#বিষাদ_বৃক্ষ
#নূপুর_ইসলাম
বৈশাখ মাস বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। ঝড় টর নেই বললেই চলে। এটা অলি আবসারদের ভাগ্য বলুক আর যাই বলুক। বিদায় নিয়েও যেন ঠিক কালবৈশাখীর আরেক রুপ এসে সারা রাত শুধু বিয়ে বাড়ি কেন পুরো গ্রামকেই লন্ডভন্ড করে ফেলল। এই লন্ডভন্ডে অবশ্য বিয়ের বাড়ির আমেজে কোন ভাটা পড়ল না। সকাল হতেই আবার সব শুরু ।
আজাদ সারা রাত ঘুমায়নি। সকালে রুম একটু খালি পেয়েই পটাং হয়ে শুয়ে পড়েছে। তখনি আনতারা রুমে এলো। সব সময়ের মতো ধীরে ধীরে। আজাদের গায়ে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। গলা, ঘাড়, পিঠ সব মেহেদীর লাল রঙে রঙিন হয়ে আছে।
এই নিয়েও পুরো বাড়ি হাসাহাসিতে মাখামাখি। শবনম ভাবি আজাদকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল, -- কাহিনী কি? যতদূর মনে পড়ে মেহেদীতো আনতারার হাতে দিয়েছিলাম। সেই মেহেদী আপনার গায়ে চালান হলো কিভাবে?
সব সময়ের মতো আজাদের কোন ভাবান্তর হয়নি।সে তার মতোই বলেছে। আনতারা আর আমি আলাদা নাকি? সে দিয়েছে মানেই তো আমি দিয়েছি। তার হাতে রং ফুটবে আর আমার গায়ে ফুটবে না। এমন হয় নাকি?
-- ওরে বাবা তো দেখি লাইলি মজনুর প্রেম।
-- উঁহু! আজাদ আর আনতারার প্রেম।
শবনম দিয়েছে আজাদের বাহুতে বিশাল এক চিমটি। চিমটি কেটে ফিসফিস করে বলেছে, -- বাবাহ! এক রাতেই ঘোল খেয়ে গেছো? বাকি জীবন তো পড়েই আছে
-- তোমার দেবরের রাণী'ই এমন ভাবি। বাকি জীবন নিয়ে বড়ই চিন্তিত আছি।
আনতারা তখন লজ্জায় মিশে যাওয়ার জোগাড়। এই দুজনের মুখে কোন লাগাম নেই। মানুষ দেখে না, জন দেখে না। যখন যা মুখে আসে বলতে থাকে। সে আর আজাদের সামনেই আসেনি। এখনো আসতো না। শবনম ভাবি জোর করে ঠেলে পাঠালো। তার ঘাড়ে পড়েছে তিন জনের দায়িত্ব। আজাদ, নানাভাই, আর শ্বশুর আব্বা।
কিছুক্ষণ পরেই বিথীকে গোসল দেওয়া হবে। গোসলের পরেই একেবারে বউ সাজিয়ে ফেলবে। আর এই গোসল তো গোসল না। পুরো বাড়ির মানুষ কাদা আর কালি দিয়ে মাখামাখি করছে। সে নিজেও বলতে গেলে ভূত। কাউকে নাকি বাদ রাখা যাবে না। তাই সবাইকে ভাগাভাগি করে দেওয়া হয়েছে। আর তার ঘাড়ে পড়েছে এই তিন জন।
তিন জনের মধ্যে দু- জনকে দিয়েছে সুন্দর ভাবেই।নানা ভাই কিছু বলেই নি। হেসে শুধু বলেছে, -- বুবু জান খুশি তো?
আনতারা তো মহাখুশি তবে শ্বশুর বাবার জন্য একটু ভয় পেয়েছিল। তবে মানুষটা এতো ভালো। সে যখন সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সে হেসে বলল, -- যা করতে এসেছো তাড়াতাড়ি করতো মা। দুনিয়ার কাজ আছে।
আনতারা হেসেই এগিয়ে গিয়েছে। আলতো করে শুধু দু- গালে লাগিয়েছে। তারপর এলো আজাদের রুমে। এখন একমাত্র এ'ই বাকি। ভাবি বলেছে একজনও যদি বাকি থাকে, সে আজকে শাড়ি পরিয়ে দেবে না। তাই আসা।
আনতারা আজকে চেয়ার টেনে বসলো না। বসলো আজাদের মাথার কাছে। বসে ভালো ভাবে বোঝার চেষ্টা করল। আজাদ ঘুমিয়েছে কি না। অবশ্য এই লোক খুবই চতুর। আনতারা একদম বুঝে না। ঘুমিয়ে আছে কি জেগে। অবশ্য জেগে থাকলেও সমস্যা নেই। কেন জানি এই লোকটাকে এখন আর ভয় করে না। তার মনে হয় নানা ভাই যেমন, আজাদও তেমন। তার কোন কিছুতেই এরা কখনো কিছু বলবে না।
সে কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে রইল তারপর কপালে হাত ছোঁয়াবে তখনি আজাদ আনতারা হাত ধরে ফেলল। ধরে সাথে সাথেই চোখ খুলল। খুলতেই হেসে ফেলল, -- আনতারার পুরো মুখে কালিতে মাখামাখি। ফর্সা গায়ে কালো মুখ। লাগছে একেবারে ভূতনির মতো।
আনতারা মুখ ফুলালো। আজাদ আবারো হাসলো। হেসে বলল,
-- কালকে মেহেদী আজকে আবার কালি?
-- আমি মেহেদি মাখাইনি, সেটা আপনার দোষ।
-- তো দোষ ছিল বলে আজকে শাস্তি দিতে এসেছো?
-- শাস্তি দেবো কেন? সবাইতো সবাইকে দিচ্ছে।
-- সবার ইচ্ছে হচ্ছে দিচ্ছে। তুমি কি আমাকে নিজের ইচ্ছায় দিতে এসেছো?
তখনি টুপ করে ক্যারেন্ট চলে গেল। রাত ভরে লন্ডভন্ড হলেও সকালে সূর্য উঠেনি। আকাশ এখনো অন্ধকার। ক্যারেন্টে আসছে যাচ্ছে। দিন, তবুও মনে হচ্ছে সন্ধ্যা বেলা। ঘরের ভেতরে তো হারিকেন জ্বালিয়েই কাজ করতে হচ্ছে।
আজাদ জানালা খুলেনি। তাই ক্যারেন্ট যাওয়ার সাথে সাথে পুরো ঘর অন্ধকারে ডুবে গেলো। আবার যে তান্ডব শুরু হবে তা দেকেই বোঝা যাচ্ছে।
আনতারা আরেকটু চেপে বসলো। বলল, -- জানালা খুলে দিন।
-- এমনি ভালো আনতারা।
-- অন্ধকার আমার ভালো লাগে না।
-- আমি আছিতো।
-- আপনি থাকলে কি হবে। আমি বাইরে যাব। জানালা খুলেন।
আজাদ শুয়েই একটু এগিয়ে জানালা খুললো। খুব একটা আলো নেই। তবুও আজাদের মুখ স্পষ্ট হলো। আনতারা হালকা হেসে বলল, -- একটু কালিই তো, দেই।
আজাদ স্বাভাবিক ভাবেই বলল -- দাও।
আনতারা আবারো হাসলো। হেসে দু- হাতে আজাদের গালে, কপালে, ইচ্ছে মতো মাখল। আজাদ শুধু সেই হাসি হাসি মাখা মুখটা দেখল। দেখতে দেখতেই বলল, -- এই যে তোমার ইচ্ছা পূরণ করলাম। আমাকে কিছু দেবে না?
আনতারা ভালো ভাবে মাখতে মাখতে বলল, -- না।
-- তোমার এই না কখনো হ্যাঁ হবে?
-- না।
আজাদ হাসলে! হেসে বলল, -- আমার শ্বশুরের মেয়ে এতো কিপটে কেন?
আনতারার ঘষা শেষ। মুখের এক ইঞ্চিও বাদ নেই। অবশ্য দাঁড়ির জন্য খুব একটা সুবিধে হয় নি। তবুও খারাপ না। আনতারার কেন জানি খুব ভালো লাগলো। সে হেসেই বলল -- আমার বাবার মেয়ে খুব ভালো। বাকি যেগুলো সেগুলো তো আজাদের তারা বেগম।
আজাদ আবারো হাসলো! দুষ্টুমি মাখা কন্ঠে বলল, -- স্বামীর নাম মুখে নিতে নেই জানো না?
আনতারাও ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসেই বলল, -- স্বামী কে?
-- হাহ্! কপাল।
আনতারা খিলখিল করে হাসলো! হেসে বলল, -- উঠুন।
-- কেন?
-- আমি বলেছি তাই ।
- তুমি বললেই উঠতে হবে?
-- হ্যাঁ।
-- আমার কথা তো একটাও শুনো না।
-- মহারাণী কারো কথা শুনে না। বরং তাদের কথা সবার শুনতে হয়।
-- সত্য, বলেই আজাদ উঠল। তারা বসা একেবারে কাছাকাছি। মুখোমুখি হতেই আনতরা হাত দিয়ে মুখ ঘরিয়ে দিলো।
তাদের খাট বরাবর আলমারি। আলমারির আয়নার তাদের দু- জনের প্রতিচ্ছবি । দুজনেই কালিতে ভূত। আনতারা সেটা দেখার জন্যই উঠতে বলেছে।
আজাদ আয়নার মধ্যে তাঁকিয়ে হেসে ফেলল। আনতারাও হাসলো। আগের মতো খিলখিলানো হাসি। আজাদ সেই হাসি মুগ্ধ নয়নে দেখল। দেখে বলল, -- দংশন তো করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো না কেন মেয়ে?
আনতারা প্রথমে বুঝে নি, খেয়াল করল পরে। করেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
আজাদ আগের মতোই হেসে বলল, -- কি হয়েছে?
-- কি বললেন?
-- আমি তো কতোকিছুই বলি।
আনতারা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাঁকিয়ে রইল। তারপর উঠে দাঁড়ালো। দরজার সামনে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, -- আমাদের বিয়ের আগে কখনো আমাদের ওখানে আপনি গিয়েছিলেন?
-- আমি প্রায়ই শহরে যাই আনতারা। ক্লিনিকের বিভিন্ন কাজে যেতে হয়।
-- আমি শহরের কথা বলিনি। আমাদের ওখানে।
আজাদ হাসলো! হেসে আবার শুতে শুতে বলল, -- জ্বি না মহারাণী। শ্বশুর বাড়ি আমি একবারই গেছি।
বর যাত্রী আসবে যোহরের পরে। আসাদ ভাহিরটা দেখে ভেতরে আসলো। পুরো বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে আছে। দিনের বেলায়ও হারিকেন জ্বালিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তবুও ভালো রাতের মতো এখনো নামেনি। তবে গুমোট হয়ে আছে। এই গুমোট গুমোট ভাবে আজকে দিনটা কোনরকম গেলেই হলো। তারপর ভেসে যাক কোন সমস্যা নেই।
সে রুমে এসে পানি খেল। সকাল থেকে খাবারের সময় পাইনি। অবশ্য পেলেও কালকের মতো খেতে পারতো না। সব কিছু গুছিয়ে সামনে পেতে পেতে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। এলোমেলো ভাবে কিছুই করতে পারে না।
তার মধ্যে কাঁদা, পানি, মানুষ পুরো বাড়ি লেটকা চেটকা। সে শবনম বলে চেঁচাতে গিয়েও থেমে গেল। সে ভালো করেই জানে শবনমও আছে দৌড়ের উপর। বড় বউ সব দিকই তাকে সামাল দিতে হয়। সে বড় একটা হাঁফ ছাড়লো। অধিকাংশ ছেলেরাই বাইর বাড়ি। মেয়েরা এখন বাথরুমের সাইডে। হইচই শোনা যাচ্ছে। বিথীকে সম্ভবতো গোসল দিচ্ছে। বয়স্ক মহিলাদের গীতও শোনা যাচ্ছে। তাদের ছোট্ট বোনটা সেই দিন হাঁটি হাঁটি পা পা করে পুরো বাড়ি ঘুরে বেরাতো। আজ সে চলে যাবে। কেমন আজব এই রীতি। বাবাকে দেখলাম প্যান্ডেলের এক কোণে দাঁড়িয়ে বার বার চোখ মুছছে। আদরে একটু বাঁদর হয়েছে তবে তাদের কলিজা এই মেয়ে। পরের ঘরে ভালো থাকবে তো?
তখনি তার ভেতরটা মুচড়ে উঠল। এমন শবনমও এক বাড়ির মেয়ে। তাকেও নিশ্চয়ই এভাবে আদরে বড় করেছে। তাকে কি সে ভালো রাখতে পেরেছে? এই গত কয়েক বছরে, সে কি কখনো এই মেয়েটার খোঁজ নিয়েছে? ছোট্ট একটা মেয়ে। যার ঘাড়ে সব দায়িত্ব চেপে দিয়েছে। পারলে ভালো না পারলে ধমক। কত কথা, কত খোঁটা এমন কি?
আসাদ খাটে গা এলিয়ে দিলো। সব হিসেব আজকে তার কাছে বড়ই এলোমেলো। এজন্যই হয়ত বলে নিজের ঘাড়ে পড়লে, পরের বোঝার হিসেব বোঝা যায়। তখনি শবনম এলো। আসাদ ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। শবনমের শরীর প্রায় আধা ভেজা। পুরো মুখ কালিতে মাখামাখি। তবে হাত পরিষ্কার। সেই পরিষ্কার হাতেই খাবার প্লেট।
সে প্লেট রাখতে রাখতে নির্বিকার ভাবে বলল, -- আর কিছু লাগবে?
আসাদ নিরুত্তাপ কন্ঠে বলল, -- লাগবে?
শবনম জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো। আসাদ সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল -- শবনম। উঁহু আসাদের বউ শবনম না। চঞ্চল, এলোমেলো, দুনিয়ার অকাজ করা সেই হারিয়ে যাওয়া শবনম।
শবনম নিষ্পলক ভাবেই তাকিয়ে রইল। আসাদ কথা বলে কম। যাও বলে কঠিন করে। তবে আজকের কন্ঠে ভিন্ন। আর ভিন্নতার আশা এখন আর আসাদের কাছে সে আশা'ই করে না। বিয়ের পরে করতো। যতবারই করতো ততবারই ভেঙে চুরে শেষ হয়েছে। এখনতো মেনেই নিয়েছে তবে এখন আবার কেন?
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল! ফেলে কিছু বলল না। বেরিয়ে এলো। যেতেই সামনে পড়ল আনতারা। আনতারার হাতে একগাদা কালি। সে এগিয়ে শবনমের হাতে মাখাতে মাখাতে তার মিহি সুরে বলল, -- আমার তিনজন আমিতো দিয়েছি। তো আপনারটা বাদ থাকবে কেন? যদি থাকে আমি আপনার কাছে আর কখনো শাড়ি পরবো না।
শবনম হাসলো! হেসে আনতারার মতোই মিহি সুরে বলল, -- শুধু কালি না। তেল আনো আনতারা। আমার আবার এতো ভালো তে পোষে না। ঘষতে ঘষতে যেন চামড়া ছিলে যায়।
আনতারা সাথে সাথে না বোধক মাথা নাড়ল। শবনম শুনলে তো। সে তেলের খোঁজে বের হলো। তার নাকি পুরোনো শবনম লাগবে। হজম করতে পারবি রে বুইড়া ব্যাটা।
আসাদ খায়নি। উঠেও নি। শবনম বেরিয়ে যেতেই কাপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ছিল। তখনি আবার শবনম এলো। দাঁড়ালো আসাদের সামনে। হাত অবশ্য এবার পেছনে মোড়ানো। সে একটা ঢোক গিলে বলল, -- একটু উঠবেন।
আসাদ সাথে সাথে চোখ খুলল। শবনম এসেছে সে বুঝতে পারেনি। হাত সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
-- একটু উঠুন। কাজ আছে।
আসাদ উঠে বসলো। বসে কিছু বোঝার আগেই ঝড়ের গতিতে শবনম কিছু করেই দৌড়।
আসাদ হতম্বভ হয়ে গেছে। হতম্ভব কাটতেই তার স্বভাব মতো সে চেঁচিয়ে উঠল,-- শবনম।
শবনম শুনলে তো। সে আর এই রুমের আশে পাশে তো ভালোই, একশো হাতের মধ্যেও নেই।
চলবে.......