#কাব্যের_তিতলি
#আরহা_ফারিশ
#পর্ব_২
সকালবেলা হঠাৎ কারো তীক্ষ্ণ চিৎকারে কাব্যের কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুমের আবেশে জড়িয়ে থাকা চোখ দুটো সে অতি কষ্টে খোলার চেষ্টা করল। গত রাতটা তার একেবারেই ভালো কাটেনি। এইটুকু একটা ছোট সোফায় আর যাই হোক, আয়েশ করে ঘুমানো সম্ভব নয়; সারারাত এপাশ-ওপাশ করেই কেটেছে।
চোখ কচলাতে কচলাতে কাব্য বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল, তিতলি ভয়ে একেবারে আড়ষ্ট হয়ে সিঁটিয়ে আছে। তিতলির ভয়ার্ত মুখাবয়ব দেখে কাব্য ঘুম জড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
— কি হয়েছে সাতসকালে এভাবে চিৎকার কেনো করছো?
তিতলি ভয়ে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলল,
— তে.. তেলাপোকা।
কাব্য এবার শোয়া থেকে উঠে বসে বিদ্রুপ স্বরে বলল,
— আস্ত একটা তেলাপোকা ভাজি করে খাবার ক্ষমতা তুমি রাখো। আর তুমি কিনা এই সামান্য তেলাপোকাকে ভয় পাচ্ছো?
— ইয়াক আমি কেনো তেলাপোকা খেতে যাব?
— তাহলে তেলাপোকা কেনো তোমাকে খেতে যাবে?
— আমি কখন বললাম তেলাপোকা আমাকে খাবে।
— তাহলে সাতসকালে এর ভয়ে আমার ঘুমের বারোটা কেনো বাজালে?
তিতলি এবার চুপসে গেল ।বলার মতো তার কাছে এখন কিছুই নেই। এই লোকের সাথে যতই কথা বাড়াবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সব দোষ তার ঘাড়েই চাপাবে । এখন এই বদলোককে কিভাবে বুঝাবে মেয়েদের তেলাপোকাকে ভয় পেতে কোনো কারন লাগেনা, তেলাপোকা উড়তে দেখলে আপনা-আপনি মুখ দিয়ে চিৎকার বেরিয়ে পড়ে। তিতলিকে চুপ থাকতে দেখে কাব্য তাচ্ছিল্য হেসে ওয়াশরুমে ঢুকে পরে ।
তিতলি ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। রুম থেকে বেরিয়ে দেখে কাব্য ডাইনিং টেবিলে বসে আছে আর ফারদিনা শেখ তাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। তিতলির তাদের সামনে যেতে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। মা বারবার বলে দিয়েছিল আসার সময় শশুর বাড়ি এসে যেনো তারাতারি ঘুম থেকে উঠে ঘরের সকল কাজ শেষ করে ফেলে, আর সে কিনা এতক্ষণ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল। এখন কিভাবে যাবে শাশুড়ির সামনে, যদি তাকে বকা দেয়?
তিতলির এসব আজগুবি ভাবনার মাঝে ভেসে আসে ফারদিনা শেখের কন্ঠস্বর ।
— আরে সেখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো, আয় এদিকে আয়।
কাব্য এক রুটি মুখে পুরতে পুরতে বলল,
— জায়গায় জায়গায় এভাবে স্টাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওর স্বভাভ ।
— আহহ কাব্য।
মায়ের ঝাড়ি শুনে চুপ মেরে গেল কাব্য। ফারদিনা শেখ তিতলিকে এনে কাব্যর পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। অতপর তার প্লেটে খাবার বেড়ে দেওয়ার সময় বললেন,
— আমি তুই করে ডাকাতে কি তোর অস্বস্তি হচ্ছে? কাব্যকে তুই করে বলি তাই তোকে ও বললাম, তুই ও তো আমার মেয়ে তাইনা।
তিতলি কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। কোথায় সে ভেবেছিল হয়তো তাকে বকাঝকা করবে আর এখানে কিনা ।
— আচ্ছা তোর ভালো না লাগলে আর ডাকব না।
— এই না না আন্টি আমি কিছু কেনো মনে করব? আমার আম্মু ও তো আমাকে তুই বলেই ডাকে।
— এই আন্টি কি হ্যাঁ? আম্মু ডাকবি।
তিতলি সামান্য হেসে বলল,
— ঠিক আছে ।
সকালের নাস্তায় আজ পরোটা আর গরু ভোনা করেছে ফারদিনা শেখ । কাব্যর গরুর মাংস খুবই পছন্দের। টেবিলে বসে টুকটাক কথা বলে হাসছে ফারদিনা শেখ ও তিতলি। কাব্য কেবল গম্ভীর খেয়ে যাচ্ছে। কোনো রকমে খাবার পর্ব শেষ করে উঠে রুমে চলে যায় সে। কাল গ্রামে যাওয়ার আগে ভার্সিটি থেকে দুদিনের ছুটি নিয়েছিল। ভেবেছিল আজকে চলে যাবে পরক্ষণে আবার ভাবলো ছুটি যখন নিয়েই নিয়েছে আর গিয়ে লাভ কি বরং দুদিন রেস্ট নেওয়া যাক।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ফারদিনা শেখের হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিতে থাকে তিতলি। এটা সেটা করছে আর দুজন গল্পসল্প করছে । কাব্য রুম থেকে তাদের হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে। একদিক দিয়ে অবশ্য ভালোই হয়েছে তার মার শেষমেষ একজন সঙ্গী হলো। কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতে থাকা বইয়ে মনোনিবেশ করল।
রান্না ঘরে কখনো তেমন যাওয়া হয়নি তিতলির। আজ সারাটাক্ষন রান্না ঘরেই থেকেছে ফারদিনা শেখের সাথে । একে তো গরম তার উপর ঘেমে একেবারে নাজেহাল অবস্থা তিতলির। ফর্সা গালগুলো ইতোমধ্যে লাল হয়ে উঠেছে । ফারদিনা শেখ তিতলির অবস্থা দেখে তাকে রুমে পাঠিয়ে দিলেন।
রুমে এসেই তিতলি দেখে কাব্য বইয়ে মনোনিবেশ করে আছে। কাবার্ড থেকে একটা হালকা মেরুন কালারের থ্রি-পিস বের করে গোসলে ঢুকে পড়ে। কাব্য একবার আড়চোখে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি বইতে নিবদ্ধ করে । গোসল শেষে চুল মুছতে মুছতে বের হয়ে দেখল কাব্য এখনও সেই ভাবেই বসে আসে। তিতলি প্রথমবারের মতো কাব্যর দিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল। পরনে একটা অফ হোয়াইট টি-শার্ট । গায়ের রংটা উজ্জ্বল ফর্সা।তিতলি নিজের দিকে এবার তাকিয়ে বুঝলো লোকটা তার থেকে ফর্সা বেশি, একেবারে ফার্ম মুরগি। সিল্কি চুলগুলো কপালে এসে বারবার পরছে, কাব্য সেগুলোকে হাত দিয়ে পিছন দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিতলির ভাবনার মাঝেই কাব্য হুট করে জিজ্ঞেস করল,
— নাম কি তোমার?
কাব্যের এহেন প্রশ্নে আকাশ থেকে যেনো পড়ল তিতলি।
— বিয়ে করেছেন অথচ নাম জানেন না?
— না জানিনা।
— কেনো কবুল বলার সময় শুনেননি?
কাব্য তিতলির চোখে চোখ রেখে বলল,
— তখন প্রয়োজন বোধ করিনি।
— তাহলে এখন কেনো করছেন?
— কেননা আমার প্রয়োজন বোধরা এখন প্রয়োজনবোধ করছে ।
তিতলির বলতে খুব ইচ্ছে হলো মিয়া আপনি তো অনেক ঘাড়ত্যাড়া লোক। কিন্তু কিছু বলল না চুপ মেরে গেল । তিতলিকে চুপ মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাব্য আবারও জিজ্ঞেস করল,
— কথার মাঝখানে হঠাৎ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পরো কেনো তুমি? নাম জিজ্ঞেস করেছি তো।
— তিতলি ।
কাব্য রুমটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে ভ্রু উচিয়ে বলল,
— কোথায় তিতলি?
— আমার নাম তিতলি ।
— অহহ, শুধু তিতলি নাকি আগে পিছে কিছু আছে ?
— সিহা মেহজিয়া তিতলি ।
কাব্য আর কিছু বলল না। সে আবারও বইতে মনোযোগী হলো । দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে একটা গাঢ় ঘুম দিল তিতলি । একদিন জার্নি করলেই পরেরদিন তার গাধার মতো ঘুমাতে হয়। সেই যে তিতলি ঘুম দিলে ঘুম ভাঙলো তার পাচঁটার দিকে । চোখ কচঁলাতে কচলাতে বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা বের করে টাইম দেখতেই জিহ্বায় কামড় দিল। এই রে সে এতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছে আর তাকে কেউ একটু ডাক ও দিল না। তিতলি তরিগরি পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে পরে। রুম থেকে বেরিয়ে সামনের দৃশ্য দেখে সে আরেকটু অবাক হয়। কাব্য আর ফারদিনা শেখ ড্রয়িং রুমে বসে । কাব্য মায়ের মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। ফারদিনা শেখ হেসে হেসে কি যেনো কথা বলছে, আর গম্ভীর মুখে শুনে যাচ্ছে।
তিতলি মাথা নিচু করে ধীর পায়ে তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ফারদিনা শেখ কথার মাঝে তিতলিকে দেখতে পেয়ে হালকা হেসে বললেন,
— ঘুম ভালো হয়েছে তো?
তিতলি খানিকটা অস্বস্তি বোধ করল। ফারদিনা শেখ সেটা বুঝতে পেরে হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন,
— আয় এদিকে বস। তোর মাথায় আমি তেল দিয়ে দেই।
তিতলি বাধ্য মেয়ের মতো গিয়ে বসে পড়ল। ফারদিনা শেখ তিতলির খোপা করা চুল ছেড়ে দিতেই তা ঝড়ঝড় করে কোমড় গিয়ে ঠেকলো। কাব্য একবার সেদিকে তাকিয়ে বলল,
–– এগুলো চুল নাকি পাখির বাসা?
— কাব্য্য্য!!!
আবারো ঝাড়ি শুনলো শুধু মাত্র মেয়েটার জন্য। কাব্য এ যাত্রায় বিরক্তির সাথে সাথে হিংসা বোধ করল। মেয়েটার কারণে সকাল থেকে তার মা তাকে শুধু বকেই যাচ্ছে। কাব্য বেশ বুঝতে পারলো মেয়েটা তার মাকে ও হাত করে নিয়েছে। ফারদিনা শেখ বাটিতে গরম করে রাখা তেল হাতে নিয়ে তিতলির চুলে মালিশ করতে আরম্ভ করলেন। তিতলির কেমন সুখ সুখ অনুভূত হচ্ছে।অজান্তেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফোটে উঠল। কাব্য আর ফারদিনা শেখকে দেখে মনে হচ্ছে একজন আদর্শ মায়ের আদর্শ সন্তান ।
ঠিক সে সময় কলিংবেলের কর্কশ ধ্বনি বেজে উঠল । বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি ক্রমাগত বেল বাজিয়েই চলেছে । তিতলির বুঝে এল না এমন কে করে অন্তত দরজাটা খোলার সুযোগ তো দিবে।
ফারদিনা শেখ তিতলির মাথায় তেল মালিশ করতে করতে সামান্য হেসে কাব্যকে উদ্দেশ্যে করে বললেন,
— বাদরটা চলে এসেছে, এখন সামলা।
ফারদিনা শেখের কথা তিতলি না বুঝলে ও কাব্য ঠিকই বুঝতে পারলো। সে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলে দরজা খুলার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে পড়ল। বিরক্তি নিয়ে দরজার দিকে অগ্রসর হতে হতে ভাবলো দরজাটা খুলার পর অপর প্রান্তের ব্যক্তি প্রশ্ন করতে করতে তার মাথা চিবিয়ে খাবে। ভাবতেই বিরক্তিতে কাব্যর মাথা বিষিয়ে উঠল।
(চলবে…….)