লাগল।
পাঁচ বছর ছয় মাস পর, এই শহর তাকে আবার বুকে টেনে নিলো —
কিন্তু এবার সে আগের কিয়ারা নয়,
সে একজন মা, সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা একজন নারী,
যে ভালোবাসা হারিয়েও শক্তি খুঁজে পেয়েছে নিজের ভেতর।
গেটের বাইরে কিয়ারার ভাই বোন দাঁড়িয়ে ছিল।
কিরণ ছুটে এসে ছেলে মেয়েদের বুকে টেনে নিল, চোখে জল—
ঃ- আমার রাজপুত্র, আমার পরী আম্মু… কেমন আছেন??..
মিরান হাসতে হাসতে বলল,
ঃ- খালামনি আমরা খুব ভালো আছি আলহামদুলিল্লাহ !
মাহিরা নামিরার কাঁধে মুখ লুকিয়ে বলল…
ঃ- খালামুনি, এখানে গরম লাগছে।
কিয়ান মাহিরার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল…
ঃ- এই তো মামুনি আমরা এখনই বাড়িতে ফিরবো। সেখানে তোমার নানুমনি রা , নানাভাই রা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
কিয়ারা নীরবে মাথা নাড়ল—
তার মনে হচ্ছিল, এই মাটিতে ফেরা যেন এক অজানা পরীক্ষার শুরু।
কায়রান এগিয়ে গিয়ে ছোট ভাই কে জড়িয়ে ধরলো। নীলাভ বড় ভাই কে জড়িয়ে ধরে হাসলো।
ঃ- কত বড় হয়ে গেছিস, সেই কবে দেখেছিলাম।
ঃ- তুমিও তো বড় হয়ে গেছো ভাইয়া, আগের থেকে আরো বেশি সুদর্শন হুমমম!...
নীলাভের কথায় কায়রান ওর পিঠে কিল মারলো।
ঃ- এখনো আগের মতই ফাজিল আছিস।
কিয়ান এগিয়ে এসে ভাই কে জড়িয়ে ধরলো। তারপর নীলাভ ওদের সাথে আশা সাদাফ ও সাবিহা কে পরিচয় করিয়ে দিল। তারপর সকলে মিলে বাড়ির দিকে রওয়ানা হল।
এদিকে মাহাদ এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে ওদের কে দেখছিল। ওর কেন জানি বাচ্চা দুটো কে ভীষণ কাছের মনে হচ্ছে।
বাচ্চা দুটোর দিকে তাকিয়ে মাহাদ যেন একটা ঘোরে চলে গেল। ওর কেন জানি বাচ্চা দুটো কে ভীষণ আপন আপন লাগলো। এই প্রথম কোনো বাচ্চা কে একটুখানি কোলে নিতে ইচ্ছে করছে, একটুখানি ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। মাহাদ ভীষণ মায়াময় দৃষ্টিতে বাচ্চা দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।
ঃ- কি হলো বাড়িতে যাবে না??.. আমি তো চলে এসেছি, আরও কেউ কি আসবে??..
রিদিতা মাহাদ কে ওভাবে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল। তারপর মাহাদ নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রিদিতা ছেলে কে নিয়ে মাহাদের পাশে বসে পড়ল।
ঃ- তোমরা একা কেন এলে??..ওর বাবা কে নিয়ে আসলে না কেন??..
মাহাদ রিদিতা কে জিজ্ঞেস করল।
ঃ- ঐ ফা*কারের কথা আর বলো না তুমি, ওই শালা মাদারের বাচ্চা আমাকে চিট করেছে।
রিদিতা রাগে ক্ষোভে কটমট করে বলে উঠলো।
এদিকে বাচ্চার সামনে এমন গালি দেওয়া শুনে গাড়ির সামনে বসে থাকা রাহুল খুক খুক করে কেশে উঠলো। মাহাদ নিজেও একটু বিরক্তবোধ করলো। তবে আর কোনো বাড়তি কথা বললো না। ওর মন পড়ে আছে এয়ার পোর্টের ওই ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা দুটোর কাছে।
গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে মাহাদ।
মনের ভেতর অস্থিরতা জমে উঠেছে,
কেন যেন বারবার সেই মুখটা চোখে ভাসছে —
ওই মেয়েটা... ওই চোখদুটো... ওই হাসিটা...
এমন পরিচিত লাগছে কেন?
সে নিজের মনকে তিরস্কার করল,
ঃ- না, এটা শুধু কাকতালীয়।
ও হয়তো কেউ অন্য কেউ।
কিন্তু হৃদয়ের কোথাও এক অজানা ব্যথা বাজছে।
রাহুল জিজ্ঞেস করল,
ঃ- ভাই, আপনি ঠিক আছেন??..
মাহাদ নিঃশব্দে বলল…
ঃ- না... কিছু একটা ঠিক নেই।
গাড়ির জানালায় তার প্রতিফলন, আর পেছনে ম্লান হয়ে যাওয়া সেই কাঁচের দরজা—
যেখানে কিয়ারা দাঁড়িয়ে ছিল দুই সন্তানকে নিয়ে,
দু’জনের দৃষ্টির মাঝে যেন এক অপূর্ণ জীবনের দীর্ঘ নীরবতা ভাসছিল।
— — —
চৌধুরী বাড়ি তখন আনন্দে ভরপুর—
সবাই ভীষণ খুশি কিয়ারাদের কে এতো বছর পর ফিরে পেয়ে। মেয়েরা সবাই সাবিহা কে নিয়ে গল্প করছে, মেয়েটা কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের সবার সাথে মিশে গিয়েছে। কিন্তু
কেউ জানে না, আসলে এই মেয়েটাও এই বাড়ির একজন সদস্য হতে চলেছে।
কিরণের মা হালকা গলায় বললেন,
ঃ- ওর চোখদুটো একদম তোর মতো, কিয়ারা। কত সুন্দর, তবে মিরানের চোখজোড়া আরো বেশি সুন্দর!.
কিয়ারা থমকে গেল,
চুপ করে উঠে গেল নিজের ঘরে।
অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল,
ঃ- একদম বাবার মতো হয়েছে যে!..
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে থামিয়ে দিল—
ঃ- না, সে তো চলে গিয়েছিল চিরদিনের মতো। আমার বাচ্চাদের উপর ঐ বাড়ির কারো ছায়া টাও পরতে দেবো না।
তার কণ্ঠে একরাশ কষ্ট আর অসমাপ্ত ভালোবাসা,
যা এখনও ধুঁকছে বুকের ভেতর।
রাত নেমে এসেছে উত্তরার আকাশে।
হালকা বৃষ্টি পরেছে সন্ধ্যার পর থেকেই,
জানলার পাশে দাঁড়িয়ে কিয়ারা তাকিয়ে আছে অন্ধকারে—
বৃষ্টির জল জানালার কাঁচ বেয়ে নামছে,
যেন কারও অশ্রু ঝরছে নীরবে, অজানা কারও জন্য।
বেডরুমের কোণে মিরান ঘুমোচ্ছে শান্ত মুখে,
আর মাহিরা নরম চাদর মুড়িয়ে মায়ের কোলের কাছে গুটিসুটি মেরে আছে। ছেলেটা ভীষণ শান্ত, আর এই বয়সেই বেশ বুঝদার। কিন্তু মেয়েটা ভীষণ দুষ্টু হয়েছে, যতক্ষণ জেগে থাকে একজায়গায় স্থির হয়ে থাকে না । সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখতে মাহিরা একাই যথেষ্ট, ছোটাছুটি ছাড়া যার দিনই শুরু হয়না। আর মিরান সারাক্ষণ বোনের সাথে সাথেই থাকে যেন বোন কোথাও পরে গিয়ে আঘাত না পায়। কিয়ারা মুচকি হেসে ছেলে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে কিয়ারা ফিসফিস করে বলল—
ঃ- তোমরা আমার বেঁচে থাকার কারণ, আমাকে দেওয়া আল্লাহর অশেষ রহমত।
কিন্তু বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল হঠাৎ।
এই শহর, এই রাত, এই গন্ধ—
সব কিছুতেই এক নাম বারবার বাজছে মনে,
"মাহাদ..."
সে চোখ বন্ধ করল।
এক মুহূর্তে যেন পাঁচ বছর আগের প্রতিটা স্মৃতি ফিরে এলো—
বিয়ের রাত, প্রতারণা, রক্তক্ষত হৃদয়,
আর সেই বিদায়ের মুহূর্ত যখন সে নিজের বুকে অনাগত সন্তান নিয়ে সমাজের ভয়ে ভীত হয়ে
পিছন না ফিরে চলে গিয়েছিল পৃথিবীর অন্য দেশে।
তারপর নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিঃশব্দে হাসল—
ঃ- আজ আমি ফিরে এসেছি… কিন্তু তুমি জানতেও পারোনি,
তোমার সন্তানরা তোমার শহরের বাতাসেই নিশ্বাস নিচ্ছে। অথচ তুমি জানো তারা নেই। এটাই তোমাকে জানাতে চেয়েছিলাম। কারণ তোমার আমার সন্তানদের উপর কোনো অধিকার নেই। ওরা শুধুমাত্র আমার সন্তান।
বাতাসে হালকা ঝড় উঠল, পর্দা উড়ে উঠল,
আর সেই সঙ্গে কিয়ারার চোখে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল—
সে জানে, এই শহর আবার ওর জীবনটাকে ওলটপালট করে দেবে,
কিন্তু এবার সে ভাঙবে না।
এবার কিয়ারা শুধু কিয়ারা নয়—
এক মা, এক প্রতিশোধের আগুন।
— — —
পরের দিন সকালে কিয়ারা ঘুম থেকে উঠেই আগে ছেলেমেয়ে কে ফ্রেশ করিয়ে দিল। তারপর কিরণ আর মেহরাব এসে ওদের নিয়ে গেল। কিয়ারা ফ্রেশ হয়ে নিজেও নীচে নেমে আসলো। ডাইনিং টেবিলে ওদের জন্য এলাহী আয়োজন করা হয়েছে। আজ কতগুলো বছর পর ছেলে মেয়েরা বাড়ি ফিরেছে। বাবারা মন খুলে বাজার করে এনেছে, আর মায়েরা নিজেদের সবটা ভালোবাসা দিয়ে সেগুলো রান্না করেছে।
কিয়ারা নিচে নেমে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। মাহিরা সাদাফের কোলে বসে আছে, আর মিরান বোনের পাশেই চেয়ারে বসে আছে। তারা ভাই-বোন দু'জনেই মায়ের অপেক্ষা করছে। কারণ মায়ের হাতে ছাড়া এই ভাই-বোন কারো হাতে খাবার খায় না।
কিয়ারা এসে মিরানের পাশের চেয়ারে বসতেই মাহিরা মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। কিয়ারা মেয়ে কে কোলে নিয়ে মুখে পাউরুটিতে জেলি মাখিয়ে মেয়ের মুখের সামনে ধরল। এভাবেই ছেলে মেয়ে কে একসাথে খাইয়ে দিল। বাকিরা সবাই খাওয়া রেখে ওদের মা ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
ঃ- কি হয়েছে?.. তোমরা সবাই এভাবে তাকিয়ে আছ কেন??..
কিয়ারা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
ঃ- না দেখছি , যেই কিয়ারা আগে নিজেই খেতে বসলে কত বাহানা করতো, সে কিভাবে যত্ন করে বাচ্চাদের খাবার খাওয়াচ্ছে।
নায়লা চৌধুরী হেসে বলে উঠলেন।
কিয়ারা বড় চাচীর কথা শুনে হেসে ফেললো। মাকে হাসতে দেখে তার ছানারাও হেঁসে উঠল। ওদের হাসতে দেখে বাকিরাও হেঁসে উঠল।
ঃ- আচ্ছা অনেক দিন পর ওরা বাড়িতে ফিরেছে, বিশেষ করে নীলাভ। আমি তাই বাড়িতে একটা গেট টুগেদার এর আয়োজন করতে চাচ্ছিলাম। তোমরা কি বলো?!..
বড় চাচা নামির চৌধুরী সবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন।
উনার এই কথায় বাকিরা সবাই কিয়ারার দিকে তাকালো। কারণ গেট টুগেদার হলে সেখানে লিস্টের প্রথমেই থাকবে খান পরিবার। কিয়ারা সবাই কে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওদের ভাবনা চিন্তা বুঝতে পারলো।
ঃ- তোমরা সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন?.. আমার কোনো সমস্যা নেই, চাচ্চু তুমি আয়োজন করতে পার।
কিয়ারার এই কথায় সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ওরা ভেবেছিল এটা শুনেই কিয়ারা না আবার রিয়্যাক্ট করে বসে। কিন্তু ওরা হয়তো ভুলে গিয়েছে যে ও ওর আগেই সেই কিয়ারা টি নেই।
ঃ- আচ্ছা আমার খাওয়া শেষ, আমি বাচ্চাদের নিয়ে একটু বাগানে যাচ্ছি। খেয়াল রাখবে ওদিকে যেন এখন কেউ না যায়।
এই বলে কিয়ারা চেয়ার ছেড়ে উঠে বাচ্চাদের নিয়ে ড্রয়িং রুম পেরিয়ে বাহিরে চলে আসলো। আর বাকিরা ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কিয়ারার মা নীলাশা চৌধুরীর চোখজোড়া ভিজে উঠলো। বাকিরাও সবাই কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। কারণ ঐ বাগানেই তো রয়েছে কিয়ারার আদরের কলিজার তৃতীয় টুকরো টাহ!...
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ