ফন্ট সাইজ:
থিম:
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি

৩১তম পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৩১)

লেখনীতে : #অহনা_রহমান

"আমি তো এমন হিয়াকে চিনি না, যে হিয়া অন্যায়কারীকে দেখে ভয় পায়। যে হিয়া নিজেকে গুটিয়ে রাখে। আমি তো বরং ভালোবেসেছি স্ট্রং হিয়াকে। যে ঠকে গিয়েও ভেঙে পড়েনি। সেই হিয়া চোখে চোখ রেখে সত্য বলেছে বারংবার। তাহলে এখন কি হলো তার? মাঝেই আমার চিন্তা হয়। আমি কি হিয়া নামক পাখিটার ডানায় আঘাত করেছি? সে আর উড়ে না কেন? আমি কি জানতে পারি কি হয়েছে তার?"

নাফি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল গুলো ঠিক করছে৷ সে পুরোপুরি রেডি হয়ে গেছে। সাদা শার্ট এবং কালো প্যান্টের ফর্মাল গেটআপে। হিয়া খাটে বসে নাফিকেই দেখছিলো। এবং নাফির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলো সে। হয়তো কোনো এক রূপকথার রাজ্যে! হঠাৎ তার ঘোর কাটে নাফির কথা বলার শব্দে। তখন মেয়েটি হকচকিয়ে উঠলো। এবং চকিত নজরে সামনে তাকালো। নাফি ততক্ষণে হাঁটু গেঁড়ে বসেছে হিয়ার সামনে। তা দেখে মেয়েটি অবাক হলো। ব্যস্ত কন্ঠে আওরালো,

"ক'ক'কি করছেন?"

নাফি হিয়ার কথার জবাব না দিয়ে, হিয়ার পায়ের নুপুর জোড়া ঠিক করে পড়িয়ে দিলো। দুই পায়ের নুপুর এমন অবস্থায় ছিলো, হিয়া যদি উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করতো, তাহলে নিশ্চিত উষ্টা খেয়ে পড়তো। যা হিয়া নাফির কর্মকাণ্ডের পর খেয়াল করলো। হিয়া ভাষা হারিয়ে ফেললো। একটা মানুষ ঠিক কতটা খেয়াল করে দেখলে এই সামান্য বিষয়টা ও নজর এড়ায় না? নাফি ঠিক কতটা খেয়াল রাখে হিয়ার! হিয়া ভাবতে পারলো না।

নুপুর জোড়া ঠিক করে নাফি উঠে দাঁড়ালো। চিবুক উঁচু করে ধরলো হিয়ার। হিয়া চোখ রাখলো নাফির মুখশ্রীতে। ঠিক তখনই নাফি বলল উপরোক্ত কথা গুলো!

হিয়া বুঝলো নাফির কথার অর্থ। এই যে হিয়া, এখন রাজ ও রুহিকে কিছু বলে না তাই তো! ওদের সাথে দুরত্ব বজায় রেখে চলে। আবার ওরা ঝামেলা করলেও হিয়া কিছু বলে না। তাই তো! "আমি জানি তো, আপনি প্রতিবাদ করেন। আপনি থাকতে আমি কেনো ওদের সাথে মুখ মেলাবো?" নাফির সুন্দর চেহারার দিকে তাকিয়েহিয়া মনে মনে বললো এসব। তবে মুখে বলল,

"এখন যে সম্পর্কের পরিবর্তন হয়েছে। আমি চাই না, আমার কোনো কার্যকলাপে আপনার অসম্মান হোক৷ আমি চাই না, আপনার আগে গিয়ে কোনো কাজ করতে। যার খেসারত আপনাকে দিতে হয়। আপনিই তো বলেছিলেন, আমাকে রক্ষা করবেন৷ আমার অসম্মান হতে দেবেন না। আমি তে আপনার উপর ভরসা রেখেই চুপচাপ থাকি৷"

নাফি আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো হিয়ার কপালে। খানিকটা হাসলো ও সে। তবে তা হিয়া দেখলো না। নাফি এরপর বসলো হিয়ার পাশে। হিয়ার মাথাটা টেনে নিজের কাঁধের উপর রাখলো। বলল,

"ময়না, এই যে বললে না সম্পর্কের পরিবর্তন? এটা আমাকেও মেইনটেইন করতে হয়। এই যে দেখো, রুহি তো আমার ছোটো ভাইয়ের বউ। ও তোমার সাথে অন্যায় করে এবং করেছে তা আমি জানি। কিন্তু আমি কিছু বলতে পারি না। কেননা আমি সম্পর্কে ভাসুর হই। এখানে আমার সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা আছে৷ কিন্তু ও তোমার বোন হয় আর এখন বড় জা। এখানে কিন্তু তোমার চুপ থাকাটা বড়ই বেমানান। এখানে যেহেতু আমি অপারগ, তাই তোমার নিজেকে নিজেই রক্ষা করা উচিৎ। বুঝলে? আমার ভাইয়ের বিষয়টি আমি দেখবো। ওটা তোমার ভাবতে হবে না৷ তুমি শুধু রুহিকে সামলাও৷ মনে রেখো ওরা জিতে গেলে কিন্তু তুমি হেরে যাবে হিয়া৷ আর তুমি হারলে হেরে যাবো আমিও "

"আমার যে ভয় হয়। আমার জন্য যদি আপনাকে অসম্মানিত হতে হয়? ওরা যদি প্রকাশ করে দেয়, আমার অতীত! তখন.....!"

হিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগে নাফি বলে উঠলো,

"একটা কথা বলোতো, তোমার বিয়ে হয়েছে কার সাথে?"

হিয়া ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।

"হ্যাঁ?"

"বিয়ে কার সাথে হয়েছে তোমার? আমার কি হও তুমি?"

হিয়া থতমত খাওয়া গলায় বলল,

"আ‘আপনার সাথে।"

"আমি তো সব মেনে নিয়েছি ময়না। এবং তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি আমি। তাহলে কে কি বললো না বললো তুমি কেন দেখবে পাখি? ওরা যা করবে, করতে দাও। আর আমার অসম্মান? সেটা আমার ভাই, ইহজন্মেও করবে না। যতদিন না কোন কাজ করছে, ততদিন তো অসম্ভব। দিন শেষে ওকে আমার কাছেই আসতে হবে৷"

হিয়া আর কিছু বললো না। তার তো মুখ চুলকাই রুহিকে কিছু বলার জন্য। শুধুমাত্র নাফির কথা চিন্তা করে সে কিছু বলে না। এখন যখন নাফিই চাইছে, সে প্রতিবাদ করুক। তাহলে আর অপেক্ষা কিসের?

নাফি নিজের দামী হাত ঘড়িতে সময়টা দেখে নিলো। নাহ! আর দাঁড়ানো যাবে না। এখনই যেতে হবে। ও শেষবার হিয়ার কপালে চুমু খেলো। হিয়াকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল অফিসের উদ্দেশ্যে। বলে গেল, আজ যেন হিয়া ভার্সিটিতে না যায়।

----

হিয়া নিজের রুমে বসে ফোন স্ক্রল করছিলো। এমন সময় দরজায় নক করলো কেউ। নাফির সঙ্গে বকবক করাতে, বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো সকালের বিষয়টা। দরজার শব্দ শুনে হিয়ার মনে পড়লো তখনকার কথা। মনে মনে হাসলো ও। একেই বোধহয় বলে, ফান্দে পড়া! হিয়া তাচ্ছিল্য হেঁসে উঠলো। কি অদ্ভুত! যে মেয়েটাকে এভাবে ঠকালো, এখন নাকি তার কাছেই হাত পাততে হবে। হাস্যকর!

দরজা খুলে রুহিকে দেখতে পেলো হিয়া। রুহি ওকে দেখে বাঁকা হাসলো। হিয়া বুঝলো, কালকের ঘটনার জন্য রুহি ভীষণ খুশিতে আছে। রুহি বোধহয় বুঝলো না, এভাবে সে নিজেকে নির্লজ্জ প্রমান করলো। রুহি নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

"কালকের জন্য আমি দুঃখীত হিয়া।"

"তুমি আমার নাম ধরেছো কেন? এসব কোন ধরনের অভদ্রতা? কারো কথায় মানো না দেখছি৷"

রুহি হেঁসে উঠলো শয়তানের মতো৷ বলে উঠলো,

"আমার সংসারে আগুন লাগিয়ে এখন দেমাগ দেখাস?"

"অবশ্যই দেখাচ্ছি। সমস্যা তোমার? অবশ্য সমস্যা থাকারই কথা। যার জামাই বেকার, আমার স্বামীর কাছে হাত পাততে হয়, তার সমস্যা থাকারই কথা।"

রুহি হাত ওঠালো হিয়ার উপর। মারতে গেল হিয়াকে। তবে তার আগেই হিয়া ধরে বসলো রুহির হাতটা। হিয়া একটুও টললো না। রুহির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো৷ দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

"খবরদার! এমন দুঃসাহস দ্বিতীয়বার দেখাতে এসো না। হাত একদম ভেঙে দেবো। আর তোমার ভাসুর মানে আমার স্বামীকে চেনো তো? আমার গায়ে একটা টোকা লাগলে কিন্তু সে আর ভাসুর-টাসুর মানবে না। সোজা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে।"

রুহি কিছু বলার আগে নিচ থেকে ডাকলো রাজ,

"রুহি কতক্ষণ লাগে তোমার? আমি বেরোবো তো।"

রাজের কথার জবাবে হিয়া চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

"বেয়াদব বিয়ে করলে এমনই হয় দেবরবাবু!"

হিয়ার বলা শেষের সম্মোধন শুনে রাজ যেন ধাক্কা খেলো একটা। হজম করতে পারলো না বিষয়টা। ও ছিলো দাঁড়ানো। হিয়ার কথা শুনে রাজ পাশে থাকা শোফায় বসে পড়লো। বুকের সেই চিনচিন ব্যাথাটা আবারও শুরু হলো। আজকাল হিয়াকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর রমনী মনেহয় তার। নাফির পাশে দেখলে হিংসা লাগে। এই যে কালকে এতটা মার খেলো, অথচ হিয়ার প্রতি তার ভাইয়ের এতোটা ভালোবাসা দেখে সে কিছুই করতে পারলো না। নাহলে তো সেও ঝামেলা বাধাতো। কিন্তু যখনই শুনলো তার ভাই হিয়া নামক মেয়েটাকে এতটা ভালোবাসে তখনই তো তার সমস্ত শক্তি অদৃশ্য কোন জাদুতে চলে গেল। রাজ আর ভাবতে পারলো না। সে নিচে হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো। আজকাল সবকিছুতেই তার বিতৃষ্ণা জমে গেছে।

---

হিয়া রুহির দিকে তাকালো এবার। ওর মতোই নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

"রুহি আপা আ'ম সো স্যরি! এটা কিন্তু বোন হিসেবে বলিনি৷ তুমি যেহেতু আমার ছোট জা, তাই একটু শাসন করলাম। প্লিইজ ডোন্ট মাইন্ড!" আস্তে আস্তে আবার বলল,

"অবশ্য মাইন্ড করলেও আমার কিছু যায় আসে না।"

হিয়ার হাতে তখনও রুহির হাত। হিয়া রুহির হাতে নাফির দেওয়া টাকা গুলো গুঁজে দিলো। ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে দিলো। রুহির মুখের সামনেই দরজা বন্ধ করে দিলো ও। লজ্জায় অপমানে রুহির পা জোড়া ভেঙে এলো। একটু হলেও অনুধাবন করতে পারলো, কালকে ভার্সিটিতে হিয়ার সাথে কি হয়েছে। হিয়ার ওই সময়ে কেমন অনুভব হচ্ছিল। কিন্তু এসব অনুভূতি রুহির বেশিক্ষণ থাকলো না। কথায় আছে, কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। রুহির ব্যাপারটাও তাই। জীবনে প্রথমবার এতোটা অপমানিত হলো সে৷ রাজের কাছে গিয়ে রুহি ওর মুখের উপর ছুঁড়ে মারলো টাকা গুলো৷ খেঁকিয়ে বলল,

"অকর্মা, কাপুরুষ কোথাকার! তোর যখন ইনকাম করার মুরোদ নেই, তাহলে কেন বিয়ে করেছিলি আমাকে? মাদা**** তোর টাকার দরকার তুই ভিক্ষা করতে পারলি না? আমাকে কেন পাঠাইলি খা*** পো***!"

শেষের কথাটা শুনে রাজ আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না। কষিয়ে এক চড় মেরে বসলো রুহির গাল বরাবর। চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল নিজেদের রুমে। ঠাস করে দরজা আঁটকে, রুহিকে ছুঁড়ে মারলো দেয়ালের দিকে। রুহি তাল সামলাতে না পেরে বারি খেলো দেয়ালে। তবে বেশি কিছু হলো না তার। রুহি নিজেকে সামলানোর আগে রাজ আবারও হামলা করলো ওর উপর। রুহির গলাটা টিপে ধরলো। চোখ পাকিয়ে বলে উঠলো,

"বিয়ে আমি করতে চেয়েছি নাকি তুই এসেছিলি আমার কাছে? ডাইনি কোথাকার! তোর চেয়ে হিয়া হাজার গুন ভালো। দেখেছিস ওরা কেমন সুখী? আর তোরে বিয়ে করে আমার জীবনটা জাহান্নাম হয়ে গেছে।"

রুহি ছটফট করতে থাকলো ছাড়া পাওয়ার জন্য। দম আঁটকে আসছে তার। রাজ ওকে ছাড়ার আগে ফের বলল,

"এতোবার ভাবি তোকে কিছু বলবো না। কিন্তু তুই শালা এমন একটা চিজ! এমন একেকটা কাজ করিস যাতে মাইর ফরজ হয়ে যায়। আচ্ছ কি করলে একটু শান্তি দিবি তুই? আমি জাস্ট বিরক্ত রুহি।"

রাজ রুহিকে ছেড়ে দেওয়া মাত্রই রুহি তেড়ে উঠলো। রাজের কলার ধরে বসলো ও। অশ্রাব্য গালি দিয়ে বলল,

"বা*** তোর সাহস কি করে হয় আমার গায়ে হাত দেওয়ার? হিয়া এখন খুব ভালো হয়েছে তাই না? ওরে যে রেইপ করাতে চেয়েছিলি, জানে তোর ভাই? বলবো নাকি? দেখি কি করে?"

রুহির কথা শুনে রাজ শিথিল হয়ে এলো। কাল রাতে যে মারটা খেয়েছে! এখন যদি এই কথা নাফির কানে যায়, তাহলে ও রাজের হাড় একটাও আস্ত রাখবে না এটা শিওর।

চলবে?

(শব্দসংখ্যা: ১৩০০+)

ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন