ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় রুহের মাহরাম (১ম খন্ড)

২০তম পর্ব

লেখক: মারিয়াম হোসাইন

#প্রিয়_রুহের_মাহরাম 🌿

#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন

পর্বঃ- ২০

🌿🌿🌿

"আজ কায়রার বিয়ে"

পার্লারের মেয়েরা কায়রা কে সাজাতে শুরু করেছে। কনের জন্য সমস্ত কিছু তো ঐ বাড়ি থেকেই পাঠানো হয়েছে। কায়রার পরনে আছে টকটকে লাল রঙের লেহেঙ্গা। মাথায় খোঁপা করে তাতে লাল গোলাপ দেওয়া। মেহেন্দি রাঙা হাত দুটোয় ঝুমকাওয়ালা লাল রঙ্গের চুড়ি। আর এখন মেকআপ আর্টিস্ট ওর চেহারায় মেকআপ এর ফিনিশিং টাচ দিচ্ছে।

ওর পাশেই সাজতে বসেছে বোনেরা। কিয়ারা ও কিরণ সব একরকম পরেছে আর ওদের সাজ ও একরকম দিচ্ছে। দুজনের পরনেই মেরুন রঙের লেহেঙ্গা। চুল বেনী করে তাতে বেলি ফুলের গাজড়া লাগিয়েছে। হাতে মেরুন রঙের ভেলভেট চুড়ি। আর চেহারায় ড্রেসের সঙ্গে মানানসই মেকআপ। পায়ে মাঝারি সাইজের হিল জুতো। ওদের দেখাদেখি আরিফা,আরিয়াও সব একরকম পরেছে।

ওদের পরনে আছে কালো খয়েরী রঙের লেহেঙ্গা। চুল ছেড়ে তাঁতে বেলি ফুলের গাজড়া লাগিয়েছে। হাতে কালো খয়েরী রঙের ভেলভেট চুড়ি, আর পায়ে হাইহিল পরেছে। এখন শুধু ওদের মেকআপ বাকি আছে। যেটা মেকআপ আর্টিস্ট এখন কমপ্লিট করে দিচ্ছে। আলিশা আর নামিরা পরেছে নেভি ব্লু রঙের লেহেঙ্গা। চুল খোঁপা করে তাতে বেলি ফুলের গাজড়া লাগিয়েছে।

আর হাতে নীল রঙের ভেলভেট চুড়ি পরেছে, সাথে মাঝারি সাইজের হিল জুতো পরেছে। চেহারায় ড্রেসের সঙ্গে মানানসই মেকআপ। ব্যস মেয়েদের সাজ কমপ্লিট হয়েছে। কিয়ান ও কায়রান একরকম পাঞ্জাবি পরেছে। ওদের পরনে আছে সবুজ রঙের পাঞ্জাবি সাথে ডিজাইনার কটি।

ওদের দুজনের পায়েই বুট জুতো পরেছে। দুজনের হাতে একই মডেলের ঘড়ি পরা, আর দুজনের চুলের স্টাইল ও একই রকম কাট দেওয়া হয়েছে। দুজনকেই ভীষণ হ্যান্ডসাম লাগছে। আর মিশাল-মিহরাব তো সব সময়ই একরকম পরে। আজকেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দুজনেই মেরুন রঙের পাঞ্জাবি সাথে ডিজাইনার কটি পরেছে।

দুজনের হাতেই একই মডেলের ঘড়ি আবদ্ধ। চুলের কাটিং ও সব সময়ের মত দুজনের একই আছে। আর দুজনের পায়েই কালো রঙের বুট জুতো শোভা পাচ্ছে। মানে হলো ওরা দুজনে শুধু আজকে বিয়ের অনুষ্ঠান বলে নয়, ওরা সব সময়ই একরকম পরে সবকিছু। ওদের সব কিছুতেই এতো মিল থাকে যে পরিচিত মানুষজনও ওদের কে আলাদা করে চিনতে পারে না। কোনটা যে মিশাল আর কোনটা যে মিহরাব সেটা কেউই বলতে না সঠিক ভাবে।

তবে আজকে নিজেদের বোনের বিয়ে!.. তাই আজকের দিনটা‌ ওদের সব ভাই বোনের জন্যই ভীষণ স্পেশাল। ও‌হহ হ্যাঁ আর একজনের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। ফুলের মত চরিত্রে চরিত্রার্থ আরিয়ান ভাইয়ের কথা। সেই চরিত্রবান সাধু নিজেও কিয়ারার সাথে ম্যাচিং করে মেরুন রঙের পাঞ্জাবি সাথে ডিজাইনার কটি পরেছে। হাতে ব্রান্ডের ঘড়ি, পায়ে বাকিদের মতোই কালো বুট জুতো পরেছে।

চুলের কাটিং নিজের মর্জি মত দিয়েছে। কিয়ারা ও কিরণ তো একরকম পরেছে এখানেও এই মহান চরিত্রবান সাধু ব্যক্তির বিরাট সমস্যা ছিল। ওদের কে যে কতবার আলাদা আলাদা পরতে বলেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। বেচারা মনে মনে ভেবেছিল যে ও আর কিয়ারা ম্যাচিং করে পরবে। কিন্তু ওর ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে কিয়ারা ও কিরণ সব কিছু একরকম পরেছে। তারপরেও এই ব্যাটা কিয়ারার সঙ্গে মিলিয়ে পরেছে।

----এদিকে খান ম্যানশনে----

নাঈম পরেছে রেড গোল্ড মিশ্রিত শেরওয়ানি। মাথায় শেরওয়ানির সঙ্গে ম্যাচিং পাগড়ি পরা । হাতে ব্রান্ডের ঘড়ি আর পায়ে বর জুতো। এখনকার ছেলেদের তো আর রুমালের ঝামেলা নেই। বর তৈরি, এখন নিচ থেকে বড়োদের ডাক আসলেই বিয়ে করতে চলে যাবে। কিন্তু বরের ভাই-বোনেরা এখনো তৈরি হয়নি। বিশেষ করে বরের বোনেরা, তাদের সাজগোজ এখনো শেষ হয়নি। বাড়িতেই মেকাআপ আর্টিস্ট এনে দিয়েছে মাহাদ। অকারণে বাড়ির মেয়েদের বাহিরে যাওয়া টা মাহদ এর বিশেষ পছন্দ নয়। যদিও সাজগোজ মেয়েদের জন্য সবচেয়ে পছন্দনীয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কিন্তু মাহাদ তো মাহাদই , ওর কাছে এটা একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয় তাই কেউ বাহিরে যেতে পারেনি। তারপর মেয়েরা মাহাদ এর কাছে ঘ্যানঘ্যান করে মেকআপ আর্টিস্টদের বাড়িতে এনেছে। আর এখন তারা মনের সুখে সাজছে তো সাজছেই , ওদের সাজগোজ আর শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে নাহ। এদিকে যে বর মশাই নিজের বউ কে বিয়ের সাজে দেখার জন্য আকুল-ব্যাকুল হয়ে বসে আছে ওদের যেন সেদিকে কোন খেয়ালই নেই।

নাঈম এবার অধ্যের্য হয়ে বলে ফেলল....

ঃ- এই অয়ন !.. ওদের কে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই ভাই। আমি তো বউ নিয়ে এবাড়িতেই আসবো, তাইনা?.. ওরা তখন তো দেখতেই পাবে। এখন চল আমরা চলে যাই। নাহলে ওদের আশায় বসে থাকলে আমার আর আজকে বিয়ে করা হবে না। ভাই!..

অয়ন, মানাফ, মায়ান সহ ওদের সব কাজিন রা নাঈমের এই কথা শুনে উচ্চ স্বরে হেঁসে উঠল। অয়ন বললো...

ঃ- শালা তুই তো দেখছি বউ কে দেখার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছিস ?... হুঁ হুঁ আর এই তোকেই বিয়ের জন্য রাজী করাতে আমাদের কত কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

ওর এই কথা শুনে নাঈম বলে উঠলো....

ঃ- তো কী হয়েছে?.. মানুষের বিয়ে তো একবারই হয়, তাইনা?.. তাহলে আমার একমাত্র বউ তাকে দেখার জন্য পাগল হতেই পারি। এটা তেমন বেশি গুরুতর বিষয় নয়।

ওর কথায় আবারও সকলে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।

ওদের এমন হাসি ঠাট্টার মধ্যেই সেখানে হঠাৎ মাহাদ উপস্থিত হলো।

ওর পিছনে পিছনে আবার রাহুল ও আছে, এই ব্যাটা সব সময় মাহাদ এর আগে পিছে থাকেই। মাহাদ কে দেখে রুমের সবাই এক মিনিট এর জন্য চুপ হয়ে গেল।

অয়ন মাহাদ কে উদ্দেশ্য করে বলল...

ঃ- বাব্বাহ, এতক্ষণে নেতা সাহেবের দর্শন পেলাম। এবার জীবন টা বুঝি আমার ধন্য হলো। মাহাদ ওর কথা শুনে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল....

ঃ- এসব কি কথাবার্তা?.. আর তোর কী আমাকে দেখলেই এমন মেয়ে মানুষের মতো ঢং করে কথা বলতে ইচ্ছে করে?...

ঃ- ওমা!.. আমি আমি আবার কখন ঢং করলাম?.. আমাকে কী সিনেমার এক্টর মনে হয় তোর ?..

ঃ- তুই যে পরিমাণে ফাজিল,তোকে সিনেমা কেন কোন নাটকের সাইড ক্যারেক্টার হিসেবেও নিবে নাহ।

দায়সারা ভাবে বলে উঠলো মাহাদ। ওর এই কথা শুনে অয়ন বলে উঠলো...

ঃ- ভাই !.. তুই এমনটা করতে পারলি আমার সাথে?.. এতো গুলো কাজিন ব্রো দের সামনে এভাবে আমার ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেললি ?.. দুঃখি দুঃখি মুখ করে বললো অয়ন।

ঃ- আমার জিনিস পত্র সব ঠিকঠাক আছে। আর তাই তোর ইজ্জত এর প্রতি আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।

অয়ন ওর কথা বুঝতে না পেরে আবার বলে উঠলো...

ঃ- মানেহ?... কী বললি তুই?.. কি ঠিক আছে। আমার প্রতি ইন্টারেস্ট নেই মানে?..

ওদের দুজনের ঝগড়া দেখে বাকিরা মুখ টিপে হাসছে।

ঃ- মানে আবার কি, যা বললাম তাই। আর তোর কী নিজের প্রতি ছেলেদের ইন্টারেস্ট চাই?.. তাহলে বল আমি ঐসবের ব্যবস্থা করে দেবো । শত হলেও তুই আমার ফুফাতো ভাই বলে কথা।

অয়ন এবারো মাহাদ এর ঘুরানো পেঁচানো কথা বুঝতে পারলো না। ও আবার বলল..

ঃ- নিজের প্রতি ছেলেদের ইন্টারেস্ট চাই মানে?... আর ঐসব , কী ব্যবস্থা করে দিবি তুই?..

মাহাদ এবার ওর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে নাঈমের দিকে এগিয়ে গেল।

ঃ- অগ্ৰিম বিয়ের শুভেচ্ছা!... আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। তাই আমি তোর বিয়েতে থাকতে পারছি নাহ। আমাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় যেতে হবে। ফিরে এসে নতুন মেহমান এর সাথে দেখা করবো।

নাঈমের কাঁধে হাত রেখে বলল মাহাদ।

নাঈম ওর কথা শুনে অস্থির হয়ে বলল....

ঃ- এই তুই থাকবি না মানে?.. তোকে তো আগেই বলেছি যে বিয়েতে আমার সাথে তোকেও যেতে হবে। তাহলে তুই এখন ঢাকায় যাচ্ছিস, মানে কি?..

ঃ- আমিও তো বলেছিলাম যে, আমি থাকবো তোদের সাথে। কিন্তু এখন আমাকে আর্জেন্ট ঢাকায় যেতে হবে। তোরা সাবধানে যাস আর হ্যাঁ অবশ্যই সাথে কিছু বডিগার্ড নিয়ে যাবি। আমি আসছি!..

এই বলে চলে যাবে, দরজার সামনে যেতেই অয়ন বললো...

ঃ- এই আমার কথার উত্তর দিয়ে যাহ। আমাকে ইনসাল্ট করে চলে যাবি ভেবেছিস?...

ঃ- হ্যাঁ ঐসব থার্ড জেন্ডার।

এই বলেই মাহাদ বেরিয়ে গেল।

ওর এই কথা শুনে অয়ন বলে উঠলো

ঃ- এই ও কি কোনো ভাবে আবার আমাকে ইনসাল্ট করে চলে গেল?.. ও কি আমাকে ইন্ডিরেক্টলি গে বলে গেল?...

ওর কথায় বাকিরা সবাই আবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। ওদের কে এভাবে হাসতে দেখে অয়ন যা বুঝার বুঝে গেছে। ও তাই চুপ করে নাক ফুলিয়ে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পর নাঈম ওরা সবাই নিচে নেমে আসলো। তারপর একে একে বাড়ির মেয়েরাও নিচে নামতে লাগলো। মুক্তা ও নাঈমা সব কিছু একরকম পরেছে। ওদের পরনে আছে মেজেন্ডা রঙের লেহেঙ্গা। হাতে ম্যাচিং ভেলভেট চুড়ি, মাথায় খোঁপা করে তাতে বেলি ফুলের গাজড়া লাগানো। ড্রেসের সঙ্গে মানানসই মেকআপ আর পায়ে মাঝারি সাইজের হিল জুতো।

অয়ন্তি আর মীরা আবার একরকম পরেছে। ওদের পরনে আছে গাঢ় গোলাপি রঙের লেহেঙ্গা । হাতে ম্যাচিং ভেলভেট চুড়ি, আর চুল বেনী করে তাতে বেলি ফুলের গাজড়া লাগানো। ড্রেসের সঙ্গে মানানসই মেকআপ আর পায়ে হাইহিল পরেছে।

ওদের কে এভাবে জোড়া জোড়া সাজতে দেখে মায়ান বলে উঠলো

ঃ- কিরে!.. তোরা এমন জোড়া সেজে এসেছিস কেন?.. আর বাসার সব ময়দা তো মনে হয় চেহারায় মেখে চলে এসেছিস।

বলেই হেসে উঠলো। ওর সাথে তাল মিলিয়ে মানাফ বলে উঠলো

ঃ- হ্যাঁ এদের কে দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহে মনে হয় বাসায় আর সকালের নাস্তায় রুটি তৈরি হবে না। ওদের এই কথা শুনে নাঈমা বলে উঠলো এই তোরা কী শুরু করলি?.. এভাবে বলছিস কেন?..

ওর সাথে তাল মিলিয়ে মুক্তা বলে উঠলো

ঃ- তোদের যদি ইচ্ছে করে তো তোরাও মেখে আয় যাহ। আর ওদের পিছনে লাগছিস কেন?.. আমরাও তো জোড়া সেজেছি । পারলে আমাদের কে কিছু বল দেখি?..

ঃ- হ্যাঁ তাই তো। পারলে আপুদের কে বলো না দেখি?...

বলে উঠলো অয়ন্তি।

ঃ- আমরা আটা মাখি আর ময়দা মাখি সেটা আমাদের ইচ্ছে। আমাদের চেহারা আমাদের মর্জি। অয়ন্তির সাথে তাল মিলিয়ে বলে উঠলো মীরা।

ওদের কে এভাবে ঝগড়া করতে দেখে নাঈম বলে উঠলো ...

ঃ- থাক!.. আমার আর আজকে বিয়ে করা হবে না। সেটা আমি বুঝে গেছি, বুঝে গেছি । এই বলে নাঈম সোফায় বসে পরলো।

ঃ- কেন, বিয়ে হবে না কেন?... আর তুই বসে পরলি কেন আবার?... আমরা কি বউ আনতে যাবো না??...

ঃ- বসবো না তো কি করবো‌ হ্যাঁ?.. তোরা যা শুরু করেছিস তাতে আজ আর আমার বিয়ে করতে যাওয়া হবেনা। আর বিয়ে না হলে তোরা বউ আনবি কি করে ?... তবে হ্যাঁ তুই বিয়ে করলে বউ আসবে অবশ্য।

কথাটা বলে উঠলো নাঈম। ওর এই কথা শুনে অয়ন বলে উঠলো

ঃ- ধুর ব্যাটা!.. কি বলছিস?.. বিয়ে আজকেই হবে। আর তোর বিয়েই হবে। এই এবার চল সবাই। বড়রা যারা যারা যাবে তাদের কে তাড়াতাড়ি আসতে বল। ওর কথা শুনে মীরা গেল বড়দের কাছে।

~~~~+~~~~

এই বর এসেছে!.. বর এসেছে!..

এই‌ বলে শোরগোল পড়ে গেল।

গেইটের সামনে সব কাজিন রা মিলে বরের থেকে টাকা আদায় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ওদের মধ্যে কিয়ারা নেই। ও কায়রার কাছে বসে আছে। বোন আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তো বিদায় হয়ে যাবে। আর কখনো আগের মতো নিজেদের মধ্যে প্রিয় খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে না।

আর কখনো একসাথে বসে লুডু খেলা হবে না। আর কখনো লুডু খেলায় বড় ভাইয়া চিটিং করলে সেটা নিয়ে ঝগড়াও করা হবে না। দুইবোন পাশাপাশি বসে নিশ্চিন্তে অফুরন্ত গল্প করা হবে না। আর কেউ ওর অহেতুক প্রশ্নের ধৈর্য ধরে উত্তর দিবে না।

আর কেউ বাহিরে গেলে আসার সময় ওর জন্য ওর প্রিয় খাবার নিয়ে আসবে না। ও রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে তাকলে আর কেউ কখনো ভাত মেখে মুখে তুলে খাইয়ে দিবে না। আর কেউ ওর জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে উপন্যাস এনে দিবে না। যে এগুলো করতো সেই মানুষটি তো আর অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যের বাড়ির সদস্য হয়ে যাবে।

সেই মানুষটি কিছু সপ্তাহ বা কিছু মাস পরে পরে আসবে নিজেরই বাড়িতে অতিথি হিসেবে।

এগুলো ভাবছে বোনের পাশে বসে কিয়ারা। ওর চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরে পড়ছে।

কায়রা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে। মাথাটা নীচু করে ভাবছে কিছু। ওর বিয়েটা তো পারিবারিক ভাবে হচ্ছে। আগে থেকে নিজেদের মধ্যে কোনো চেনাজানা নেই।‌ হ্যাঁ বিয়ে ঠিক হওয়ার পর অবশ্য দুজনের ফোনে কথা হয়েছে বেশ কয়েক বার।

কিন্তু তাও কায়রা ভাবছে, তারপর স্বপ্ন আর একরাশ অজানা ভবিষ্যতের প্রতিধ্বনি। এইতো আর অল্প কিছুক্ষণ, ওর জীবনের নিজস্ব স্বাধীনতার শেষ প্রহর।

“কবুল” শব্দ টা উচ্চারণ করতেই , সব বদলে যাবে।

নিজের ঘর ছেড়ে, নিজের নাম ছেড়ে, একটা নতুন পরিচয়ে নিজেকে খুঁজতে হবে।

কিন্তু ও কী সত্যিই তৈরি?

এত গুলো বছর ধরে যাকে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছে… সেই ও,

অন্য এক মানুষটার জীবনের সঙ্গে জুড়ে যাবে, যাকে ও পুরোপুরি চেনেই না।

– "ভালোবাসা কি সময় নেয়, নাকি বাধ্যতাই একদিন ভালোবাসায় বদলে যায়?"

কায়রা আয়না থেকে চোখ নামিয়ে ফেলে, মৃদু শব্দে একটা নিঃশ্বাস ফেলে।

কে যেন বলেছিল, বিয়ের দিন মেয়েরা শুধু বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দুঃখে কাঁদে না—

ওরা কাঁদে কারণ একসাথে হাজারটা অনুভূতির ভার বুকে জমে থাকে।

ভয়, স্বপ্ন, ব্যথা, আশা… আর একরাশ না-বলা প্রশ্ন।

ঃ- উনি কি বুঝবেন আমাকে?..

– উনি কি ধরতে পারবেন আমার কান্না লুকানো হাসি?...

– উনি কি ছুঁয়ে দেখবেন আমার ভেতরের দোলাচলগুলো?...

আবার কায়রা আয়নার দিকে তাকায়, এক চিলতে হাসি ফোটে ঠোঁটে)

ঃ- সব মেয়ে নাকি রাজকন্যা হতে চায়…

কিন্তু আমি তো শুধু চাই, কেউ আমায় এমনভাবে ভালোবাসুক

যেমনভাবে আমি নিজেকে ভালোবাসতাম—

ভয়হীন, অচেনা, একটু এলোমেলো… একটু আমি।

আজ, শেষবারের মতো আমি শুধু "আমি"—

কাল থেকে আমি হবো কারও স্ত্রী।

কারও জীবনের অংশ।

এবং তারও আগে…

আমার নিজের সঙ্গে একটা নতুন চুক্তি সই করবো—

ভালোবাসা না থাকলেও, আস্থা রাখতে শিখবো।

ভয় পেলেও… পা বাড়াবো।

কারণ বিয়ে শুধু ফুল আর গয়নার গল্প না…

বিয়ে মানে সাহস— নিজেকে হারিয়ে নতুন কাউকে নিজের ভিতরে জায়গা করে নেওয়া।

--- --- --- --- ---

অবশেষে নাঈম শালীদের দাবি পূরণ করে কাজিন ভাই ব্রাদার নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। বর কে নিয়ে সবাই ছাদের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। বিয়ের স্টেজ বাড়ির ছাদে করা হয়েছে। তারপর কাজী সাহেব ততক্ষণে চলে আসলো বরের দিকে। কিন্তু কনে কেই এখনো স্টেজে আনা হয়নি। তাই সকল কাজিন বোনেরা ও কনের বান্ধবীরা মিলে কনে কে আনতে গেল।

সবাই আগেপিছে হেঁটে কনে কে মধ্যমনি করে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। বর ও কনে কে সামনাসামনি বসানো হলো, বরের সাথে বর পক্ষ আর কনের সাথে বসেছে কনেপক্ষ। দু'পক্ষের মাঝখানে ফুলের পর্দা টানানো আছে। অবশেষে সবার উপস্থিতি দেখে নিয়ে কাজী তার কাজ শুরু করে দিল….

ঃ- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম!..

পিতা নেহাল চৌধুরীর বড় কন্যা কায়রা চৌধুরী কে দশ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া নিজ সম্মতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজি থাকিলে বলুন…

আলহামদুলিল্লাহ কবুল!..

কাজীর কথার উত্তরে নাঈম একটুখানি চুপ থেকে সম্মতি দিয়ে বলে উঠলো…

ঃ- আলহামদুলিল্লাহ কবুল!..

ঃ- আরো একবার বলুন..

ঃ- আলহামদুলিল্লাহ কবুল!..

ঃ- আরো একবার বলুন…

ঃ- আলহামদুলিল্লাহ কবুল!..

এরপর কাজী সাহেব নাঈমের দিকে রেজিস্ট্রি পেপার টা এগিয়ে দিল। নাঈম সাইন পেন টা হাতে নিয়ে একটু থেমে রইল। হয়তো একটু কিছু ভাবলো, তারপর ধীরে সুস্থে কাবিননামায় সাইন করে দিল।

এবার কাজী কনের সামনে অসলো এবং একই নিয়মে আবার বলে উঠলো….

ঃ- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম!..

পিতা নাদিম শেখের একমাত্র ছেলে নাঈম শেখ কে দশ লাখ টাকা দেনমোহর গ্ৰহনপূর্বক নিজ সম্মতিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজি থাকিলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল!..

কাজীর বলা কথাগুলো শুনে কায়রা নিশ্চুপ হয়ে রইলো, ওকে এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে কায়রার বাবা এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখল। ভাই কিয়ান ও ছোট বোন কিয়ারা দুপাশে থেকে বোনের দুহাত ধরে সাহস দিলো। কায়রা বাবার দিকে চেয়ে নিরবে সম্মতি দিয়ে বলে উঠলো…

ঃ- আলহামদুলিল্লাহ কবুল!..

ঃ- আরো একবার বলুন…

ঃ- আলহামদুলিল্লাহ কবুল!...

ঃ- আর একবার বলুন!...

ঃ- আলহামদুলিল্লাহ কবুল!..

এরপর কাজী সাহেব কায়রার দিকে নাঈমের সাইন করা রেজিস্ট্রি পেপার টা এগিয়ে দিল। কায়রা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনের পেপার টার দিকে।

যখন শেষ বার “কবুল” শব্দ টা উচ্চারণ করল আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না আপনাআপনিই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে সামনে বাড়িয়ে দেওয়া পেপার টার উপর। কায়রা কাঁদছে, থেকে থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছে কিন্তু কোন শব্দ করছে না। কায়রার কান্না দেখে বোনের বা হাত টা আরো শক্ত করে চেপে ধরে কিয়ারাও নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে‌।

কায়রার বাবা আবারও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে সাইন করতে ইশারা করলেন। কায়রা আস্তে করে সাইন পেন টা হাতে নিয়ে রেজিস্ট্রি পেপার টার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ডান পাশ থেকে কিয়ান আরো একবার সাইন করতে তাড়া দিল। কায়রা ধীরে সুস্থে কাবিননামায় সাইন করে দিল। কাজী সাহেব উচ্চস্বরে বলে উঠলো…

ঃ- আলহামদুলিল্লাহ!..

বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। আজ থেকে আপনারা দুজন স্বামী-স্ত্রী। একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গণ্য হলেন। সদা সর্বদা একসাথে থাকবেন, নিজেদের মধ্যকার বিশ্বাস বজায় রাখবেন। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা আপনাদের মঙ্গল করুন।

—চলবে—

ইনশাআল্লাহ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন