#প্রিয়_রুহের_মাহরাম🌿
#লেখিকাঃ_মারিয়াম_হোসাইন
পর্বঃ- ৩৭
🌿🌿🌿
--- সাজেক ভ্যালি ঝর্ণা ভ্রমণ ---
দুপুরে তারা হাঁটতে হাঁটতে বের হলো কাছের ঝর্ণার দিকে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, মাঝে মাঝে মেঘ এসে পুরো দলটাকে ঢেকে দিচ্ছিল। বান্ধুবিরা চেঁচিয়ে উঠল—
“দেখ, আমরা যেন আকাশের ভেতর হাঁটছি!”
অবশেষে গর্জন শুনতে শুনতে পৌঁছাল ঝর্ণার কাছে। প্রচণ্ড জলধারা পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে। কিয়ারা জুতো খুলে পাথরের ওপর দাঁড়াল, ঠান্ডা পানির ফোঁটা তার মুখ ভিজিয়ে দিল।
সে চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিল—
“এ মুহূর্তটা আমি কখনো ভুলব না।”
বান্ধুবিরা কেউ ছবি তুলছে, কেউ পানিতে নামছে। কিয়ারা হাসতে হাসতে পানি ছিটাল, চারপাশে প্রতিধ্বনিত হলো হাসির শব্দ।
--- রাতের আকাশের নিচে ক্যাম্প ফায়ার ---
রাতে সবাই মিলে ক্যাম্পফায়ারের আয়োজন করল। গান, হাসি, ঠাট্টায় চারপাশ গরম হয়ে উঠল। কিন্তু কিয়ারা দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। বান্ধবী রা জিজ্ঞেস করলো, "তুই এখানে একা কেন?"—সে কেবল হেসে বলল, "বাতাসটা উপভোগ করছি।"
তবে তার অন্তরের ভেতরে যেন অদ্ভুত টান কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, কারও দৃষ্টি তাকে ঘিরে রেখেছে। হয়তো পাহাড়ের অন্ধকারে কেউ আছে—যে চেনা হয়েও অচেনা, অথচ অদৃশ্য হয়েও যেন দৃশ্যমান এক ছায়া…
কিয়ারা আকাশের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ কণ্ঠে বলল—
“তারাগুলো এত কাছে মনে হচ্ছে, যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলব।”
বান্ধুবিরা হেসে বলল—“এই সফর আমাদের জীবনের সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে।”
কিয়ারা চুপ করে আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকল। মনের ভেতরে কোথাও হালকা শূন্যতা, কিন্তু সে সেটা আড়াল করে হাসতে থাকল।
এভাবেই কেটে গেল সাজেক সফরের দ্বিতীয় দিন—আনন্দ, হাসি, আর পাহাড়ি মুগ্ধতায় ভরা।
কিন্তু কেউ টের পেল না, তৃতীয় দিনে এ আনন্দ এক ভয়ংকর বাঁক নিতে চলেছে…
—---+---—
– সাজেক সফরের তৃতীয় দিন –
তৃতীয় দিনের ভোর
সূর্য ওঠার আগে কিয়ারা বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। পাহাড়ের কোলে মেঘের নদী বয়ে চলেছে, বাতাসে শীতলতা। কিয়ারা নিজের ফোনের ডায়েরিতে লিখল—
“জীবনের সেরা সফর… মনে হচ্ছে এ মুহূর্ত চিরকাল থাকুক।”
কিন্তু ভাগ্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল তার জন্য।
---
সকালে সবাই মিলে পাহাড়ি পথ ধরে ঘুরতে বের হলো। হাসি-ঠাট্টা, ছবি তোলা চলছিল। কিয়ারা সবুজের গভীরতায় মুগ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে দলের পেছনে পড়ে গেল।
সকাল সকাল পাহাড়ের চূড়ায় উঠতেই সবাই মুগ্ধ—মেঘের রাজ্যে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি। কেউ সেলফি তুলছে, কেউ মেঘ ছোঁয়ার চেষ্টা করছে, আর কিয়ারা দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের প্রান্তে। বাতাস তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, চোখে অদ্ভুত ঝলক।
হঠাৎ কিয়ারা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন লম্বা, কালো পোশাকে মোড়া মানুষকে দেখতে পেল। মুহূর্তের জন্য তার বুক ধড়ফড় করে উঠলো—কেউ তাকে অনুসরণ করছে? নাকি মাহাদের ছায়া এখানে পর্যন্ত এসেছে? কিন্তু সে যখন ভালো করে তাকালো, তখন সেখানে আর কেউ নেই—শুধু কুয়াশা আর বাতাস।
কিয়ারা আবারও নিজের মনের ভূল ভেবে এড়িয়ে গেল।
লোকটাকে একটু বেশিই মিস্ করছে হয়ত, তাইতো বারবার ওর উনাকে নিয়ে যেখানে সেখানে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।
দলের সবার সাথে ঘুরতে ঘুরতেই
হঠাৎ কিয়ারার চোখে পড়ল এক অচেনা সরু পথ, গাছের ফাঁকে আলো ঝিকমিক করছে। কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না সে।
“একটু গিয়ে দেখি,”—নিজেকেই বলল কিয়ারা।
দল এগিয়ে গেল, আর কিয়ারা পথ পাল্টে একা ঢুকে পড়ল বনের ভেতর।
প্রথমে সব শান্তই লাগছিল—পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ। কিন্তু হঠাৎই পেছনে কিছু ভারী পদশব্দ। সে ঘুরে দাঁড়াল।
চারদিক থেকে পাঁচ জন অচেনা পুরুষ বেরিয়ে এলো। চোখে হিংস্র দৃষ্টি, হাতে ধারালো ছুরি।
“এই সুন্দরী মেয়েটা একা একা কী করছে?”—একজন কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল।
কিয়ারার বুক কেঁপে উঠল।
ঃ- “আমি… আমি আমার বন্ধুদের খুঁজছি।”
ঃ- “বন্ধু?”—আরেকজন হেসে উঠল—“আজ থেকে আমরা-ই তোমার বন্ধু।”
কিয়ারার ভেতরে এক ঝটকা এলো। সে হঠাৎ দৌড় দিল বন জঙ্গলের ভেতর। পেছনে ধাওয়া শুরু হলো।
“পালাতে পারবে না!”—চিৎকার করল ওরা।
শ্বাসকষ্টে দৌড়াতে দৌড়াতে কিয়ারা পাহাড়ের কিনারায় এসে পৌঁছাল। সামনে গভীর খাদ, নিচে অদৃশ্য অন্ধকার।
পেছনে জঙ্গিরা ছুটে আসছে, হাতে লাঠি আর ছুরি। কিয়ারা চোখ বন্ধ করল।
“হে আল্লাহ, তুমি আমাকে রক্ষা করো।”
“ধর! শালীকে পালাতে পারবে না!”
কিয়ারা দৌড়াতে শুরু করল। তার পায়ের শব্দে শুকনো পাতা চূর্ণ হচ্ছিল। শরীরে ক্ষত, শ্বাস কষ্টে ভেঙে পড়ার উপক্রম, তবুও দৌড় থামায়নি। জঙ্গিদের হাতে পড়লে কি হবে তা সে জানে না—কিন্তু মরার আগে শেষ চেষ্টা করবে।
—+—
এইজন্যই হয়তো লোকটা ওকে আসতে নিষেধ করেছিল। এখন কী করবে ও ??... লোকটা ওকে সাবধান করেছিল। কিন্তু ও আবারও লোকটার কথা অমান্য করে ফেলেছে। এখন কী হবে??... ওকে কে বাঁচাবে এই ভয়ানক জঙ্গিদের হাত থেকে।
ভয়ে আতঙ্কে কিয়ারা কেঁদে উঠলো। ও একা একটা মেয়ে হয়ে কোনো ভাবেই এতগুলো জঙ্গি ছেলেদের সাথে পেরে উঠবে না। তবে কি এখানেই ওর জীবনের সমাপ্তি ঘটে যাবে??..
আর কী মায়ের বুকে ফিরে যাওয়া হবে না??.... ঐ লোকটার সাথে কী ওর আর দেখা হবে না??...
ঝোপঝাড় পেরিয়ে, খাড়া ঢাল বেয়ে, কিয়ারা ছুটছিলো অন্ধকার বনের ভেতর দিয়ে। পেছনে মশাল হাতে কয়েকজন জঙ্গি ধাওয়া করছে। তাদের চোখ জ্বলছে হিংস্রতায়।
হঠাৎ সামনে একটা পাথুরে পাহাড়ের প্রান্ত এসে গেল। নিচে গভীর খাদ—মেঘে ঢাকা, দেখা যাচ্ছে না কোথায় গিয়ে শেষ। কিয়ারা দাঁড়াল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য, শ্বাস নিতে নিতে বুঝতে পারলো, পেছন থেকে জঙ্গিরা এগিয়ে আসছে।
“আর কোনো রাস্তা নেই…” তার চোখ ভিজে উঠল, ঠোঁটে ফিসফিস, “হে আল্লাহ… বাঁচাও।”
কিয়ারা বুঝে গেল এবার ওকে কি করতে হবে। সামনে গভীর খাদ, আর পিছনে ভয়ংকর জঙ্গি বাহিনী। যাদের হাতে একবার পড়লে বেঁচে ফিরতে পারলেও ওর ইজ্জত নিয়ে ফিরতে পারবে না। আর এমনভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ওর জন্য অনেক উত্তম।
লোকটা ওকে বলেছে যে, ও তার আমানত। আর তিনি নিজের আমানতের খিয়ানত কখনো বরদাস্ত করেন না। ও যদি বাঁচার আশায় জঙ্গিদের হাতে ধরা দেয় তাহলেও ঐ নিষ্ঠুর লোকটা ওকে বাঁচিয়ে রাখবে না।
আর নিজের ইজ্জতের উপর একটা আঁচ ও আসতে দিবে না ও । যতক্ষণ দেহে প্রান আছে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করে যাবে।
যদি হেড়ে যায় তাহলে মৃত্যুকে কবুল করবে। তবুও কোনো হারাম কোনো স্পর্শ তার আমানতে লাগতে দিবে না কিয়ারা। সাথে ফোনটাও নেই, দৌড়ের চক্করে সেটা ছিটকে গিয়ে কোথায় পড়েছে তার কোনো হদিস নেই ওর কাছে।
এতক্ষণে হয়তো টিমের বাকিদের কাছে খবর পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু তারা ওর পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে ও হয়তো শেষ হয়ে যাবে। আর কোনো আশা খুঁজে পাচ্ছে না কিয়ারা।
সে ঘুরে আবার দৌড় দিল, কিন্তু জঙ্গিরা খুব কাছে এসে গেছে। এক ঝটকায় একজন তার ড্রেসের অংশ ধরে ফেললো। কিয়ারা ঝাঁকুনি দিয়ে ছাড়াতে গিয়ে ভারসাম্য হারাল—
আর তারপর মুহূর্তের মধ্যেই সে পাহাড়ের প্রান্ত থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ল।
চোখে শুধু অন্ধকার আর মেঘ, কানে বাতাসের তীব্র শব্দ।
হঠাৎ সব কিছু যেন থমকে গেল।
”
অন্ধকারে ডুবে গেল কিয়ারা ।
ঝাপসা চোখে কিয়ারা শুধু আকাশটাকে ঘুরতে দেখল। কান্না, ভয়, বেদনা সব মিশে বুকের ভেতর চাপা ব্যথা তৈরি করল।
তারপর সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে জঙ্গিরা হতভম্ব।
“সে কি বেঁচে আছে?”—একজন ফিসফিস করে বলল।
---
ঠিক তখনই পাহাড়ের অন্য পাশে রাস্তায় শোনা গেল ভয়ার্ত গর্জন—অনেক গাড়ির শব্দ, হর্ন, আর অস্ত্রের ঝকঝকে ঝলক।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই কালো এসইউভির লম্বা কনভয় পাহাড়ের ধারে এসে থামল। সাথে বিশাল ট্রাক, কালো পোশাকে দেহরক্ষী বাহিনী, সবার হাতে আধুনিক অস্ত্র। বিদেশি ট্রেনিং প্রাপ্ত বিশাল বিশাল কুকুর।
গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আফনান মাহাদ খান —মন্ত্রীপুত্র, রাজপুত্রের মতো ব্যক্তিত্ব, কিন্তু চোখে অন্ধকারের শাসন। তার কালো কোট বাতাসে উড়ছিল, ঠান্ডা চোখ যেন রক্ত জমিয়ে দেয়।
তার আগমনেই পাহাড় যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“সার্চ টিম নামাও!”—মাহাদের কণ্ঠ বজ্রের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
“নিচে নামো, পুরো এলাকা চেক করো—রায়া কে খুঁজে আনো!”
তার লোকজন সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের ধারে রশি নামাতে শুরু করল। কেউ নেমে গেল নিচে, কেউ ড্রোন নামিয়ে এলাকা স্ক্যান করতে লাগল। কুকুর গুলো কে কিয়ারার একটা স্কার্ফ এর টুকরো দেওয়া হয়েছে। সেটার ঘ্রাণ শুঁকে নিয়ে কুকুর গুলোও নিজেদের দায়িত্ব পালনে নেমে গিয়েছে।
মাহাদ পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে নিচে তাকাল। মেঘে ঢাকা খাদে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে।
কলিজা টা অজানা আশঙ্কায় শুকিয়ে আসছে ।
“তুমি আমার স্ত্রী… তোমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না। শুনছো রায়া, আমি আসছি।”
—-----—
— ফ্ল্যাশ ব্যাগ —
সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হয়ে আসছে, কিয়ারার বান্ধুবিদের মধ্যে হইচই শুরু হলো। অজানা আতঙ্কে , ভয়ে কিরণের চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল।
“কিরু কোথায় গেল?”
“কেউ কি ওকে দেখেছ?”
কেউ উত্তর দিতে পারল না। সবার চোখে আতঙ্ক নেমে এলো। শিক্ষকরা দ্রুত চারপাশে খোঁজা শুরু করলেন। পাহাড়ি বন তখন কুয়াশায় ঢেকে গেছে, এক পা ফেললেই গা ছমছম করছে।
ঠিক তখনই সাজেকের নীরবতা ভেদ করে পাহাড়ি রাস্তা কাঁপিয়ে একের পর এক কালো এসইউভি আর ট্রাক ঢুকে পড়ল। হেডলাইটের আলো অন্ধকার চিরে এগিয়ে এলো।
সবাই হতবাক।
গাড়ি থেকে নামল মাহাদ। কালো শার্ট, ঠান্ডা চোখ, কপালে ভাঁজ—চারপাশ যেন কেঁপে উঠল তার আগমনে।
“ও কোথায়?”—কণ্ঠে বজ্রধ্বনি।
বান্ধুবিরা কেঁপে উঠে উত্তর দিল—
“সে… সে বনে হারিয়ে গেছে।”
মাহাদের চোখ লালচে হয়ে উঠল, গর্জে উঠল—
“কেউ কেমন করে ওকে পাহাড়ে একা রেখে চলে এলো ?!”
তার নির্দেশে পাহাড় ঘিরে ফেলল দেহরক্ষীরা। টর্চলাইট, অস্ত্র, সবাই ছুটে গেল জঙ্গলের ভেতরে।
---
ঘণ্টাখানেক জঙ্গলের আনাচে কানাচে খুঁজাখুজি চললো। এর মধ্যেই মাহাদ ঘোষণা দিলো যে জঙ্গলের মধ্যে বা তার আসে পাশে যাদের পাওয়া যাবে সবাইকে আটক করা হোক । এর মধ্যেই রাহুল কিয়ারার ফোন টা খুজে পেল। মাহাদের কাছে নিয়ে গেল ফোনটা । সেটা দেখে মাহাদ জিজ্ঞেস করল যে ওটা কোন দিকে পাওয়া গিয়েছে??... যেদিকে পাওয়া গিয়েছে সেদিকে আরো ভালো করে খোঁজা হোক।
তারপর ছেলেরা জঙ্গলের গভীরে খুঁজতে গিয়ে সেই জঙ্গির দলটাকে ধরে ফেলল। ওদের কে মারধর করার পরেও যখন ওরা কিছু বললো না, তখন মাহাদ এগিয়ে এসে একজনের পায়ে শুট করে দিল। এটা দেখে জঙ্গি দলের বাকিরা এবার প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল। এতক্ষণে ওরা খুব ভাল করে বুঝে গেছে যে, ওরা কাকে ধাওয়া করেছিল।
জঙ্গি দলের মধ্যে থাকা একজন অতিরিক্ত ভয়ে ভীত হয়ে সবকিছু বলে দিল। সবকিছু শুনে মাহাদের যেন এবার মাথা টা খারাপ হয়ে গেল। মাথা টা তো আগেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। যখন সারাদিনের কাজ শেষ করে ফোন দিয়েও কিয়ারা কে পাওয়া যায়নি। তারপর ওর ফোনের লোকেশন চেক করে যখন দেখলো যে, কিয়ারা সেই ওর কথা অমান্য করে নিজের জেদ বজায় রেখে সাজেক চলে এসেছে। কিন্তু যখন কিয়ারা কে মাহাদ কলে পাচ্ছিল না তখন ওর মেজাজ আরও বিগড়ে গেল।
আর সেই মেজাজে ঘি হিসেবে কাজ করলো কিরণের একটা ফোন কল। মাহাদ একদিকে ওর কথা অমান্য করে সাজেক আসায় এমনিতেই প্রচুর রেগে গিয়েছিল । আবার খবর এলো তিনি নাকি হারিয়ে গিয়েছেন। তাকে কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।
এরপরেও কি সম্ভব মাহাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকা??.... দলবল নিয়ে চলে এলো ওকে খুঁজতে। এতটা পথ যে মাহাদ কিভাবে এসেছে, সেটা শুধু ওরই জানা আছে। ওকে একবার খুঁজে পাক, তারপর দু গালে কষিয়ে দুটো থাপ্পড় লাগাবে।
এতো এতো পাহাড়ি রাস্তার মধ্যে সেই রাস্তাটা কোনদিকে সেটা জঙ্গি ছেলেটা বলতে পারছে না সঠিক ভাবে। তারপর আরো কয়েক ঘণ্টা খোঁজার পর অবশেষে এক পাহাড়ি খাদের নিচ থেকে ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। কুকুর গুলো গর্জন করে দৌড়ে সেদিকে চলে গেল। কুকুর গুলোর এমন তর্জন গর্জন শুনতে পেয়ে বাকিরাও সেদিকে এগিয়ে গেল। টর্চের আলো ফেলতেই দেখা গেল—কেউ ভেজা ঘাসের ওপর পড়ে আছে, অচেতন। তার কপাল থেকে রক্ত ঝরছে, ঠোঁট ফ্যাকাশে।
মাহাদ নিজে দৌড়ে নেমে গেল নিচে। কারণ অবয়ব দেখেই সে বুঝে গেছে ওটা কে। কাদামাটি শরীরে মেখে সে কিয়ারাকে কোলে তুলে নিল।
“রায়া! চোখ খোল… আমি এখানে আছি।” আজ তোর খবর করে ছাড়বো। নিষেধ করেছিলাম আমি ।
তার হাত কাঁপছে, কিন্তু কণ্ঠ ভরা আগুনে—
“যে বা যারা এর পেছনে আছে, আমি কাউকে ছাড়ব না!”
কিয়ারার ঠোঁট সামান্য নড়ল। অচেতন অবস্থায়ও সে যেন মৃদু কণ্ঠে ফিসফিস করল—
“নীল চোখ…”
মাহাদের বুক কেঁপে উঠল। চোখ জ্বলে উঠল, কিন্তু সে দাঁত চেপে বলল—
“তুমি আমার হাতে নিরাপদ, আমি তোমাকে কিছু হতে দেব না।”
দেহরক্ষীরা দ্রুত স্ট্রেচার নামিয়ে আনল। কিয়ারাকে তুলতেই মাহাদ বলল—
“গাড়ি প্রস্তুত করো। ওকে ঢাকায় নিতে হবে। এখনই।”
পুরো পাহাড়ি এলাকা তখন আলো, শব্দ আর আতঙ্কে কাঁপছিল।
কেউ চোখ সরাতে পারছিল না সেই দৃশ্য থেকে—
একজন মন্ত্রীপুত্র, যার চোখে শুধু এক জিনিসের আগুন—ভালোবাসা, আসক্তি আর হারানোর ভয়।
— — —
হাসপাতালের ঘরে নীরবতা। সাদা আলোয় ঘেরা সেই ঘরে একমাত্র শব্দ—মনিটরের বীপ আর স্যালাইনের ফোঁটা পড়ার টুপটাপ শব্দ।
মাহাদ কিয়ারার কেবিনের ভিতরে থাকা একটা সোফায় বসে আছে। কপালের ওপর হাত রেখে সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়েছে। তার চোখ লাল, কিন্তু দৃষ্টি স্থির—যেন কোনো ভয়ানক যুদ্ধ শেষে ক্লান্ত যোদ্ধা এখন শুধু তার রাজকুমারীকে পাহারা দিচ্ছে।
অবশেষে কিয়ারার চোখ দুটো আস্তে আস্তে খুলল। দুর্বল দৃষ্টি সামনের দিকে গিয়ে থামতেই কিয়ারার বুক হঠাৎ কেঁপে উঠল। সে দ্রুত উঠে বসতে চাইল কিন্তু মাহাদ জোর কদমে হেঁটে ওর সামনে দাঁড়িয়ে গেল। তার হাতটা চেপে ধরল—
“রায়া… আলহামদুলিল্লাহ! তুমি চোখ খুলেছো।”
কিয়ারা অনেক কষ্টে ঠোঁট নড়াল, ফিসফিস করে বলল—
“আমি ভেবেছিলাম… আমি আর ফিরব না।”
মাহাদ হঠাৎ তার হাত শক্ত করে ধরে উঠল, কণ্ঠে প্রচণ্ড রাগ আর ব্যথা মিশে গেল—
ঃ- “ইচ্ছে তো করছে আমিই এখন তোকে মেরে ফেলি। কিন্তু তুই অসুস্থ বলে বেঁচে গেলি। আমি নিষেধ করার পরেও তুই আমাকে অমান্য করে চলে গিয়েছিস। একবার খালি সুস্থ হয়ে নে তারপর তোর ব্যবস্থা হচ্ছে।”
কিয়ারা এবার প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে। লোকটাকে দেখেই মনে হচ্ছে তিনি এই মুহূর্তে ওর উপর প্রচন্ড রেগে আছেন। কিয়ারার দুর্বল চোখে অশ্রু এসে ভিজে গেল।
কিছুক্ষণ পর কিরণ রা কয়েকজন ভেতরে ঢুকতে চাইলে মাহাদ তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল।
ঃ- “কেউ ঢুকবে না।” তার গলা কাঁপছিল কিন্তু কঠিন। “ওর পাশে শুধু আমি থাকব। যখন খেয়াল রাখার দরকার ছিল তখন সেটা পারো নি। তাই এখন তোমরা বাইরে যাও।”
সবাই হতভম্ব হয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল। কিয়ারা মৃদু স্বরে বলল—
“ওরা তো আমার বন্ধু… চিন্তায় ছিল।” আর কিরণ !..
মাহাদ চোখ নামিয়ে তার কপালে হাত রাখল। খুব ধীরে, গম্ভীর গলায় বলল—
ঃ- “আমি জানি ওরা তোমার বন্ধু। কিন্তু তাদের চেয়ে বেশি অধিকার আমার। তুমি আমার স্ত্রী। তোমাকে আমি পৃথিবীর কারো সাথে ভাগ করব না। তোমার হাসি, তোমার ভয়, এমনকি তোমার দুর্বল মুহূর্তও—সবকিছু শুধু আমার জন্য।”
কিয়ারার চোখে জল গড়িয়ে পড়ল। তার কণ্ঠে ভাঙা সুর—
ঃ- আপনি এতো রাগী কেন মাহাদ…?”
মাহাদ ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করে বলল—
“কারণ আমি তোমাতে আসক্ত পাগলের মতোই। আমি সহ্য করতে পারি না কেউ তোমার কাছাকাছি আসুক, আর আজ তো তুমি আমার কথা অমান্য করে এসেছিলে বলে হারাতে যাচ্ছিলে… আমি যদি এক মুহূর্ত দেরি করতাম, তুমি এখন…”
কথা শেষ করার আগেই সে চুপ হয়ে গেল। তার কপালে দীর্ঘ চুমু খেল।
ঃ- “তুমি বেঁচে আছো এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। তবে ভেবো না যে আমি সব ভুলে গিয়েছি।
নার্স ভেতরে ঢুকে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করল। মাহাদ একপাশে সরে গেলেও তার হাত থেকে কিয়ারার হাত ছাড়ল না। সবার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল—মাহাদ হয়তো গম্ভীর, রাগী, কিন্তু তার ভেতরে কিয়ারার জন্য অসহায় ভালোবাসার এক সমুদ্র বইছে।
---চলবে---
ইনশাআল্লাহ