#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ৩২
🌿🌿🌿
হসপিটালের জানালায় বৃষ্টি পড়ছে টুপটুপ করে।
নিস্তব্ধ রাত।
আইসিইউ-র আলো ম্লান।
মিরান আর মাহিরা দু’জনেই শান্ত ভাবে ঘুমিয়ে আছে।
তাদের মাস্ক-ঢাকা মুখ দেখলে বুক ফেটে কান্না আসে।
কিয়ারা ওদের মাথার পাশে বসে কাঁধ জড়িয়ে আছে।
চোখ ফুলে গেছে কান্নায়,
ঠোঁট শুকিয়ে গেছে শুকনো প্রার্থনায়।
ঠিক তখন—
করিডোরের শেষ মাথা থেকে ভারী বুটের শব্দ।
ঠক… ঠক… ঠক…
আফনান মাহাদ খান।
গাঢ় কালো শার্ট, ভেজা চুল,
চোখে এমন লাল দাগ—
যেন পুরো পৃথিবীর ওপর তার রাগ জমে আছে।
সে এসে কাঁচের সামনে থামল।
বাচ্চাদের দিকে তাকাল কয়েক সেকেন্ড।
তার বুক অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল…
একটা অপরিচিত ব্যথা,
একটা টান—যেটা সে এখনও বোঝে না।
হাত দুটো মুঠি করে ফেলল।
ঃ- আমি জানব… কে আমার থেকে সত্যটা লুকিয়েছে।”
সে কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।
কিয়ারা চমকে উঠল।
চোখ লাল করে তাকালো—
ঃ- আপনি এখানে কেন?...
আর এখন গভীর রাত হয়ে গেছে… ডাক্তার বলেছে—”
মাহাদ তার কথা কেটে বলল—
“চুপ।”
একটা শব্দ।
কঠোর, ধারালো, হুকুমের মতো।
কিয়ারা কেঁপে উঠল।
মাহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে দুই বাচ্চার দিকে তাকাল।
তার গলাটা ভাঙা গর্জনের মতো—
ঃ- কেন এদের দেখে আমার বুক ব্যথা করে?..?..
কেন এদের কাঁদলে আমার মাথা ধরে?..?..
আমি কার বাচ্চাকে—এভাবে…”
থেমে গেল।
নিজের কথায় নিজেই ব্যথা পেল।
কিয়ারা কাঁপা গলায় বলল—
ঃ- ওরা অসুস্থ… প্লিজ, আওয়াজ করবেন না…।”
মাহাদ ধীরে তার দিকে তাকাল।
চোখে অবিশ্বাস, রাগ, সন্দেহ, অস্থিরতা—
ঃ-তুমি কি কিছু লুকিয়ে আছো আমার থেকে?.?.. তাহলে এখনো সময় আছে সত্যিটা বলে দাও।
কিয়ারার নিশ্বাস থমকে গেল।
ঃ- কি বলছেন… আমি কেন?… আমি… আমি কিছু লুকাইনি।”
মাহাদ আরও এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল—
ঃ- তুমি জানো… আমি যখন এদের কাছে আসি।
তখন কেন আমার মনে হয়
আমি… আমি…”
তার গলা শক্ত হয়ে গেল।
কথা বের হল না।
কিয়ারা চোখ নামিয়ে ফেলল।
হাঁটু কাঁপছে।
মাহাদ তাচ্ছিল্যভরা হেসে উঠল—
ঃ- যেমন হোক… আগামীকাল সকালেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
কিয়ারা চমকে উঠলো, মাথা তুলে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল…
ঃ- কি… কি পরিষ্কার হবে?..?..
মাহাদ তার গালে একটি ঝড়ো নিশ্বাস ফেলল—
“সত্য।”
তারপর ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার কাছে এসে থেমে বলল—
ঃ- আর হ্যাঁ… যদি তুমি কিছু লুকিয়ে থাকো, তাহলে প্রস্তুত থেকো।
কারণ আমি সত্য জানলে কাউকে… রেহাই দেব না।”
দরজা ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে গেল।
কিয়ারা নিস্তব্ধ হয়ে বাচ্চাদের ধরে কাঁদতে লাগল—
ঃ- হায় আল্লাহ…
এটা কি ঝড় নামছে আবার?”
দুই ছোট্ট বাচ্চা—
যাদের সত্য মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ছুরি হয়ে।
— — —
হাসপাতালের সেই সকালটা অন্যরকম শান্ত। কিন্তু মাহাদের ভেতরের ঝড়ে চারপাশের সেই শান্তি কোনো মানেই রাখে না। রাতভর সে এক মুহূর্তও ঘুমায়নি—বাচ্চাদের কাঁচের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, দু’হাত পেছনে শক্ত করে গোঁজা।
সূর্যের আলো হালকা করে জানালা ছুঁতেই ডাক্তার রায়হান নিচু গলায় বললেন,
ঃ- স্যার… রিপোর্ট… এসে গেছে।”
মাহাদ পেছন ফিরলো না।
শুধু বলল,
ঃ- কেবিনে নিয়ে যান।”
ডাক্তার রায়হানের হাতে তখন পাতলা একটা ফাইল—কাগজ হলেও ওজন যেন পাহাড়ের মতো।
নিজের রুমে ঢুকে রায়হান দেখল মাহাদ ইতিমধ্যেই সেখানে দাঁড়ানো।
দরজা নীরবে বন্ধ হতেই রুমের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
রায়হান ফাইলটা টেবিলে রাখতেই হাত কাঁপল।
মাহাদ সেটা দেখল—কিন্তু কিছু বলল না।
চোখ না তুলে রায়হান শুধু বলল,
ঃ- স্যার… যা আছে রিপোর্টে… আমি কিছু বলছি না। আপনি নিজেই—”
তার গলা কেঁপে গেল।
মাহাদ ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখে কোনও রাগ নেই—শুধু বরফের মতো নীরবতা।
রায়হান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
ফাইলের ওপর তার হাত থামল কিছু সেকেন্ড। মুহূর্তটা লম্বা, অসহনীয়, নিস্তব্ধ।
তার ভেতরে—
যেন কেউ শ্বাস থামিয়ে রেখেছে।
যেন বুকের মাঝখানে একটা ভারী পাথর।
অবশেষে সে ফাইলটা নিজের দিকে টেনে নিলো।
পর্দার ফাঁক দিয়ে হাসপাতালের আলো তার মুখে পড়ছে।
ভেতরে শিরায় শিরায় টান—ভয়?...
রাগ?...
অথবা এমন কোনও সত্যের আশঙ্কা যা সে জীবনও কোনদিন কল্পনাই করেনি ।
মাহাদ ফাইলের প্রথম পাতা উল্টালো।
পাতার শব্দটা যেন চাবুকের মতো তীক্ষ্ণ।
তার আঙুল ডিএনএ ম্যাচিং সেকশনে থামতেই রায়হান নিঃশ্বাস চেপে ধরল।
মাহাদের চোখ ধীরে ধীরে সেদিকে গেল।
সে কিছু পড়লো, কিছু স্পষ্ট করে দেখলো।
আর তারপর…তারপর আর কিছুই নড়ল না।
রুমের বাতাস যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
তার চোয়াল শক্ত হলো।
শিরায় রক্ত থেমে গেল বলে মনে হলো।
তারপর—
সে নিঃশ্বাস টানল। গভীর। ধীর। অবিশ্বাসে ভরা।
রিপোর্টের ওপর তার আঙুল ধীরে থেমে গেল।
— — —
হাসপাতালের বিশাল কেবিনটা ছিল অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ।
গায়ে কাঁটা দেওয়া সেই নীরবতার মাঝেই মাহাদ দাঁড়িয়ে আছে—
দুটি হাত টেবিলের দুই ধারে চেপে ধরা, যেন টেবিলটা ভেঙে যাবে।
রিপোর্টের কাগজ এখনো পুরোটা খোলা না। ডাক্তার রায়হান দূর থেকে তাকিয়ে—
কপালে ঘাম জমে উঠছে।
তার চোখে ভয় স্পষ্ট…
কারণ সে জানে—
এই এক টুকরো কাগজ আজ কারো জীবন উল্টে দিতে যাচ্ছে।
মাহাদ ধীরে ধীরে রিপোর্ট খুলল।
পাতার প্রান্তে তার আঙুল কেঁপে উঠল—
যখন থেকে কিয়ারা তাকে ছেড়ে গিয়েছিল,
সেদিনও তার হাত এত কাঁপেনি।
তার চোখ স্লো-মোশনের মতো টেক্সটের ওপর নামতে লাগল।
“DNA Match Probability: 99.99%”
লাইনটা দেখার পর তার দুনিয়া আটকে গেল।
যেন শ্বাস নেয়া টাই দুর্বিষহ হয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর যেন কেউ জ্বলন্ত লোহার রড গুঁজে দিলো।
কিছুক্ষণের জন্য সে অসাড়।
কিছুই শুনতে পাচ্ছে না—
ডাক্তার, শব্দ, হাসপাতাল…
সব মিলিয়ে গিয়েছে।
শুধু একটা সত্য সামনে—
বাচ্চারা… তারই।
রিপোর্টের ওপর তার আঙুল শক্ত হলো। নীল রঙের চোখজোড়া ভয়াবহ রকমের লাল হয়ে উঠল।
সে হঠাৎ রায়হানের দিকে তাকালো—
সেই দৃষ্টি মানুষের নয়, আহত একটা সিংহের।
রায়হান তোতলাতে লাগল,
ঃ- স্যার… রিপোর্টে যেটা আছে… আমি—”
মাহাদের কণ্ঠ ভাঙল না,
কিন্তু হিমশীতল হয়ে বের হলো,
ঃ- কখন এসেছিল রিপোর্ট?”
ঃ- সকাল সাতটার দিকে, স্যার।”
ঃ- আগে জানালেন না কেন?”
ঃ- আপনাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল স্যার, তাই—”
মাহাদ চেয়ারটা এত জোরে ঠেলে উঠে দাঁড়াল যে শব্দে পুরো রুম কেঁপে গেল।
তার চোখে আগুন—
রাগ না, ব্যথা না—
দুটোই মিশে এক অচেনা তাণ্ডব।
“কিয়ারা…
তুমি কীভাবে পারলে?
আমার কাছ থেকে পাঁচটা বছর…
আমার নিজের সন্তান…
তুমি আমাকে জানালে না কেন?”
তার মনে একটার পর একটা ধাক্কা।
মেয়েটার হাসি, ছেলেটার চোখের ভঙ্গি—
সব মনে পড়ছে এখন।
ঠিক তারই মতো…
ঠিক তার রক্তের মতো।
তার নিঃশ্বাস কাঁপতে লাগল।
শেষ পাতায় একটা নোট—
“Both children share paternal markers consistent with Mahad Khan.
No genetic abnormalities detected except severe allergic tendency.”
এটা দেখে তার বুকের ভেতর আরও মোচড় দিলো—
ঃ- এত ছোট…এতটা অসহায়…
আমি পাশে ছিলাম না।”
এখন তার নিজের ওপরই ঘৃণা তৈরি হলো। ক্রোধ, লজ্জা, হতাশা—সব মিশে গন্ধহীন এক দহন।
ডাক্তার রায়হান সাহস করে এক পা এগোতেই মাহাদ তাকাল।
ঃ- এক ইঞ্চি কাছে আসবেন না।”
স্বরে কোনো চিৎকার নেই।
কিন্তু সেই নীরব হুমকিতে ডাক্তার পেছনে সরে দাঁড়াল।
মাহাদ এরপর দরজার দিকে হেঁটে গেল— ধীর, ভারী, গভীর শ্বাস টেনে।
দরজা খোলার মুহূর্তে সে থামল।
ঃ- ডাক্তার…এই রিপোর্ট, এইহাসপাতাল, এই পুরো ঘটনা—
একটাও ভুল হলে…”
সে বাক্য শেষ করল না।
তার দরকারও নেই।
রায়হান শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
কারণ সারা দুনিয়া জানে—
খাঁনেরা প্রতিশোধ নিলে সেটা থামানো যায় না।
মাহাদ বের হতেই নার্সরা পথ ছেড়ে দাঁড়াল। তার চোখের দিকে কেউ তাকাতে পারল না। হাসপাতালের করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
সে সরাসরি লিফটের দিকে গেল।
হাতে এখনো সেই রিপোর্ট—
কাগজ যেন তার শিরায় শিরায় ছুরি চালাচ্ছে।
লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার এক সেকেন্ড আগে সে ফিসফিস করে বলল—
“কিয়ারা… তুমি আমার থেকে এতো বড় সত্যটা লুকিয়েছিলে…কেন?”
লিফট নামতে লাগলো।
মাহাদের ভেতরের আগুন উঠতে লাগল।
— — —
ডিএনএ রিপোর্ট হাতে নিয়ে মাহাদ যখন ওয়ার্ডে ঢুকল,
তার শরীর যেন আগুনে জ্বলছে—
কিন্তু মুখে একফোঁটা চিহ্ন নেই।
কারো চোখে সে সন্দেহ জাগাতে চায় না। কারো মুখ থেকে একটা শব্দ শুনতে চায় না।
শুধু সন্তানের কাছে যেতে চায়—
যে সন্তানকে পাঁচটা বছর কেউ তার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।
ওয়ার্ডে ঢুকতেই বাতাস বদলে গেল।
দুটি ছোট্ট বেড—
মেয়েটা একটা, ছেলেটা অন্যটায়।
কিয়ারা এখন এখানে নেই, ডাক্তারের সাথে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গিয়েছে। তারপর আবার চৌধুরী বাড়ির সবাই আসছে বাচ্চাদের দেখতে, তো এখানে বসে তো কথা বলা যাবে না। তাই কিয়ারা একটু বাহিরে বেরিয়েছে।
মাহাদ ধীরে এগোল,
মনের মধ্যে একটা অচেনা ব্যথা চেপে বসে—
ঃ- ওরা আমার… এতদিন ধরে… এক মুহূর্তও জানতাম না।”
মেয়েটা দুর্বল—চোখ আধখোলা, নিঃশ্বাস ছোট ছোট।
মাহাদ পাশে বসে তার ছোট্ট হাত ধরল।
হাতটা ঠাণ্ডা…
আর অদ্ভুতভাবে সে অনুভব করল—
এই স্পর্শ তার ভেতরে গিয়ে কোথাও নরম কিছু ভেঙে দিচ্ছে।
মেয়েটার চোখ একটু নড়ল।
ধীরে তাকালো মাহাদের দিকে।
মাহাদের গলা আটকে গেল।
সে চুপচাপ বলল—
ঃ- বাবা আছি… তুমি ভয় পেও না।”
তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না
যে এতদিন সে এই শব্দ উচ্চারণই করেনি কোনো সন্তানের জন্য।
ছেলেটা একটু বেশি দুর্বল।
এলার্জি শকে শরীর ক্লান্ত।
মাহাদ তার পাশে দাঁড়িয়ে আরো কাছে ঝুঁকল।
ছোট্ট মুখটা দেখেই তার বুক ধক করে উঠল—
ঠিক তার ছোটবেলার মতো—
একদম হুবহু।
“আমার ছেলে…”
শব্দটা গলার ভেতরে থেমে গেল।
তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল—
কিন্তু সে কেঁদে ফেলে না।
এটা মাহাদ।
তার চোখের পানি বের হয় না—
শুধু ভেতরে ভেতরে জমে পাথর হয়ে যায়।
ডাক্তার চেক করতে আসতেই মাহাদ কে কেবিনে দেখে বেশ ভড়কে গেল। মাহাদ সেসবের তোয়াক্কা না করেই ঠাণ্ডা স্বরে বলল—
ঃ- এখন থেকে এই রুমে
ওদের চিকিৎসার সব সিদ্ধান্ত আমার অনুমতি ছাড়া নেবেন না।”
ডাক্তার থমকে গেল।
মাহাদের চোখে এমন একটি ঝড় আছে, যা থেকে কেউই বাঁচতে পারে না।
ঃ- ওরা এখন পুরো পর্যবেক্ষণে।
আমি চাই, এক সেকেন্ডের জন্যও—
ওদের কোনোরকম অবহেলা না হয়।”
ডাক্তার মাথা নাড়ল—
কারণ অস্বীকার করার ক্ষমতা তার নেই।
মাহাদ রিপোর্ট ভাঁজ করে কোটের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলল।
এখনই কাউকে জানালে—
কিয়ারা সবকিছু শুনতে পারলে ছটফট করবে, আবার হয়তোবা বাচ্চাদের লুকিয়ে ফেলবে। তবে এবার আর মাহাদ সেই সুযোগ দেবে না। আর তখন এতো এতো ঝামেলায়
দুই অসুস্থ বাচ্চার ওপর চাপ পড়বে।
আর সে এটা হতে দেবে না।
বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে সে ধীরে বলল—
ঃ- আগে তোমরা ভাল হও…
তারপর…এই পৃথিবীকে আমি হিসেব করে নেব।”
তার গলার স্বরে একটা হুমকি ছিল—
যেটা শুধু সিংহের থেকে বের হয়।
মোবাইল vibrate করল।
স্ক্রিনে নাম—
Nayeem Calling…
মাহাদের চোখ মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে গেল।
তার হাত শক্ত হয়ে উঠল।
কিন্তু সে রিসিভ করল না।
কারণ আজ সে এমন অবস্থায়…
যেখানে কথা বললে সবাই ভেঙে পড়বে। এখনো সবাই
এখন তার মাথায় শুধু দুটি লাইন—
ঃ- ওরা আমার রক্ত।
আর কেউ ওদের কাছ থেকে আমাকে আলাদা করতে পারবে না।”
মোবাইল আবার বাজল।
মাহাদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে শুধু ফিসফিস করল—
“না… এখন নয়।”
বাচ্চারা ঘুমালেও মাহাদ তাদের মাঝের চেয়ারটিতে বসেই রইল। লাইট কমিয়ে দিল।
চারদিক গভীর নীরব।
মাহাদ মাঝেমাঝে ওদের শ্বাস দেখে—
ওদের ছোট্ট বুকে উঠানামা দেখে—
আর শ্বাস নিতে ভুলে যায়।
ভোরের দিকে সে কাগজটা আবার বের করে দেখল।
একদম কাছ থেকে।
আঙুল দিয়ে নামগুলো ছুঁয়ে দেখল।
Mahad khan — Paternal Match
তার ভিতরে যেন ছুরি বেঁধে দেওয়া হল।
রিপোর্ট ভাঁজ করে রাখার সময়
সে ধীরে বলল—
ঃ- আগে তোমরা সুস্থ হও…
তারপর আমি তোমার মায়ের সাথে বোঝাপড়া করব,
আর জানতে চাইবো…সে আমাকে কেন এই সত্য থেকে দূরে রেখেছে।”
তার চোখে কোনো পানি নেই—
শুধু আগুন।
অচেনা, ঘুমহীন, দগ্ধ আগুন।
— — —
সকল ১০টা, স্থান: এভার গ্ৰীন হসপিটাল।
হসপিটালের চতুর্থ তলার ২০৪ নম্বর কেবিনে লোকসমাগম বাড়ছে। চৌধুরী বাড়ি থেকে সবাই বাচ্চাদের দেখতে এসেছে। কিয়ারা বাচ্চাদের বেডের পাশেই বসে আছে, তবে ও খেয়াল করছে রাতের পর থেকেই যেন বাচ্চাদের ডক্টররা এক্সট্রা কেয়ারের মাঝে রাখছে। এখানে কিয়ারার পরিবারের দুজন ভাই সিনিয়র ডক্টর বিধায় হয়তো ওদের এক্সট্রা কেয়ার করা হচ্ছে, এই ভেবে কিয়ারা অতটা মাথা ঘামায়নি।
সবাই বাচ্চাদের আদর করছে, তারা সবাই আসার সময় অনেক কিছু নিয়ে এসেছে। মিরান তো ছোট থেকেই গম্ভীর স্বভাবের ছেলে, তবে মাহিরা তা নয়। সে জেগে থাকলে একটুও চুপ থাকতে পারে না। এইযে এখন সবার সাথে টুকটুক করে কথা বলেই যাচ্ছে।
ওদের দুষ্টুমির মাঝেই কিয়ারা বাচ্চাদের হালকা কিছু খাবার খাইয়ে দিয়েছে। ডক্টর ভারি খাবার দিতে বারণ করেছে, তাহলে বমির সমস্যা হতে পারে। তাই কিয়ারা এখনই বাচ্চাদের ভারি কিছু দিচ্ছে না। তারপর সবগুলো ওষুধ দুধ দিয়ে বাচ্চাদের খাইয়ে দিল।
মিরান ভীষণ ভালো, মায়ের বাধ্য ছেলে চুপচাপ নাকমুখ বুজে সবগুলো ওষুধ খেয়ে নিয়েছে। কিন্তু মাহিরা সবসময় ওষুধ থাকে দূরে থাকে, মানে ওকে কোনোভাবেই ওষুধ খাওয়ানো যায় না। তারপর নীলাভ বুদ্ধি করে সবসময় দুধ দিয়ে খাইয়ে দেয়। এবার কিয়ারাও এভাবেই খাইয়ে দিল। তবে ডক্টর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দুধ ইগনোর করতে বলেছে। যেহেতু ওরা এলার্জিতে আক্রান্ত হয়েছে।
ঃ- কিয়ারা বাচ্চাদের কখন ছাড়বে??.. ডাক্তার কিছু জানিয়েছেন??..”
ঃ- নাহ আব্বু , আজকের দিনটা পর্যবেক্ষণ করে দেখবে। তারপর যদি আল্লাহর রহমতে আর কোনো সমস্যা না হয়, তাহলে হয়তোবা কালকে ডিসচার্জ দিবে।
কিয়ারা বাবার সাথে কথা বলছিল। ওদের কবে ডিসচার্জ দিবে সেই বিষয়ে। এবার নীলাশা চৌধুরী বললেন..
ঃ- তুমি যদি বাচ্চাদের সাথে বেরোতে তাহলে এমন হতো না। আর ওদের যে এমন মারাত্মক এলার্জির সমস্যা রয়েছে, সেটা আমাদের জানাবে না।
কিয়ারার বেশ মন খারাপ হয়ে গেল। আসলেই ওর অন্তত কিরণ কে বলে দেওয়া উচিত ছিল। বাচ্চারা তো বাহিরে গেলে কিছু দেখলে খেতে চাইবেই। আর কিরণেরও বেশ গিল্টি ফিল হলো। তবে এখানে ওর তো কোনো দোষ নেই, ও তো আর জানতো না বাচ্চাদের এমন ভয়ঙ্কর এলার্জি আছে।
তারপর একে একে সবাই ফিরে গেল, শুধু নীলাশা চৌধুরী থেকে গিয়েছেন। সাবিহা হসপিটালে আসার সময় মনে করে কিয়ারা ও কিরণের জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক নিয়ে এসেছে। ওরা দুজন এই দুদিন ধরে একই পোশাক পড়ে আছে। তারপর একে একে দুজনে কেবিনের ওয়াশ রুমে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে।
তারপর কিয়ারা ও কিরণ হসপিটালের ক্যান্টিনে খাবার খেতে গিয়েছে । আর নীলাশা চৌধুরী নাতিনাতনিদের কাছে রয়েছেন।
ঃ- আচ্ছা কিরণ, আমার সকাল থেকে মনে হচ্ছে যেন কিছু একটা ঠিক নেই। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমার অজান্তে কিছু একটা ঘটে গিয়েছে।
কিয়ারা খেতে খেতে কিরণ কে বলে উঠলো। কিরণ খাওয়া থামিয়ে ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে কি বলতে চাইছে সেটা বোঝার চেষ্টা করলো।
ঃ- কিন্তু তোর এমন কেন মনে হচ্ছে.??.. তুই কি কিছু সন্দেহ করছিস?...
ঃ- হ্যাঁ আবার না, মানে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে লোকটা কিছু টের পেয়েছে, বা এমনও হতে পারে তিনি সন্দেহ করছেন।
কিয়ারার এই কথায় কিরণ চমকে উঠলো। তারপর ও এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখে মাথাটা নিচু করে ফিসফিস করে বলল…
ঃ- তুই কি ভাইয়ার কথা বলছিস??.. কিন্তু উনি কেন সন্দেহ করবেন। আর সেদিন ওনার মা ও দাদি বাচ্চাদের দেখে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিল। আমারও মনে হচ্ছে উনারা কিছু সন্দেহ করেছেন। তবে বলার সাহস পাচ্ছেন না। আর তোর কি মনে হয়, এবার ভাইয়া কে জানানো উচিত নয়??...
কিরণের কথায় কিয়ারা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারপর আবার কিরণের শেষের কথাটা শুনে বলল…
ঃ- আমি এখন কিভাবে এসব জানাবো??.. আর আমি বললেই যে উনি মেনে নিবেন, তেমনটাও নয়। উনার কাছে সবসময় ফাস্ট প্রায়োরোটি হচ্ছে উনার পরিবার। তারা যদি এখন আবার সবাই মিলে আমাকে অসম্মান করে, আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তোলে, লোকটা গতবারের মতো এবারও হয়তো আমাকে ও আমার বাচ্চাদের অস্বীকার করবে। তাই এতো অনিশ্চয়তা নিয়ে এতো বড় রিস্ক নিতে পারবো না। আল্লাহ যা ভালো হয় সেটাই করবেন, ইনশাআল্লাহ।
কিরণ ওর কথায় মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। তারপর দুজনে খাবার খেয়ে চতুর্থ তলার বাচ্চাদের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ