ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (২য় খন্ড)

৩৮তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম🌿

#দ্বিতীয়_খণ্ড 
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন 
পর্বঃ- ৩৮
🌿🌿🌿
সকালটা খান ম্যানশনে অস্বাভাবিক ব্যস্ততায় ভরা।
যেন পুরো বাড়িটা রাতারাতি জেগে উঠেছে—
সবার হাতে কাজ, উচ্চস্বরে আলোচনা, ফর্সা রোদ ঝরে পড়েছে বারান্দায়, আর হাওয়ায় লেগে আছে গুলাপ জল আর কাঁচা হলুদের মিষ্টি গন্ধ।
কিন্তু বাড়ির এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও…
কিয়ারা এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
সে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি।
পাঁচ বছরের দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝি, আঘাত — সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
ঠিক তখনই মাহাদের মা, মিতালী খান সকল আত্নীয় স্বজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন—
ঃ- আমাদের ছেলে অয়নের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আর কনে হচ্ছে কায়রার ফুফাতো বোন—নামিরা!”
এক মুহূর্তে যেন পুরো বাড়ি আনন্দে থমকে গেল।
কেউ কেউ বিস্মিত, কেউ খুশি, কেউ দৌড়ে প্রস্তুতি শুরু করে দিল।
কিয়ারা খানিকটা চিন্তিতই হয়ে গেল—
তার আত্মীয় আর মাহাদের পরিবার একই ছাদের নিচে…
যেন ভাগ্য খুব হিসাব করে একটি নতুন নাটকের সেট বানিয়েছে।
ঃ- তা আপা সেটা তো বুঝলাম, বেশ খুশির খবর। কিন্তু আপনার বড় ছেলে কে বিয়ে করাবেন না??... আপনার ছেলের বিয়ের সুখবর কবে পাবো। 
ওখানে থাকা একজন বলে উঠলো। খান পরিবারের সবাই একটু চুপ হয়ে গেল। কিয়ারা অনুভূতিহীন চোখে মিতালী খানের দিকে তাকিয়ে রইল। 
ঃ- আসলে আপনাদের অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, আমার বড় ছেলের বিয়ে আরও বছর খানেক আগেই হয়ে গিয়েছে। তবে পারিবারিক কিছু ঝামেলার কারণে আমার পুত্রবধূ কে আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় পাইনি। 
মিতালী খান স্পষ্ট করে বলে উঠলেন। ওখানে থাকা সকল আত্নীয় স্বজন বেশ চমকে উঠলো। উনারা একে অপরের সাথে বলাবলি করছে। কিভাবে কি হয়েছে, এতো বড় একটা ঘটনা কবে ঘটলো??.. আর সবটা এতোটা নীরবে করা হলো কেন?.. সবার মনেই এমন আরও নানান ধরনের প্রশ্ন কৌতুহল।‌
ঃ- আর আপনাদের জন্য আরও একটি চমক রয়েছে। সেটা হলো আমি কিছু গ্ৰ্যান্ড মাদার হয়ে গিয়েছি। 
মিতালী খানের এই কথায় যেন অতিথিদের মাথায় বাজ পড়ল। সবাই ভীষণ আশ্চর্য হয়ে মিতালী খানের দিকে তাকিয়ে রইল। মিতালী খান একটঙ হেসে বাচ্চাদের ডাকলেন।
ঃ- দাদুভাই, দাদুমনি এদিকে এসো তো। 
মিতালী খানের কথায় কিয়ারা বাচ্চাদের নিয়ে উনার দিকে এগিয়ে গেল। উপস্থিত সবাই ওদের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আসলেই বাচ্চাগুলো ভীষণ আদুরে। মিরান ও মাহিরা সামনে গিয়ে সবাইকে সুন্দর করে সালাম দিল। এতে যেন উপস্থিত অতিথিরা আরও বেশি চমকে উঠলো। 
ঃ- আপা, আপনি তো জীতে গিয়েছেন। আপনার পুত্রবধূ নিঃসন্দেহে ভীষণ সুন্দরী। আর বাচ্চাদের খুব ভালো শিক্ষা দিয়েছে।‌ আপনার নাতিনাতনিদের তো পুতুলের মত লাগছে। এতো মিষ্টি আর অদুরে বাচ্চাগুলো। 
তারপর মিতালী খান সবাই কে কিয়ারা ও বাচ্চাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। আসলে এটার খুব দরকার ছিল, যাতে কেউ কিয়ারা ও বাচ্চাদের নিয়ে কোন আজে বাজে কোনো মন্তব্য করতে না পারে। 
কিয়ারাও খুশি মনে সবার সাথে পরিচিত হলো। সবাই আরও অবাক হলো যখন জানতে পারলো কায়রা ও কিয়ারা আপন দুইবোন। 
ঃ- আপা, এতো দেখছি আপনাদের বাড়ির সব ছেলেরাই ওবাড়ির মেয়েদের সাথে সেটিং করে নিয়েছে। 
এই কথায় মিতালী খান একটু হেসে বললেন..
ঃ- আসলে কি বলুন তো ওই বাড়ির মেয়েগুলো এতোটাই সুন্দরী আর নম্র ভদ্র, যে আমাদের ছেলেরা ওদের ছাড়া আর কোন মেয়েই দেখতে পাচ্ছে না। 
উনার এই কথায় সবাই হেসে উঠল। আর ছেলেরা বেশ লজ্জা পেল, তবে মাহাদ তো মাহাদ’ই ও থোড়াই না এগুলো কেয়ার করে। 
— — — 
বাড়ির সবাই কাজে দৌড়াচ্ছে,
কিয়ারা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে না থাকতেই…
মাহাদ দূর থেকে লক্ষ্য করছিল তাকে।
তার চোখে অদ্ভুত অস্থিরতা—
যেন কেউ নিজের ঘর থেকে খুব দূরে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে,
কিন্তু ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না।
মাহাদ এগিয়ে এসে দাঁড়াল কিয়ারার কাছে।
ঃ- তুমি সাইডে দাঁড়িয়ে আছ কেন??.. করার মতো কাজ পাচ্ছ না??.? 
কিয়ারের চোখ একটু বিস্ময়ে বড় হলো।
ঃ- আমি কাউকে বিরক্ত করতে চাই না। 
মাহাদের গলা গভীর, নিচু।
ঃ- ঢং কমিয়ে করো তুমি অতিথি নও। এই বাড়ির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
এক মুহূর্তে পরিবেশ থম মেরে গেল।
পরিবারের সবাই তাকালো তাদের দিকে। কিয়ারা এই কথায় ভীষণ পুলকিত অনুভব করলো। মাহাদ ওখান থেকে অন্যদিকে চলে গেল। এখনো অনেক কাজ বাকি আছে, ওদের যে কারোরই বিয়ে বা যেকোনো বড় অনুষ্ঠান খান ম্যানশনে আয়োজিত হয়ে থাকে। 
মাহাদের দাদি, নরম হাসি দিয়ে বললেন—
ঃ- ঠিকই বলেছে মাহাদ। কিয়ারা নাতবউ, তুমি স্টেজ ডেকোরেশন আর কালার থিম ঠিক করবে। এত দিন পর আমাদের ঘরে শুদ্ধতা ফিরে এসেছে।
কিয়ারা হতবাক।
তার প্রতি এমন আস্থা আগে কেউ দেয়নি। দূর থেকে বাচ্চা দুটো দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল—
ঃ- মাম্মা! আমরা তোমাকে হেল্প করবো!.
ঘর ভরে গেল হাসিতে।
কিয়ারা অজান্তেই হালকা হেসে ফেলল, যা দেখে দূর থেকে মাহাদের বুকের ভেতর কিছু নরম হয়ে গেল।
প্রিপারেশনের মাঝে কিয়ারা দেখতে পেল—
এক কোণায় অয়ন দাঁড়িয়ে আছে,
আর লাজুক নামিরা মাথা নিচু করে বসে।
মাহফুজা খান সবার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।
কিয়ারা দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই থেমে থাকে…
তার মনে প্রশ্ন উঠে—
“আমার বিয়ের সময় কি কেউ আমাকে এরকম সম্মান দিয়েছিল?”
হঠাৎ ভেতরটা হালকা ব্যথায় টন করে ওঠে। মাহাদ সেই ব্যথা দূর থেকেই ধরে ফেলে।
মাহাদ কাছে এসে আস্তে বলল—
ঃ- তোমার চোখের ওই ব্যথা একদিন আমি দেখেছিলাম… তুমি দেখোনি শুধু।
কিয়ারার নিঃশ্বাস আটকে যায়।
এত দীর্ঘ সময় পরে এই স্বীকারোক্তি কেন?..?..
সে উত্তর দিতে পারার আগেই মাহাদ বলে—
 ঃ- এই বিয়ে আমাদের সবার জন্য সবকিছু আবার নতুন করে শুরু করার একটা মাধ্যম হতে পারে… শুধুমাত্র 
তুমি চাইলেই হতে পারে।
কিয়ারা তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে রাগ, অভিমান, কষ্ট—সব একসাথে মিলেমিশে আছে।
সে কিছুই বলে না, কিন্তু নীরবতাই যেন সবচেয়ে জোরালো উত্তর।
আজ সারাদিন জুড়ে খান ম্যানশন কে রাজকীয় রুপ দেওয়া হয়েছে। হলঘর ভরে যায় স্টেজের কাঠের গন্ধে। ওর্কিড, গোলাপ, রজনীগন্ধার তালিকা তৈরি হয়। ডিজাইনার আসে মেহেন্দি নাইটের সেটআপ দেখতে, বাচ্চারা দৌড়ে দৌড়ে ডেকোরেশনের ফুল কুড়োয়। মিরান ও মাহিরা এখানে এসে এতো মানুষজন পেয়ে যেন আরও চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কিয়ারা রঙের থিম ঠিক করে এবং মাহাদ দূর থেকে সবকিছু দেখে…
চোখে এক তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ে।
— — — 
খান বাড়ির পুরো বাগান টা যেন আলো, ফুল, বাতি আর গানবাজনার শব্দে কেঁপে উঠছে।
হাজার রঙের ফেয়ারিলাইট, ঝুলে থাকা বেলুন, গন্ধরাজের মালা—সব মিলিয়ে রাজকীয় উজ্জ্বলতা।
কিন্তু আসল ঝলক তো শুরুই হলো তখন—
বর কনেদের এন্ট্রি হলো—সবাই চুপ!
সবার ভেতর দিয়ে ধীর পায়ে কিয়ারা ঢুকল।
মেহেদি সবুজ লেহেঙ্গা, গাছে ঝুলে থাকা বাতির আলো তার গায়ে পড়ে সোনা হয়ে ঝলকে উঠছে।
হালকা নো-মেকআপ লুক… কেবল চোখেই আগুন।
একটা চুল কানের পাশে গড়িয়ে পড়েছে—আর সেই একটাই চুল মাহাদের বুকের ভেতর ঝড় তুলতে যথেষ্ট।
সবাই বর কে নিয়ে হইহুল্লোড় করতে থাকে।
তারপর—
মাহাদের চোখ—সোজা কিয়ারায় আঘাত করলো।
ওই চোখে অভিমান নেই।
রাগ নেই।
শুধু এক অদ্ভুত টান…
একটা পুরোনো দাবি, যা মাহাদ ছাড়া আর কেউ জানে না।
মেহেদি আরম্ভ হতেই বরদের পক্ষ আর কনেপক্ষ গাইতে শুরু করলো।
আলিশা হাসছে, নামিরা ও সাবিহা রা লাজুকভাবে বসে আছে। আর হবু বরেরা চোখের ইশারায় হবু বউদের লজ্জায় লাল বানাচ্ছে। সবাই আনন্দে ভাসছে। 
কিন্তু—
একজন ছেলে, একটু দুষ্টু হাসি নিয়ে কিয়ারার হাত ধরে টেনে বলল,
ঃ- এদিকে আসো বেয়াইন, আমাদের নাচে তোমাকে চাই।
কিয়ারা বিরক্ত হয়ে হাত সরানোর আগেই—
 মাহাদের গর্জন ছেলেটার কানে পৌঁছালো—
ঃ- হাতটা সরাও।
ওদের চারদিক নিস্তব্ধ, ঢোল থেমে গেল, গান আটকে গেল। এবার সবার মনোযোগ ওদের দিকে ফিরে গেল। 
মাহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
তার চোখ তীব্র, অগ্নি জ্বলা।
ঃ- ও আমার ফ্যামিলির মানুষ।
ওর অনিচ্ছায় কেউ ওকে ছুঁতেও পারবে না। তোমার আগে ওর পরিচয় জেনে নেওয়া উচিত ছিল। 
বাগানের আলো যেন লাল হয়ে উঠল ওই মুহূর্তে। মাহাদ ছেলেটার সেই হাত টা মুচড়ে ধরলো।‌
সে ছেলেটা কুঁকড়ে গেল—
আর কিয়ারা কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।
ঃ- ইউ ডোন্ট ওন মি। 
কিয়ারা ঠান্ডা গলায় বলল।
মাহাদ ঝুঁকে তার কানে খুব নিচু গলায় বলল—
ঃ- হয়তো এখন আর বিশ্বাস করো না… কিন্তু তোমাকে ছাড়া কিছুই নিজের নয়। আগেও বলেছি এখনো বলছি, যেটা খানেদের থাকে সেটা একমাত্র তারই থাকবে। অন্য কেউ সেটা স্পর্শ করার অধিকার রাখে না। 
কিয়ারার বুকের ভেতর ধপ করে কিছু থেমে গেল। মাহাদের এতোটা অধিকার বোধ দেখে হয়তো কিয়ারার বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠলো। 
লোকটা এখনো ওর প্রতি এতোটা পজেসিভ!..
— — — 
নামিরা ও সাবিহা গালে হলুদ রেখে বসে আছে।
কিয়ারা ও মেহেন্দি আর্টিস্ট তাদের হাতে মেহেদি এঁকে দিচ্ছে।
হঠাৎ—
মাহাদও এসে পাশে দাঁড়াল।
কাজের ভান করলেও তার দৃষ্টি কিয়ারার নরম আঙুলে আটকে আছে।
কিয়ারা অনুভব করল।
সে ইচ্ছা করেই ঠান্ডা গলায় বলল—
ঃ- দূরে গিয়ে দাঁড়ান। আমি কাজ করছি।
মাহাদ আস্তে ফিসফিস করে—
ঃ- তোমাকে কে দেখছে, আমি তো দেখতে এসেছি ডিজাইন কেমন হচ্ছে। 
কিয়ারা গলার শব্দ আটকে গিলল।
চোখ তুলে তাকাতে চাইল না। লোকটা মিথ্যে কথাও ঠিকমত বলতে পারে না।
কনেপক্ষ–বরপক্ষ সবাই মিলে নাচছে। মেহেন্দি দেওয়া শেষ হতেই কিয়ারাকেও ডেকে নাচের মঞ্চে ওঠানো হল।
কিয়ারা জোর করে হাসল, নাচ শুরু করল, কিন্তু—
মাহাদের চোখে কিছু পুড়ছিল।
সে সামনে থাকা গ্লাস চেপে ধরেছিল এত জোরে
যে গ্লাসটা কেঁপে উঠল।
হঠাৎ—
এক ছেলের হাত কিয়ারার কোমরে পড়ল।
মাত্র এক সেকেন্ড।
পরের সেকেন্ডে—
মাহাদ ঝড়ের বেগে ডান্স ফ্লোরে উঠে এলো, ছেলেটার হাত টেনে মুচড়ে ধরলো। আর কিয়ারার কোমরের কাছে নিজের ঠান্ডা হাত রেখে বলল—
ঃ- এই লাইন পার হলে হাত ভেঙে ফেলব।
ঢোল থেমে গেল।
সবাই তাকিয়ে রইল।
কিয়ারা রাগে-লজ্জায় কাঁপতে লাগল—
ঃ- আপনি পাগল নাকি??.. সবার সামনে এগুলো কি করছেন?..
ঃ- যদি বলো তোমার কাছে?..?.. তাহলে হ্যাঁ।
ঠিক পরেই দুই বাচ্চা দৌড়ে এসে কিয়ারার গলা জড়িয়ে ধরল।
ঃ- মাম্মা! মাম্মা! আমাদের সাথে নাচো!
বাচ্চাদের টানেই পরিস্থিতি হালকা হয়ে গেল। কিয়ারা বাচ্চাদের নিয়ে নাচতে লাগল। দূর থেকে মাহাদ তাকিয়ে থাকল।
তার চোখে এখন আর রাগ নেই—
শুধু একটাই কথা—
ঃ- এই দৃশ্যটা আমি কখনো কারও সাথে ভাগ করব না। এই প্রাণ গুলো কে আমি কারো সাথে ভাগ করবো না। ওরা শুধুমাত্র আমার অস্তিত্ব, আমার ঘরের রাণী। 
— — — 
গায়ে হলুদের রাত — খান ম্যানশন!.
খান ম্যানশনের প্রতিটা কোণা সোনালি আলোয় ঝলমল করছে। চারপাশে গাঁদা, গোলাপ, টিউলিপে সাজানো পথ। মধ্য উঠোনে মেঝে জুড়ে রঙ-বেরঙের আলপনা—লাল, হলুদ, সোনালি—দেখলেই উৎসবের গন্ধ পাওয়া যায়।
রাত আটটা বাজতেই ঢাক, মイク্স, দোয়েলের সুরে শুরু হলো অনুষ্ঠান।
মহিলারা গানের তালে তালে নেচে উঠছে—হাসাহাসি, খুনসুটি, ঢেউ তোলা আলো… সব মিলিয়ে উৎসবের চূড়ান্ত আবহ।
কনেদের প্রবেশ হলো যেন সোনালি অগ্নির মতো। 
গায়েহলুদের জন্য কনেদের কে যারা সাজিয়েছে, তারা যেন শিল্পীর কাজ করেছে।
হালকা সোনালি লেহেঙ্গা, মাথায় গজরা, হাতে রঙিন চুড়ি…
আর একদম সূক্ষ্মভাবে দেওয়া হলুদ ফুলের টিকলি তাদের অস্বাভাবিক কোমল দেখাচ্ছে। দু'জন কনেকে একই রকম সাজ দেওয়া হয়েছে। 
কিয়ারা ও মেয়ে কাজিনরা কনেদের নিয়ে যখন সিঁড়ি বেয়ে নামলো, চারদিকের মানুষ থমকে গেল।
শুধু বাচ্চারা থপ করে দৌড়ে গিয়ে কিয়ারার আঁচলে লেগে গেল।
কিয়ারা হেসে দু’জনকে বুকে জড়াল। পুরো দৃশ্যটা এমন ছিল যেন পৃথিবী কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছে।
মাহাদ দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।
তার মুখে কঠিন ভাব, কিন্তু চোখে নিয়ন্ত্রণহীন প্রশংসা।
যতই কিয়ারার সাথে মনোমালিন্য থাকুক…
সত্যিটা হলো—কিয়ারাকে এভাবে সাজানো দেখলে কারোরই হৃদয় স্থির থাকতে পারে না।
সে নিজের অজান্তেই কয়েক পা সামনে এগিয়ে গেল।
গায়েহলুদ শুরু হওয়ার আগেই বর-কনেদের কে নিয়ে সবাই কেন্দ্রে বসল।
কিন্তু দেখা গেল, কিয়ারার ফুফাতো বোন নামিরা (কনে) হঠাৎ এসে ওর কান ধরে বলছে—
ঃ- দেখ তো, তুই আসবি না বলছিলি! এখন হাসাহাসি করে ঘুরছিস??...
কিয়ারা লজ্জায় লাল হয়ে গেল, আর বাচ্চারা খিলখিল করে হেসে উঠলো।
বিয়ের ঘর আবেগ আর হাসিতে দুলে উঠলো।
পুরো রীতি শুরু হলো সবার আগে হলুদ লাগিয়ে।
বুড়িরা, ফুফু-খালা, কাজিন—সবাই এসে কনে-বরের গায়ে প্রথমে হলুদ মাখালো।
তারপরই আসে “দুষ্টুমি পর্ব”।
এক ফুফু হঠাৎ কিয়ারাকে ইশারা দিল—
 ঃ- যাও, তুমি লাগাও মাহাদের গায়ে প্রথম হলুদ। তোমাদের বিয়েতে তো আমরা কেউই থাকতে পারিনি। তাই এই সাথে তোমাদের টাও উপভোগ করি। কি বলো তোমরা সবাই?!..
কিয়ারার মুখ শুকিয়ে গেল।
মাহাদও অবাক হয়ে চোখ ছোট করে তাকিয়ে আছে। এদিকে এ ফুপির কথায় সবাই যেন উৎফুল্ল হয়ে হইহই করে চিৎকার করে উঠল। 
কিয়ারা ধীরে ধীরে সামনে গেল, হাত কাঁপছে।
হলুদের পাত্রে আঙুল ডুবিয়ে যখন মাহাদের গালে লাগালো—
সেই মুহূর্তে মাহাদ নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইলো শুধু তার মুখের দিকে।
এতটা নীরবতা গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে খুব কমই আসে।
কিয়ারার ধরা-ছোঁয়া মন খারাপ, রাগ, অভিমান—সবকিছু যেন সেই এক স্পর্শে জমাট বাঁধা বরফের মতো গলে যাচ্ছিল।
সবাই যখন চেঁচিয়ে উঠলো
“আহা! আহা! এরা তো নিজেরাই বর-কনে হয়ে গেছে!”
কিয়ারা লজ্জায় লাল হয়ে গেল, সেটা দেখে মাহাদ কড়া দৃষ্টিতে সবাইকে তাকিয়ে চুপ করে দিল।
কিন্তু মুখের লুকানো হাসিটা কেউ মিস করেনি।
জমজরা দুইজনই কিয়ারা ও মাহাদের মাঝে বসে বলছে—
ঃ- মাম্মাকে হলুদ লাগাই, বাবাকে হলুদ লাগাই!”
ঃ- বাবাকে হলুদ লাগাই, মাম্মাকে হলুদ লাগাই!..”
তারপর দুজনে মিলে হলুদ নিয়ে মাহাদের গালে চাপড় দিল—
মাহাদ রাগ দেখালেও মুখের এক পাশের হাসিটা লুকোতে পারলো না।
রাতের শেষে কিয়ারা বাগানের কোণে দাঁড়িয়ে তার নিজের গালের হলুদ মুছতে যাচ্ছিল।
মাহাদ চুপচাপ কাছে গেল।
মাহাদ হালকা গম্ভীর গলায় বলল..
ঃ- হাতটা সরাও… মুছো না। তাহলে এর থেকেও বেশি করে লাগিয়ে দেবো। আর তখন কিন্ত মুছতে পারবে না।‌
কিয়ারা হঠাৎ করেই মাহাদের কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলো। 
ঃ- কেন?.?..
ঃ- উৎসবটা অন্তত শেষ না হওয়া পর্যন্ত। দেখলে?... ওদের গায়ে তোমার রঙটাও লাগছে। বাচ্চারা কতটা খুশি!. ওদের জন্য হলেও মুছে ফেলো না। 
এই কথা বলেই মাহাদ বাচ্চাদের দিকে তাকালো।
শব্দ খুব কম, কিন্তু অর্থ অনেক গভীর। কিয়ারা কিছু বললো না—শুধু চোখ নামিয়ে রাখলো। তবে জোর করে আর মুছতে চাইলো না। আসলে সত্যি বলতে ওরও ভীষণ ভালো লাগছে। কিন্তু লজ্জায় পড়ে মুছে ফেলতে চাচ্ছিল। 
---চলবে--- 
ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন