ফন্ট সাইজ:
থিম:
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি

৩৫তম পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৩৫)

লেখনীতে: #অহনা_রহমান

রাবেয়া হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো ড্রয়িংরুমে। হিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ফ্লোরে৷ অজ্ঞান অবস্থায়। হিয়াকে ওই অবস্থায় দেখে রাবেয়া চিৎকার করে উঠলো। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সে৷ বেশি জোরেও আসতে পারলো না৷ তবুও নিজের সমস্তটা দিয়ে রাবেয়া ছুটে এলো। হিয়ার পাশে বসে পড়লো রাবেয়া। এরপর হিয়ার মাথাটা নিজের কোলের উপর নিয়ে, আস্তে আস্তে হিয়ার গালে চাপড় দিতে লাগলো। মেয়েটা ততক্ষণে ঠোঁট উলটে কেঁদে ফেলেছে৷

“ছোড আফা? হিয়া আফা, ওডেন। কি হয়ছে আফা?”

হিয়া উঠলো না৷ শুনলো না রাবেয়ার কথা৷ রাবেয়া কি রেখে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না৷ ও হিয়াকে আলতো করে আবার শুইয়ে রাখলো। ড্রয়িংরুমের এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকলো আতঙ্কে। হঠাৎ মনে হলো, নাসিমাকে কল করার কথা৷ তখনই রাবেয়া থামিয়ে দিলো নিজের ছোটাছুটি। সেও এই একটু-খানিতেই হাপিয়ে উঠেছে। রাবেয়া ফের গেল হিয়ার কাছে৷ এবারে নিজের অন্তর্বাসের ভেতর থেকে বের করলো নিজের বাটন ফোনটা। এক মুহূর্ত সময় অপচয় না করে কল করলো, নাসিমার ফোনে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বেশ কয়েকবার কল করার পরও নাসিমা কল রিসিভ করলেন না। এতে যেন রাবেয়ার দুশ্চিন্তা আরও বাড়লো। অসুস্থ শরীরটা নিয়ে রাবেয়া হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। আর হিয়াকে ডাকতে লাগলো। স্বল্প শিক্ষিত রাবেয়া একবারও ভাবলো না, হিয়ার চোখেমুখে পানি দিলেই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। রাবেয়া আবারও চেষ্টা করলো কাউকে জানানোর। অনেক খুঁজে নিজের ফোনে নাফির নাম্বার টা পেলো সে৷ এরপর শুরু করলো লাগাতার কল দেওয়া।

নাফি তখন অফিসের কাজে ব্যস্ত। নতুন প্রজেক্ট শুরু করার পর কাজের পরিমাণ যেন বেড়েছে৷ একটুও বাড়তি সময় পায় না সে। রাবেয়ার কল দেখেও সে রিসিভ করার সময় পেলো না। কিন্তু একাধারে কল দেওয়াতে নাফি খানিকটা বিচলিত হলো। নাফি ক্লান্ত হয়ে নিজের কেবিনের চেয়ারে মাথাটা এলিয়ে দিলো। এরপর সে রাবেয়ার কল রিসিভ করলো। তৎক্ষনাৎ ওপাশ থেকে শুনতে পেল, রাবেয়ার কান্নার শব্দ। নাফি হতভম্ব হয়ে গেল রাবেয়ার কান্না শুনে। ক্লান্ত মুখশ্রীতে ফুটে উঠলো চিন্তার ছাপ। নাফি কিছু বলার আগেই শুনতে পেল, রাবেয়ার বলা কিছু শব্দ,

“ভাইজান, ছোডআফা বেহুশ হয়ে গেছে৷ ভাইজান, তাড়াতাড়ি আহেন ভাইজান৷ আমার ডর লাগতেছে।”

হিয়ার কথা শুনে নাফি তড়িৎ উঠে দাঁড়ালো। একটু আগের ক্লান্ত নাফি মুহুর্তেই সবল হয়ে গেল। চেয়ারের হাতলের থেকে নিজের কোর্ট না নিয়ে, দ্রুত কেবিন ছেড়ে বের হলো। রাবেয়া উদ্দেশ্যে বলল,

“আমি এক্ষুনি আসছি। ডাক্তারকে কল করছি আমি৷ ময়নার মুখে পানির ছিটা দে। আমি কলে থাকছি। যা বলছি দ্রুত কর।”

এরপর নাফি একজন কলিগকে বলল ওর অসুবিধার কথা। সে যেন একটু সামলে নেয় এদিকটা। তারপর আর নাফি দাঁড়ালো না সেখানে। লিফট বেয়ে নেমে এলো বহুতল ভবন থেকে।

ওদিকে রাবেয়া প্যানিক করতে করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ রাবেয়া হিয়ার চোখেমুখে পানির ছিটা দিলো। তবে হিয়ার রেসপন্স পাওয়া গেল না৷ নাফি তখনও ফোনে এটা-ওটা বলে যাচ্ছে৷

ঠিক তখনই কলিংবেল বাজলো। রাবেয়া ভাবলো, নাসিমা এসেছে। ও কাঁদতে কাঁদতে ছুটলো দরজার দিকে। দরজা খুলে দেখতে পেল রাজ দাঁড়িয়ে৷ রাবেয়া যেন প্রান ফিরে পেলো। রাবেয়াকে কাঁদতে দেখে রাজ বলল,

“কি হয়েছে তুই কাঁদছিস কেন?”

রাবেয়া কান্না জড়িত গলায় বলল,

“ভাইজান, ছোডআফা অজ্ঞান হয়ে পরে আছে ভাইজান। শিগগির আসেন।”

রাবেয়ার কথা কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্রই রাজ দৌড়ে ড্রয়িংরুমে গেল। হিয়াকে ওই অবস্থায় দেখে রাজও হতভম্ব হয়ে গেল। প্রথমে হিয়াকে কোলে তুলে নিলো রাজ। আস্তেধীরে সোফায় শুইয়ে দিলো। এরপর পানির ছিটা দিতে থাকলো লাগাতার। কিছুক্ষণ পর হিয়ার চোখ দুটো নড়ে উঠলো। হিয়া পিটপিট করে তাকালো এবারে৷ কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলো না মেয়েটা।

রাজ কিছু বলতে চেয়েও পারলো না হিয়াকে৷ কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন তার গলাটা চেপে ধরেছে। রাজ ও রাবেয়া তাকিয়ে ছিলো হিয়ার দিকে। ঠিক তখনই কলিংবেল বাজলো। রাবেয়া গিয়ে দরজা খুলে দিলো আবার। দেখলো নাফি এসেছে সঙ্গে একজন মহিলা ডক্টর। রাবেয়া ডক্টরকে আগেও দেখেছে। নাসিমার বান্ধবী তিনি। সে হিসেবে বেশ কয়েকবার এসেছেন এই বাড়িতে৷

রাবেয়া দরজা ছেড়ে দাঁড়ালো। নাফি এবং ডক্টর মাহবুবা ভেতরে এলেন। হিয়াকে স্থির হয়ে পড়ে থাকতে দেখে নাফির কলিজা মোচড় দিয়ে উঠলো। ও হিয়ার শিওরে বসলো গিয়ে। হিয়ার মাথাটা নিজের কোলের উপর নিলো। নাফির চোখে যেন অশ্রু চিকচিক করছে। ভাঙা কন্ঠে বলল,

“কি হয়েছে ময়না? এভাবে পড়লে কিভাবে?”

মাহবুবা নাফির কান্ড দেখে হাসলেন। বললেন,

“দেখি সরো৷ দেখা যাচ্ছে তো, তোমার বউ ঠিক আছে৷ এতো কান্নাকাটি করো না।”

নাফি মাহবুবার কথা গায়ে মাখলো না৷ বরং বলল,

“আন্টি, আমার হিয়া এভাবে স্থির থাকার মেয়ে নয়। আপনি দেখুন না কি হয়েছে।”

মাহবুবা এবারে বেশ মুগ্ধ হলেন। এখনকার সময়ও স্ত্রীকে এভাবে ভালোবাসা যায়? মাহবুবা বললেন,

“আচ্ছা তুমি সরো আমি দেখছি।”

“ওকে রুমে নেওয়ার ব্যবস্থা করো নাহয়!”

মাহবুবার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে নাফি হিয়াকে কোলে তুললো। সবাইকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগলো দোতলায়। রাবেয়া মাহবুবাকে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে গেল দোতলায়। নিচে শুধু রাজ রইলো। কেন যানি রাজ যেতে পারলো না সবার সাথে। ওর ও চিন্তা হচ্ছে হিয়ার জন্য। নাফি ও হিয়ার দিকে তাকিয়ে রাজ মলিন হাসলো। হাসির সাথে হাহাকার গুলো ঝেড়ে ফেলার পায়তারা করছিলো ছেলেটা। কিন্তু তা আর পারলো কই!

হিয়া ততক্ষণে একটু স্বাভাবিক হয়েছে। মাহবুবার সাথে বিরবির করে টুকটাক কথা বলছে সে। মাহবুবা প্রথমেই হিয়ার পালস পরীক্ষা করলেন। এটা শিওর হলেন, হিয়া শরীর দুর্বলের জন্যই অজ্ঞান হয়েছেন। তবে তিনি অন্য কিছুর সন্দেহ করলেন! হিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন,

“আচ্ছা মা, তোমার কি মাথা ঘুরায়?”

হিয়া জানালো,

“হ্যা।”

“কবে থেকে?”

“বেশ কয়েকদিন।”

“বমি-টমি হয় নাকি?”

হিয়া নাফির দিকে আড়চোখে তাকালো। একবার দেখে নিলো নাফির চেহারা। বলল,

“হ্যাঁ। অনেকদিন যাবত ধরে হচ্ছে এরকম।”

“খাবার-দাবার খেতে পারো তো?”

হিয়া জবাব দেওয়ার আগে দরজা দিয়ে ঢুকলেন নাসিমা৷ তিনি বলে উঠলেন,

“খায় না মাহু। আগে মুটামুটি খেলেও এখন আর খেতে চায় না৷ না খেলে, মাথা ঘুরে পড়বে না?”

মাহবুবা মুচকি হাসলেন হিয়ার দিকে তাকিয়ে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে হিয়ার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

“পিরিয়ড হয় না কতদিন?”

হিয়া যেন তাজ্জব বনে গেল। সবাই ওদের দিকেই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। হিয়ার তখন মনে পড়লো, আসলেই তো! অনেকদিনই তো তার পিরিয়ড হয় না৷

মাহবুবা নিজেই বললেন,

“কি অনেকদিন তাইনা?”

হিয়া অস্ফুট স্বরে বলল,

“হুম।”

মাহবুবা স্বাভাবিক হয়ে বসলো আবার। হিয়ার পালস পরীক্ষা করলেন আবারও। আরও কিছুক্ষণ দেখলেন হিয়াকে। এরপর মুখটা ছোট করে বসে রইলেন সিরিয়াস ভঙ্গিতে। নাফি-নাসিমার উৎকন্ঠা বাড়লো আরও৷ নাসিমা এগিয়ে গেলেন। মাহবুবার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

“কি হয়েছে মাহু? হিয়ার কি হয়েছে?”

মাহবুবা কথা না বলে কাঁধ থেকে নাসিমার হাতটা সরিয়ে দিলেন। তা দেখে নাফিও এগিয়ে এলো৷

“আন্টি কোনো কথা বলছেন না যে৷ কি হয়েছে হিয়ার?”

মাহবুবা কেমন গুমোট গলায় বলল,

“সরি নাফি, সরি নাসিমা। তোরা আমাকে মাফ করে দিস।”

মাহবুবার এমন কথা শুনে নাফির হৃদপিণ্ডটা থেমে গেল যেন। ও একবার তাকালো হিয়ার দিকে। আরেকবার তাকালো নিজের মায়ের দিকে৷ বেচারা কিছুই বুঝতে পারছে না। কি হয়েছে হিয়ার? নাসিমার অবস্থাও তাই। উনি মাহবুবার দিকে তাকিয়ে আছেন ব্যাকুল হয়ে। সময় যেন থেমে গেছে ওখানেই। কারও মুখে টু শব্দটি নেই। হিয়া নিজেও আকাশ থেকে পড়েছে৷ তার আবার কি হলো! ও ভাবুক হয়ে তাকিয়ে রইলো মাহবুবার দিকে। তিনজনের এমন উদ্ভট চাহনি দেখে মাহবুবা ফিক করে হেঁসে উঠলেন,

“এইবারে আমার চার্জটা বেশিই দিতে হবে সাথে মিষ্টিও খাওয়াতে হবে আনলিমিটলেড। এইজন্যই আগে থেকে সরি বললাম।”

মাহবুবার কথা শুনে ওরা তিনজনই অবাক হলো। নাফি বলল,

“মানে? কি হয়েছে আন্টি? কিছুই তো বুঝলাম না।”

মাহবুবা হেঁসে বললেন,

“এ বাড়িতে নতুন সদস্য আসতে চলেছে। তুমি বাবা হচ্ছো নাফি।”

নাসিমাকে জড়িয়ে ধরে মাহবুবা একই ভাবে বললেন,

“তুই দাদু হবি নাসু। এর চেয়ে খুশির আর কিইবা হতে পারে?”

মাহবুবা নাসিমাকে ছেড়ে দিয়ে হিয়ার গালে আদর করে দিয়ে বললেন,

“তুমি মা হচ্ছো পাগলী মেয়ে। এইবার সিরিয়াস হতে হবে কিন্তু।”

সবাই আপাতত শক খেয়েছে এমন খবরে। শুধু হিয়া পিটপিট করে তাকালো নাফির দিকে।

চলবে?

ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন।

(ছবিটি আপকামিং কোনো পর্বের)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন