ফন্ট সাইজ:
থিম:
সবটাই তুমিময় (সিজন ২)

১০ম পর্ব

লেখক: মিথিলা মাশরেকা

#সবটাই_তুমিময়-২

#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-১০
দরজায় নক করে অনুমতি নিয়ে এসিপি আতিকের কেবিনে ঢুকলো প্রদীপ। চল্লিশের এদিক ওদিক বয়সী এসিপি টেবিলে রাখা পেপারওয়েট ঘোরাতে ব্যস্ত। প্রদীপ সোজা সামনে বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকালো। পরনে জিন্স,টিশার্টের উপর কালো হুডি,পায়ে উচু হিল,মুখে মাস্ক,চোখে কালো চশমা। চেহারা ঢাকার সবরকমের চেষ্টা যাকে বলে। তবে প্রদীপের চিনতে সময় লাগেনি। গম্ভীরভাবে দাড়িয়ে রইলো ও। এসিপি দাড়িয়ে গেলেন এবার। বললেন,
-সিডনে থেকে অদ্রি এয়ারস্ট্রাইক রিলেটেড কিছু লিড নিয়ে এসেছে প্রদীপ। 
প্রদীপ চকচকে চোখে তাকালো অদ্রির দিকে। অদ্রির দৃষ্টি টেবিলে থাকা খবরকাগজে স্থির। অঙ্কুরের ছবি ছাপা হয়েছে ফ্রন্টপেইজে। বড়বড় হরফে তার ছবির নিচে লেখা মিস্টার ইম্পসিবল। বিমান হাইজ্যাকিংয়ের মতো ভয়াবহ ঘটনার পরও সে না নিজের আত্মবিশ্বাস হারুয়েছে,না পুরো টিমকে দুর্বল হতে দিয়েছে। ম্যাচ ক্যান্সেল করানোর পরিবর্তে উল্টো জয়ের ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরেছে জাতীয় দল। আর এতোবড় বিপর্যয়ের মাঝেও সেটা সম্ভব হওয়ার পেছনে অঙ্কুরের দিকনির্দেশনা প্রধান ছিলো। এমনটাই বক্তব্য কোচসহ বাকিসব ক্রিকেটারদের। পেপারের উপর হাত রেখে অদ্রির দিকে ঝুকলো প্রদীপ। উৎসাহ নিয়ে বললো,
-কে ছিলো?
...
-বলো অদ্রি! কে সে? কে ছিলো এই এয়ারস্ট্রাইকের পেছনে। বলো?
অদ্রি একপলক এসিপির দিকে তাকালো। উনি প্রদীপকে বললেন,
-আমাদের টিমের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মেম্বার্সের একজন তুমি। এতো তাড়াতাড়ি এটা জানা সম্ভব না,তা তুমিও জানো প্রদীপ। আমরাও তো চেষ্টা করছি। কতোটুকোই বা জানতে পারলাম বলো? 
প্রদীপ অদ্রির দিকে শক্তচোখে তাকিয়ে বললো,
-কতোটুকো জেনেছো অদ্রি?
অদ্রি দাড়িয়ে গেলো। একপাশে দেয়ালে টানানো বিমানহামলার জায়গাটার পুড়ে যাওয়া ছবি। টার্গেট হিসেবে আকিবুকি করা সেটা। ছবিটার দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বললো,
-বিমানহামলার মতো এতোবড় বিষয়টা কেউ এমনিএমনি ঘটাবে না। জেনেবুঝে,জঙ্গিদের নির্মুল করবে বলেই এই এয়ারস্ট্রাইক,এটাতে কোনো সন্দেহই নেই। ইনি টেরোরিস্টদির প্রতি ক্ষোভটাই দেখিয়েছেন।
-এটুকো আমরাও জানি। নিজে কতোটুকো করেছো,ক্লিয়ার ইট আউট!
প্রদীপ অধৈর্যের স্বরে বললো। অদ্রি বিনম্রভাবে টেবিলের কলমদানী থেকে একটা পেন্সিল হাতে নিলো। দেয়ালে টানানো কিছু অপরাধীদের ছবিতে পেন্সিলে দাগ কেটে বললো,
-এনাদের মাঝে কেউই সাসপেক্ট না। সাসপেক্ট নিসন্দেহে অনেক চালাক। এতোসব প্লানিং করতে কতোটা মেধা লেগেছে তার,আমরা সবাই তা ধারনা করতে পারছি। এই ক্রিমিনালদের বয়স আর ক্রাইমের সাথে এয়ারস্ট্রাইক বিষয়টা মানানসই না। তাছাড়া উক্ত ব্যক্তি যথেষ্ট পয়সাওয়ালা লোকও বটে। এয়ারস্ট্রাইকের জন্য পুরো একটা বিমান কেনা,দলবলের খরচ সবটার জন্য জাকজমক খরচ করতে হয়েছে তাকে। 
এসিপি আতিক ধীরকন্ঠে বললেন,
-রিচ এন্ড ইয়াং।
-এক্সাক্টলি।
অদ্রি থামলো। প্রমান ছাড়া অঙ্কুর কেনো,কারো বিরুদ্ধেই কিছুই বলতে পারবে না ও। তাই অঙ্কুরের নাম নিলো না। একবার মনেমনে নিজেকে প্রশ্ন করলো,সত্যিই কি এজন্যই অঙ্কুরের নাম নিলো না ও? নাকি ও চায়ই না অঙ্কুর এসবে জড়াক। যা করেছে,তাতে ক্ষতি তো হয়নি কোনো। পিযুশসহ ওর পুরো গ্যাং শেষ। দেশ অনেকবড় একটা আতংকগোষ্ঠীর হাত থেকে বেচেছে। প্রদীপ বললো,
-সিডনের কেউ?
অদ্রি হুডির হাতপকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করলো। সামনের ল্যাপটপে ঢুকিয়ে কিছু ছবি দেখালো উপস্থিত দুজনকে। হাতের নির্দেশক লাইটটা দিয়ে একটা ব্যক্তিগত বিমানের ছবি দেখিয়ে বললো,
-এ ট্রান্সপোর্ট। এয়ারস্ট্রাইক এই ব্যাক্তিগত বিমান থেকেই করা হয়েছিলো। 
প্রদীপ বললো,
-তুমি কিভাবে জানলে? 
-আম্...
-নিশ্চিত তুমি? এই প্লেনটাই?
প্রদীপের অধৈর্য দেখে অদ্রি মুচকি হাসলো। এসিপি প্রদীপকে বললেন,
-অদ্রি প্রমান ছাড়া কথা বলে না। ভুলে কেনো যাচ্ছো প্রদীপ?
অদ্রি ল্যাপটপে দুটো ভিডিওর একত্রিত একটা ডকুমেন্টারি দেখালো ওদের। বললো,
-এয়ারস্ট্রাইকের সময়কার স্যাটেলাইট ভিউ থেকে এটার পজিশন দেখেছিলাম। দেন ওখানকার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এনশিওর হই।
প্রদীপ চোয়াল শক্ত করে বললো,
-এটার মালিক কে?
অদ্রি বেখায়ালীভাবে বললো,
-মিস লিজেল।
 
নাম নিয়ে অদ্রি ল্যাপটপের ছবি দেখিয়ে ইশারা করলো প্রদীপকে দেখার জন্য। ছবিটা দেখেই কপাল কুচকে এলো প্রদীপের। এ ট্রান্সপোর্টের মালিকানার সার্টিফিকেট হাতে সাদাচুলওয়ালা এক আশির্ধো বৃদ্ধা। প্রদীপ বললো,
-এ কি করে এসবে...
-রাইট! এতো বয়স্কা কেউ এসবে জড়িত,অবাক হওয়ারই বিষয়। শুধুমাত্র বয়সের জন্য একে সন্দেহর তালিকা থেকে বাদ দিতে পারতাম না। তাই ক্রসকোশ্শেন করেছি তাকেও। তার বক্তব্য,তার ছেলে স্পেইনে থাকে। এটা তার স্বামী মারা যাওয়ার আগে ছেলেকে উপহার দিয়ে গেছেন এটা। এয়ারস্ট্রাইকের দিন ওটা তার বিশাল বাড়িটার পেছনের দিকটায় রাখা ছিলো। একাকী বাসায় ছিলেন,শুধুমাত্র ওটার টেক অফের সময় টের পেয়েছেন কিছু একটা ঘটেছে। তারপর আর কিছুই জানেন না। সেদিনই তার একাউন্টে ওটার সমপরিমান টাকা ট্রান্সফার করে কেউ। তার বলা সবকিছুর প্রমান মিলেছে তার ছেলে,প্রতিবেশী আর ব্যাংকের কাগজপত্র থেকে। টাকাটা কোথা থেকে ট্রান্সফার করা হয়েছে,সেটা জানার চেষ্টা করেছিলাম। লাভ হয়নি। আর এ ট্রান্সপোর্ট এখনো ট্রেসিংয়ের বাইরে।
-শেষমেষ বিমানচুরি?
চরম অবিশ্বাসের ভাবে বললেন এসিপি। অদ্রি চুপ করে রইলো। ঘটনার ক্রম তো এই অদ্ভুত ঘটনাকেই নির্দেশ করছে। প্রদীপ বললো,
-তারমানে টার্গেট আগে জানতো,মিস লিজেলের বিষয়ে। এ ট্রান্সপোর্টের বিষয়ে।
-হুম। এসব হুট করে করে বসা কোনো আকস্মিক কাজ না। অনেক প্লানিংপ্লটিং করে,জঙ্গি আস্তানা ঠিক কোথায় হবে,এই ধারনায় পাকাপোক্ত হয়ে তবেই সবটা ঘটিয়েছে সে লোক।
অদ্রির কথায় এসিপি নড়েচড়ে বসে বললেন,
-তোমার কি মনে হয় অদ্রি? বাইরের দেশের কেউ?
-বাইরের দেশের কেউ বিডির সন্ত্রাসদমনে এতো আগ্রহ দেখাবে কেনো? পিযুশের দলের প্রতি কারো এতো ক্রোশ তো থাকার কথা না।
অদ্রি,এসিপি দুজনেই প্রদীপের দিকে তাকালো। অদ্রি বললো,
-এটা নিয়ে আপনার এতো ক্লারিটিও অনাকাঙ্ক্ষিত লাগছে প্রদীপ স্যার।
প্রদীপ চোখ সরিয়ে নিলো। একটুপর আবারো ওর দিকে ঘুরে বললো,
-কি বলতে চাইছো তুমি?
-নাথিং। একচুয়ালি ঠিকই বলেছেন আপনি। আপনার সাথে সহমত আমি। এসিপি স্যার? আমিও প্রদীপ স্যারের সাথে সহমত। এসব যেই করে থাকুক,সে বিডির কেউ। এজন্যই সিডনিতে দেরি করি নি আর। চলে এসেছি। সাসপেক্ট এখানে,এই বাংলাদেশেই। দুটো উদ্দেশ্য থাকতে পারে তার। হয় সে বিডির ভালো চেয়েছিলো। অথবা টেরোরিস্ট ইউনিটের খুবই খারাপ পরিনতি চেয়েছিলো। নিজের হাতে শাস্তি দিতে চেয়েছিলো। বিষয়টা বেআইনি,তবে ক্রাইম কি? এসিপি স্যার?
অদ্রি উত্তরের আশায় এসিপি আতিকের দিকে তাকালো। প্রদীপ শক্তকন্ঠে বললো,
-যা বেআইনি,তাই ক্রাইম। বিবেচনাবোধকে বেশি দৌড়াতে শিখিও না অদ্রি। নিজের দায়িত্বগুলো পালন করো।
অদ্রি এসিপির দিকে তাকালো আরো একবার। সে আশ্বাসের মতো করে ঘাড় নাড়ালো ওরদিক তাকিয়ে। মাথায় টুপিটা আরো ভালোমতো তুলে দিয়ে,মাস্কটাও ঠিকমতো পরে নিলো অদ্রি। জ্যাকেটের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে বেরিয়ে পরলো সিআইডি অফিস থেকে। 
•
দুদিনের ব্যবধানে বাসায় বসে শুধু সেই আগের প্রমানগুলোই উল্টেপাল্টে দেখেছে অদ্রি। আর কিছুই মেলেনি অতিরিক্ত। ওর এখন অঙ্কুরের উদ্দেশ্য জানা দরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানতে পারলো আজকে অঙ্কুরের প্রেসমিটিং আছে। ঠিক করলো সেখান থেকেই ও ফলো করবে অঙ্কুরকে। বিকেল গরাতেই মাকে তানহার বাসার কথা বলে স্কুটিটা নিয়ে বেরিয়ে পরলো ও। মেইনরোডের সংস্কার কাজ চলছিলো একাংশের। স্কুটি নিয়ে সাবধানেই এগোচ্ছিলো অদ্রি। আচমকাই একটা গাড়ি সামনে চলে আসায় বেসামাল হয়ে স্কুটিটাসহ পরে যায় ও। হাতের কনুই আর হাটু ইট বিছানো রাস্তায় লেগে ছড়ে গেছে একদম। জ্বলছে প্রচন্ড। ওড়নায় হাত চেপে ধরে তবুও আগে সামনে তাকালো অদ্রি।
বিপরীতদিকের গাড়িটা সামনের এক গোলচত্ত্বরে গিয়ে ঠেকেছে। শব্দ করে হর্ন বাজিয়ে চলেছে সমানে। রাস্তার কাজ করতে থাকা আশেপাশের লোকগুলো এগোলো সেদিকে। একটু পরেই ভীড় কমে গেলো। সরে গেলো সবাই। ওদিকে তারমানে বড়সর ক্ষতি হয়নি ভেবে স্বস্তির শ্বাস ফেললো অদ্রি। কোনোমতে খুড়িয়ে উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলো ও। কিন্তু পারছেই না। স্কুটি একদম পায়ের উপর পরেছে ওর। মচকে তো গেছেই। আর্তনাত করে পা চেপে ধরেই বসে রইলো। ইতিমধ্যে এক ভদ্রমহিলা ওর কাছে বসে গিয়ে ব্যস্তভাবে বললো,
-ইশ! কতোটা ছড়ে গেছে। আ'ম সরি! এক্সট্রেমলি সরি!
চোখ খিচে বন্ধ করে ছিলো অদ্রি। কথাগুলো শুনে আস্তেধীরে চোখ খুললো ও। বেশভুষায় মহিলাটিকে দেখে উচ্চবিত্ত বলেই মনে হচ্ছে। মহিলা পাশের কাউকে ডাক লাগিয়ে বললেন,
-শুনছেন? মেয়েটা অনেকটা আঘাত পেয়েছে। এদিকটায় দেখুন। ওকে আমার গাড়িতে তুলতে সাহায্য করুন প্লিজ।
-ন্ না না! আমি ঠিক আছি।
আবারো ওঠার চেষ্টা করলো অদ্রি। কিন্তু পুনরায় ব্যথায় কুকড়ে উঠে পা চেপে ধরলো। হাত দিয়েও রক্ত ঝরছে। মহিলা সেদিকটা দেখে আদেশের মতো করে বললেন,
-তুমি ঠিক নেই। চলো আমার সাথে। ইউ নিড এইড!
-না ম্যাম! আমি...
-তোমার কোনো কথা শুনছি না। দোষটা আমার ড্রাইভারের। তুমি যাচ্ছো আমার সাথে,ব্যস!
আর কথা বাড়ালো না অদ্রি। এমনিতেও এখান থেকে একাকী নড়চড় সম্ভব না ওর। দুজন মিলে ওকে ওই মহিলার গাড়ির ব্যাকসিটে তুলে দিলো। পাশে চরে বসলেন ভদ্রমহিলাও। ব্যথায় দশমিনিটের রাস্তাটা চোখ বন্ধ করে চুপচাপ সয়ে নিয়েছে অদ্রি। গাড়ির গতি কম হতেই বুঝলো হসপিটাল এসে গেছে হয়তো। কিন্তু চোখ মেলেই ধারনা পুরোপুরি ভুল প্রমানিত হলো ওর। গেইট দিয়ে গাড়িটা এক দ্বিতল প্রাসাদের দিকে এগোচ্ছে। গেইটের নেইমপ্লেটে ঝকঝকে লেখনী,"খানম ভিলা"। অদ্রি কপাল কুচকে তাকালো ভদ্রমহিলার দিকে। এটা কার বাসা? হসপিটাল ছেড়ে এখানে কেনো?
#চলবে...
[ গল্প সম্পর্কিত আড্ডা দিতে জয়েন করুন মিথিমহল। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন