ফন্ট সাইজ:
থিম:
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি

৩৮তম পর্ব

লেখক: অহনা রহমান

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৩৮)

লেখনীতে: #অহনা_রহমান

এমনিতেই তো নাফির চোখের মনি হিয়া। আর এখন তো, তার সন্তান হিয়ার গর্ভে! নাফিকে আর পায় কে! হিয়াকে পারে না মাথায় নিয়ে ঘোরে। এখন নাফির সকল আত্মীয় স্বজন জেনে গেছে, তার বিয়ে হয়েছে। রুহির বোনের সাথেই নাফির বিয়ে হয়েছে। এই নিয়ে অবশ্য বেশ কয়েকজন নানারকম মন্তব্য করেছে। কিন্তু এটা জরুরি না, জরুরি হলো হিয়ার প্রতি নাফি ও নাসিমার এতো আদর যত্ন দেখে সেদিন নাফিকে একজন বলল,

“ভাই ঘরের বউকে এতো তুলুতুলু করে কে রাখে? মনে হয় আর কারো বউ নেই। এই বউ জাতকে না, এতো মাথায় রাখতে নেই। এদের রাখতে হবে সারাক্ষণ দাঁতের উপরে। নাহলে না বউ’রা বাধ্য থাকবে!”

কথাটা বলেছিলো নাফির এক ছেলে কাজিন। সম্পর্কে সে আবার নাফির সিনিয়র। তার কথা শুনে নাফি কি যে অবাক হয়েছিল! অবাক হয়ে বলেছিলো,

“কি যে বলেন! বউ আবার দাঁতের উপর রাখে কিভাবে? আমি তো ভেবেই পাই না মানুষ বউ পিটাই কিভাবে। বউ হচ্ছে আদরের জিনিস। তাকে সবসময় পুতুলের মতো রাখতে হবে৷ সে বায়না ধরবে, রাগ করবে এটাই তো স্বাভাবিক। একজন দায়িত্ববান স্বামী হিসেবে সেই রাগ পুরুষের ভাঙাতে হবে। এটাই তো নিয়ম। এখানে আবার ঝগড়াঝাঁটি কোথা থেকে আসবে? কেনই বা স্ত্রীকে ঝগড়ার উপর রাখবো?”

“এতো লাই দিলে মাথায় উঠে যায়। কোন সময় দেখবা, ঘাড় মটকে চলে যাবে।”

“সারাদিন যদি খ্যাঁচখ্যাঁচ করেন, ঘাড় মটকে দেওয়ায় স্বাভাবিক।” বিরবির করে নাফি কথাটা বললেও ভদ্রতার খাতিরে সামনাসামনি বললো না। লোকটাকে বলল,

“শুনুন ভাই, আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে কেমন ব্যবহার করবেন সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার। কিন্তু জেনে রাখুন, মেয়েলোক নরম কোমল হয়। এদেরকে যত্নে রাখাই উত্তম৷ আরেকটা কথা হলো, কথায় আছে ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’! সর্বপরি তারাও মানুষ। তো আপনি যেমন ব্যবহার করবেন তেমনই তো পাবেন তাই না?”

নাফির কথা শুনে সোহেল নামের ব্যক্তিটি ক্ষেপে গেলেন। তিনি চটে গিয়ে কিছু বলতেই যাবেন তার আগেই কেটে পড়েছিলো নাফি। মুর্খের সাথে তর্কে না জড়ানোই উত্তম!

*

নাফি আছে তার লজিক নিয়ে। স্ত্রীরা পুতুলের মতো। তাদেরকে পুতুলের মতোই রাখতে হবে। যেমনটা সে রাখে, তার পুতুল বউ হিয়াকে।

সেদিনের কথা মনে পড়তেই হেঁসে উঠলো নাফি। সেদিনের কথা মনে পড়ার কারণ আছে। আজ হয়তো সোহেল আসবে। শুধু সোহেল নয়, নাফিদের আত্মীয়-স্বজন যেখানে যারা আছে সকলেই আসবে৷ নাফির বিয়ের সময় কোনো অনুষ্ঠান করা হয়নি। কিন্তু আজ হবে। হিয়ার পরিবারের সকলে-ও আসবে।

বাজে এগারোটা। হিয়া সকাল থেকে বমি করতে করতে কাহিল হয়ে আছে। বিছানায় শুয়ে আছে সে। বাড়িতে মেহমান আসা শুরু করেছে। কিন্তু তার যাওয়া বারণ। নাফি পইপই করে নিষেধ করেছে, নিচে যেতে।

“না না কোনো দরকার নেই নিচে যাওয়ার। একেবারে সেজেগুজে পারলে ছাঁদে যেও৷ যদি কষ্ট হয়ে যায় তো তাও যাওয়ার দরকার নাই। একটু গুছিয়ে রুমে বসে থাকবে। যার দরকার হবে, সে এসে দেখে যাবে।”

হিয়া অবাক হলো। আশ্চর্য! সবকিছু একটু বেশি বেশি! আর কেউ কি মা হয়নি কখনো? নাকি সে’ই দুনিয়ার একমাত্র প্রেগন্যান্ট মহিলা! হিয়া কিছু বলতে গিয়েও বলেনি তখন৷ আর বাহিরে লোকজন থাকার কারণে নাফিও বেশিক্ষন দাঁড়াতে পারেনি ওর কাছে। নাফি চলে যাওয়ার পর থেকেই হিয়া ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে বিছানায়। আজ সে কোথাও যাবে না আর সাজবেও না। শুয়ে থাকতে থাকতে হিয়ার চোখটা লেগে এসেছিলো। হঠাৎ একটা শব্দে ও ধরফরিয়ে উঠে বসলো।

“সুখের ঘুম আর কত ঘুমাবি বোন? এবার ওঠ৷”

রুহি শব্দ করেছিলো খাটের পাশের টেবিলে। হিয়া সেই শব্দেই উঠে বসেছিলো। ও বসামাত্রই রুহি বলল কথাগুলো। হিয়ার মেজাজ খারাপ হলো। এমনিতেই ভয় পাইয়ে দিয়েছে! এখন আবার ঢংয়ের কথা বলছে৷ যত্তসব ফাউল!

“হ্যাঁ উঠলাম। কিছু বলবে?”

রুহির সাথে কারো সম্পর্ক একটুও ভালো হয়নি। বরং খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে রাজের সাথে!

রাজ এখন নাফির সাথে অনেকটাই সহজ ভাবে কথা বলে। হিয়ার সাথে দরকার ছাড়া বলে না। তবে বললে ভালো ভাবেই বলে।

রাজ এখন কারো সাথে মিশে না তেমন। ভার্সিটির ক্লাস শেষে, রাজ আজকাল পার্টটাইম জব’ও করে। মুলত এসবই ভালো লাগেনা রুহির। রুহি আগেও যেরকম ছিলো এখনও সেরকম! কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না_ এমন প্রবাদের মতো তার স্বভাব একটুও বদলায়নি। তবে রাজ আর এখন সহ্য করে না এসব। রুহিকে সে সময় দিয়েছে আজ অনুষ্ঠান পর্যন্ত। এরমধ্যে রুহি তার সিদ্ধান্ত রাজকে জানাবে।

“রুহি রাজের সাথে সংসার করবে, সমস্ত অন্যায় স্বীকার করে হিয়ার কাছে ক্ষমা চেয়ে।

আর নাহলে, রাজের সাথে তার ডিভোর্স হবে৷ খুব শীঘ্রই হবে।”

রাজ অপশন দিয়েছে দুইটা। যেকোনো একটা রুহিকে মানতেই হবে৷ এই নিয়ে রুহির আরও ক্ষোভ। আর তার সকল ক্ষোভ'ই হিয়াকে ঘিরে।

হিয়ার সাথে খুব একটা কথাবার্তা হয় না রুহির। যতটুকু হয় কাটাছেঁড়া! হিয়া একটুও ছাড় দেয় না রুহিকে। যেহেতু ওদের মাঝে ভালো সম্পর্ক নেই তাই রুহির হিয়ার রুমে আসাটা স্বাভাবিক মনে হলো না।

“আমার সকল সুখ কেড়ে নিয়ে তুই কতটা ভালো আছিস বল হিয়া? তোর ভালো থাকা দেখলে না, আমার খুব হিংসা হয়। আমি জ্বলেপুড়ে যায় বিশ্বাস কর।”

“এখানে বিশ্বাস করার কি আছে? তুমি তো আরও কুড়ি বছর আগে থেকেই আমাকে হিংসা করো৷ সে আমি ভালো থাকি আর না থাকি! এখন কি বলতে চাও সেটা বলো! যদি কিছু বলার না থাকে, তাহলে যাও এখান থেকে। আমি ঘুমাবো!”

রুহি হিয়ার পাশে এসে বসলো। হিয়ার চিবুক ধরে বলল,

“রাজ আমাকে ডিভোর্স দিবে বলেছে। আমি এসব ঝামেলা চায় না হিয়া৷ আমিও তোর মতো সংসার করতে চায়।”

হিয়া হতবাক হলো। এ যে ভুতের মুখে রামরাম! ভাবাগো! হিয়া বুঝতে পারলো না, রুহি হঠাৎ কেন এসব কথা বলছে। মারজিয়া আর নাফিজকে ভার্সিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাই? নাকি জিহাদকে পুলিশে ধরেছে তাই এমন অনুশোচনা!

“আমাকে ক্ষমা করে দে হিয়া। একটু রাজকে বলবি তুই? রাজ আমাকে বলেছিলো, তোর লকাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে। নাহলে আজকের দিন পরে আমাকে ডিভোর্স দেবে। তুই আমাকে ক্ষনা করবি? আমাকে দিবি একটা সুযোগ?”

রুহির মুখটা বেশ ব্যাকুল মনে হলো হিয়ার কাছে৷ রুহিকে এমন কখনোই দেখেনি হিয়া। কখনো না। তবে কি সত্যিই রুহি ভালো হয়ে গেছে? ও সত্যিই রাজের সাথে থাকতে চাইছে? হিয়ার বিশ্বাস হলো না৷ কিন্তু…..

হিয়ার পা ধরে বসলো রুহি৷

“আমাকে ক্ষমা কর হিয়া৷ একটা সুযোগ দে। আমি ছোট মার কাছে আর আব্বুর কাছেও মাফ চাইবো। আমাকে একটাবার সুযোগ দে।”

রুহি কাদতে লাগলো। হিয়া উপেক্ষা করতে পারলো না সেই কান্না। হিয়া তড়িৎ সরে গেল৷ রুহির কান্না দেখে ও আকুতি মিনতি দেখে হিয়ার সকল রাগ পানি হয়ে গেল। ওর জায়গায় অন্যকেউ থাকলে পরিস্থিতি বিবেচনায় তারও হয়তো এমন হতো।

“আচ্ছা ছাড়ো ছাড়ো! এখন আমাকে কি করতে বলছো সেটা বলো! আর তুমি যদি মন থেকে অনুশোচনা বোধ করো তাহলে আমার কিছু৷ বলার নেই। তুমি সংসার করো রাজের সাথে।”

“চল না নিচে। রাজকে একটু বল, তোর কাছে ক্ষমা চেয়েছি আমি। আমি বললে বিশ্বাস করবে না।”

“তুমি বললে বিশ্বাস করবে না কেন? অবশ্যই করবে। যাও বলো গিয়ে।”

রুহি ফের পা ধরলো।

“দয়া কর একটু। চল না প্লিজ। তুই না গেলে ও বিশ্বাস করবে না।”

অগত্যা হিয়াকে উঠতে হলো। সে ভেবেছিল যাবে না নিচে। কিন্তু রুহির জন্য তাকে যেতে হচ্ছে। রুহির হঠাৎ পরিবর্তন হিয়ার খটকা লাগলেও রুহির কান্না টা সে অবিশ্বাস করতে পারলো না। তাছাড়া এতদিন ওরা একসাথে ছিলো। হয়তো মায়ায় পড়ে গেছে।

রুহি হিয়াকে ধরে নিয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত এলো। হিয়া বারবার মানা করলো রুহিকে। তাকে ধরতে হবে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা! এখন দরদ মনে হচ্ছে উতলে পড়ছে৷ ওরা দুজন সিঁড়ির কাছে পৌঁছতেই রুহি দাঁড়িয়ে গেল। হিয়াও দাঁড়ালো সাথে সাথে। নিচে অনেক মানুষ। মেহমান দিয়ে ড্রয়িংরুম পরিপূর্ণ। এখন এতো মানুষের মধ্যে রাজের সাথে কথা বলা, হিয়ার ভালো লাগলো না। ও ঘুরে উপরে যাবে তখনই, নিচ থেকে ওকে ডাকলো কেউ। হেলেনা এসেছে।

“কি হলো হিয়া? নিচে ডাকছে তো। ছোটমা এসেছে।”

“হ্যা যাবো নিচে। আআআ আম্মু এসেছে।”

রুহির কথার জবাব দিয়ে হিয়া পা বাড়ালো নিচের সিঁড়িতে। অমনি রুহি ওকে ধাক্কা মারলো। সব এতো দ্রুত ঘটে গেল যে কেউ বুঝতেই পারলো না৷ কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ঘরের বাতাস ভারি হয়ে উঠলো। সিঁড়ির নিচে টা রক্তে ভেসে গেল। তার সাথে ভেসে এলো মানবীর আর্তচিৎকার!

চলবে?

পেইজের অবস্থা খুবই শোচনীয়। অনুরোধ রইলো সকলে তিন-চারটা করে কমেন্ট করবেন। ইদানীং গল্প কারো কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এমন চলতে থাকলে লেখালেখি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে।

[ কালকে রাতেই দিতাম কিন্তু এমবি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে দিতে পারিনি।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন