#বিষাদ_বৃক্ষ
#নূপুর_ইসলাম
রাফিয়া বিয়ে বাড়ি থেকে আর ফিরে যায়নি। এতো ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে এতো রাতে তো আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না। তাই রাতে ইব্রাহিম লোকটার বাসায় ছিল। তাছাড়া এই গ্রামের পাট তার এখানেই শেষ। ক্লিনিকে তার কিছু দরকারি জিনিস ছিল। সেগুলোই নিতে এসেছে।
সে তার সব কিছু গোছগাছ করল।রবিবার ছাড়া ক্লিনিকে তেমন ভিড় থাকে না। আজও নেই। তাছাড়া রোগী দেখার চেম্বার এক পাশে হওয়ায়, এই পাশটা এখন বলতে গেলে পুরোই নীরব। প্রায় দু- বছরের উপরে এই রুমটায় ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়ার পরও আজ কেমন অচেনা লাগছে।
আজাদের সাথে তার পরিচয় তার ভাইয়ের মাধ্যমে। তার বড় ভাই, আর আজাদ একই ভার্সিটিতে ছিল। গলায় গলায় সম্পর্ক না থাকলেও ভালো বন্ধুত্ব ছিল। মাঝে মাঝে বাসায় আসতো। প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ার মতো আজাদের মধ্যে তেমন কিছু নেই। বলতে গেলে গ্রাম থেকে উঠে আসা গেঁয়ো ভূত বলা যেতে পারে। সে প্রথমে ভেবেছিল গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে টেলে হবে হয়ত। যারা একটা শার্ট, একটা রংচটা জিন্স নিয়ে পরিবারের দিন ঘুরাতে জান প্রাণ ছেড়ে শহরের ভার্সিটিতে পড়তে আসে। শুধু একটা ভালো চাকরির আশায়।
তবে তার ধারণা ভুল ছিল। আজাদ আসলে ছিলোই এমন। সাধারণ চেহেরার সাধারণ দেখতে একটা ছেলে। কোন বারতি রং নেই, ঢং নেই। শুধু আছে মন ভোলানো একটা হাসি। যে কথাই বলো ফিক করে হেসে ফেলবে। যেন সব কিছুতেই কতো মজা। প্রথম দেখায় প্রেমে না পড়লেও তার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যার কারণে তার সাথে মিশে, কথা বলে প্রেমে না পড়ে সে থাকতেই পারেনি। তাই সে নিজেই এগিয়ে গিয়েছিল।
তার আর আজাদের সম্পর্ক শুরু হলো বিনা অনাড়ম্বর ভাবে। দু- জনের দুনিয়া ছিল ভিন্ন। ওই মাঝে মাঝে শুধু একটু দেখা আর কথা বলা। কখনো ইচ্ছে হলে হাতে হাত রেখে বসে থাকা।
সেই অনাড়ম্বর জীবনে হঠাৎ করেই পরির্বতন এলো তার মেডিকেলে পড়ার সময়। হঠাৎ করেই মনে হলো আজাদ তার সাথে বড়ই বেমানান। ততদিনে আজাদের ভার্সিটির পাঠ প্রায় শেষ। সে গ্রামের ছেলে গ্রামে ফিরে যাবে। সে শুনে অবাক হয়ে বলেছিল, - তুমি গ্রামে যাবে কেন?
আজাদ তার স্বভাব মতো হেসে বলেছিল, -- আমার কি এখানে থাকার কথা?
রাফিয়া ডানে বামে যাইনি। সোজা করে বলেছিল, -- তুমি গ্রামে ফিরে গেলে আমার এই সম্পর্ক রাখা সম্ভব হবে না।
আজাদ তখনও আগের মতোই হেসেছিল। হেসে বলেছিল, -- এই সম্পর্ক তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে। যখন তুমি সুন্দর, স্মার্ট, পরিপাটি মাহতিম স্যারকে দেখেছো।
রাফিয়া তখন চমকে উঠেছিল। আজাদকে সে সব সময় বোকাই ভেবে এসেছে। যা বলে সব সময় এক কথাই হ্যাঁ। দিন দুনিয়ার কোন খেয়াল নেই। এই ছেলে তার মেডিকেলের ভেতর পর্যন্ত কিভাবে গেল তার মাথায় এলো না।
বিনা অনাড়ম্বরে যেমন এই সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, বিনা অনাড়ম্বরেই এই সম্পর্ক শেষ হলো। মাঝে কয়েক বছর কোন যোগাযোগ ছিল না। ততদিনে রাফিয়া এতটুকু ঠিকিই বুঝেছে। কি হারিয়েছে সে।
তারপরই হঠাৎ করে আবার আজাদের সাথে দেখা। সেই আগের মতো, তার ভাইয়ের মাধ্যমে। এই কয়েক বছরেও এই ছেলের কোন পরিবর্তন নেই। সেই আগের মতোই এলোমেলো, অগোছালো। দিন দুনিয়া কোন খেয়াল নেই। রাফিয়ার সাথে কথাও বলল খুব স্বাভাবিক ভাবে। তার সাথে চিট করেছে, এমন কোন হাবভাবও দেখা গেল না। রাফিয়া তো একবার জিজ্ঞেসই করে বসলো, -- তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো তো?
আজাদ তার স্বভাব মতো হেসে ফেলেছে। তবে কিছু বলে নি। রাফিয়া আবার নতুন করে আজাদের প্রেমে পড়ল। আজাদের ক্লিনিকের কথা শুনে এক কথায়ই রাজি হয়ে গেল। সে জানে ভাঙা সম্পর্ক আবার জোড়া লাগতে সময়তো লাগবেই। তাই সে ভেবেছে ধীরে ধীরে আজাদকে আবার তার প্রেমে মাতোয়ারা করবে। তবে তার সব চেষ্টায় পানি ফেলল এই বিয়ে। মানবে কি করে?
তখনি পরিমল বাবু উঁকি দিলেন। রাফিয়া চমকে উঠল। সে দরজা লাগায়নি। দু- মিনিটের কাজ ছিল। ক্লিনিকের কিছু দূরে জামিল লোকটা আছে। তার দায়িত্ব নিরাপদে তাকে শহরে পৌঁছে দেওয়া। তাই ভেবেছে যাবে আর আসবে। সে চমকেই বলল, -- স্যার আপনি?
পরিমল বাবু হাসলেন। হেসে এগিয়ে বললেন, -- হ্যাঁ আমি! তুমি চলে যাচ্ছো নাকি?
-- হ্যাঁ।
-- সব ফর্মালিটি কমপ্লিট?
-- না তেমন কিছু হয়নি। তবে আজাদ বলেছে আমার ইচ্ছে হলে আমি চলে পারি।
-- হুম! আজাদ যখন বলেছে তাহলে অবশ্যই পার।
-- ভালো থাকবেন স্যার। হয়ত আর দেখা হবে না।
-- এটা একদম সত্য, আর দেখা হবে না।
-- মানে?
পরিমল বাবু আবার হাসলেন! হেসে বললেন, -- অভিনয় ভালো ছিল রাফিয়া।
রাফিয়া আবারো চমকালো। পরিমল বাবুরতো কিছু জানার কথা না। তখন আনতারা যেতেই রাফিয়া সরে দাঁড়িয়েছে। সে ভেবেছিল আজাদ তাকে কিছু বলবে। তবে সে রকম কিছু হয়নি। কেন করেছি জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেনি। সে নিজের মতো সিগারেট ধরিয়েছে। পরে রাফিয়া আর দাঁড়ায়নি। তার কাজ এইটুকুই ছিল। আনতারাকে দেখানো। অবশ্য কাজও না। সে শুনে নিজেই রাজি হয়েছে। আজাদ তাকে হেয় করে সুখের সংসার করবে এটা তার সহ্য হচ্ছিল না। তাই ইব্রাহিম লোকটা বলতেই সে অনায়াসেই রাজি হয়েছে।
সে নিজেকে সামলে বলল, -- কিসের অভিনয়?
পরিমল বাবু উপরের ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে একবার তাঁকালেন। তারপর বড় একটা শ্বাস ফেলে এগিয়ে রাফিয়ার সামনে দাঁড়ালেন। তার দুটো হাত'ই প্যান্টের পকেটে। রাফিয়া চমকে উঠার কারণে এতক্ষণ খেয়াল করেনি। এখন করল! করে কিছু বলবে তার আগেই পরিমল বলল, -- স্যরি রাফিয়া। তোমার শুধু এই গ্রামের পাট চুকেননি, বরং এই দুনিয়ার পাটই চুকে গেছে।
বলেই হঠাৎ করে রাফিয়ার মুখে রুমাল চেপে ধরল। রাফিয়া ছাড়ানোর জন্য কিছুক্ষণ ছটফট করল। তবে হাই ডোজের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।
পরিমল বাবু কিছুক্ষণ রাফিয়ার মুখের দিকে নিশ্চুপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর রাফিয়ার গায়ের ওড়না টেনে গলায় পেঁচিয়ে ধরলেন।
আসাদ রুমে এসে দেখল। শবনম শুয়ে আছে। মাথায় সম্ভবতো পানি দেওয়া হয়েছে। আর পুরো ঘর প্রায় বমিতে মাখামাখি। সেই বমি আনতারা ধীরে ধীরে পরিষ্কার করছে। সে এগিয়ে এসে বলল, -- কি হয়েছে?
আনতারা নিজেও ভয়ে শেষ। ভাবি যে এতো অসুস্থ সে তো জানতোই না। রুমে এসে দেখে অবস্থা কাহিল। কাকে বলবে, কাকে ডাকবে সে দিশেই পেল না। পরে নিজেই পানি এনে ভাবির মাথায় পানি দিয়েছে, চোখ মুখ মুছিয়েছে। লেবু চিপড়ে একটু শরবত করে দিতেই কেমন ঢকঢক করে খেলো। আনতারার এতো মায়া লাগলো।
এই বাড়িতে এসেছে পর থেকে বিনা স্বার্থে এই মানুষটাইতো তাকে আগলে রেখেছে। আর সে একটু খেয়াল রাখতে পারল না। সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,-- ভাবির কি হয়েছে?
আসাদ হতম্ভব হয়ে আছে। আসলে এতো কিছু হলো এই দিকের তার কোন খেয়ালই ছিল না। সে হতম্ভব হয়েই এগিয়ে গেল। শবনমের মাথার কাছে বসে কপালে হাত রাখল। প্রথম বার নরম সুরে বলল, -- কি হয়েছে শবনম? দেখি চোখ খুলোতো। আমাকে বলো সমস্যা কি?
শবনম চোখ খুললো না। কেননা খুললেই সে কেঁদে ফেলবে। আসলে এই কয়দিনের দৌড়দৌড়ি নানান ঝামেলায় খেয়াল না করলেও, কিছুক্ষণ আগে যখন চোখ মুখ উল্টিয়ে বমি করল। তখনি তার টনক নড়ল। তার শেষবার তারিখ গেছে কবে? এতো এতো ঝামেলায় সে মনেই করতে পারল না। তখন থেকেই তার ভেতর কাঁপছে।
এতো এতো বিষাদের মাঝেও আসাদ হাসলো! সে ভুলেই গেল রুমে আনতারা আছে। সে নিচু হয়ে আলতো করে শবনমের কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
আনতারা তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সে লজ্জা পেয়েছে তবে একটু স্বস্তিও লাগছে। হয়ত ভাবি বেশি অসুস্থ না। মনে হচ্ছে চিন্তার তেমন কোন কারণও নেই। সে বেরিয়ে চলে এলো একেবারে আবসারের রুমে। নানা ভাই আর রুম থেকে বের হয়নি।
আবসার আনতারাকে দেখে হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলো। আনতারা এগিয়ে গিয়ে পাশে বসল। বসতেই আবসার নরম সুরে বলল, -- কাল কি হয়েছিল বুবু?
আনতারার মুখটা মলিন হলো। মলিন মুখেই মুখটা নিচু করল। তবে কোন শব্দ উচ্চারণ করল না।
আবসারও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাঁকিয়ে রইল। তবে এই ব্যাপারে কিছু আর জিজ্ঞেস করল না। কথা ঘুরিয়ে বলল, --- কিছু বলতে এসেছিলে?
আনতারা উপর নিচে মাথা দোলালো।
-- কি?
-- আমি মিথিকে একটু দেখতে যাই?
আবসার আবারো কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসল। নিশ্চুপ বসলেও এবার তার চেহেরার রং বদলেছে। আনতারা বুঝেনি। তাই আগের মতোই বলল, -- একটু যাব। গিয়েই চলে আসবো।
আবসার বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে বলল, -- একা যেও না। রমিজকে বলছি তাকে নিয়ে যাও।
আনতারা মাথা নাড়লো। নেড়ে বেরুবে আবসার আবার তাকে ডাকল, -- আনতারা?
আনতারা ফিরে তকালো। আবসার আবারো কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। আনতারা এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এখন করল। নানা ভাই কিছু নিয়ে খুবই চিন্তিত। যেন কিছু বলতে চায়, তবে বলতে পারছে না।
আবসার ঢোক গিলে চোখ বন্ধ করল। করে আস্তে করে বলল, -- চোখের দেখা সব সময় সত্যিই হয় না আনতারা আর... আবসার থেমে গেল। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলল, --- যাও সন্ধ্যায় আগে ফিরে এসো।
আনতানাও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা সে বুঝতে পারে না। তবে আজ এইটুকু বুঝল নানা ভাই আজাদের কথা বলেছে আর বাকিটুকু?
আনতারা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। সেইদিন এইটুকু রাস্তা হাঁটতেই তার কাহিল অবস্থা হলেও, আজ সে হেঁটে এলো নির্ধিদ্বায়। রমিজ ভাই অবশ্য তার সাথে সাথে হাঁটছে না। সে হাঁটছে একটু পিছনে। মাথা নিচু করে। আনতারার একবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল, -- আপনার ছোট ভাই কোথায়? তবে কেন জানি গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। সেটা অভিমান থেকে, না রাগ থেকে নাকি অন্যকিছু আনতারা বুঝতে পারল না।
আনতারাকে দেখেই মিথি দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। এতদিনে যে মেয়ে আনতারার ধারেরও কাছে আসে নি। আজ তাকেই সবচেয়ে আপন ভেবে আঁকড়ে ধরতে চাইল।
আনতারা কিছু বলল না, বরং মিথিকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেয়েটা এমন থরথরিয়ে কাঁপছে কেন? কি হয়েছে তার সাথে?
আনতারা জহিরের দিকে তাকালো! জহির মাথা নিচু করে বলল, -- মিথি পুরো না খাওয়া ভাবি। এই বাড়ির এক ফোটা পানিও সে এখন পর্যন্ত গলা দিয়ে নামাইনি। আপনি কি ওকে একটু বুঝাবেন?
আনতারার বড়ই দিশেহারা লাগল। এতো এতো ঝামেলা এতো এতো সংসারের মারপ্যাঁচে সে তো কখনো পরেনি। কি করবে সে?
সে মিথির মাথায় পরম মমতায় হাত বুলালো। আর তখনি আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল। এতো কিছুর পরেও এই দিশেহারা অবস্থায় শুধু একজনের কথাই তার মনে পড়ছে। আর পড়ছে বলেই দিশেহারা ভাবেই মনে মনে বলল, -- আজাদ আপনি কোথায়?
আনতারা নিজের হাতেই মিথিকে খাওয়ালো। সে ভেবেছিল মিথি জেদ করবে, রাগ দেখাবে। তবে সে তেমন কিছুই করেনি। আনতারা যখন খাবার সামনে নিল সে চুপচাপ খেল। খাইয়েই নিজেই হাত, মুখ ধোয়ালো, মাথা পরিপাটি করে বাঁধলো। একদিনেই মেয়েটার চেহেরা অন্য রকম লাগছে। আবার সে এক গাধামি করেছে। এসেছে এসেছেতো খালি হাতে। মিথির টুকটাক জামা কাপড় থেকে দরকারি কিছু জিনিস নিয়ে আসার দরকার ছিল। তার গোবর মাথায় এসব কিছুই আসে নি। সে বাঁধতেই দরজায় টোকা পড়ল।
আনতারা নিজেই উঠল। দরজা সামনে যেতেই দেখল, জহির দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে জামা কাপড়। সে বাড়িয়ে বলল, -- এগুলো আমার ছোট বোনের। আপাতত নিন আমি সব ব্যবস্থা করছি।
আনতারা কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে রইল। তারপর তার স্বভাব মতো কোমল সুরে বলল, -- মিথির জায়গায় যদি আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিথীই থাকতো তাহলে আজকে কি বিথীর জন্যও এমন ব্যবস্থা করতেন?
জহির চমকে উঠল! আনতারা উত্তরের জন্য তাঁকিয়ে রইল। জহির কথা বলতে পারল না। আনতারা বড় একটা শ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে কাপড় নিল। নিতে নিতে বলল, -- জহির ভাই আমি খুবই স্বল্প বুদ্ধির মানুষ। এত প্যাঁচ আমি ধরতে পারি না। তবে আমার বাবা বলত " আমরা যাকে সত্যিই ভালোবাসি তার ক্ষতি আমরা কখনো চাইতে পারি না।
জহির নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। এক ভুল তার পুরো জীবনে কলঙ্ক মাখিয়ে দিল। সে কি কখনো আর এই কলঙ্কের দাগ মুছতে পারবে?
মিথি জহিরের দিকে তাঁকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে হাসলো। তার বোনের সম্মান নষ্ট করে মৃত্যুর পরিকল্পনা করা লোকের সাথে তাকে সারা জীবন থাকতে হবে, তার দেওয়া খাবার খেতে হবে, তার দেওয়া কাপড় গায়ে জড়াতে হবে। একই ঘর, একই ছাদ, একই বিছানায় ঘুমাতে হবে। এতো বড় শাস্তি কি তার পাওনা ছিল। সে হেসেই বলল, -- দরজাটা লাগিয়ে দাওতো ভাবি। আমার গা গুলিয়ে আসছে।
আনতারার বেরুতে বেরুতে সন্ধ্যায় হয়ে গেল। রমিজ ভাই কোথায় আছে কে জানে? সে বেরিয়ে আশে পাশে তাঁকালো। এই বাড়ির চারপাশ বিশাল দেয়াল ঘেরা। জায়গাও অনেক। বাহিরের হাবভাব বোঝা যায় না। তবে পুরো বাড়ি আলোয় ঝলমল করছে। সন্ধ্যা যে হয়েছে বোঝার উপায় নেই।
সে একটু এগুলো। গেইটের সামনে ইব্রাহিম লোকটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। তাকে দেখে হালকা হেসে বলল, -- ভালো আছ আনতারা?
আনতারা দাঁড়িয়ে গেল। লোকটার ব্যবহার অমায়িক,তবুও কেন জানি আনতারার ভয় হলো। আজাদ বলেছিল" মানুষের চোখ কখনো মিথ্যা বলেনা।
সেই অন্ধকারেও সে আজাদের চোখ দেখেছিল। এক পলকে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই চোখ ছিল স্বচ্ছ। কোন ভয় নেই, অপরাধ বোধও নেই। আর এই লোকের চোখের দিকে তাঁকালেই আনতারার কেন জানি ভয় হয়। কেন? এই যে এখন তার গলা শুকিয়ে আসছে।
আনতারা অভিনয় জানে না, অনুভূতি আড়াল করতে পারে না। পারে না বলেই তার ভয় তার চোখে মুখেই ফুটে উঠল।
ইব্রাহিম সেই ভয়মাখা মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে রইল। তারপর হালকা হেসে বলল, -- সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চলো তোমাকে এগিয়ে দেই।
আনতারা ভয় মাখা কন্ঠেই বলল -- রমিজ ভাই কোথায়?
-- আছে সামনেই এসো?
আনতারা ঢোক গিললো। গিলে ধীরে ধীরে এগুলো। ইব্রাহিমও তার সাথে এগুলো। এগুতে এগুতে বলল, -- তোমার শরীর ঠিক হয়েছে?
আনতারা হালকা করে শুধু মাথা নাড়ল। তার ভালো না লাগলে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কারো সাথেই না।
-- তোমাদের বাড়ির অবস্থা কি? ভাইজান ঠিক আছে?
আনতারা এবারো শুধু মাথা নাড়ল। ইব্রাহিম আবারো হাসলো। হেসে বলল, -- একটা গল্প শুনবে আনতারা?
আনতারা কোন ভণিতা ছাড়াই দু- পাশে মাথা নাড়ল। সে শুনবে না। নেড়ে আশে পাশে তাঁকালো। রমিজ ভাই কই?
-- সেইদিন তোমার বাবার গল্প বলেছি, আজকে বলবো দাদির। শুনবে না?
-- আসলে আমাকে বাড়ি যেতে হবে। নানা ভাই তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছে।
-- আমিতো তোমাকে ধরে রাখছি না। চলো যেতে যেতে বলি।
-- আপনার কষ্ট করতে হবে না। শুধু রমিজ ভাইকে একটু ডেকে দিলেই হবে।
ইব্রাহিম দাঁড়িয়ে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়েছে। আনতারা অবশ্য ফিরেও তাঁকায়নি। তবে ইব্রাহিমের সাথে সেও দাঁড়িয়েছে। দাঁড়ালেও তার চোখ আশে পাশে ঘুরছে। রমিজ ভাই কই?
ইব্রাহিম শান্ত চোখে আনতারার সেই চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত ভাবেই বলল, -- ঠিক আছে দাদির গল্প না শুনতে চাও, রুপার গল্প শুনো।
আনতারা সাথে সাথেই ভ্রু কুঁচকালো। মনে মনে একবার নামটা আওড়ালো। কোথায় যেন এই নামটা শুনেছে? তখনি সে চমকালো। সেই বেদেনী বৃদ্ধ মহিলা।
সে চমকেই ইব্রাহিমের দিকে তাঁকালো। তাঁকাতেই ইব্রাহিম বলল, -- তুমি কি জানো আনতারা? যেই বাড়িতে তুমি থাকছো, নিজের বলে ভাবছো, যেই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার এতো তাড়া তোমার। সেই বাড়ি থেকেই তোমার দাদিকে শুধু জীবনটা বাঁচানোর জন্য রাতের আঁধারে পালিতে যেতে হয়েছিল। কেন হয়েছিল জানো? শুধু তোমার বাবা তাঁর গর্ভে ছিল বলে।
আনতারা নিজেকে শক্ত করে বলল -- আমি জানি! নানা ভাই বলেছে। তারা তো আমার দাদা- দাদিকে তেমন ভাবে চিনতো না। তাই ভুল বুঝেছিল।
-- কি ভুল, তুমি তোমার নানা ভাই জিজ্ঞেস করোনি?
আনতারা উত্তর দিতে পারল না। সে জিজ্ঞেস করেনি। ইব্রাহিম বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল, -- অথচ তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছো। আর আমিই সেই ব্যক্তি যে একমাত্র তোমার দাদিকে বাঁচিয়ে নিয়েছি, আগলে রেখেছি, আমার জন্যই তোমার প্রাণ প্রিয় বাবা এই পৃথিবীর আলো দেখেছে।
-- এটা সত্য না।
-- এটাই একমাত্র সত্য আনতারা।
-- সেই দিনতো আপনি অন্য কথা বলেছিলেন।
-- বলতে হয়েছিল। কেননা তোমার নানা ভাই যেমন চায়নি আনজুমের বাচ্চা দুনিয়াতে আসুক। তেমনি এটাও চায় না, তুমি সব কিছু জানো।
-- আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না।
-- না করলে নেই। তুমি না করলেই তো সত্য বদলাবে না। তো এক কাজ করো না কেন? তুমি না হয় তোমার নানা ভাইকে জিজ্ঞেস করো। তাকে তো আবার খুব বিশ্বাস করো।
আনতারা কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে রইল! তার ভেতর ফুঁপিয়ে উঠতে চাইছে। সে আর দাঁড়ালো না, নিজের মতোই এগুতে থাকলো। ইব্রাহিম হাসলো! তখনি ভেতর থেকে হন্তদন্ত হয়ে রমিজ বেরুলো। বেরুতে বেরুতে কঠিন চোখে ইব্রাহিমের দিকে তাকালো।
ইব্রাহিম বাঁকা হেসে বলল -- কষ্ট হয়নিতো রমিজ?
রমিজ উত্তর দিল না। আনতারা যেই দিকে গেছে সে সেই দিকে দৌড়ে গেল।
আনতারা বাড়িতে পা রাখতেই থমকে গেল। তাকে দেখেই মুর্শিদার মুখের প্রতিটা শব্দ তীরের ফলার মতো তাঁর হ্নদয় ভেদ করে ছিন্নভিন্ন করে ফেললো।
অলক্ষী, অপয়া, জন্মের সময় মাকে খাইছে, বিয়ের আগে বাপেরে, এখন খাইতেছে তার সংসাররে। তা না হইলে তার ভরা সংসার এভাবে ডুববো কেন? তাগো ডুবাইয়া হে হাওয়া লাগাইয়া ঘুরে বেড়াইতেছে। বাড়ি আসছে সন্ধ্যা বেলা। ওরে কে কোথায় আছিস? পটের বিবির পা ধোয়ার পানি আন।
আনতারা কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। শাড়ির আঁচল শক্ত করে মুঠো করে ধীরে ধীরে নিজের রুমে এলো। সে চলে এলেও, মুর্শিদার বিলাপ চলতেই থাকলো। তাকে মদন দিতে লাগলো, তাদের বাপের বাড়ির মানুষ। যেই বোন বিয়েতে আসেনি। সে বিকেলে এসে হাজির। মনে কষ্ট পেয়েছে তবে বোনের বিপদে বাসায় মুখ গুঁজে পরে থাকবে নাকি? আর সে এসেই বোনের মাথায় যা ঢালার ঢেলেছে। সেগুলো'ই এখন মুর্শিদা আগুন রুপে বের করছে।
আনতারা রুমে এসে চুপচাপ শুয়ে রইল। সব সময় অল্পতেই থরথরিয়ে কাঁপা আনতারা এই প্রথম খুব সহজেই যেন সব হজম করে ফেলল। মুর্শিদা অবশ্য এখন থেমেছে। থামতেই সে চোখ বন্ধ করল। কতক্ষণ এভাবে ছিল কে জানে। তার ধ্যান ভাঙলো দরজার শব্দে। আনতারা চোখ খুলল না। চোখ না খুললেও সে জানে কে এসেছে।
আজাদ রুমে এসে খাটে বসলো না। সে বসলো নিচে আনতারার পায়ের কাছে। বসে পা ছড়িয়ে বলল -- আজকে বলবে না সব ঠিক করে দিন।
আনতারা চোখ খুললো না। সেও তার মতো আস্তে করে বলল -- একদিন পরে এসে বুঝি তা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হলো।
-- আমার ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কি, কিছু আসে যায় আনতারা?
-- যায় না?
-- তুমি বলো?
-- আপনি বলুন?
-- উঁহু! আজকে আমি না। তুমি বলো আনতারা। আমি তোমারটা শুনতে চাই।
আনতারা চোখ খুললো! খুলে অবশ্য আজাদের দিকে তাঁকালো না। নিজের মতো ধীরে ধীরে উঠে বসলো। বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাঁকিয় বলল, -- আপনি ভালো না খারাপ?
-- খারাপ।
-- আমার কাছে সত্য বলেন না মিথ্যা?
-- খারাপ মানুষ! মিথ্যাই তো বলবো।
-- আমি শুধু একটা প্রশ্ন করবো। উত্তরটা সত্য চাই। সেটা ভালো হোক খারাপ। বলবেন না?
-- তুমি বলেছো সেখানে দ্বিতীয় কোন কথা নেই।
আনতারা ফিরে তাঁকালো। তাঁকাতেই চোখে চোখ পড়ল। আনতারা অবশ্য না তাঁকিয়েই বুঝেছে। সে উঠা মাত্রই আজাদ তার দিকে তাঁকিয়েছে । আর তাঁকিয়েই আছে। সে আজ চোখ ফেরালো না। চোখে চোখ রেখেই বলল, -- আমি যা দেখেছি তা সত্য না মিথ্যা?
-- আমি বললে তুমি বিশ্বাস করবে?
-- হ্যাঁ করবো।
-- কেন?
-- কারণ আমার মন বলেছে। মানুষ মিথ্যা বলে মানুষের মন কখনো মিথ্যা বলে না।
আজাদ হাসলো! হেসে পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, -- আমি যত খারাপই হই। তবে মেয়ে ঘটিত কোন দোষ বা বদনাম আমার নেই। যা দোষ, যা বদনাম, আর যা করার একজনের সাথেই করেছি। আর সেটা তুমি।
আনতারা সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নিলো। যতই হজম করা শিখুক। এই লোকের মতো তো আর ঠোঁট কাটা হওয়া সম্ভব না। সে চোখ ফিরিয়েই বলল, -- আপনি কি আমার দাদির ব্যাপারে কিছু জানেন?
-- প্রশ্ন তো একটা হওয়ার কথা ছিল।
-- খারাপ মানুষের বউ আমি। কথার খেলাপ তো হবেই।
আজাদ আবারো হাসলো! হেসে বলল, -- জানি।
-- আমাকে বলবেন?
-- না।
-- কেন?
-- সব কিছু জানতে নেই।
আনতারা বড় একটা শ্বাস ফেলল। ফেলে বলল -- মিথি সাথে কি হয়েছে?
-- সব ঠিক হয়ে যাবে। জহির ভালো ছেলে।
-- ভালো তো বিথীর সাথে এমন করতে গিয়েছিল কেন?
-- যেই কারণে তুমি ভেতরে ভেতরে ছটফট করছো সেই কারণে।
আনতারা অবাক হয়ে আবার ফিরে তাঁকালো। আজাদ নিজের মতোই বলল, -- খারাপ মানুষেরা অতি সহজেই অন্যর মাথা ধোঁলাই করতে পারে।
-- উনি খারাপ মানুষ?
-- উঁহু! খারাপতো আমি আনতারা।
-- কি বলছেন?
-- চোরের দশদিন গৃহস্থের একদিন। দশদিন হোক তারপরে বলবো।
আনতারা হা হয়ে তাঁকিয়ে রইল। তার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। আজাদ সিগারেট পায়ে পিষলো। তখনি সোহাগী দৌড়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো। বাড়িতে পুলিশ আইছে, বড় মামি পুলিশ আইছে।
সবাই দৌড়ে বেরুলো। রাফিয়া ক্লিনিকে আত্মহত্যা করেছে। তার লাশ তার কেবিনে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। মরার আগে সে চিঠি লিখে আজাদকে দায় করে গেছে। তার সাথে আজাদের নাকি দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কে ছিল। তাকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করায় সে মানতে পারে নি। তাই আত্মহত্যা করেছে।
আনতারা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। আর আজাদ সব সময়ের মতো হাসলো।
চলবে.......