ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিশিগন্ধা

১ম পর্ব

লেখক: ঈশিতা ইশা
আরশ ভাই আমাকে পছন্দ করেন ঘূনাক্ষরেও কখনো টের পাইনি। আর জানবোই বা কীভাবে!  তার সাথে আমার দেখা হয় বছরে গুণে গুণে দু'বার। তাও আমি যখন তার নানুবাড়িতে বেড়াতে যাই। তার নানুবাড়ি বলছি কারণ আরশ ভাইয়ের নানু আমার নানুর আপন বড় বোন। তো সেই সূত্রে তিনি আমার খালাতো নানুর বড় মেয়ের ঘরের ছেলে। সোজা করে বললে- তিনি আমার খালাতো নানুর ঘরের খালাতো ভাই।
আমি চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে। লাফালাফি করে পুরো বাড়ি দাপিয়ে বেড়ানো আমার কাজ। মা সবসময় বলে, আমাকে বিয়ে দিলে সাথে করে দু'জন কাজের লোক দিতে হবে শুধু আমার দেখাশোনা করার জন্য। সেখানে আমার সম্পূর্ণ বিপরীত সত্ত্বার মানুষটা আমাকে পছন্দ করবে এটা নিতান্তই বিস্ময়কর। কল্পনাতেও এমনটা ভাবতে পারে না কেউ।
বড় হওয়ার পর থেকে আরশ ভাই চঞ্চল না হলেও প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কথা বলেন না সে। আমার এখনো মনে আছে প্রথমবার তার সাথে যখন দেখা হয়েছিলো আমি তখন ক্লাস টু তে পড়ি। মা আমাকে পুতুল দিয়ে বলেছিলেন চুপচাপ খেলতে, দুষ্টুমি না করতে। লক্ষী মেয়ের মতো আমিও তা-ই করছিলাম। হুট করেই কেউ একজন ঝুটি ধরে টান দেয়। কাঁদতে কাঁদতে সেদিন প্রথম মানুষটাকে দেখি। আমাকে কাঁদানো মানুষটা ছিলেন আরশ ভাই। আমায় কাঁদিয়ে তিনি দাঁতের পাটি বের করে হাসছিলেন।  তার মুক্তার মতো চকচক করা দাঁত গুলো দেখে খুব রাগ হয়েছিলো। মন চেয়েছিলো ঘুষি মেরে ভেঙে দেই। সেই মনোবাসনা পূর্ণ করা কখনো সম্ভব হয়নি। 
গুণে গুণে আমার চেয়ে সাত বছরের বড় সে। বয়সের এ বিস্তার ফারাকের ফয়দা লুটতেন তিনি। যখনই আমি তার নানু বাড়িতে যেতাম সে কীভাবে জানি টের পেয়ে হাজির হতেন। আর সুযোগ পেলেই আমার ঝুটি টেনে আমায় কাঁদাতেন। সে-সব বহু আগের কথা। ধীরে ধীরে আমরা বড় হতে লাগলাম আর তিনিও কেমন অন্যরকম হয়ে গেলেন। আগের মতো আমায় দেখলে ভেঙাতেন না, আর না আমার ঝুটি ধরে টানতেন। কেমন একটা দূরত্ব বজায় রাখতেন। 
সেধে কথা বলা তো দূর কি বাত, আমার দিকে ফিরেও তাকাতেন না। আমিও অবশ্য সরাসরি কখনো সেভাবে কথা বলার চেষ্টা করিনি। করেছি, তবে সেটা অন্য পন্থায়।
ভাবনার মাঝে নিশির ফোন বাজতে শুরু করে। বিরক্ত হয় কিঞ্চিত। ফোন হাতে নিতেই দেখে রিয়ানের কল। ভ্রু কুঁচকে কলটা কেটে দেয়। এরপর আবারো ফোন বাজতে শুরু করলে রিসিভ করে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে,
'কি সমস্যা? বিরক্ত কেনো করছো?'
রিয়ান জবাব দেয়,
'তুমি কি আমাকে ইগনোর করছো নিশি?'
'হ্যা করছি তো?'
'কেনো নিশি?'
'কেনো মানে? তুমি আমার কে হও যে তোমার প্রশ্নের উত্তর দিবো?'
'আমি তোমাকে ভালোবাসি নিশি।'
'এক্সকিউজ মি। যখন আমার সাথে সম্পর্কে থাকাকালীন আরেক মেয়ের সাথে ইটিশপিটিশ করছিলা তখন মনে ছিলো না? তখন কই ছিলো এই ভালোবাসা? আমি এখন আর তোমাকে ভালোবাসি না। শোনো রিয়ান আমাকে আর বিরক্ত করবা না। বিরক্ত করলে তোমার নামে বাসায় নালিশ করবো।'
কথাগুলো বলেই রিয়ানের মুখের উপর কল কেটে দেয় সে। 
ফোনটা পাশে রাখতেই 'টুং' করে মেসেজ আসার শব্দ হয়। না তাকিয়েও সে বুঝতে পারে কার মেসেজ এসেছে। নির্ঘাত আরশ ভাই!
একটা মেসেজ আসার দু মিনিটের মাথায় আরেকটা মেসেজ আসে। 
বাধ্য হয়ে ফোনটা তুলে নেয় নিশি। মেসেজ ওপেন করতেই শ্বাস ফেলে।
'তোর মাথা ব্যথা কমেছে? আমি স্টিল অনেক বিজি। কল ব্যাক করবো, পারছি না। আর আধাঘন্টা সময় দে কল দিচ্ছি।'
এর পরবর্তী মেসেজ-
'ফোন সাইলেন্ট রাখিস না। মনে হচ্ছে মিনিট দশের মধ্যেই কল দিতে পারবো।'
মেসেজ দু'টো পড়ে নিশির গা জ্বলে যায়। মনে হচ্ছে সে কথা বলার জন্য মরে যাচ্ছে। মেসেজ গুলো কেউ পড়লে ভাববে সে আরশের সাথে কথা বলতে ব্যাকুল অথচ দৃশ্যপট ভিন্ন। অবশ্য এই সুযোগ সে-ই দিয়েছিলো। সেদিন সে যদি অমন একটা অদ্ভুত, অপ্রত্যাশিত, মাথাহীন কাজ না করতো, তাহলে আজ এই মুসিবত আসতোই না। কি দরকার ছিলো আগ বাড়িয়ে আরশকে নিজের জীবনে ডেকে আনার! 
দুজনের মধ্যে বেশ তো দূরত্ব ছিলো। দূরত্ব ডেকে এনেছিলো আরশ আর সে পাকনামি করে দূরত্ব মিটিয়েছে।
.
এসএসসি পরীক্ষা চলছিলো তখন।
ভীষণ ব্যস্ত সময় চলছে। কিন্তু পরীক্ষার চাপের মাঝেও নিশির মাথায় চলতো অন্যরকম দুষ্টু বুদ্ধি। এক মিনিট স্থির থাকার মতো মেয়ে না সে। সেখানে এসএসসি পরীক্ষার সময় মা সবসময় ধমকে পড়তে বসান। বাবাও মায়ের ভয়ে তাকে সবসময় পড়তে বলেন। মায়ের ডালঘুটনির বাড়ি খাওয়ার ভয়ে ঠিকঠাক পড়তে বসতো।
রাত তখন প্রায় দেড়টা। ফিজিক্স পড়া শেষ করে সে বিছানায় এলিয়ে দিয়েছিল। মাথা ভার হয়ে ছিলো, কিন্তু ঘুম আসছিলো না।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে ফেসবুকে ঢুকলো।নিউজফিড স্ক্রোল করছিলো খুবই আনমনে।
হঠাৎ একটা আইডি চোখে পড়ে। নাম- মাহবিল আল আরশ।
প্রোফাইল পিকচারে আধো আলো-আঁধারি ছবি দেওয়া। নিশির ভুরু কুঁচকে যায়, 'উনি কি আরশ ভাই?'
কৌতুহল হয়ে ক্লিক করে প্রোফাইলে ঢোকে। তেমন কিছু নেই, দু-একটা বইয়ের ছবি, সূর্যাস্তের ছবি।
স্ক্রোল করতে করতে একটা ছেলের ছবিতে চোখ আটকায়। ভালো করে ছবিটা দেখে সে। হ্যাঁ, লোকটাকে সে চেনে। এই অহংকারী লোকটা ওর খালাতো নানুর ঘরের খালাতো ভাই!
বাসায় গেলে পরিবারের সবাই যখন আরশ ভাইকে ঘিরে নানা গল্পে মেতে ওঠে, নিশি তখন ওর থেকে দূরেই থাকে। আরশ ভাইও খুব একটা পাত্তা দেয় না তাকে।
বড় হওয়ার পর লোকটা এমন ভাবে তাকে এড়িয়ে যায় মনে হয় সে কোনো পেত্নী। 'হাই' 'হ্যালো' অবধি করে না।
কখনো সখনো চোখাচোখি হলে স্রেফ গম্ভীর চেহারা করে পাশ কাটিয়ে যায়। নিশিও মনে মনে ঠিক করেছিলো সামনাসামনি কখনোই নিজ থেকে সেধে এই অহংকার করা লোকের সাথে কথা বলবে না।
আইডিটা দেখে সেদিন নিশির মাথায় দুষ্টু একটা বুদ্ধি চাপলো।
'উনি আমার ফেসবুক আইডির নাম জানেন না। ছবিও তো নেই। মজা করে দেখি কী করেন!'
তৎক্ষণাৎ ফেক আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। মেসেজ অপশনে গিয়ে লেখে-
'হাই হ্যান্ডসাম।' 
সাথে একটা চোখ মারা ইমুজি দিয়ে দেয়।
মেসেজ পাঠিয়ে মিটমিট করে হাসে।
বিরবির করে বলে,
'কী ভাবেন নিজেকে? দেখি আপনি আসলে অমন নাকি শুধুই ভালো সাজার ভান ধরেন।'
সে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে সে। পরের দিন পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যায়। বিকেলে নেট অন করে ছুটে যায় ইনবক্সে।
নাহ্! রিপ্লাই আসেনি। আরশ ভাই পাত্তাই দেয়নি তার ফেক আইডিকে। নিরাশ না হয়ে নিশি মিশনে নেমে যায়। লাগাতার মেসেজ পাঠায়।
পরের দুদিন ধরে মেসেজ পাঠায়-
'হ্যালো।'
'অনলাইন বাট ইগনোরিং?'
'হেই, ডোন্ট বি সো রুড!'
'রিপ্লাই করলে গফ রাগ করবে?'
'সবাইকে অহংকার মানায় না বাট ইট সুট'স ইউ আরু।'
তবুও সাড়া নেই। পরপর তিনদিন মেসেজ দিয়ে পাত্তা না পেয়ে চতুর্থ দিন, হাল ছেড়ে দিয়ে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো পাশের বালিশে।
ঠিক তখনই একটা মেসেজ আসে।
ফোন হাতে নিতেই দেখে আরশ ভাই রিপ্লাই করেছে।
'হু ইজ দিস?'
বিজয়ীর হাসি দিয়ে নিশি খাটের উপর লাফালাফি করেছিলো। মা অবশ্য চেঁচিয়ে বারণ করেন কয়েকবার। খাট থেকে নেমে রিপ্লাই করে,
'দিস ইজ রাণী ভিক্টোরিয়া। ক্যান উই টক?'
রিপ্লাই আসে,
'এবাউট হোয়াট?'
নিশি উত্তেজনা দমিয়ে টাইপ করে,
'এবাউট ইউ। আই ওয়ানা নো ইউ মিস্টার।'
এরপর শুরু হয় পরিচয় লুকিয়ে চ্যাটিং। সে ভেবেছিলো কিছুদিন মজা করবে পরিচয় লুকিয়ে।
কিন্তু সমস্যা হলো দশটা মেসেজ পাঠালে, একটা উত্তর আসে। তবুও হাল ছাড়েনি সে। ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট একসেপ্ট না করে আরশ তার একটা দুইটা মেসেজের রিপ্লাই করতো। মাঝে বিরক্ত হলেও হাল ছাড়েনি নিশি।
এসএসসি পরীক্ষা শেষ হতে হতে নিশি অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো আরশকে মেসেজ করাতে। 
নিজেকে অনেক চালাক মনে করলেও এ সত্য অবশ্য বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারেনি সে। পরীক্ষা শেষ এ নানু বাড়ি বেড়াতে যায়। সেখান থেকে নানুর বোনের বাড়িতে মানে আরশের নানুর বাড়িতে যায়। 
নানুর বোনের বাড়িতে তারা চারজন সদস্য। নানু, নানা, মামা আর কাজের মেয়েটা। নিশি বেড়াতে যাওয়াতে তারা বেশ খুশি হয়। ঢাকার মধ্যে পাঁচতলা বিল্ডিং এর তিনতলায় ভাড়া থাকেন নিশির খালাতো নানু। এ ফ্ল্যাটের সুন্দর দিকটা হচ্ছে বারান্দা। মস্ত বড় বড় দু'টো বারান্দা আছে। এছাড়া ফ্ল্যাটের দরজার বাহিরের সামনের এবং পাশের দিকের অংশ জুড়ে অনেকটা খালি জায়গা রয়েছে। খালাতো নানু সেখানে গাছ লাগিয়েছেন অনেকগুলো।
একদিন বিকেল বেলা বারান্দায় গুনগুন করে গান গাইছিলো সে আর গাছে পানি ঢালছিল।
'আমি আমার হোল লাইফে কাউকে এমন ভয়ংকর গলায় গাইতে শুনিনি।  মনে হলো গাছগুলোও কান বন্ধ করে ফেলেছে।'
কথাটা কানে আসতেই নিশি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চমকে ওঠে। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরশ।
নিশি হালকা কেশে বলে,
'মোটেও না। আমি এতো খারাপও গাই না।'
আরশ দু হাত ভাজ করে বলে,
'একটু আগে একটা পাখি উড়ছিলো, তোর গানের আওয়াজে এখন বারান্দার রেলিংয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।'
নিশি দু’চোখ কুঁচকে তাকায়। মুখের গাল ফুলে যায় রাগে।
'আপনার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।'
বলে পানি দেওয়ার মগটা নামিয়ে রাখে।
তারপর ফিসফিস করে,
'পাখিটা রেলিংয়ে পড়ে না গিয়ে আপনার ওপর পড়লে ভালো হতো।'
আরশ ভ্রু তুলে বলে,
'কি বললি?'
'কিছু না।'
বলে হুট করে পানি ঢালতে গিয়ে নিজের পায়ে পানি ফেলে নিশি।
লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায়। সেখান থেকে পালানোর জন্য সরতে নেয়।
আরশ হেয়ালি না করে জিজ্ঞেস করে,
'তোর নাম আলিজা না?'
সে মাথা নাড়ায়। নানু বাড়ির সকলে তাকে এ নামেই ডাকে। আর দাদু বাড়ির সকলে ডাকে নিশি। কিন্তু আরশ এমন ভাবে প্রশ্নটা করলো মনে হচ্ছে সে তার নাম আজ প্রথম শুনেছে!
আরশ হাত বাড়িয়ে কিছু একটা এগিয়ে দেয়। নিশি তাকিয়ে দেখে তার ফোন।
আরশ বলে,
'ফোনটা টেবিলেই ছিলো।
আমি যখনই নিশিগন্ধা আইডির রিপ্লাই দিচ্ছিলাম, তখনই এই ফোনে নোটিফিকেশন আসছিলো। হাতে নিয়ে দেখি ফোন লকড, কিন্তু স্ক্রিনে "Arosh sent you a message" এই লেখাটা ভাসছিল।'
জিজ্ঞেস করতেই কাজের মেয়ে জানালো- এটা তোর ফোন।'
নিশি লজ্জায় একদম পাথর হয়ে যায়। চোখ নামিয়ে চুপচাপ ফোনটা নেয়। মনে হচ্ছিলো, এখনই মাটি ফেটে গেলে সে সেখানেই ঢুকে যায়।
আরশ একটু থেমে বলে,
'নেক্সট থেকে ফোন সাইলেন্ট মোডে রেখবি তাহলে ধরা পরার চান্স থাকবে না।
আর হ্যাঁ, আলিজা নামের চেয়ে নিশিগন্ধা নামটা সুন্দর।'
বলেই সে চলে যায়।
পিছন থেকে তাকিয়ে নিশি বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। এই ঘটনার পর থেকে তার আর সাহস হয়নি আরশের সাথে দুষ্টুমি করার। তবে তাদের মধ্যে টুকটাক যোগাযোগ হতো। 
.
সকালবেলা মায়ের বকুনিকে ঘুম ভাঙে নিশির। চোখ কচলে তাকায়।
'কয়টা বাজে দেখছিস? শুক্রবার বলে কী সারাদিন ঘুমাবি? ওঠ ফ্রেশ হয়ে আয়, নাশতা রেডি।'
চোখ মেলে নিশি দেখে ঘর আধা-অন্ধকার। মা পর্দা সরাতেই আলো এসে ঘরটাকে রাঙিয়ে দেয়।
নিশি হালকা গলায় হাই তুলে পাশ ফিরে বিছানায় গড়ায়, কিন্তু মা ততক্ষণে রুম থেকে বেরিয়ে গেছেন।
বিছানায় বসে পায়ের কাছে তাকিয়ে দেখে, পাশের সিঙ্গেল খাটে ছোট বোন নেই। মানে সে তো অনেক আগেই উঠে গেছে!
নিশি হালকা বিরক্তিতে ফোনটা হাতে নেয়। চোখ কচলে স্ক্রিনে তাকিয়ে যা দেখে তাতে তার ঘুম পুরোপুরি উবে যায়।
৩২টা মিসড কল। নিচে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা- আরশ ভাই, ৩২ মিসড কল। পঞ্চান্নটি মেসেজ।
চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা।
'বাপরে! এতো কল! আমি তো ফোনটা সাইলেন্টে রেখে ঘুম দিয়েছিলাম!'
পেটের মধ্যে কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। নাহ, কোনো জরুরি কিছু না হলে আরশ ভাই এতবার ফোন করতেন না।
তবে.. এই প্রথম না, আগেও তো এমন করেছে। মাঝে মাঝে এমন সময় কল দেয়, যখন জানে নিশি রিসিভ করতে পারবে না। তারপর মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করবে, 'তুই কল রিসিভ করিস না কেন?'
নিশির হঠাৎ মনে পড়ে যায় গতকালের ঘটনা। প্রথমে আরশ ভাইয়ের ব্যবহার তার কাছে স্বাভাবিক লাগত। কিন্তু তার বেস্ট ফ্রেন্ড রিমি এমন কিছু কথা বলেছিলো যা শুনে তার মনে হয় আরশ ভাই তাকে পছন্দ করেন।
রিমি বলেছিলো,
'দেখ, ছেলেরা যাকে পছন্দ করে দিনরাত তার খবর রাখে। কল দেয়, মেসেজ দেয়। খেয়াল রাখে।'
তখন নিশি আঁড়চোখে তাকিয়ে বলেছিলো,
'তুই আবার কবে থেকে লাভ গুরুর ভূমিকায়?'
রিমিও তখন ভেংচি কেটে জবাব দেয়,
'তোর সাথে যখন এমন হবে মিলিয়ে নিস।'
তারপর থেকে রিমির কথাগুলো এক এক করে মাথার ভেতর বাজছে।
মাথা নাড়িয়ে সে এসব কথা উড়িয়ে দিতে চায়। এসব নিয়ে আর ভাববে না বলে পণ করে। ফোনটা বিছানায় ফেলে চলে যায় মুখ ধুতে। ভুলে যায় ফোনের ওপাশে থাকা মানুষটাকে কল করে জানাতে।
ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে নিয়ে এসে চেয়ার টেনে টেবিলে বসে।
ডাইনিং টেবিলে ছোটবোন নিতি আগে থেকেই বসে। মুখভর্তি রুটি। 
নিশির দিকে তাকিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল,
'কিরে ঘুম ভাঙলো?'
নিশি হাত উঁচিয়ে বলে,
'মারবো এক চড়। খা চুপচাপ। তোকে না কতবার বলেছি তুই করে বলবনি না? আমি তো কত বড় জানিস?'
নিতি জিহ্বা দেখিয়ে বলে,
'বেশ করেছি৷ তোকে তুই বলবো।'
নিশি মারতে নেয় অমন সময় সুরাইয়া বেগম রান্নাঘর হতে বের হন। থেমে যায় সে। আজিজুল খান পত্রিকা পড়ছেন। মেয়েরা কি করছে তাতে তার খেয়াল নেই।
সুরাইয়া কাপে চা ঢালতে ঢালতে নিশির উদ্দেশ্যে বলেন,
'তোর ঘুম ভাঙাতে একটা হর্ন লাগবে রে, আমি আর পারি না।'
নিশি গলা নামিয়ে বলল,
'আজ একটু বেশি ঘুম হয়ে গেছে। কাল রাতে মাথা ব্যথা করছিলো।'
বাবা তখন পেপার পড়তে পড়তে বলে উঠলেন,
'সে কি! পড়াশোনার খুব চাপ মনে হচ্ছে?'
মুখে রুটি পুড়ে নিশি জবাব দেয়,
'হ্যা অমনি।'
সুরাইয়া বলে,
'ও পড়ে নাকি? সামনে এইচএসসি পরীক্ষা সেই কথা মাথায় আছে? আর দু-মাস বাকি পরীক্ষার।  মহারানী কুম্ভকর্ণের ন্যায় পড়ে পড়ে ঘুমায়। এক দন্ড বই নিয়ে বসে না।'
আজিজুল খান চোখ তুলে বলে,
'কি ব্যপার নিশি কি শুনছি এসব? এবার রেজাল্ট খারাপ হলে আমি কিন্তু তোমার মায়ের মার থেকে বাঁচাতে পারবো না।'
নিশি বলে,
'হ্যা খেয়েই পড়তে বসবো।'
.
ঘরের জানালার পর্দা অর্ধেক খোলা, সূর্যের হালকা আলো ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। ফ্যান ঘুরছে মাঝারি গতিতে। নিশি পড়ার টেবিলের সামনে বসে মন দিয়ে পড়ছে। 
চারপাশে প্রায় নিস্তব্ধতা। টেবিলের উপর একটা নীল রঙের পানির বোতল, আর পাশে ফোনটা রাখা।
ঠিক তখনই- 'টিং টং' কলিং বেলের আওয়াজ হয়
'নিশি..দরজাটা একবার খুলে দে তো মা।'
সুরাইয়া বেগম রান্নাঘর থেকে বলে ওঠেন।
নিশি বিরক্তি নিয়ে বলে,
'মা, আমি তো পড়ছি। নিতিকে বলো না?'
'ও গোসলে। তুই দে না খুলে। তোর বাবা আসার সময় হয়েছে।'
সুরাইয়ার চেঁচিয়ে বলে।
নিশি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
'একটু পড়তে বসেছি তার মাঝে বারবার উঠতে হচ্ছে। নিতিও হয়েছে এক পাঁজি। সেই কখন গোসলে ঢুকেছে, এখনো বের হয়নি!'
এই বলে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়।
ঘড়ির দিকে একবার তাকায়। সময় দুপুর ২বেজে ৩মিনিট।
বাবা হয়তো এখন ফিরেছেন। ঘরে অদ্ভুত রকম এক ধরনের শান্ত-গরম ভাব।
নিশি ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজার ক্লোজার খুলে নিচে তাকিয়ে লক ঘুরিয়ে খুলে ফেলে। ধীরে ধীরে দরজা টেনে বাইরে তাকাতেই...চক্ষু জোড়া বড় বড় হয়ে যায়।
সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আরশ। নিশির বিশ্বাসই হচ্ছে না!
ধবধবে সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরনে। পরিপাটি চুল, হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে রোদের মধ্যে হেঁটে এসেছে। চোখাচোখি হতেই নিশির ছোট্ট আত্মা খানা মনে হচ্ছে এক্ষুনি বেরিয়ে যাবে। ভেতর থেকে সত্ত্বা বলে ওঠে,
'এবার তোর কি হবেরে নিশি!'
...
(চলবে..?)
#নিশিগন্ধা
#পর্ব_|০১|
#ঈশিতা_ইশা

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন