নামাজ শেষে ধীর পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে যায় বাঁধন। বুকের ভেতর অস্থিরতা। মনে জুড়ে হাজারো দুশ্চিন্তা। কোনোমতে নিজেকে সামলে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। ভেতরে চোখ পড়তেই থমকে যায়। বিছানায় শুয়ে এখনো যন্ত্রণায় ছটফট করছে রূপা। তলপেট চেপে ধরে কাঁদছে অবিরাম।
দৃশ্যটা দেখেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে বাঁধনের। ভেতরে যাওয়ার সাহসটুকু যেন হারিয়ে ফেলে। কীভাবে যাবে? কীভাবে নিজের চোখের সামনে রূপাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখবে? ওর কান্না শুনলেই যে নিজের চোখের জল আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সেখানে কাছে গেলে হয়তো নিজেও হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে। নিজেকে সামলাতে পারবে না। সমস্ত শক্তি হারিয়ে অসহায়ের মতো ভেঙে পড়বে রূপার সামনেই।
না। এখন ভেতরে যাওয়া যাবে না।দ্রুত পায়ে সেখান থেকে সরে আসে বাঁধন। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে যায়। চারদিকে ঘন অন্ধকার। রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে চেপে বসেছে তার বুকে। ছাদের একপাশে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ে। হাঁটু দুটো ভাঁজ করে বুকের কাছে টেনে নেয়। তারপর আর কান্না আটকে রাখতে পারে না। মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
হঠাৎ মনে পড়ে যায় মায়ের কথা।শৈশবের স্মৃতিতে যতটুকু মনে আছে। সেও একদিন নিজের মাকে এভাবেই তলপেট চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাঁদতে দেখেছিল। মায়ের সেই অসহায় মুখখানি আজও কোথাও যেন মনের গভীরে রয়ে গেছে। সেদিন তার বাবা আহসান রহমান নামাজ পড়ছিলেন। ছোট্ট বাঁধন নিজের চোখে সবকিছু দেখেছিল। মায়ের কষ্ট। বাবার নামাজ। সেই সময়ের প্রতিটি দৃশ্য তার স্মৃতিতে অল্প অল্প করে জমে ছিল।
সেদিন সে বুঝতে পারেনি সেই দৃশ্যের গভীরতা। বুঝতে পারেনি মায়ের যন্ত্রণা দেখে বাবার বুকেও হয়তো ঝড় উঠেছিল। আজ বড় হয়ে নিজের জীবনে সেই একই দৃশ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাঁধন যেন নতুন করে সবকিছু অনুভব করছে।সেদিন তার মা যন্ত্রণায় কেঁদেছিলেন। আর আজ কাঁদছে তার স্ত্রী।সেদিন বাবা নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন। আর আজ বাঁধনও জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে হাত তুলেছে। নিজের সমস্ত আকুলতা দিয়ে প্রার্থনা করেছে। তবু রূপার কষ্ট কমাতে পারছে না সে। ভালোবাসার মানুষটাকে চোখের সামনে এভাবে ছটফট করতে দেখা যে কতটা অসহায় করে দেয়। তা আজ নিজের বুক দিয়েই বুঝতে পারছে।
হাঁটুর ওপর মাথা রেখে আবারও কেঁদে ওঠে বাঁধন। চোখের জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে আসে। মনে হয় নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে যদি রূপার কষ্টটুকু সরিয়ে নেওয়া যেত। তাহলে এক মুহূর্তও দেরি করত না সে।
ইশ। যদি জাদু জানত৷ যার সাহায্যে মুহূর্তেই রূপার সমস্ত যন্ত্রণা নিজের শরীরে টেনে নিতে পারত। তাহলে নিজের বুক চিরে হলেও সেই কষ্টটুকু গ্রহণ করত। রূপাকে একটুও কষ্ট পেতে দিত না। ওর চোখে জল আসার আগেই সমস্ত যন্ত্রণা নিজের ভেতর আটকে নিত। রূপা নিশ্চিন্তে ঘুমাত। মুখে ফুটে থাকত প্রশান্তির হাসি। আর বাঁধন নীরবে সব সহ্য করে যেত।
দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। বুকের ভেতর শুধু একটাই আকুতি। কীভাবে রূপার কষ্ট কমাবে? কী করলে ওর মুখে আবার হাসি ফিরবে?কিছুই তো করতে পারছে না সে। নিজের ভালোবাসার মানুষটার যন্ত্রণা নিজের শরীরে নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও তার নেই। এই অসহায়ত্বই যেন তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।
কাঁদতে কাঁদতে একসময় সেখানেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে বাঁধন। অশ্রুসিক্ত চোখের পাতা কখন যে নিদ্রার ভারে বুজে আসে। তা সে নিজেও টের পায় না।রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফোটার ক্ষণে বাঁধনের অনুভব হয়। তার বুকে কেউ একজন শুয়ে আছে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায় সে। নিজের বুকের দিকে দৃষ্টি পড়তেই ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তার বুকে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে রূপা। দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে তার গলা। ছোট্ট শিশুর মতো স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মেয়েটি।
ভ্রুযুগল কুঞ্চিত হয় বাঁধনের। মনে প্রশ্ন জাগে। মেয়েটা কখন ছাদে আসলো?পরক্ষণেই দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় রূপার মুখশ্রীতে। কী অপরূপ প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। মুখজুড়ে লেগে আছে গভীর নিশ্চিন্ততার কোমল আভা। নিজের বুকের ওপর হার্টওয়াইফকে এভাবে নির্ভার হয়ে ঘুমাতে দেখে বাঁধনের অন্তরে নেমে আসে পাহাড়সম প্রশান্তি। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা যেন মুহূর্তেই স্তিমিত হয়ে আসে। বুঝতে পারে। কাল রাতে হয়তো তাকে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে চলে আসে রূপা। তারপর এখানে তাকে পেয়ে আর কোথাও যায়নি। স্বামীর বুকে মাথা রেখে দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বাঁধনের অধরে ফুটে ওঠে স্নিগ্ধ হাসি। পরম মমতায় দুহাতে বউটাকে নিজের বুকের সঙ্গে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে নেয় ।তারপর ঝুঁকে পড়ে আলতো করে চুমু এঁকে দেয় তার কপালে। আপনমনে বিড়বিড় করে।
" আমার হার্টওয়াইফ। "
________
ইশতিয়াক আর সীমার দিনগুলো মোটামুটি ভালোই কাটছে। অন্তত ওপর থেকে দেখলে তাই মনে হয়। কিন্তু সীমার অবস্থা নাজেহাল। ইশতিয়াকের পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মেয়েটা। সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারছে। একটু শান্তিতে থাকার উপায় নেই।শেষমেশ বাবাকে ফোন করে আসতে বলেছে সীমা। এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও নয়। যতটা সম্ভব ইশতিয়াকের কাছ থেকে দূরে থাকবে।
সকাল সকাল তৈরি হয়ে নিচে নামে ইশতিয়াক। আজ তার চাকরির ইন্টারভিউ। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েই সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসে।নিচে নেমে থমকে যায়। তার মামা এসেছেন। সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন। পাশেই বসে আছে সীমা। ইশতিয়াককে দেখতেই বিলকিস বানু হাতের ইশারায় ডাকেন। মায়ের ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য নেই। সঙ্গে সঙ্গেই এগিয়ে এসে তাঁর সামনে দাঁড়ায়। বিলকিস বানু প্রশ্ন করেন।
" কোথায় যাচ্ছিস? "
ইশতিয়াক জবাব দেয়।
" একটু কাজ আছে। "
বিলকিস বানু গম্ভীর স্বরে বলেন।
" বস। কথা আছে। "
নীরবে সোফায় বসে পড়ে ইশতিয়াক। বিলকিস বানু সীমার প্রসঙ্গ টেনে বলেন।
" সীমা তোর সঙ্গে থাকতে চায় না। ও ডিভোর্স চায়?। "
কথাটা শুনে মুহূর্তেই থমকে যায় ইশতিয়াক। ধীর ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সীমার দিকে। মাথা অবনত করে বসে আছে মেয়েটা। ইশতিয়াক ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে শান্ত কণ্ঠে বলে।
" আমি কখন বলেছি যে ওকে ডিভোর্স দেব? "
বিলকিস বানু ছেলের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন।
" তুই ডিভোর্স দিবি না। বেশ। কিন্তু ও তোকে ডিভোর্স দেবে? "
" অসম্ভব। আমার দেহে প্রাণ থাকতে না ও আমাকে ডিভোর্স দিতে পারবে৷ আর না আমি ওকে ডিভোর্স দিব৷ বিয়ে যখন হয়েছে তখন আমার সঙ্গে ওকে সংসার করতেই হবে। আমাকে ভালো লাগুক কিংবা না লাগুক। আমার সঙ্গেই ওর সংসার করতে হবে। "
কথাটা কানে যেতেই ঝট করে মুখ তুলে তাকায় সীমা। ইশতিয়াকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে।
" থাকব না আমি আপনার সঙ্গে৷ আপনি একটা বেকার। কোনো কাজকর্ম করেন না। দিনরাত ঘুরে বেড়িয়ে বাবার হোটেলে খান। কী যোগ্যতা আছে আপনার? যে আপনার সঙ্গেই আমাকে সংসার করতে হবে? আর যা-ই হোক। এমন মাস্তান ছেলের সঙ্গে আমি কিছুতেই সংসার করব না৷ "
সীমার একের পর এক তির্যক বাক্যেও ইশতিয়াকের মুখের প্রশান্তি ম্লান হয় না। মেয়েটার অভিযোগে বিরক্ত হওয়ার বদলে তার চোখেমুখে আরও কোমলতা ছড়িয়ে পড়ে। শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে প্রশ্ন করে।
" যদি চাকরি করি? তাহলে কি আমার সঙ্গে থাকবে? "
মুখ বাঁকিয়ে সীমা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে।
" চাকরি করে তো দেখান? "
" ঠিক আছে। "
সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েই উঠে দাঁড়ায় ইশতিয়াক। সীমা এবারও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে বলে।
" আমি বাবার সঙ্গে চলে যাব। আমার আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না। আপনার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। "
ঘাড় সামান্য অবনত করে সীমার মুখের দিকে তাকায় ইশতিয়াক। গম্ভীর মুখাবয়বে বিরক্তি কিংবা অভিমানের কোনো ছাপ নেই। শান্ত কণ্ঠে বলে।
" যাও। তবে মনে রেখো। আমি চাকরি নিয়েই ফিরব। ততদিন নিজের খেয়াল রেখো। এমন কিছু করে বসো না। যার জন্য আমাকে জানোয়ার হয়ে উঠতে হয়। "
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না ইশতিয়াক। দীর্ঘ পদক্ষেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তার চলে যাওয়ার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকে ইসরাত। যেন ভাইয়ের এমন সিদ্ধান্ত এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। অবাক কণ্ঠে বলে।
" ভাইয়া কি সত্যিই চাকরি করবে? নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি? "
সীমা ঠোঁট বাঁকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলে।
" হুদাই। মুখের কথার তো অভাব নেই। চাকরি পাওয়া কি এতই সহজ? "
ইসরাত বোনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে।
" এমন করছিস কেন? পেতেও তো পারে। "
সীমা নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দেয়।
" দেখা যাবে। "
____________
দুপুরের খরতপ্ত রোদে চাকরির ইন্টারভিউ শেষে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে ইশতিয়াক। ইন্টারভিউ মোটামুটি ভালোই হয়েছে। তবে ফলাফল জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামীকাল পর্যন্ত। প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণায় বুকের ছাতি শুকিয়ে আসছে তার। পাশের দোকান থেকে এক বোতল ঠান্ডা পানি কিনে ঢকঢক করে পান করতে থাকে।
পানির বোতলটা ঠোঁটে ঠেকানো অবস্থাতেই হঠাৎ দৃষ্টি আটকে যায় রাস্তার দিকে। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে বছর চারেকের ছোট্ট একটি মেয়ে। পরম নিশ্চিন্তে আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত সে। তার পেছনেই দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে বিশাল এক বাস। চালক একের পর এক সজোরে হর্ন বাজিয়ে চলেছে। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই শিশুটির। নিজের ছোট্ট জগতে মগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে সে।
দৃশ্যটা চোখে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় ইশতিয়াক। হাত থেকে পানির বোতলটা ছিটকে পড়ে যায় মাটিতে। পরক্ষণেই আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে প্রাণপণে ছুটে যায় । ছুটে গিয়ে শিশুটিকে টেনে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগটুকুও পায় না। এক ঝটকায় তাকে তুলে রাস্তার ওপাশে ছুড়ে মারে।
কিন্তু শিশুটিকে বিপদমুক্ত করতে গিয়ে নিজের জীবনের কথাটুকু ভাবার অবকাশ পায় না ইশতিয়াক। নিজেকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়ার আগেই মুহূর্তের মধ্যে তার ওপর দিয়ে চলে যায় বাসটা।নিমিষেই রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে রাজপথ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। পথচারীরা ছুটে আসে দুর্ঘটনাস্থলে। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে জমে যায় মানুষের ভিড়। আর রাস্তার বুকে নিথর হয়ে পড়ে থাকে ইশতিয়াক।
55
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে 55 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান