#প্রিয়_রুহের_মাহরাম🌿
#দ্বিতীয়_খণ্ড
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ৩৪
🌿🌿🌿
কিরণ চোখ ডলতে ডলতে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো। ড্রইং রুমের সোফায় বসে কিয়ারা কেঁদেই যাচ্ছে তো কেঁদেই যাচ্ছে। কিরণ হন্তদন্ত হয়ে ওর দিকে ছুটে গেল। এতক্ষণে ওর ঘুমের রেশ কেটে গিয়েছে।
ঃ- কি হয়েছে??.. এভাবে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছিস কেন??.. তোর জামাই মরছে??...
ওর এই কথা শুনে কিয়ারা মুখ তুলে ওর দিকে তাকালো। ওর ক্রন্দনরত চেহারা দেখে কিরণের বেশ মায়া লাগলো। ওকে দেখেই মনে হচ্ছে বেশ সিরিয়াস কিছু ঘটেছে। এবার কিরণ এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল…
ঃ- কি হয়েছে??.. তুই কাঁদছিস কেন??.. কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছিস??...
ঃ- ও..ওই লোকটা বাচ্চা…বাচ্চাদের নিয়ে গেছে।
কিয়ারা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো। কিরণ প্রথমে ওর কান্নার কারণে বুঝতে পারলো না, কিন্তু ভালো করে কথাটা ভাবতেই ও চমকে উঠে কিয়ারার বেডরুমে ঢুকে গেল। তারপর পুরো রুম খালি দেখে কিরণ হতবাক হয়ে বেরিয়ে এলো।
ঃ- কে নিয়ে গিয়েছে??... আর তুই কিছু না জানিয়ে এখানে বসে বসে কাঁদছিস??.. কাউকে জানাবি না?.. কখনো নিয়ে গেছে, কতজন ছিল??.. এতো বড় বাড়িতে, এতো কড়া সিকিউরিটির মধ্যে ছেলেধরা ভিতরে এসে বাচ্চাদের নিয়ে গেল কিভাবে??..
কিয়ারা এই কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে কিরণের দিকে তাকালো। ও কখন বললো যে ছেলেধরা?.. এই মেয়েটা এতো বেশি বুঝে কেন??..
ঃ- আমি কখন বললাম ছেলেধরা এসেছে। ঐ খবিশ অসভ্য লোকটা আমার বাচ্চাদের নিয়ে গেছে। আমি এতো বার বারণ করলাম, কিন্তু বাচ্চারাও নাচতে নাচতে চলে গেল।
কিয়ারার এই কথায় কিরণ ওর দিকে খেয়ে ফেলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর সোফায় ঠাস করে বসে পড়লো।
ঃ- তো তার বাচ্চাদের তিনি নিতেই পারেন। আর তুই এতে এভাবে মরা কান্না কাঁদছিস কেন??.. যখন বাচ্চাদের আটকাতে পারলি না, তাহলে এখন কেঁদেই কি হবে??.. আর তুই এতো চিন্তা করছিস কেন??.. বাচ্চারা না জানলেও তো তুই জানিস উনিই ওদের বাবা।
ওর এই কথা শুনে হসপিটালের সবকিছু কিয়ারা কিরণ কে খুলে বললো। এদিকে এতো কিছু কিয়ারা আবার নিজের মধ্যে চেপে রাখায় কিরণ বেশ রেগে গেল। ওকে অন্তত সবকিছু আগেই বলতে পারতো?!..
ঃ- আর তুই অবাক হবি যে, বাচ্চারা ওই খবিশ লোকটাকে নিজেদের বাবা মানতে শুরু করেছে। আজকে যখন নিতে এলো বাচ্চারা বাবা বলে ডেকেছে, আমি স্পষ্টই শুনেছি। কিন্তু উনার সাথে বাচ্চাদের এতো ভালো বন্ডিং হলো কবে??...
ঃ- তো ঠিকই তো আছে। বাবা কে কি বাবা না ডেকে আঙ্কেল ডাকবে??.. আর এতে তো তোরই লাভ হলো ভাইয়া নিজেই সবকিছু খুঁজে বের করেছে। এবার বাচ্চাদের জন্য ধীরে ধীরে তোদের মধ্যকার ঝামেলা মিটে যাবে।
কিরণের কথায় কিয়ারা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল…
ঃ- তুই ঐ লোকটাকে এখনো চিনিস না। আমি মানছি আমি সেদিন দেশ ছেড়ে চলে গিয়ে ভুল করেছি। কিন্তু সবটা কি আমার দোষ ছিল??.. উনি যদি আমাকে আগেই সবটা জানিয়ে রাখতো তাহলে তো আমিও এতো বড় ভুল করতাম না। কিন্তু উনি এসব কিছুই মেনে নিবেন না। আর আমি যতোটুকু সম্ভব বুঝতে পারছি তাতে উনি শুধু মিরান ও মাহিরার কথাই জানতে পেরেছেন।
আর এতেই উনি আমাকে ক্ষমা করবেন না। পাঁচটি বছর উনি বাচ্চাদের থেকে দূরে ছিলেন , এমনকি ওদের কথা জানতেন না পর্যন্ত। বাচ্চারা আমাদের ঝামেলা, ভুলের কারণে এতো সুন্দর একটা পরিবার থেকে দূরে থেকেছে। তবে এতে সব দোষ তো আমার একার নয়, আর এই সবকিছু যখন খান ম্যানশনে জানাজানি হবে?. তখন ওরা আমার দিকেই আঙুল তুলবে । ওরা নিজেদের ভুল দেখতে পাবে না, তখন প্রথম আঙ্গুল টা আমার দিকেই আসবে।
আর ঐ লোকটা যদি ভুলেও মাহিরানের কথা টা জানতে পারে তাহলে আমাকে মেরেই ফেলবে। আমাকে তিনি কখনো ক্ষমা করবে না। আমি রাগে ক্ষোভে একজন বাবা কে তার সন্তানের জানাজা থেকে বঞ্চিত করেছি। একজন বাবা তার সদ্যজাত শিশুর মৃতমুখ টাও দেখতে পারেনি। আমি ভূল করেছি.. খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছি। উনি এগুলো জানতে পারলে সহ্য করতে পারবেন না, কিরণ। আর না কখনো আমাকে ক্ষমা করবেন।
কথাগুলো বলে কিয়ারা কান্নায় ভেঙে পড়লো। কিরণের চোখেও পানি চলে এসেছে। ও তো আর এতো কিছু ভেবেই দ্যাখেনি। কিয়ারা কে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল…
ঃ- তাহলে জানাবি না, আমরা ছাড়া বাহিরের কেউ মাহিরানের বিষয়ে জানে না। সবাই জানবে তোর দুটোই সন্তান। বাহিরের কাউকে মাহিরানের বিষয়ে কিচ্ছু জানতে দেবো না। তুই চিন্তা করিস না, তুই এতটুকু জীবনে একা একা অনেক লড়াই করেছিস। এবার তোর ভালো থাকার সময় এসেছে।
কিয়ারা হেঁচকি তুলে কাঁদছে। এটা যে আরও বড় অন্যায় হবে, তখন তো আল্লাহও ওকে ক্ষমা করবেন না।
ঃ- তুই কি বলছিস কিরণ?!.. এতো বড় অন্যায় কিভাবে করবো??... এতে যে আল্লাহও আমাকে ক্ষমা করবেন না। একজন বাবার তার সন্তানের সম্পর্কে জানার অধিকার আছে। আমি রাগে ক্ষোভে, তাকে ভুল বুঝে, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তাকে পাঁচটি বছর যাবত সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছি। আর অন্যায় করতে পারবো না যে!.
আল্লাহ আমার ভাগ্যে যা রেখেছেন, সেটাই হবে, কেউ সেটা এড়াতে পারবো না। এবার নিশ্চয়ই সবাই সবকিছু জেনে যাবে। তাতে কি?. আমাকে ভুল বুঝবে, অনেক খারাপ ভাববে। কিন্তু আমার তখন যেটা সঠিক মনে হয়েছিল সেটাই করেছি। আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই যে যা খুশি তাই ভাবুক।
কিন্তু হ্যাঁ আমার আফসোস হয়!. যখন মনে পড়ে একজন বাবা কে তার মৃত সন্তানকে এতোটা কাছে থেকেও দেখতে দেইনি। তখন আমার নিজের কাজে ভীষণ আফসোস হয়। যখন মনে পড়ে আমাদের ভুল বুঝাবুঝির কারণে আমার ফুটফুটে বাচ্চারা একটা সুন্দর পরিবার থেকে দূরে থেকেছে।
তখন আমার নিজের কাজে ভীষণ আফসোস হয়। তবে এবার আমি আর তাদের বাবা সন্তানের মাঝে দেয়াল হবো না। কিন্তু কেউ আমি বা আমার বাচ্চাদের দিকে আঙুল তুললে সেটাও চুপচাপ মেনে নেবো না।
কিরণ সবকিছু শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিয়ারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
— — —
এদিকে মাহাদ আজকে কতটা খুশি সেটা হয়তো ও কাউকে বলে বুঝাতে পারবে না। ও কিয়ারাদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসেই বাচ্চাদের নিয়ে শহরের সবচেয়ে ভালো একটা শপিং মলে ঢুকলো। তারপর বাচ্চাদের জন্য যা যা পছন্দ হয়েছে, সেই সবকিছু কিনে নিয়েছে। সবকিছু শপিং মলের ম্যানেজার খান ম্যানশনে পাঠিয়ে দিবে। আর এখন মাহাদ বাচ্চাদের নিয়ে খান ম্যানশনে ফিরছে।
ওরা শপিং মল থেকে বেরিয়ে হসপিটালে নিয়ে বাচ্চাদের চেকআপ করিয়ে নিয়েছে। আর বাচ্চারা তো বাবা কে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ টাই পেয়ে গিয়েছে। ওরা ভীষণ খুশি, বাচ্চাগুলো একটু পর পর গাড়ির উইন্ডো থেকে এটা ওটা দেখিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করছে। ওরা বাংলাদেশে আসার পর এই প্রথম কোথাও এভাবে ঘুরতে বেরিয়েছে। তাই তাদের কৌতুহলের শেষ নেই।
এদিকে সেই অধৈর্য, গম্ভীর মুখের মাহাদ খানের চেহারা থেকে যেন হাসি সরছেই না। মাহাদ ভীষণ নরম গলায় বাচ্চাদের সাথে কথা বলছে। বেশ শান্তভাবে বাচ্চাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। ইস্ এই ছোট্ট প্রাণ দুটোর দিকে তাকালেই ওর কলিজা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এতো সুন্দর মিষ্টি বাচ্চা দুটো ওর নিজের, এটা ভাবতেই গম্ভীর মুখো তিতা করোলা ওরফে মাহাদ খানের চোখ মুখ আনন্দে ভরে উঠছে। আজকে যেন ওর মুখ থেকে হাসি সরছেই না।
বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে বলতে গাড়ি এসে বিশাল এরিয়া জুড়ে বানানো খাঁন ম্যানশনের সামনে পৌঁছাল। মাহাদ মুচকি হেসে বাচ্চাদের নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
ঃ- ওও আল্লাহ!.. এতো বড় বাড়ি?.. বাবা এটা কার বাসা?.. আমরা কোথায় এসেছি?..
মাহাদ মেয়ের কথায় হেঁসে ফেললো। তারপর মেয়ের গালে চুমু খেয়ে বললো…
্ঃ- আম্মু!. এটা তোমাদের দাদু বাড়ি। এখানে সবাই তোমাদের ভীষণ ভালোবাসে।
ঃ- ওও বাবা, তাহলে আমরা এখানেই থাকবো??.. কিন্তু মাম্মা কে তো রেখে এসেছি। মাম্মা তো আমাদের না পেয়ে খুব কাঁদবে।
ছোট্ট মিরান বাবার হাত ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো। এবার কিয়ারার কথা শুনতেই মাহাদের মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
ঃ- বাচ্চারা, তোমাদের মাম্মা তোমাদের বাবা কে অনেক অনেক কাঁদিয়েছে। এইযে এতো বছর তোমাদের কে বাবার থেকে লুকিয়ে রেখেছে। তাই এখন বাবা তোমাদের মাম্মা কে একটু পানিশমেন্ট দিচ্ছে। তারপর মাম্মা আবার তোমাদের কাছে চলে আসবে। একটুও মন খারাপ করবে না কেমন!?..
বাচ্চারা মাহাদের কথা শুনে খুশি হলো। মাম্মা কে বাবা একটুখানি পানিশমেন্ট দিচ্ছে, তারপর মাম্মা আবার ওদের কাছে চলে আসবে। আর মাম্মা বাবাকে ওদের সাথে দেখা করিয়ে দেয়নি। তাই মাম্মা কে বাবা একটুখানি পানিশমেন্ট দিক। তারপর ওরা মাম্মা কে অনেক ভালোবাসবে। তাহলে মাম্মা নিশ্চয়ই আর রেগে থাকবে না।
— — —
খাঁন ম্যানশনে যেন আজকে খুশির বন্যা বইছে। তবে বাড়ির কেউই সঠিক কারণ জানে না। তবে খাঁন পরিবারের বড় কর্তা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছে। তবে বাকিরা সবাই বেশ চিন্তিত, কেন এতো আয়োজন, কাদের জন্য করা হচ্ছে এগুলো??... সবার মনেই ভীষণ কৌতুহল জমেছে।
খাঁন পরিবারের সবাই এই মুহূর্তে খান ম্যানশনে উপস্থিত হয়েছে। সকাল সকাল ওদের কে কেন থাকতে বলেছে কারো যানা নেই। মাহাদের মা মিতালী খান ঢাকায় ছিলেন। ছেলে তাকে আজকে খান ম্যানশনে থাকতে বলেছে। তাই মানাফ মাকে নিয়ে সকাল সকাল চলে এসেছে।
ওদের ফুফুরাও স্বপরিবারে উপস্থিত হয়েছে। তবে নাঈম ও অয়ন কিছুটা বুঝতে পেরেছে যে কারা আসছে।
সবার এতো এতো উত্তেজনা, এতো কৌতুহল দেখে কায়রা এবার বলেই ফেললো…
ঃ- কারা আসবে মামা?..?.. কাদের জন্য এতো তোরজোর চলছে। আপনাদের কাছের কোনো আত্নীয় নাকি??...
ঃ- আসবে…আসবে , খান বংশের প্রথম উত্তরাধিকারীরা আসছে। আমার বংসের প্রথম প্রদিপ এতো বছর পর খাঁন ম্যানশনে আসছে। ওদের আদর যত্নে যেন কোনো ক্রুটি না হয়।
মাহফুজ খান বেশ উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠলেন। এদিকে সবাই উনার এমন উত্তরে বেশ চমকে উঠলো। মাহাদ তো বিয়েই করেনি, তাহলে কোন উত্তরাধিকারের কথা বলছে মাহফুজ খান??..
ঃ- কিন্তু আঙ্কেল কারা আসছে??.. একটু খোলাসা করে বলবেন??.. আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।
রিদিতা চিন্তিত হয়ে বলে উঠলো। ও এসেছে থেকেই এবাড়িতে পড়ে আছে। এদের এতো ধনসম্পদ, মাহাদ এখানকার এমপি পদে নিযুক্ত রয়েছে। ওর আর ওর ছেলের বেশ খাতিরদারি হচ্ছে। তাই ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ছেলেকে নিয়ে এখানে, এই পরিবারে পার্মানেন্ট সদস্য হয়ে থেকে যাবে।
আর মাহাদ ওর ছেলে রাফি কে একটু বেশিই আদর করে। তাই ও যদি কেঁদেকেটে ছেলের কথা বলে অনুনয় বিনয় করে, তাহলে নিশ্চয়ই মাহাদ ওকে বিয়ে করে নিবে। আর তারপর এই বাড়িতে ও সবার উপরে ছুড়ি ঘুরাবে। ও তখন এই বাড়িতে রাণীর মতো থাকবে। তখন মাহাদ কে ও যা বলবে মাহাদ তাই করবে। আর তখনই এই সবকিছু হবে ওর আর ওর ছেলের। কিন্তু এখন এতোসব পরিকল্পনা করে শেষে কি হয় কে জানে।
ওদের একেক জনের একেক রকম ভাবনা চিন্তার মধ্যেই খাঁন ম্যানশনের মেইন দরজা শব্দ করে খুলে গেল। সবাই চমকে উঠে নিজ নিজ ভাবনা চিন্তা থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো মাহাদ দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু অতিথি কোথায়??.. এখানে তো ওরা কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না। ফিরোজ খান তার সহধর্মিণী কে উদ্দেশ্য করে বললেন…
ঃ- কি হলো, দাঁড়িয়ে আছো কেন??.. আমার বংশের প্রথম উত্তরাধিকারীরা আসছে। তাদের কে স্বাগতম জানিয়ে খান পরিবারের রিতিনীতি অনুযায়ী ভিতরে প্রবেশ করাও।
ঃ- কিন্তু দাদাভাই, বাহিরে তো ভাইয়ের সাথে কেউই নেই..।
এই বলে যেই মায়ান সদর দরজার দিকে তাকালো ও সহ বাকিরাও চমকে উঠলো।
মাহাদের দু’পাশে বাবার হাত ধরে ছোট্ট মিরান ও মাহিরা দাঁড়িয়ে আছে। সবাই ওদের কে মাহাদের সাথে দেখে ভীষণ চমকে উঠলো। মাহফুজ খান কি বললেন?.. ওদের জন্যই এতো আয়োজন??.. কিন্তু ওরা তো কিয়ারার সন্তান। তাহলে?..
ওখানে থাকা সবার সবকিছু গুলিয়ে গিয়েছে।
ঃ- একি ওরা এখানে কী করছে??.. ওরা আপনার সাথে কেন??..
কায়রা বেশ চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল। ও ভাবতেই পারছে না যে কি হচ্ছে।
মাহফুজা খান কিছু ভেবে ছলছল চোখে নিজের স্বামীর দিকে তাকালেন, ফিরোজ খান উনাকে চোখের ইশারায় আস্বস্ত করতেই তিনি ছুটে ওদের দিকে এগিয়ে গেলেন।
তারপর মিরান ও মাহিরা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। মিতালী খানও শাশুড়ির পিছনে পিছনে এগিয়ে গেল। তারপর তিনিও ওদের ভীষণ আদর করলেন। এদিকে কেউই কিছু বুঝতে পারছে না।
মাহফুজ খান মিরান কে টেনে কোলে তুলে নিলেন।
ঃ- কেমন আছো দাদুভাই?... আমাকে চিনতে পেরেছো?... আমি তোমার দাদাভাই হই।
ছোট্ট মিরান দাদাভাই এর সাথে লেপ্টে গেল।
ঃ- হ্যাঁ দাদাভাই, বাবা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে।
মাহফুজ খান ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে মিরানের কপালে চুমু খেয়ে আদর করলেন। এদিকে বাকিরা এবার একটু একটু বুঝতে শুরু করেছে। তবে কিভাবে কী সেটাই কেউ বুঝতে পারছে না।
ঃ- মাহাদ, এবার তুমি আমাদের বলো যে, এতো বছর ধরে আমার বংশের প্রথম উত্তরাধিকারীদের লুকিয়ে রেখেছে কেন?... এতো দিন আমরা কেউই ওদের বিষয়ে কিছুই জানতে পারিনি কেন??.. খান বংশের প্রথম উত্তরাধিকারীরা নিজের এমন আলিশান বাড়ি থাকতে অন্যদের বাড়িতে কেন বড় হবে?..?
ফিরোজ খান মাহিরা মিরান কে আদর করে গম্ভীর গলায় মাহাদের কাছে কৈফিয়ত চাইলেন।
ঃ- এই সবকিছুর জন্য তো তোমরাই দায়ী দাদাভাই!.. পাঁচ বছর আগে সেদিন পরিবারের, তোমাদের সম্মান মা বোনেদের সম্মান সবকিছু রক্ষা করতে গিয়ে ওদের হারিয়েছিলাম। সেদিন ও যা যা বলেছিলো, সেই সবকিছু সত্যি ছিল। এদিকে আমি ওকে কিছুই জানাতে পারিনি, আর ও ভেবেছিল আমি ওকে ঠকিয়েছি।
তাই সেদিনই ও দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে আমাকে ডিভোর্স পেপার ও একটা এবর্শন এর ফাইল দিয়ে গিয়েছিল। আর আমি সেগুলো কে সত্য ভেবে রাগ করে ওকে আর খোঁজার চেষ্টা করি নি। নাহলে আমার বাচ্চারা আমাকে ছাড়াই বড় হতো না।
মাহাদের এই কথা শুনে সবার মনে পড়ে যায়, সেদিন সবাই কিয়ারার সাথে কি বাজে ব্যবহার টাই না করেছিল। সবাই বেশ অনুতপ্ত হয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। আর কায়রা কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ চেপে ধরলো। ওর বোন চরিত্রহীন নয়, ওর ছোট্ট কিয়ারা ভীষণ পবিত্র। এদের কথায় প্রভাবিত হয়ে ও নিজের মায়ের পেটের বোন কে কতই না আঘাত করেছে। তখন ঐ ছোট্ট মেয়েটি এতো সব কিছু কিভাবে সহ্য করেছে। আল্লাহ, ও কোন মুখে গিয়ে বোনের সামনে দাঁড়াবে??..
ঃ- যা হয়েছে সেটা পরিস্থিতির কারণে, কিন্তু তাই বলে ওই মেয়েটা পাঁচটি বছর ধরে আমার বংশের প্রথম উত্তরাধিকারীদের লুকিয়ে রাখবে??.. এটা কেমন কথা?.. হ্যাঁ মানছি ওর সাথে অন্যায় করা হয়েছিল, তাই বলে পাঁচটি বছর কিন্তু কম সময় নয়। আর ও সেদিনও কিছুই বলেনি আমাদের কে।
ফিরোজ খান গম্ভীর গলায় বললেন। কায়রা এতে বেশ রেগে গেল, এতো কিছুর পরেও এরা ওর বোনকে কোন বিবেকে দোষ দিচ্ছে??..
ঃ- নানাভাই, সেদিন আমার বোনকে কতকিছুই না শুনিয়েছেন আপনারা। আমার বোন, আমার পরিবার কে কতটা অপমানিত হতে হয়েছিল। এতো কিছুর পরেও আপনি আশা করছেন যে ও কেন বাচ্চাদের কথা জানালো না?.. এখন তো মাহাদ ভাইয়া বাচ্চাদের কথা জানিয়েছেন, তাই আপনারা সেটা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। কিন্তু আমার বোন জানালে তখনও নিশ্চয়ই সেদিনের মতো ওকে চরিত্রহীন প্রমাণ করে বাচ্চাদের জারজ বলে জানাতেন।
ঃ- কায়রা, মুখ সামলে কথা বলো। ভুলে যেওনা যে তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছো।
কায়রার শাশুড়ি রেগে গিয়ে বলে উঠলেন। তার বাবার সাথে পুত্রবধূর এমন কথার টোন তিনি সহ্য করতে পারলেন না।
ঃ- আমি তো ভুল কিছু বলিনি, আম্মু। এই আপনারাই তো আড়ালে আবডালে আমার বোনকে চরিত্রহীন নষ্ট মেয়ে বানিয়ে আমার মাথা খেয়েছেন। আমাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছেন, যে এতো বছর পরও আমি আমার আদরের ছোট বোন কে দেখে একটু ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতে পারিনি। এই আপনিই আমার মনকে ওর প্রতি এতোটা বিষাক্ত করে তুলেছেন।
এবার আর কায়রার কথায় কেউ কোনো জবাব দিতে পারলো না। তবে নাঈম মাথা নিচু করে ফেলল, ও সবকিছু যেনেও কাউকে সেদিন কিচ্ছু বলতে পারেনি। কায়রা কে ওর পরিবার এভাবে মানুষিক অত্যাচার করেছে, সেটা ও জানতেও পারলো না। কেমন স্বামী ও?.. কায়রা যখন জানতে পারবে যে ও আগে থেকেই সবকিছু জানতো, তখন কি হবে??.. ও কায়রা কে তখন কি জবাব দেবে??..
ঃ- যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন পুরোনো কথা তুলে ভবিষ্যত খারাপ করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমরা সবাই দরকার হলে কিয়ারা ও তার পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইবো। আর আমাদের বাড়ির পুত্রবধূ কে সসম্মানে ফিরিয়ে আনবো।
মাহফুজা খান গম্ভীর গলায় বলে উঠলো। সবাই তার কথায় নিরব সম্মতি জানালো। তারপর সবাই নতুন সদস্য দের নিয়ে মেতে উঠলো।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ