গভীর রাত। চারপাশ নিস্তব্ধ। নিঝুম আঁধারে মগ্ন পুরো জগত।ব্যালকনিতে একাকী দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টি। তার আনমনা চোখ জোড়া দূর আকাশে লীন। প্রান্তর জুড়ে বইছে এক চিলতে ঠান্ডা হাওয়া। এলোমেলো বাতাস মেতেছে তার চুলের খেলায়। চারপাশের রূপটা বড্ড মায়াবী। তবু বৃষ্টির মনে আনন্দের ল্পর্শ নেই। কোনো কিছুই আজ তাকে ছুঁতে পারছে না। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে অচেনা ব্যাকুলতায়। মনজুড়ে কেবল এক অস্থির ছটফটানি। কেন এই আনমনা হাহাকার? কেন এই ব্যাকুলতা? উত্তরটা সে নিজেও জানে না।
কিছুক্ষণ কেটে গেল।হঠাৎ এক গাড়ির গর্জন ভাঙলো নিস্তব্ধতা। বৃষ্টির কানে এলো সেই শব্দ। চমকে উঠলো মেয়েটি। তৎক্ষণাৎ চোখ গেল গেটের পানে।গাড়ি থেকে নামলো আকাশ।
পুরুষটিকে দেখেই বুকটা ছাৎ করে উঠলো বৃষ্টির। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো ভয়ে। বড্ড অগোছালো আজ আকাশ। চোখ দুটো যেন তাজা জবা ফুলের মতো রক্তিম। এলোমেলো চুল ছড়িয়ে আছে মাথায়। মাতালের মতো হেলতে-দুলতে হাঁটছে সে।আকাশের এই রূপ এড়ালো না বৃষ্টির নজর। ব্যাকুলতায় ভরে উঠলো তার মন। আনমনেই বিড়বিড় করে বললো,
"কী হয়েছে ওনার? এমন করে হাঁটছেন কেন?"
ততক্ষণে আকাশ ঢুকে পড়েছে বাড়ির উঠোনে।
দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে নিচে ছুটে এলো বৃষ্টি। বাইরে তখন ঘনঘন কলিং বেল বাজছে।বুকের ভেতর প্রলয় নাচছে। কাঁপা হাতে আলতো করে দরজা খুললো বৃষ্টি। সামনে ওকে দেখে থমকে দাঁড়ালো আকাশ। চোখে তার একরাশ বিস্ময়। অপলক চেয়ে রইলো মেয়েটির পানে।
এমন বিধ্বস্ত রূপ দেখে আর নীরব থাকতে পারলো না বৃষ্টি। বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে উঠলো অজস্র প্রশ্ন। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে বলেই উঠলো,
"কী হয়েছে আপনার? এমন দেখাচ্ছে কেন?"
মেয়েটির কাঁপনঘেরা কণ্ঠস্বর। তাতেই যেন আমূল অস্থির হয়ে উঠলো আকাশ। ব্যাকুল ভেজা গলায় আস্তে করে বললো,
"বৃষ্টি!"
শব্দটি উচ্চারণের পর আর কোনো দ্বিধা রয়নি। সহসা বৃষ্টিকে বুকের মাঝে তীব্র শক্তিতে জড়িয়ে ধরলো সে। অতর্কিত কাণ্ডে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল বৃষ্টি। এক লহমায় যেন হিম হয়ে এলো তার চঞ্চল শরীর।রমণীর শুভ্র ঘাড়ে আলতো করে মুখ গুঁজলো পুরুষটি। তীব্র উত্তাপে হাঁপাতে হাঁপাতে আকাশ ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
"হেই স্টুপিড। প্লিজ... আমায় ছেড়ে যেও না। আই কান্ট... তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। সোজা মরে যাবো। হাঁপিয়ে উঠছি আমি... দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। তুমি কেন কিছু বুঝতে পারছো না? আই নিড ইউ... আমার কেবল তোমাকেই চাই। যেকোনো মূল্যে চাই। তুমি শুধুই আমার... আমার কাছেই তোমাকে থাকতে হবে। প্লিজ... ডোন্ট লিভ মি! আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কোনোদিন আর মুখেও আনবে না।"
আকাশের মাতাল মাখানো কথাগুলো কানে আসতেই বৃষ্টির অন্তরে যেন তীব্র চাবুকের আঘাত লাগলো।আকাশ এসব কী বলছে! লোকটা কি সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেল?
সীমাহীন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল মেয়েটি। তার কন্ঠনালী যেন হঠাৎ শুকিয়ে কাঠ, মুখ দিয়ে ফুটলো না একটা টু শব্দও।ঠিক তখনই নাকের কাছে ভেসে এলো এক উগ্র, কটু গন্ধ। মুহূর্তের মধ্যেই সত্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল বৃষ্টির কাছে। আকাশ প্রচুর মদ গিলেছে।লোকটা যে একবারে বেহুঁশ মাতাল হয়ে এসব প্রলাপ বকছে, তা অনুধাবন করতে বৃষ্টির বিন্দুমাত্র বিলম্ব হলো না। হয়তো প্রেমিকার সাথে কোনো তুমুল ঝগড়া হয়েছে। তাই ঝোঁকের মাথায় নেশায় ডুবে, তাকেই নিজের প্রেমিকা ভেবে এমন আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরেছে!বুকের ভেতরটা এক অচেনা কষ্টে ভারী হয়ে আসলো বৃষ্টির। নিথর প্রাণহীন পাথরের মতো জমে রইলো সে।
ওদিকে বৃষ্টির অবশ শরীরটাকে আরও তীব্র শক্তিতে চেপে ধরলো আকাশ। পুরুষটার উস্কোখুস্কো ঠোঁট থেকে থেকে ব্যাকুল হয়ে বিবিড় করে উঠলো,
"আমায় ছেড়ে যেও না বৃষ্টি... প্লিজ, আমায় ছেড়ে যেও না!"
আকাশের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর এক আপ্রাণ চেষ্টা চালালো বৃষ্টি। হাঁপাতে হাঁপাতে ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
"স্যার, ছাড়ুন! আমি আপনার প্রেমিকা নই... আপনি ভুল করছেন!"
কিন্তু আকাশের যেন সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। সে আঠার মতো ল্যাপটে ধরে রইলো মেয়েটিকে।কোনো উপায় না পেয়ে দিশেহারা চোখে চারপাশটা দেখলো বৃষ্টি। নিঝুম রাত, পুরো বাড়ি নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে৷ সবাই এখন গভীর ঘুমে অচেতন। কাকে ডাকবে সে এই অসময়ে?
ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ টলে উঠলো আকাশ। বৃষ্টি চটজলদি হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো তাকে। শরীরের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে পুরুষটি। নিজের দেহভারটুকুও ধরে রাখার ক্ষমতা আর নেই তার।আকাশের এই করুণ অবস্থা দেখে বৃষ্টির বুঝতে বাকি রইলো না যে, লোকটা একবারে বেহুঁশ মাতাল। এখন নিজের পায়ে ভর দিয়ে রুমে যাওয়ার সাধ্যও নেই তার। বাধ্য হয়ে তাকেই পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।
বুকের ভেতর থেকে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বৃষ্টির। আকাশকে শক্ত করে ধরে, ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে এলো তার ঘরে। বিছানায় শুইয়ে দিতেই, ঢলে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল আকাশ।
আকাশের ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখের পানে চেয়ে নিভৃত দীর্ঘশ্বাস ফেললো বৃষ্টি। ব্যাকুল হৃদয়ে আস্তে করে বিড়বিড় করে বললো,
"জানি, আপনি সব নেশার ঘোরে বলেছেন। তবে এটা যদি নেশার ঘোর না হয়ে ঘোর বাস্তব হতো... তবে হয়তো এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি আমিই হতাম।"
---
পরদিন সকাল।
রহমান বাড়ির সবাই তখন ডাইনিং টেবিলে অলস আড্ডায় প্রাতরাশ সারছে। সবার মুখেই আজ এক অলৌকিক, তৃপ্তির হাসি। কতকাল পর আজ রহমান পরিবারের সবাই একসূত্রে বাঁধা পড়েছে! যেন বহু দিন পর এই খাঁ খাঁ পরিবারে আবার আনন্দের জোয়ার ফিরে এসেছে।
তবে সবার মুখে হাসি ফুটলেও, বৃষ্টির আর আকাশের মুখে তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। দুজনেই থমথমে মুখে একটু একটু করে খাবার মুখে তুলছে। বৃষ্টি বারবার আড়চোখে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, আবার আকাশও চুপিচুপি দৃষ্টি রাখছে বৃষ্টির দিকে। মুহূর্তেই দুজনের চোখাচোখি হতেই, চটজলদি চোখ সরিয়ে নিচ্ছে একে অপরের থেকে।
ওদের এই লুকোচুরি কাণ্ড কিন্তু বাঁধনের চোখ এড়ালো না। মনে মনে ভীষণ হাসি পেল তার, তবে মুখে কোনো টু শব্দ না করে চুপচাপ খেয়ে চললো।
খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ আহসান রহমান বাঁধনের দিকে চেয়ে বললেন,
"আলতাফ মাহবুবের সাথে কথা হয়েছে আমার। তিনি বললেন, তোর চাকরি ছাড়ার ইস্তফাপত্রটা সরকারি অফিসে জমা দেওয়া হয়নি। উনি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন তুই ছুটিতে আছিস। তাই তুই চাইলে আবার আগের চাকরিতে যোগ দিতে পারিস।"
কথাটা শুনেই বাঁধনের হাতের চামচ থমকে গেল। উপস্থিত সবার চোখ গিয়ে পড়লো তার ওপর। নিমিষে গম্ভীর হয়ে উঠলো বাঁধনের মুখাবয়ব। শক্ত গলায় বললো,
"আমি ওই চাকরি আর করবো না।"
অ্যান্সি চরম অবাক হয়ে বললো,
"কেন করবি না? তুই না বিদেশে থাকার সময় বলতিস, এই চাকরিটা করার তোর কত দিনের স্বপ্ন! তবে এখন কেন পিছিয়ে আসছিস?"
গম্ভীর স্বরে বাঁধন বললো,
"হ্যাঁ, বলেছিলাম। কিন্তু এই চাকরিটা রূপকে বাঁচানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভবিষ্যতে যে আবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না, তার কী গ্যারান্টি আছে? তাই এমন কোনো চাকরি আমি করতে চাই না, যা আমাকে রূপের কাছে পৌঁছাতে আড়াল তৈরি করবে। যে জিনিস আমাকে রূপের কাছে যেতে বাধা দেবে, তা আমার জন্য সারা জীবনের মতো নিষিদ্ধ।"
আহসান রহমান মৃদু গলায় বললেন,
"তাহলে তুই এই চাকরিটা আর করবি না?"
বাঁধন এক মুহূর্ত চুপ থেকে সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,
"হুম।"
"তাহলে এখন করবিটা কী?"
"কিছুই করবো না। তোমার ঘাড়ে বসে বসে খাবো।"
বাঁধনের গম্ভীর মুখে অনায়াস জবাব শুনে ডাইনিং টেবিলে থাকা সবার হাসির রোল উঠলো।
জেইন আহসান রহমানের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টার চকমকে হাসিতে বললো,
"আঙ্কেল, কোন ব্যাপারই না! আপনার যা কিছু আছে, সবই তো বাঁধনের। সুতরাং আরাম করে খেতে দিন না বেচারাকে! কটা দিন শান্তিতে বউয়ের শাড়ির আঁচল ধরে বসে বসে খাক!"
বাঁধন জেইনের দিকে লাল চোখে তাকালো। বেশ কড়া গলায় ধমকে উঠলো,
"জেইনের বাচ্চা!"
টেবিলের সবাই আবারও হাসিতে ফেটে পড়লো। তবে এবার আহসান রহমানের চেহারায় এক ধরনের গাম্ভীর্য নেমে এলো। তিনি স্পষ্ট গলায় বললেন,
"তাহলে এবার অন্তত তোর এই বুড়ো বাবাকে একটু সাহায্য কর।"
বাঁধন চোখ তুলে তাকালো,
"মানে?"
আহসান রহমান বুঝিয়ে বললেন,
"দেখতেই তো পাচ্ছিস, তোর কাকা আর আমার বয়স হয়েছে। এই বয়সে বিশাল ব্যবসা আর অফিস সামলানো বড্ড চাপের হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই এখন আমরা দুজন বাড়িতে একটু শান্তিতে বিশ্রাম নেই, আর তুই এবার ব্যবসার পুরো দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নে।"
এক মুহূর্তে পুরো ডাইনিং টেবিলের কোলজুড়ে নিঝুম নীরবতা নেমে এলো। সবার কৌতূহলী দৃষ্টি গিয়ে আটকে রইলো বাঁধনের শান্ত মুখের ওপর। কিন্তু বাঁধন একদম নিস্তব্ধ। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিজের ভাতের থালার দিকে।
আহসান রহমান অধৈর্য হয়ে আবার শুধালেন,
"কী হলো, দিবি না সাহায্য?"
বুকের ভেতর থেকে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো বাঁধন। তারপর সোজা হয়ে বসে বললো,
"আচ্ছা।"
কথাটা শুনতেই আহসান রহমানের চোখে-মুখে আনন্দের উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়লো। উৎফুল্ল গলায় বললেন,
"সত্যি বলছিস? তার মানে তুই রাজি!"
আলতো করে মাথা নেড়ে বাঁধন বললো,
"হুম।"
"তাহলে অফিসে কবে থেকে জয়েন করবি বল?"
"যেদিন তোমরা বলবে, সেদিনই।"
আহসান রহমান মুহূর্তকাল ভেবে নিয়ে বললেন,
"সামনে তো অনুষ্ঠান। আপাতত কিছুদিন আনন্দ-উৎসব কর। বিয়ের ঝামেলাটা চুকে যাক, তারপর জয়েন করিস।"
পাশে বসে থাকা রূপা একজোড়া ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
"বিয়ে! কার বিয়ে?"
আহসান রহমান মৃদু হেসে বললেন,
"কেন, বৃষ্টির বিয়ে!"
রূপা নাটুকে ভঙ্গিতে কপালে হাত দিয়ে আঁতকে উঠলো,
"ইস! একদম ভুলেই গিয়েছিলাম! আমার প্রাণপ্রিয় বেষ্টির যে বিয়ে!"
কথাটা বলেই হঠাৎ চঞ্চল হয়ে আবার বলে উঠলো,
"কিন্তু বৃষ্টির বিয়েটা যে কার সাথে ঠিক হলো, সেটাই তো জানি না!"
বাঁধন এবার রাগী চোখে রূপার দিকে তাকিয়ে একটু কড়া সুরেই বললো,
"খাওয়ার সময় এত কথা বলিস কেন? চুপচাপ খেতে পারিস না?"
এক নিমেষেই মুখটা কালো করে ফেললো রূপা। গোসা করে ভাত চিবোতে চিবোতে মনে মনে বিড়বিড় করে বললো,
"নিজে বললে মাফ, আর আমার বেলায় ফাঁসি!"
________
খাওয়ার পাট চুকিয়ে হায়দার শেখ বৃষ্টিকে সাথে নিয়ে বেরোনোর উদ্দেশ্যে ধীরপায়ে হলরুমে এসে দাঁড়ালেন।ঠিক তখনই মাঝপথ থেকে হায়দার শেখকে নিজের সাথে ডেকে নিয়ে একাই বাইরে বেরিয়ে গেল বাঁধন। কিছুক্ষণ পর দুজনে চুপিচুপি কী যেন কথা সেরে আবার বাড়ির অন্দরমহলে ফিরে এলো৷ হায়দার শেখ গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে সাফ করে নিলেন। উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে প্রসন্ন মুখে বললেন,
"তাহলে আজ আমরা উঠি। কাল তোমরা সবাই কিন্তু একটু সকাল সকালই আমাদের বাড়িতে চলে এসো।"
রূপা একরাশ কৌতূহল নিয়ে চোখ দুটো গোল গোল করে শুধালো,
"কেন আঙ্কেল? কাল সকালে আবার কী?"
হায়দার শেখ একবার মায়ামাখা চোখে বৃষ্টির দিকে তাকালেন৷ তারপর রূপার পানে চেয়ে ধীরকণ্ঠে জানালেন,
"কালই তো ওর এনগেজমেন্ট।"
কথাটা যেন হলরুমে বোমা ফাটালো। মুহূর্তেই সবার চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। রূপা তো রীতিমতো এক লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো,
"কীহহহ। সত্যি বলছেন?"
হায়দার শেখ আলতো করে মাথা নাড়ালেন। রূপা আর এক সেকেন্ডও দেরি করলো না। চঞ্চল গলায় বলে উঠলো,
"আঙ্কেল একদম নড়বেন না। আমি এক্ষুনি রেডি হয়ে আসছি।"
এক প্রকার ঘোষণা দিয়েই রূপা এক দৌড়ে ওপরের তলায় হাওয়া হয়ে গেল। কেউ কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না মেয়েটা এমন অনাহূতভাবে হুট করে কেন রেডি হতে গেল।ওদিকে এই খবরের ধাক্কায় আকাশের মুখটা থমথমে হয়ে উঠলো। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না। হনহন করে ওপরে উঠে নিজের রুমে ঢুকে ঠাসস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই রূপা একদম পরিপাটি হয়ে নিচে নেমে এলো। সবাই চরম অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো। বাঁধনও বাঁকা চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই একগুঁয়ে মেয়েটা যে আবার কী কাণ্ড ঘটাতে চলেছে তা সে মোটেই আঁচ করতে পারছে না।
সবাইকে এভাবে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে রূপা নাক উঁচিয়ে বললো,
"আরে, এমন হাঁ করে তাকানোর কী আছে? আমার কি পাঁচটা-দুটো বেষ্টি? একটাই তো মাত্র বেষ্টি! আর ওর এই বিশেষ দিনগুলোতে আমি ওদের বাড়িতে থাকবো না তো কাদের বাড়িতে গিয়ে থাকবো
বলেন তো?"
এবার সবার কাছে সমীকরণটা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। রূপা বৃষ্টিদের বাড়িতে গিয়ে উঠবে।বাঁধনের চোয়াল মুহূর্তেই শক্ত হয়ে এলো। চরম কড়া গলায় চেপে ধরা সুরে বলল,
"তার মানে তুই এখন বৃষ্টিদের বাড়িতে যাবি?"
রূপা বাঁধনের দিকে আড়চোখে একবার তাকালো। খুব রাগ হয়েছে লোকটার ওপর, ভীষণ গোসা হয়ে আছে মনে। ঠিক করেছে একটা কথাও বলবে না। যতক্ষণ না লোকটা নিজে এসে সেধে ‘সরি’ বলছে, ততক্ষণ একদম না। তাই বাঁধনকে একবিন্দু পাত্তা না দিয়ে ক্যান্ডিকে কোলজুড়ে তুলে নিলো। তারপর আহসান রহমানের দিকে তাকিয়ে একরাশ আকুতি নিয়ে বললো,
"আব্বু আমি কি যেতে পারবো না?"
আহসান রহমান আলতো হেসে প্রশ্রয়ের সুর বললেন,
"কে বলেছে তুমি যেতে পারবে না? তোমার প্রাণের বান্ধবীর বিয়ে, সেখানে তুমি যাবে না তো কে যাবে"
কথাটা শোনা মাত্রই রাগে-ক্ষোভে দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো বাঁধন,
"না। ও কোথাও যাবে না।"
বাঁধনের চোখরাঙানি দেখে রূপা আহসান রহমানের দিকে তাকিয়ে অভিমানে দু-গাল ফুলিয়ে নালিশ ঠুকলো,
"আব্বু...!"
আহসান রহমান বাঁধনের দিকে বুঝিয়ে দেখার চোখে তাকিয়ে বললেন,
"আহা বাঁধন৷ ওকে যেতে দে। বান্ধবীর বিয়ে, সেই হিসেবে দুদিন আগেই যাবে৷ এটাই তো স্বাভাবিক।"
আর কোনো কথা বলল না বাঁধন। রাগে রি-রি করে ভেতরে ফুঁসতে ফুঁসতে শক্ত মুখে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলো।হায়দার শেখ বাঁধনের থমথমে চেহারা দেখে সস্নেহে বললেন,
"রাগ করো না বাবা। বান্ধবীর বিয়েতে দুদিন আগেই তো সখীরা ছুটে যায় এটাই তো মেয়েদের নিয়ম।"
তাতেও নীরব বাঁধন। রাগের চোটে তার মুখ থেকে যেন বাকস্ফুরণ বন্ধ হয়ে গেছে।পাশে দাঁড়িয়ে জেইন আর ওমর ভীষণ কষ্টে নিজেদের হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। বেচারা বাঁধন৷ কত কাঠখড় পুড়িয়ে বউকে এতকাল পর কাছে পেলো, অথচ কাছে পেয়েও কাছে রাখা হলো না। বাঁধনের এই মর্মান্তিক করুণ বিয়োগব্যথায় ওদের ভেতরের হাসিটা আগ্নেয়গিরির মতো উথলে উঠছে যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে ফাটবে।
অবশেষে হায়দার শেখ বিদায় নিলেন। বৃষ্টি আর রূপাকে সাথে নিয়ে ধীরপায়ে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় রূপা একবারের জন্যও বাঁধনের দিকে ফিরেও তাকালো না। মুখ ঘুরিয়ে সোজা হেঁটে গেল।ওরা চোখের আড়াল হতেই বাঁধন ধপাস করে সোফায় গিয়ে বসলো। চেহারায় আস্ত একখানা অমাবস্যার কালো মেঘ৷ ঠিক তখনই জেইন আলতো করে বাঁধনের গা ঘেঁষে সোফায় বসলো। তারপর গালে হাত দিয়ে চরম নাটুকে সুরে গান ধরে দিল,
"কাঁন্দিস না, কাঁন্দিস না বাঁধন রে৷ ও বাঁধন রে-এ-এ!বউ গেছে বান্ধবী বাড়ি, তুই বসে বসে আঙুল চুষবি আর কাঁথা মুড়ি দিবি রে-এ-এ।"
ওমর এবার আর সামলাতে পারলো না। মুখ চেপে ধরে পেটে হাত দিয়ে হেসেই গড়িয়ে পড়লো সোফার ওপর।বাঁধন রাগী চোখে জেইনের দিকে তাকালো। বাঁধনের রাগী চাহনি দেখেও জেইনের খেয়াল নেই; সে তো তখন হাত-পা ছুড়ে পাগলের মতো হেসেই চলেছে। আর কোনো উপায় না দেখে বাঁধন এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফা ছেড়ে সোজা সেখান থেকে কেটে পড়লো। আর পেছনে পুরো বাড়িটা তাদের হাসির রুল্লোড়ে মাতিয়ে রাখলো বাকিরা।
---
রাতের নিঝুম প্রহর।নিজের রুমের শান্ত বেলকনিতে একলা দাঁড়িয়ে আছিল বৃষ্টি। হঠাৎ পেছন থেকে আস্ত একখানা তাণ্ডব চালিয়ে কেউ 'বউউউ' বলে বিকট চিৎকারে ডেকে উঠলো৷ বৃষ্টি আঁতকে উঠে পেছনে তাকাতেই দেখে রূপা। বেলকনির গ্রিলে বেশ জাঁকিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রূপা কৌতূহল মেশানো গলায় বললো,
"কী হয়েছে বল তো তোর? যখনই দেখি, তখনই এভাবে মুখটা চুন করে বিষণ্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকিস।"
বৃষ্টি ধীরেসুস্থে মাথা নেড়ে এড়িয়ে যাওয়ার ছলে বললো,
"কিছু না রে এমনি।"
রূপা ভ্রু উঁচিয়ে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো,
"কিছু লুকাচ্ছিস আমার কাছ থেকে?"
"সত্যি বলছি, কিছু লুকাচ্ছি না।"
"তাহলে এমন সারাক্ষণ মেঘলা মুখ করে আছিস কেন?"
"আসলে বাবাকে ছেড়ে এত দূরে চলে যেতে হবে তো, ভেবেই মনটা কেমন কেমন করছে।"
"ওহ, এই কথা। আরে এটা তো কোনো ব্যপারই না। বিয়ের পর জিজুকে বলে দিবি সোজা ঘরজামাই হয়ে চলে আসতে!"
বৃষ্টির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠলো,
"মজা করছিস?"
রূপা মুচকি হেসে চোখের ইশারায় বললো,
"বুঝতেই তো পারছিস!"
এর পর রাতের নির্জনতায় দুজন মিলে টুকটাক হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠলো।
---
ওদিকে রহমান বাড়িতে তখন চলছে আরেক এলাহী কাণ্ড!বাঁধনের দুই পা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছোট বাচ্চার মতো ফ্লোরে বসে আছে আকাশ।আবেগের তোড়ে তার একটাই ব্যাকুল আকুতি একটাই অনুনয়। যেকোনো উপায়ে বৃষ্টির এই বিয়েটা তাকে ভাঙতেই হবে৷ অন্য দিকে বাঁধনের নিজের বুকের ভেতরটাও তীব্র তুষের আগুনে পুড়ছে। সারাটা দিন কেটে গেল৷ অথচ একটা বারের জন্যও বউটার মিষ্টি মুখটা চোখের দেখা দেখতে পারলো না সে। একটা মিঠে কথা বলতে পারলো না অস্থির ব্যাকুলতায় তার মনটা থেকে থেকে ছটফট করে মরছে। আর এক মুহূর্তও যেন নিজেকে সামলে রাখার ক্ষমতা নেই তার।যেকোনো মূল্যে, যেকোনো উপায়ে রূপকে এখন তার লাগবেই লাগবে৷ তা না হলে এই বিরহযন্ত্রণায় সত্যি সত্যিই উন্মাদ হয়ে যাবে সে।
আকাশ বার বার আঁকড়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে বলে চললো,
"তোর পায়ে পড়ছি রে, এই বিয়েটা ভাঙ! আমি জানি, যে কোনো উপায়ে তুই পারবি এই বিয়েটা রুখে দিতে। একটু দয়া কর আমার ওপর! বিশ্বাস কর, ওই মেয়েটাকে আমি বড্ড ভালোবাসি... বাঁচবো না রে আমি তাকে ছাড়া।"যেকোনো মূল্যে আমার ওকেই চাই। প্লিজ ভাই, বোঝার চেষ্টা কর আমাকে।"
বাঁধন কিন্তু টু শব্দটিও করলো না। পাথরের মতো স্থির হয়ে গুম মেরে বসে রইলো।
আকাশ আবার কেঁদে উঠে ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,
"তুই প্লিজ বিয়েটা ভাঙ! এর বিনিময়ে তুই আমার কাছে যা চাইবি, আমি তা-ই দেবো। দরকার হলে সারা জীবন তোর গোলাম হয়ে কাটাবো, তবু তুই এই বিয়েটা হতে দিস না!"
কথাটা কানে পৌঁছাতেই বাঁধনের কঠিন ঠোঁটের কোণে হঠাৎ রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো। নিখাদ শীতল চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরকণ্ঠে বললো,
"সত্যি বলছিস? আমি যা চাইবো, তা-ই দিবি?"
বাঁধনের মুখ থেকে সাড়া পেয়ে আকাশ যেন এক মুহূর্তে নতুন প্রাণ ফিরে পেলো। ছলছল চোখে আশার আলো জ্বেলে তাকিয়ে বললো,
"হ্যাঁ বল। কী চাই তোর? তুই যা চাইবি তা-ই পাবি!"