গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (১৯)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান
সময় ও স্রোত কারো জন্য বসে থাকে না। চলতে থাকে আপন গতিতে। পেরিয়েছে দুইদিন। অর্থাৎ হিয়ার বিবাহের দ্বিতীয় দিন আজ। কালকে নাকি নাফিরা ওকে নিতে আসবে। কি অদ্ভুত না? কিছুদিনের ভেতরেই কিভাবে হিয়ার জীবনটা পাল্টে গেল৷ প্রথমে রাজের ধোঁকা তারপর রুহির পাল্টে যাওয়া। এখন আবার বিয়ে। কিভাবে কি হয়ে গেল হিয়া কিছুই বুঝতে পারে না। তখন মাঝরাত। হিয়া বিষন্ন মনে বসে আছে জানালার পাশে। বাতাসের মৃদু হাওয়ায় জানালার সফেদ রঙা পর্দা গুলো উড়ছে। লম্বা চুল গুলো ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেদিকে মেয়েটার কোনো খেয়ালই নেই। সবকিছুর উপর সে মহা বিরক্ত হয়ে গেছে। হাহ! কালকে সকালে নাকি তাকে চলে যেতে হবে। যে মেয়েটার বিশ্বাসই হচ্ছে না তার বিয়ে হয়েছে তাকে নাকি কালকে শশুরবাড়ি যেতে হবে। হিয়া কিছুই বুঝতে পারছে না।
মায়ের কাছথেকে হিয়া জেনেছে রুহি তার বিয়ের বিষয়ে জানে না। এটাও চিন্তার বিষয়। কেন রুহি বা রাজকে জানানো হয়নি তার বিয়ের কথা? শুধুই কি সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য? নাকি এর ভেতরে কোনো গল্প আছে, যা হিয়া জানে না। তারপর, নাফিকে সে প্রপোজ করলো অথচ নাফি তাকে রিজেক্ট করলো। আবার হুট করেই নাফির সাথে তার কিভাবে বিয়ে হলো? সবকিছু হিয়ার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে সবকিছু।
হ্যাঁ এটা ঠিক, সে নাফিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো এবং যেচে পড়ে প্রপোজ ও করেছিলো। কিন্তু তারপর তো সে ডিসিশন পাল্টে ফেলেছিলো। নাফিকে তো সে ভালোবাসেনি। শুধুই ব্যবহার করতে চেয়েছিলো। যেই মানুষটার কাছে সে রিজেক্ট হয়েছে, তার সাথে কিভাবে সংসার করবে মেয়েটা? এমনিতেই ওদের বিয়ের পরে নাফির সঙ্গে একবারও কথা হয়নি হিয়ার। যদিও নাফি বহুত বার কল করেছিলো। কিন্তু হিয়া রিসিভ করেনি। কি বলবে সে কল রিসিভ করে? হিয়ার মন খারাপের আরেকটা কারন হলো, মাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে। হিয়ার যে মা ছাড়া এই দুনিয়ায় কেউ নেই। আর হিয়ার মায়েরও নেই। মাকে ছাড়া হিয়া খুব বেশিদিন কোথাও থাকেনি। ওই বাড়িতে কিভাবে থাকবে হিয়া? আরও বিয়েটা যদি স্বাভাবিক ভাবে হতো তাহলে কোনো কথা ছিলো না। এভাবে হঠাৎ বিয়ে, হঠাৎ শশুরবাড়ি! এভাবে কারো বিয়ে হয়? তাও তো হিয়ার ভাগ্য ভালো বড় চাচ্চুর কথায় তাকে তিনদিন সময় দেওয়া হয়েছে রেডি হওয়ার জন্য। বাস্তবতা মেনে নেওয়ার জন্য। নাহলে তো নাফি সেদিনই তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। সেদিন নাফিদের বাড়িতে নিয়ে গেলে, হিয়ার কি হতো! সেদিনের কথা ভাবতেই হিয়া নড়েচড়ে বসলো। নাফির কথা মনে পড়তেই মেয়েটা বিরক্ত হলো। নাকমুখ কুঁচকে বিরবির করে বলল,
"ফাউল লোক কোথাকার!"
হিয়ার মনে পড়ে দুইদিন আগে, তার বিয়ের পরের মুহুর্তের কথা।
*
নাসিমার চুরি পড়ানো শেষ হয়েছে। যেহেতু নাফির বিয়ে হয়েছে তাই হিয়াদের বাড়িতে তো আর আজ রাত থাকা যাবে না। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর নাসিমা কামরুল সাহেবকে বললেন,
"তাহলে আজ আমরা উঠি ভাই সাহেব। আমাদের নতুন বৌমাকে খুব শীঘ্রই নিয়ে যাবো আমরা।"
সবাই সহমত পোষণ করলেও নাফির বাচ্চা নাফি বলে উঠলো,
"সে'কি! ওকে নিয়ে যাবো না? বিয়ে তো হয়ে গেছে এখন আবার কি সমস্যা?"
নাসিমা বিস্ফোরিত নয়নে তাকালেন ছেলের পানে। তার সন্দেহ হলো, এটা কি তার ছেলে নাফি? নাকি অন্যকেউ? নাফি তো এমন নয়। সবে বিয়ে হলো। তার নাম শুনে মেয়েটা জ্ঞান হারালো। মেয়েটা তো বিশ্বাসই করতে পারছে না তার বিয়ের কথা। আর এখনই নাকি ওকে বাড়ি নিয়ে যাবে। নাসিমা কিছু বলবেন তার আগে কামরুল হাসান বললেন,
"রুহিরা ফিরলে না-হয় একবারে যাক। তখন তো এমনিতেই বড় করে বিয়ে হবে।"
নাফি নাকচ করে বলল,
"না না আঙ্কেল আমি চাইছি, ওরা দুজন এসে আমার স্ত্রীকে আমার বাড়িতে দেখুক। তাহলে ওরা আরও বেশি অবাক হবে। আমি চাই আজই আমার ওকে নিয়ে যেতে।"
নাফির কথা শুনে হিয়া আবারও কেঁদে উঠলো। হেলেনার বুকে মাথা গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আম্মু আমি যাবো না শশুরবাড়ি। আমি যাবো না ওনাদের বাড়ি।"
কামরুল হাসান বললেন,
"বাবা বিয়ে যখন হয়ে গেছে বউ তো তোমারই। যেহেতু সব হঠাৎ হয়েছে আমাদের মেয়েটা তো এখনোও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। দুইটা দিন সময় দাও মেয়েটাকে। ধীরেসুস্থে তারপর না-হয় নিয়ে যেও।"
নাফির অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মেনে নিতে হলো কামরুল হাসানের কথা। কথা হলো তিনদিন পরে নাফি ও নাফির কিছু কাছের মানুষরা এসে হিয়াকে নিয়ে যাবে। আর যেহেতু বিয়েটা একপ্রকার চুরি করে হচ্ছে তাই কেউ জানবে না এখন। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে হিয়াকে আবারও উঠিয়ে নেওয়া হবে।
*
সেদিনের কথা ভেবে হিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মনে পরলো নাঈমের কথা। এই কয়েকদিনে হিয়ার একটুও কথা হয়নি নাঈমের সাথে। এতো সব যে ঘটে গেল নাঈমকে তো জানাতে হবে। হিয়া ঠিক করলো কাল সকালে নাঈমের সাথে দেখা করবে সে। তারপর না-হয় নাফির সঙ্গে চলে যাবে।
নাঈমের কথা মাথায় আসতেই হিয়া উঠে বসলো। আর বসে থাকা যাবে না। এখন না ঘুমালে কালকে সকালে উঠতে পারবে না সে। হিয়া নিজের ফোন থেকে নাঈমকে একটা মেসেজ দিয়ে রাখলো। কালকে কোথায় দেখা করবে আর কয়টার সময় আসবে। সকালে উঠে নাঈম মেসেজ দেখে যেন সেখানে চলে যায়।
------
সকাল তখন সাতটা। জিহাদ নিজের অগোছালো ঘরটাতে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ ফোনের উচ্চশব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। ধরফরিয়ে উঠে বসলো সে। বালিশের পাশ থেকে ফোন হাতে নিলো জিহাদ। দেখলো স্ক্রিনে রাজের কল। জিহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো ফোনের দিকে। সময়ও সেখানে স্পষ্ট___সবে সাতটা। রাজ না হানিমুনে গেছে? এতো সকালে ঘুম ভাঙলো কিভাবে ওর? জিহাদ অত আর সাতপাঁচ ভাবলো না। কল রিসিভ করলো সে। জিহাদ কল রিসিভ করার সাথে সাথে শুনতে পেল, রাজের কর্কশ গলার স্বর।
"কিরে বাই**** তোর কি কথা ছিলো। তোর সময় ছিলো তিনদিন। দুইদিন অলরেডি কেটে গেছে। তোর তো কোনো রেসপন্সই নেই। তুই কি করতে পারবি কাজটা?"
জিহাদ থতমত খেয়ে গেল রাজের কথা শুনে। রাজ তো তার সাথে কখনোই এমন আচরণ করে না। কিছু হলো নাকি! জিহাদ কোনোমতে বলল,
"ভাই আমি তো তপকে তপকে ছিলাম, কখন হিয়াকে একা পাবো। কিন্তু ও তো বাড়ি থেকেই বের হয়নি। এখন কি আমি ওর বাড়ি গিয়ে রে ই প করে আসবো নাকি?"
"শোন জিহাদ আমি এতো কথা শুনতে চাই না। যে করেই হোক ওর একটা কিছু করেতেই হবে। নাহলে ভাই আমা.....!"
থেমে গেল রাজ। কথা আঁটকে গেল তার। কিছু কিছু সমস্যা থাকে যেগুলো শত কাছের বন্ধু হলেও তাদের সাথে শেয়ার করা যায় না।
"কিছু হয়েছে তোর দোস্ত? খুলে বল আমাকে। তোর কথাবার্তায় মনে হচ্ছে তুই ঠিক নেই।"
রাজ উত্তর দেয় না। নিঃশব্দে কল কেটে দেয়। তার যে কিছু বলার নেই। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যে সে খুব বড় ভুল কাজ করে ফেলেছে। যেই ভুলের কোনো মাশুল নেই। ভুলের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে সারাজীবন। জীবনে বেঁচে থাকতে প্রয়োজন শান্তির। প্রতিটি মানুষ তার জীবনসঙ্গীর কাছে প্রথমে চায় একটু শান্তি। সেই জীবনসঙ্গীই যদি হয় অশান্তির মুল কারন। তাহলে জীবন আর জীবন থাকে না__হয়ে যায় জাহান্নাম। হয়তো রাজের পরিস্থিতি এমন।
রাজ কল কেটে জিহাদ আর শোয় না। দ্রুত শার্ট পড়ে নেয় সে। এতো গুলো টাকা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। জিহাদ শহরের বস্তি থেকে কিছু গুন্ডা ভাড়া করেছে। সে তাদের কাছে কল দিলো প্রথমে। হিয়ার বাড়ির সামনে গিয়ে নজর রাখতে হবে। কে কি করছে, কোথায় যাচ্ছে সবকিছু নজরে রাখবে হবে। তারপর ঝোপ বুঝে কোপ মারতে হবে!
*****
হিয়ার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেজে গেল নয়টা। আজকে যেহেতু মেয়েটা চলে যাবে তাই আর কেউ ডাকলো না হিয়াকে। হিয়া নয়টার সময় উঠে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিলো। কোনো রকমে জামাকাপড় বদলে সাধারণ একটা থ্রিপিস পড়লো সে। মাথায় হিজা বেঁধে, বেড়িয়ে পরলো নাঈমের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে। নাঈমকে সে আসতে বলেছিলো একটা পার্কে। সেখানের উদ্দেশ্যে হিয়া রওনা হলো।
মাঝখানে কাটলো কিছুট সময়। যথাযথ স্থানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হিয়ার বেজে গেল দশটা। খুব আশা নিয়ে হিয়া এসেছিলো, কিন্তু পার্কে আসার পর হিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল। নাঈম আসেনি এখানে। বাসা থেকে তাড়াহুড়ো করে আসায় ফোনটাও আনা হয়নি তার। এখন কি করবে মেয়েটা? হিয়া মনঃক্ষুণ্ন হলো ভিষন। তার কপালে কোন কুফা লাগলো কে জানে! এসব অঘঠন তার সাথেই কেন হচ্ছে? হিয়া সারা পার্ক খুঁজলো নাঈমকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোথাও খুঁজে পেল না । অর্থাৎ নাঈম আসেনি। হিয়া পার্কে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। অনেকটা সময় কাটার পরও নাঈম এলো না। প্রায় বারোটার দিকে হিয়া মন খারাপ করে বাসার দিকে রওনা হলো। বিকেলেই তো তাকে নিতে আসবে। আর দেরি করলে চলবে না।
হিয়া পার্ক থেকে বেড়িয়ে রিক্সার জন্য দাঁড়ালো রাস্তায়। আজ তার সাথে সবকিছুই খারাপ হচ্ছে। অনেকটা সময় কাটার পরও রিক্সা পেল না মেয়েটা। হয়তো দুপুরের সময় বলে পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া জায়গাটা বেশ নির্জন। হিয়া যখন বিরক্ত হয়ে হাঁটা শুরু করলো ঠিক তখনই একটা রিক্সা এলো। রিক্সাটা দেখে হিয়া যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। অবশেষে সে বাড়ি ফিরতে পারবে। সে রিক্সায় চড়ে বসলো। এরপর রিক্সা চলতে শুরু করলো আপন গতিতে। অনেকটা পথ আসার পর হিয়া টের পেল, এটা তো তার বাড়ির রাস্তা নয়। রিক্সা তো অন্য রাস্তায় যাচ্ছে।
গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি [সারপ্রাইজ_পর্ব]
লেখনীতে : #অহনা_রহমান
সুখ প্রথমে ভালেভাবেই মধ্যবয়সী রিক্সা ওয়ালাকে বলল,
"আঙ্কেল কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? এটা তো আমারা বাসার রাস্তা নয়।"
রিক্সা ওয়ালা হিয়ার কথার জবাব দেয় না। বরং রিক্সার গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হিয়ার মাঝে। হিয়া ভয় পায়। কাঁদো কাঁদো হয়ে পরে।
"আ..আ..ঙ্কেল আ..আ..পনি র.রিক্সা থ..থা..মা..ন।"
রিক্সা ওয়ালা এবারেও হিয়ার কথা শোনে না। বরং আগের চেয়েও দ্রুত চালাতে শুরু করে রিক্সা। এইবারে হিয়া পুরোপুরি কেঁদে ফেললো। এই চলন্ত রিক্সা থেকে ঝাঁপ দিতেও তার ভয় করছে। হিয়া চিৎকার করতে শুরু করলো এবারে। রিক্সাওয়ালাকে বলতে লাগলো,
"রিক্সা থামান বলছি, ভালো হবে না কিন্তু।"
হিয়ার ননস্টপ কান্না আর চিৎকার শুনে রিক্সা ওয়ালা বোধহয় ঘাবড়ে গেল। হঠাৎ করেই সে রিক্সা ধীরে ধীরে চালাতে লাগলো। হিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"একটা সারের (স্যারের) আদেশ আছে। আপনারে নিয়া যাইতে কইছে। এইভাবে চিল্লায়েন না।"
হিয়া স্তব্ধ হয়ে কান্না থামায়। সাথে অবাকও হয় সে। কোন স্যার তাকে নিয়ে যেতে বলেছে? হিয়া ভাবলো মনে মনে, কি গ্যারান্টি আছে যে এই লোক মিথ্যা বলছে না? হিয়া বলল,
"আমি যাবো না কোথাও। আপনি প্লিজ রিক্সা থামান। আমি কিন্তু পুলিশে কল করবো।"
রিক্সাওয়ালা হিয়ার কথার জবাব দেয় না। সে রিক্সা থামায় ও না। নির্বিকার হয়ে তার কাজ করতে থাকে। পুনরায় সে রিকশার গতি বাড়িয়েছে। ওদিকে হিয়ার দম বন্ধ লাগছে। সে আরও কয়েকবার মধ্যবয়সী লোকটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হলো। লোকটি তার সাথে আর একটা কথাও বলল না। হিয়া দেখলো, আশেপাশে মানুষ তো দুর একটা কাকপক্ষী ও নেই৷ এখান থেকে ঝাপ দিলে তার ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। যদি আহত হয়? এখানে তো কেউ নেই বাঁচানোর মতো। আহত হলে বরং তার পালানোর রাস্তা টাও বন্ধ হয়ে যাবে। হিয়ার হাত'পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ভয়ে মেয়েটা শিটিয়ে গেছে পুরো। মনে মনে দোয়া-কালাম পড়তে লাগলো মেয়েটা। এখন তার হাতে কিছুই নেই অপেক্ষা করা ছাড়া। কিভাবে এখান থেকে পালাবে সেটাই ভাববার বিষয় এখন। হিয়া আশেপাশে খুব খেয়াল করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। যদি কারো দেখা পাওয়া যায়। এমন সময় মেয়েটা দেখলো কিছু দুরেই একটা গাড়ি পার্ক করা। হিয়ার মনে আশার আলো দেখা দিলো৷ আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকলো সে যাতে ওখানে লোক থাকে। যার কাছ থেকে সাহায্য নিতে পারবে মেয়েটা।
কিছুক্ষনের মধ্যেই হিয়ারা সেই গাড়ির কাছে পৌঁছালো। হিয়া কিছু করার আগেই আশ্চর্যজনক ভাবে রিক্সাওয়ালা উক্ত গাড়ির কাছেই রিক্সা থামালো। এতে অবাকের বদলে চমকে যায় হিয়া। এখানে থামালো কেন? কে আছে গাড়িতে? এইভাবেই তো কিড ন্যাপ করা হয় মেয়েদের। হিয়া ভীত হয়। রিক্সা থামাতেই সে এক সেকেন্ড ও বসে থাকে না সেখানে। দ্রুত নেমে যায় সে। এবং কোনো কিছু না দেখেই যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলো সেদিকে দৌড়াতে থাকে। কয়েক কদম দৌঁড়ানোর পরই একটা পরিচিত ডাকে হিয়ার পা জোড়া থেমে যায়। অবাকের চরম সীমান্তে পৌঁছে পিছনে তাকায় সে। মুহুর্তেই চক্ষু কপালে ওঠে মেয়েটার। পিছনে নাফি দাঁড়িয়ে। নাফিই ডেকেছে হিয়াকে। নাফিকে এখন এই অবস্থায় কোন ভাবেই কল্পনা করেনি হিয়া। হিয়ার পুরো স্ট্যাচু হয়ে গেছে। তার সাথে আসলে কি হচ্ছে এটা কিছুতেই বুঝতে পারলো না মেয়েটা। হিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ফরমাল ড্রেসআপে থাকা নাফির দিকে। ওদিকে নাফি ততক্ষণে হিয়ার কাছাকাছি চলে এসেছে। নাফি হিয়ার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। আলতোভাবে দু'হাত রাখলো হিয়ার গালে। আদুরে স্বরে বলল,
"ভয় পেয়েছো? আমি আছি না? বিয়ের দিনই তো বললাম তোমার সকল কিছুর দায়িত্ব আমার। বিপদে আগলে রাখবো আমি! আমি থাকতে কোন বিপদ তোমাকে ছুঁতে পারবে মনেহয়?"
হিয়া নিজের মধ্যে নেই আপাতত। বলদা মেয়েটা কিছুই বুঝে না যেন৷ এখন নাফিকে দেখে সে অন্যমনস্ক হয়ে হিসেব মেলাচ্ছে। হিয়ার নীরাবতা দেখে হাসলো নাফি। সে খেয়াল করলো তাদের থেকে সামান্য দুরত্বে একটা কালো গাড়ি দাঁড় করানো হয়েছে। এখানের পরিবেশটা খানিকটা জঙ্গলের মতো। এইখানে এইভাবে গাড়ি দাঁড় করানোর কোনো মানে হয় না। তবে নাফি আপাতত এইসব দেখতে গেল না। মানুষ আজকাল, তিলকে তাল বানাতে সময় নেয় না। কিছু একটা ভেবে নাফি হিয়ার হাত ধরে নিয়ে গেল গাড়ির কাছে। নিজেই গাড়ির দরজা খুলে দিলো। সে হিয়াকে ডাকলো কয়েকবার। কিন্তু হিয়া তখনও মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে আছে নাফির দিকে। সে কি আর এসব শোনে? একপ্রকার বাধ্য হয়ে নাফি হিয়ার বাহু ধরে হালকা ঝাঁকি দিলো।
"এই যে মিসেস নাফি, নিজের মধ্যে এসেছেন?"
হিয়া হকচকালো। অপ্রস্তুত হয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো চারিদিকে। হিয়ার বেসামাল অবস্থা দেখে নাফি খুব হাসলো মনে মনে। মুখে বলল,
"গাড়িতে ওঠো তারপর সব বলছি।"
হিয়ার আর কি করার! রোবটের মতো সে উঠলো গাড়িতে। ড্রাইভিং সিটের পাশে। হিয়াকে বসিয়ে নাফি নিজে বসলো ড্রাইভিং সিটে। এরপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলল অজানার উদ্দেশ্যে।
কিছুক্ষণ কাটলো নীরাবতায়। হিয়া বেচারি অতিরিক্ত শক খেলে জ্ঞান হারায়। যেমন হারিয়েছিলো রাজের বিয়ের দিন। আর তার বিয়ের দিন। আজও এরকমই হতো। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন নিজেকে সামলে নিয়েছে হিয়া। এখন নাফির সঙ্গে কি বলবে সে? তার কি মনে নেই নাফি তাকে রিজেক্ট করেছিলো? যদিও এখন সে নাফির বউ তবুও তো এটা তার জন্য অপমানের। ভবিষ্যতে নাতি নাতনিদের সামনে যখন নাফি গল্প করবে এসব কথা, তখন হিয়ার মানসম্মান কোথায় যাবে? হিয়া জানালার দিকে মুখ দিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখতে লাগলো।
নাফি একটা ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি থামালো। গাড়ি হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় হিয়া অবাক হলো বৈকি! তবুও সে নাকির দিকে ফিরে তাকালো না। বাধ্য হয়ে কথা শুরু করলো নাফি নিজেই।
"আমার কল মেসেজ কেন ইগনোর করছো মিসেস নাফি?"
অপরিচিত নামের ডাক শুনে থমকালো হিয়া। কি আশ্চর্য, এখন এটাই তার পরিচয়! হিয়া কোনমতে আওরালো,
"এমনি।"
"এমনি কেন?"
হিয়া তখনও অন্য দিকে তাকিয়ে। নাফির দিকে তাকাতে যে লজ্জা লাগছে তার।
"এমনিই।"
"কি এমনি?"
হিয়া ফের বলল,
"এমনিই।"
নাফি তপ্ত শ্বাস ফেললো। এই মেয়ের মাথা নিশ্চিত খারাপ আছে। নাফি নিজের সিটবেল্ট খুলে একটু এগিয়ে গেল হিয়ার দিকে। নাফির নড়াচড়া বুঝতে পারলো সে। ঘুরে দেখতে গেল ব্যাপারটা। সাথেসাথেই দুজনের দুরত্ব কমে আসে। হিয়ার নাক ছুঁয়ে যায় নাফির নাকে। বিনিময় হয় দু'জনের মোহিত দৃষ্টি। কেউ কিছু বলে না, কোনো টু শব্দ পর্যন্ত হয় না। শুধু চোখে চোখে বিনিময় হয় না বলা কিছু কথা। এভাবেই কাটে কিয়ৎক্ষন।
"বেশি ভয় পেয়েছো?"
হঠাৎ নাফির কথাতে চকিতে ওঠে হিয়া৷ ঘাড় নেড়ে জানায় ভয় পায়নি। নাফি হিয়ার গাল স্পর্ষ করে আবার। যে স্পর্শে কেঁপে ওঠে হিয়া। এর পরপরই নাফি বলে ওঠে,
"স্যরি প্রিয়তমা। আমি জানি তুমি ভয় পেয়েছো। জাস্ট একটা সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। বুঝতেই পারিনি এতটা ভয় পাবে।"
হিয়া কোনো উত্তর দেয় না। দৃষ্টি নিচে নামিয়ে রাখে।
"তুমি কল রিসিভ করছো না বিধায় আজকে আম্মুকে কল করেছিলাম। তোমার খবর জানতে চাইলাম। বললো, তুমি তোমার ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গেছো। তখনই ভাবলাম একটু দেখা করা যাক। আমি এসে দেখলাম তুমি একা একা বসে আছো। আর তখনই এই পরিকল্পনা করলাম।"
হিয়ার মনে পরে আসার সময়ে মাকে বলে এসেছিলো কোথায় দেখা করবে তারা। মা নিশ্চয়ই নাফিকে বলে দিয়েছে। হিয়া কিছু বলে না। নাফির স্পর্শে সে লজ্জা পাচ্ছে। যার হিয়ার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে। নাফি এই ব্যাপারটাই ইনজয় করছে আপাতত। হিয়ার চুপ থাকা দেখে নাফি বুঝলো, মেয়েটা আজকে নিশ্চয়ই চুপচাপ থাকার ব্রত করে এসেছে। নাহলে হ্যাঁ হু কিছু তো একটা বলবে। নাফি এবারেও ব্যর্থ শ্বাস ফেললো। গাড়ি স্টার্ট করলো ফের। এইবার গাড়ি সোজা গিয়ে থামলো হিয়াদের বাড়ির সামনে। বাড়ির সামনে আসতে পেরে হিয়া তো মহা খুশি। নাফু গাড়ি থামাতেই হিয়া নামতে উদ্ধত হলো। এতে বাঁধ সাধলো নাফি।
"এতো ব্যস্ত কেন মিসেস?"
আর কিছু না বলে ব্যাক সিট থেকে কয়েকটি প্যাকেট আনলো সে। কয়েকটি বলতে বেশ কয়েকটি। হিয়া এতক্ষণ খেয়াল করেনি এসব। নাফি কোন কথা না বলে হিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলো সে'সব। ফের হিয়ার অনেকটা কাছাকাছি এসে বলল,
"এখানে যা যা আছে তাই দিয়ে সাজবে আজ। আমি খুব শীঘ্রই আসছি।"
চলবে?
আজকে দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো না। হুট করে মনে হলো কিছু একটু লিখি। এটা কিন্তু সারপ্রাইজ পর্ব। সবাই রেসপন্স করবেন হ্যাঁ? আর ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন।