#নিশিগন্ধা
#পর্ব_|০৪|
#ঈশিতা_ইশা
...
নিশির এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত রবিবার থেকে। দুটো পরীক্ষা এরই মধ্যে শেষ। আজ ছিলো গণিত।
হাঁটতে হাঁটতে বাসার গেট পার হয় সে। সদর দরজার কলিংবেল চাপে। দু'বার কলিংবেল চাপার পর নিতি দরজা খুলে দেয়।
ঘরে ঢুকে ফাইলটা সোফার উপরে রেখে সোজা ফ্রিজের দিকে যায়। ঠান্ডা পানির বোতল খুলে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দেয় কয়েক ঢোঁক। পানিটা গলা দিয়ে নামার সাথে সাথে একটু প্রশান্তি নামে চোখে মুখে।
ঠিক তখনই শোনা যায় মায়ের হাসির শব্দ। মা ফোনে কথা বলতে বলতে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে। নিশি পানির বোতলটা ফ্রিজেই রেখে দেয়।
বসার ঘরের দিকে চোখ পড়ে। নিতি টিভি খুলে বসে আছে, চিপস খেতে খেতে কার্টুন দেখছে। নিশি চোখ সরিয়ে নেয়।
নিজের ঘরে গিয়ে কলেজ ড্রেস না পাল্টেই বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে গা এলিয়ে দেয়। শরীর বড্ড ক্লান্ত। চোখ বুজে ফেলতেই মা দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে। মুখে ঝলমলে হাসি।
'নিশিরে একটা খবর আছে।'
নিশি চোখ খুলে মাকে দেখে।
'কি হয়েছে মা?'
'তোর মামার বিয়ে ঠিক হইছে।'
নিশি কপাল কুঁচকে তাকায়।
'ছোট মামার?'
সুরাইয়া হেসে ফেলে,
'আরে না রে, সাইফুলের। আরশের মামা।'
আরশের নাম শুনতেই নিশির কপাল ভাঁজ হয়ে যায়। মুখটা কঠিন হয়ে ওঠে। বালিশে মুখ গুঁজে ফেলতে ইচ্ছে করে।
মা তখনও বলে চলে,
'সামনের মাসে বিয়ের ডেট হবে মনে হয়। কালকে মেয়েপক্ষ দেখতে আসছিলো, পছন্দও হয়েছে। দুইপক্ষই খুব খুশি।'
নিশি বিছানা ছেড়ে উঠে। কোনো প্রতিক্রিয়া দেয় না।
মা তখনও বলে চলেছেন,
'তোর নানু জানালো, ওনারা গত সপ্তাহে মেয়ে দেখতে গিয়েছিলো। সব পছন্দ হয়। তারপর মেয়েপক্ষকে এসব জানাতেই তারাও বলে তারা এসে দেখতে চায়। তারপর আর কি মেয়েপক্ষ দেখতে আসে..'
বারান্দা থেকে তোয়ালে নিয়ে নিশি ঢুকে যায় বাথরুমে। মায়ের বাকিটা কথাও শোনে না। দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
শাওয়ার ছেড়ে দেয় সে। পানি পড়তে থাকে মাথার উপর দিয়ে।
মাথার ভেতর শুধু একটা শব্দ ঘুরপাক খায়
'আরশ..'
একবার ভেবেছিলো, হয়তো কষ্ট পাবে এই নাম শুনে। কিন্তু এখন যা হচ্ছে, সেটা কষ্ট না একধরনের বিরক্তি। জেদ। গা জ্বালানো রাগ।
.
পরীক্ষা শেষ হয়েছে এক সপ্তাহ হলো।
ভর দুপুরবেলা। ঘরের ভেতরে একটানা ডোরেমনের সিনেমা চলছে টিভিতে।
নিশি আর নিতি দু’জনেই বসে আছে সোফায়।
নিশির হাতে রিমোট, আর নিতির মুখে চিপস।
সুরাইয়া ঘুমাচ্ছে। দুপুরের খাবার খেয়ে একদমই নড়েনি।
হঠাৎ ঘরের নিস্তব্ধতায় ফোনের রিং বেজে ওঠে।
টি-টেবিলের ওপরে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করতে করতে খানিকটা কেঁপে ওঠে।
নিশি এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, 'বড় খালা।'
'নিতি, মাকে ডেকে দে তো।'
নিতি চিপস মুখে দিয়েই মাথা নাড়ে,
'আমি যাব না। সিনেমার সেরা সিন চলছে এখন।'
নিশি ফোনটা হাতে নিয়ে নিজেই হাঁটতে শুরু করে। ঘুমের ঘোরে থাকা সুরাইয়ার ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকে বলে,
'মা, বড় নানুর ফোন। ধরো।'
সুরাইয়া চোখ কচলাতে কচলাতে ফোন হাতে নেয়। নিশি আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ফিরে এসে আবার বসে টিভির সামনে। সিনেমার ট্র্যাক পাল্টে গেছে।
নিতি চোখ গড়িয়ে বলে,
'তুই আসতে দেরি করলি, দেখ মিস করে গেলি।'
মিনিট পাঁচেকের মাথায় সুরাইয়া বসার ঘরে এসে দাঁড়ায়।
'নিশি, নিতি তাড়াতাড়ি তৈরি হ।'
নিশি অবাক হয়ে তাকায়,
'কেনো মা? কি হয়েছে?'
'তোর বড় নানু বাথরুমে পা পিছলে পড়ে গেছে। পায়ে ব্যথা পেয়েছে খুব।'
নিশির মুখ থমকে যায়।
.
বড় নানুর বাসায় যেন একধরনের নিস্তব্ধতা। নিশি আর নিতি বসার ঘরে পাশাপাশি বসে আছে। সামনে থাকা টিভিটা বন্ধ। নিতি মায়ের ফোনে কার্টুন দেখছে। নিশি গালে হাত দিয়ে বসা।
মা ঢুকেই নানুর ঘরে চলে গেছে। সেখানে আরও আছেন বড় নানুর দুই মেয়ে তাই তো নিশিকে মা বলেছেন এখানে চুপচাপ বসতে। মামা নিজের রুমে। নানাভাই বাসায় নেই।
নানুর পা মচকে গেছে। কোমড়েও ব্যথা পেয়েছেন। ডাক্তার বলে গেছে বেড রেস্ট এ থাকতে। নিশির চোখ মাঝে মাঝে ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়ায়। মন ঠিকমতো বসে না কোথাও।
কলিং বেল বেজে ওঠে। রান্নাঘরে কাজের মেয়েটা ব্যস্ত। নিতির দিকে তাকিয়ে নিশি বিরক্ত হয়। নিজেই উঠে যায় দরজা খুলতে।
দরজা খুলতেই চোখ দু’টো খানিক বড় হয়ে যায় তার। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক হাস্যোজ্জ্বল মুখ।
'নিশি! কেমন আছো?'
নিশিও হাসে,
'নিশা আপু! আমি ভালো। তুমি কেমন আছো?'
নিশা সামনে এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে।
'আমি একদম ঠিকঠাক। কতদিন পর তোমার সাথে দেখা।'
'হ্যা, বছর খানেক পর।'
নিশা ওর হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। তারা দু’জন গল্প করতে করতে নানুর ঘরের দিকে এগোয়।
নিশা আরশের মেজ খালার মেয়ে। দু'জনের বয়সের পার্থক্য কয়েক মাসের। ছোটবেলা থেকে একত্রে বড় হয়েছে দু'জনে। নিশির সাথে তার খুব ভাব৷ নিশি এলে নিশা সময় করে চলে আসে দেখা করতে। মাঝে মাঝে দিন দুয়েক তাকে সঙ্গ দিতে থেকে যায়। নিশার মা নিশির মাকে বিশেষ পছন্দ করেন না৷ কিন্তু তার মেয়ে আবার সুরাইয়ার মেয়েকে ভীষণ পছন্দ করে।
দুই জনের নামে একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একজনের নামে ‘ই’, অন্যজনের নামে ‘আ’। নিশি আর নিশা উচ্চারণে প্রায় এক। ডাকনাম মিলে গেছে অদ্ভুতভাবে! ছোটবেলায় কেউ ডাকলে দুজনই একসাথে ফিরে তাকাতো।
সেই সময়ের বন্ধুত্ব এখনো অটুট। বয়স বাড়লেও তাদের গল্প ফুরোয় না। নিশা যেমন একটু মিশুক, নিশি তেমন তাকে সঙ্গ দিতে ভালোবাসে। একে অপরের বিপরীত হলেও, একে অপরকে সঙ্গ খুব পছন্দ করে।
ঘরে ঢুকতেই নানু মুখ তুলে তাকান,
'আরে নিশা! তোমার মা তো বললো তুমি আসবা না।'
'আসতাম না কিন্তু কাজটা হয়ে যাওয়াতে চলে এলাম মায়ের কল পেয়ে। তুমি তো বিন্দাস আছো। আমি আরও ভাবলাম পা ভেঙে টেঙে গেছে।'
সাথে সাথে নিশাকে তার মা ধমক দেয়। সে চুপ হয়ে যায়।
নিশি ফিসফিস করে নিশাকে বলে,
'আপু তুমি কথা সেরে আসো আমি বসার ঘরে যাই।'
নিশা জবাব দেয়,
'আচ্ছা যাও।'
নিশা গিয়ে নানুর পাশে বসে। নিশি রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো সেইসময় কাজের মেয়েটা তাকে ডাক দেয়।
'আপা আপনাদের চা-টা নিয়া যান।'
ট্রে তে দু কাপ চা আর পিরিচে বিস্কুট রাখা। কাজের মেয়েটার কথা মতো ট্রে টা তুলে নেয়। রান্নাঘর থেকে বের হতে নিলে মেয়েটা একটা মগ দিয়ে বলে,
'এটাও নিয়ে যান।'
নিশি ভ্রু কুঁচকে মগটার দিকে তাকায়। প্রশ্ন করে,
'এটা আবার কার?'
কাজের মেয়েটা জবাব দেওয়ার পূর্বেই নিশার মায়ের গলা পাওয়া যায়। ডাক পড়তেই মেয়েটা ছুটে যায়। কফির মগটার মালিক কে সেটা আর জানা হলো না।
ট্রে হাতে গুনগুন করতে করতে বসার ঘরে সোজা ঢুকে যায় সে। সেকেন্ড পরেই থেমে যায় সে। চোখ যায় নিতির পাশে থাকা সিঙ্গেল সোফার দিকে। না সোফাটা স্পেশাল কিছু না। সোফায় বসা মানুষটা গুরুত্বপূর্ণ, হয়তো!
নিশি ভীষণ চমকায়। এতো চমকায় যে হাতে থাকা ট্রে'র কথা বেমালুম ভুলে যায়। নিতির ডাকে বাস্তবে ফেরে।
টি-টেবিলের উপর ট্রে টা রাখে। এর মাঝে লোকটা একবারো তার দিকে তাকায়নি৷ নিজেকে জড়ো বস্তু মনে হলো নিশির। এতো বড় একটা মানুষ সে প্রায় সামনাসামনি দাঁড়িয়ে অথচ লোকটা এমন ভাবে ফোনে ঢুকে আছে মনে হচ্ছে সে চোখ সরালেই দু-চার কোটি টাকার লোকসান হয়ে যাবে।
মায়ের ফোন বাজতেই নিতি চলে যায় নানুর রুমে। নিশির শরীর কেমন শিরশির করে ওঠে। একটা চায়ের কাপ নিয়ে তিন সিটের সোফার এক কোণায় গিয়ে বসে। আরশের থেকে কয়েক হাত দূরে বসা সে। চায়ে চুমুক দিতেই আরশের কথা শুনে বিষম খায়।
'বাহ্! ভালোই উন্নতি করেছিস। আগে ভাবতাম তোর জ্ঞান বুদ্ধি হাঁটুর তলায় এখন দেখছি ম্যানার্সটা পায়ের তলায়।'
আরশের কথার মানে বুঝতে না পেরে পিটপিট করে কয়েকবার তাকায় সে।
'আমি আবার কি করলাম?'
ভ্রু কুঁচকে আরশ তার দিকে তাকায়। নিশির বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। এভাবে কেনো তাকাচ্ছে তার দিকে?
ঢোক গিলে আবার প্রশ্ন করে,
'বলুন, কি করেছি?'
'আমি বসা অথচ আমার কফির মগটা না দিয়েই নিজে আরাম করে চা খাচ্ছিস! এইটুকুও শিখিসনি অন্যকে আগে দিতে হয়! আর রোকসানাও কি আক্কেল তোর মতো গবেটের কাছে আমার কফির মগ দেয়।'
নিশি সাথে সাথে উঠে চায়ের কাপ রেখে মগটা তুলে সামনে ধরে। শুকনো মুখে বলে,
'সরি। আমি জানতাম না এটা আপনার জন্য।'
'তা জানবি কেনো? জানবি কীভাবে মানুষের আইডি লুকিয়ে স্টক করতে হয়। পাশে মগ রাখ আমি নিয়ে নিচ্ছি।'
নিশি মুখ কালো করে ফেলে। মগটা রেখে সরতে নিলেই আরশ বলে,
'চিনি এতো কম দিয়েছিস কেনো? তুই কি আমাকে ভালো করে কফিটাও এনজয় করতে দিবি না?'
নিশি জবাব দেয়,
'আমি বানাইনি। রোকসানা আপু বানিয়েছে।'
'যা ভাগ। মিথ্যে বলা লাগবে না আর।'
'আমি সত্যি বলছি।'
'সত্যি বললে এটা খেয়ে দেখ।'
আরশ তার সামনে মগটা ধরতেই সে নেয়। কিছু না ভেবে চুমুক বসায়।
'কই না তো চিনি ঠিকাছে।'
আরশ তার হাত থেকে মগটা কেড়ে নিয়ে বলে,
'তুই বেশি জানিস? যা চিনি নিয়ে আয়।'
নিশি যায় না৷ দাঁড়িয়ে থাকে।
'কি হলো যা।'
সুক্ষ্ম ধমক খেতেই নিশি রান্নাঘরের দিকে যায়। চিনির বোয়াম সমেত ফেরত আসে। নিতি ততক্ষণে বসার ঘরে ফেরত চলে এসেছে।
'নিন।'
আরশ ছোট্ট করে জবাব দেয়,
'লাগবে না।'
নিশি বোবা মুখে ফেরত যায়। চিনির বোয়াম জায়গা মতো রেখে আসে।
.
সুরাইয়া ফেরার জন্য তোরজোর শুরু করে। এর মাঝে নিশির বাবা কল দিয়েছিলেন। বেশি রাত হওয়ার পূর্বে মেয়েদের নিয়ে ফিরতে বলেছেন। ঘরের মানুষজন একটু কমতেই সুরাইয়া এসে খালার পাশে বসে। নিশি তার পেছনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নিতি খাটের উল্টো দিকে গিয়ে মিসেস তাহমিনার পাশে বসে ফোনে গেমস খেলছে। তিনি আধশোয়া অবস্থায় রয়েছেন।
মৌনতা ভেঙে সুরাইয়া বলে,
'খালা আজ চলি। ওদের বাবা কল দিয়েছে।'
মিসেস তাহমিনা বলে ওঠেন,
'সেকি! আজ থেকে যা।'
সুরাইয়া মনে মনে আওরায়,
'আপনার মেয়ে গুলোর আশেপাশে থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। বান্দরনিগুলা খালি ধান্দায় থাকে আমাকে অপমান করার। এই অপমান আমি সহ্য করবো! অসম্ভব।'
সুরাইয়াকে চুপচাক দেখে মিসেস তাহমিনা আবার বলেন,
'জামাইকেও আসতে বল। আজকে থেকে যাবি।'
সুরাইয়া সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলে,
'না না, ওর অফিস আছে। ফিরতে হবে।'
'ওহ্! ঠিকাছে যাবি যখন যা।'
'আমি পরে আবার আসবো। দরকার হলে এর মধ্যে কল দিয়েন।'
'শোন মেয়ে দুটোকে রেখে যা। কিছুদিন বেড়িয়ে যাবে।'
'নিতির ক্লাস আছে তো। সামনে বার্ষিক পরীক্ষা।'
'নিশিকে রেখে যা। ওর তো পরীক্ষা শেষ। বাসায় শুয়ে বসে থাকে। এখানে থাকুক। তাছাড়া সামনে আরিফের বিয়ে। একেবারে বিয়ে শেষেই ফিরবে না হয়।'
খালার কথায় আপত্তি জানায় সে।
নিশি কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়।
বড়দের মাঝে কথা বললে মা এক্ষুণি চটকানা বসাবে। এই বুঝে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
সুরাইয়া নরম গলায় বলে,
'না তা হয় না খালা। ওর বাবা রাজি হবেন না।'
মিসেস তাহমিনা হালকা হেসে বলেন,
'তোর জামাইকে আমি সব বুঝিয়ে বলবো। চিন্তা করিস না।'
নিতি তখনও ফোনে গেম খেলছে, একটা লেভেল ক্লিয়ার হতেই খুশিতে বলে ওঠে,
'আমিও থাকবো।'
সুরাইয়া কড়াভাবে বলে,
'তোর তো ক্লাস আছে।'
নিতি মুখটা ছোট করে খাটে গা এলিয়ে দেয়।
মিসেস তাহমিনা এবার নিশির দিকে তাকিয়ে বলেন,
'তোর কোনো আপত্তি নেই তো?'
নিশি মা'র দিকে তাকায়।
সুরাইয়া চোখ সরিয়ে নেয়। মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
তাহমিনা এবার একধাপ এগিয়ে বলেন,
'দেখ, তুই থাকলে আমার অনেক ভালো লাগে। নিশাও থাকবে বললো।'
নিশার নাম শুনে নিশির চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক ছড়ায় সেটা সে যতই লুকাতে চায় না কেন।
সুরাইয়া আর কথা খুঁজে পায় না। ভিতরে ভেতরে গলা শুকিয়ে আসছে। এই বাড়িতে থাকাটা তার ভালো লাগে না। নিশি কি করে এসে থাকে কে জানে!
তবু, সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
'ঠিক আছে। দুই-একদিন দেখুক। তবে ঝামেলা হলে কিন্তু নিজে ওর বাবা'রে আমি বুঝাতে পারবো না।'
মিসেস তাহমিনা হেসে ওঠেন।
'তোর জামাইকে আমি বুঝিয়ে বলবো।'
সুরাইয়া আর কিছু বলে না।
.
নিশি ওর মা আর বোনকে বিদায় জানিয়েছে অনেকক্ষণ হলো। সে বলে গেছে আগামীকালকে বাবা এসে ওর কাপড়চোপড় দিয়ে যাবে।
নিশা আর ওর মা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তারাও চলে যাচ্ছে। নিশা থাকবে। মা যাওয়ার পূর্বে তাকে নানুর সেবা যত্ন করার বিষয়ে এক গাদা দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।
নিশি এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলো। একটু পর বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে। যেই রুমে সে আর নিশা থাকে বেড়াতে এলে সেই রুমে এটার্চ বাথরুম রয়েছে। সেদিকে পা বাড়ায়।
ড্রইং রুম পেরিয়ে রান্নাঘর৷ তারপর একটা কমন বাথরুম। এরপর সামনে নানুর রুম। তার পাশে মামার রুম। মাঝে আরও দুটো রুম রয়েছে। শেষের রুমটায় নিশি এলে থাকে। রুমটার তার বেশ পছন্দ। আলো বাতাস আসে। সাথে বারান্দা রয়েছে। বারান্দায় দাঁড়ালে শহর দেখা যায়। রুমে প্রবেশ করতে নেয় ঠিক তখনই জোরে ধাক্কা খায় কারো সঙ্গে।
'উফ!' একসাথে দুজনেই বলে ওঠে।
নিশি ধাক্কা খেয়ে সামলে দাঁড়ায়। তাকিয়ে দেখে আরশ।
আরশ মৃদু চেঁচিয়ে বলে,
'কানি চোখে দেখিস না?'
নিশি এক পা পেছনে সরে গিয়ে বলে,
'আমি তো দেখেই যাচ্ছিলাম। আপনি না হঠাৎ করে এলেন! আর এ ঘরে আপনি?'
তার কণ্ঠ রুক্ষ হয়ে আসে,
'আপনার তো চলে যাওয়ার কথা ছিলো, না?'
আরশ ঠোঁট বাঁকিয়ে সোজা তাকায় তার চোখে,
'সেই কৈফিয়ত তোকে দিবো?
এটা আমার নানুর বাড়ি। আমি যেদিকে খুশি যাবো, থাকবো তাতে তোর কী?'
নিশি চোখ নামায় না। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
'থাকুন, না করেছে কে?
সরুন, আমি ভেতরে যাবো।'
আরশ এক পা সামনে এগিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়ায়। হাত তুলে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় দরজার ফ্রেমে।
নিশি ভ্রু কুঁচকে তাকায় আরশের দিকে।
'সরেন। আমি ওয়াশরুমে যাবো।'
'যাবি, তাতে বাধা দিচ্ছে কে? আগে উত্তর দে। চোখে দেখিস না?'
'দেখছিলাম, আচমকা আপনি এসে পড়লেন।'
আরশ ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ঝুলিয়ে বলে,
'বেশ বুঝতে পারছি ইচ্ছে করে ধাক্কা খেয়েছিস।'
নিশি বিরক্ত হয়। চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে,
'আপনি কি জানেন, আপনার ব্যবহারটা একদমই বজ্জাতের মতো?'
'ধন্যবাদ। তোর মত কারও কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছাও নেই আমার।'
'আমি যাচ্ছি।'
নিশি পাশ কাটিয়ে যেতে চায়, কিন্তু আরশ পথ আঁটকে রেখেছে।
'একটা কথা শুনে যা। তোকে আমি দেখতে পারি না। ঠিক যেমন তুই পারিস না।'
'তাহলে ঝামেলা কীসের?'
'ঝামেলা হলো, তুই এখানে থাকবি, এই বাড়িতে, আমার সামনে! এটা আমি মেনে নিতে পারছি না।'
'সেটা আপনার সমস্যা, আমার না।'
আরশ এবার একটু সামনে এগিয়ে আসে। গলার স্বর নিচু কিন্তু শীতল করে বলে,
'সাবধান করে দিচ্ছি। যদি কোনোরকম নাটক করিস, আমি কিন্তু একদম সহ্য করবো না।'
নিশি এবার আর চুপ থাকে না।
'নাটক আপনারা করেন। আমি তো এখানে বেড়াতে এসেছি, ড্রামা করতে না।'
দুজনের চোখে চোখ রাখে। প্রচণ্ড তীব্রতায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারা।
এক মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর নিশি মুখ ঘুরিয়ে বলে,
'সরে দাঁড়ান।'
আরশ এবার নিজেই সরে যায়। নিশি ঘরের ভিতর ঢুকে দরজা ঠেলে বন্ধ করে দেয়।
আরশ দাঁড়িয়ে থাকে দরজার সামনে। গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে বন্ধ দরজার দিকে। চোখে বিরাজ করছে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
...
(চলবে..)