#সবটাই_তুমিময়-২
#লেখনীতে:মিথিলা মাশরেকা
পর্ব-১২
রান্নাঘরে সালাদ কাটতে ব্যস্ত অঙ্কুর। তবে অদ্রির দিকে নজর রাখাটা বাদ যায়নি। পাশেই নায়েব কাকা এটা ওটা এগোতে ব্যস্ত। অঙ্কুর যখন ঢুকেছে রান্নাঘরে,তার মানে মায়ের জন্য রাতের খাবারটা ওই বানাবে। কিচেনে ঢোকার পর থেকেই অঙ্কুর লক্ষ্য রাখছে অদ্রির দিকে। পা ধরে কিছুক্ষন কান্নার পর হাশফাশ করছিলো ও। চুপচাপ সেটা দেখেছে অঙ্কুর। সালাদের বাটিটা পাশে সরিয়ে আবারো তাকালো ড্রয়িংরুমের দিকে। অদ্রি নেই! হন্তদন্তের মতো আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো। পরপরই সেন্টার টেবিলের উপর থাকা ব্যান্ডেজ করা পা চোখে পরলো ওর। অদ্রি মাথা তুললো। নিচে ঝুকেছিলো কোনো এক কারনে। কাউচে হাত রেখে ওর দিকে সরু চোখে তাকিয়ে রইলো অঙ্কুর। অদ্রি সেন্টার টেবিলের নিচ থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে ব্যান্ডেজ নিয়ে পায়ে প্যাচাতে শুরু করেছে। অঙ্কুর বিরবির করে বললো,
-সি আই ডি। চোখে ঈগলের দৃষ্টিশক্তি। ঠিক পেয়ে গেছে ফার্স্ট এইড বক্স!
পাশ থেকে নায়েব কাকা বলে উঠলো,
-কিছু কইলা অঙ্কুর বাবা?
-হুম? না কাকা। কিছু না।
এরইমাঝে ওষুধ নিয়ে একজন কেয়ারটেকার ভেতরে ঢুকলো। অঙ্কুর তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ওটা হাতে নিলো। অদ্রির সামনে দাড়িয়ে বললো,
-টেক ইট! এন্ড লিভ!
অদ্রি পায়ে ব্যান্ডেজ প্যাচাতে মনোযোগী ছিলো। অঙ্কুরের আওয়াজ শুনে চোখ তুলে তাকালো ও। ওর চোখমুখ লাল হয়ে আছে একদম। রক্তক্ষরন থেমেছে। তবে ব্যথা করছে প্রচন্ড। ব্যান্ডেজ প্যাচাতে গিয়ে হাতের কনুইয়ে ছড়ে যাওয়া অংশেও টান লাগছে। নাক টেনে চেচিয়ে বললো,
-থাকতে আসিনি আপনার বাসায়!
-তো যাচ্ছো না কেনো এখনো?
-আপনি বললেন না? ফাইলদুটো নিতে এসেছি? হ্যাঁ! ফাইলদুটো নিতে এসেছি আমি! আর ওগুলো ছাড়া একচুলও নড়বো না!
অদ্রির স্পষ্ট জবাবে শান্তচোখে পাশের কেয়ারটেকারের দিকে তাকালো অঙ্কুর। ছেলেটা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলো। অঙ্কুর ধীর গলায় বললো,
-ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিট অদ্রি।
...
-অঙ্কুর বাবা? রান্না তো শ্যাষ! টেবিলে আইনা রাখি?
অঙ্কুর অদ্রির দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো,
-খাবারগুলো বেড়ে দাও। আজকে ডাইনিংয়ে খাবো না। মায়ের খাবার আমি রুমে নিয়ে গিয়েই খাইয়ে আসছি।
-কেনো? ঘরে কেনো খাবো? ডাইনিংয়েই খেতে পারবো আমি।
অদ্রি পাশে তাকিয়ে দেখে আফরা খানম এসেছেন। অঙ্কুর বললো,
-আবার নিচে নামতে গেলে কেনো মা?
-খিদে পেয়েছে।
-খাবার ঘরেই আনছিলাম তো!
-লাগবে না!
আফরা খানম অদ্রির দিকে এগিয়ে গেলেন। ওর পাশে বসে গিয়ে বললেন,
-ব্যথা করছে এখনো?
অদ্রি একপলক অঙ্কুরের দিকে তাকালো। ব্যথা কমলেও এই লোকটা কমতে দেয়নি। তবুও মৃদ্যু হেসে বললো,
-জ্বী আন্টি।
-মা? ন'টা বাজে! ডক্টর তোমাকে এক্সাক্ট সাড়ে ন'টায় ওষুধ খেতে বলেছে। ডিনার করবে চলো।
অঙ্কুরের কথাকে পাত্তা দিলেন না আফরা খানম। অদ্রিকে বললেন,
-তোমার ফ্রেন্ড তো এখনো আসেনি?
-আসলে আন্টি...
-আচ্ছা ও আসুক,আজকের ডিনারটা না হয় আমাদের সাথে করবে চলো।
-না মানে আন্টি...
-কোনো না নেই। কোনো মানে নেই! খাবে চলো!
আড়চোখে অঙ্কুরের দিকে তাকালো অদ্রি। ওই চেহারায় স্পষ্ট বলা,আজকে তুমি ডিনার খাবে বললে,তোমাকেই আমি খেয়ে নেবো অদ্রি। বিষয়টাতে পৈশাচিক আনন্দ পেলো অদ্রি। মুচকি হেসে বললো,
-জ্বী ঠিকাছে আন্টি। আপনি যখন এতো করে বলছেন,ডিনার করবো আপনার সাথে।
-হোয়াট ননসেন্স! তোমার মেডিসিন দিয়ে গেলো তো! এখন...
অঙ্কুরকে চোখ রাঙালেন আফরা খানম। মায়ের দিক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলো অঙ্কুর। তীক্ষ্মদৃষ্টিতে অদ্রির দিকে তাকিয়ে বললো,
-শুধু তোমার জন্যই রান্না করেছি। ও কি খাবে?
-অঙ্কুর বাবা? আইজকা বেশি রানছো যে? আফরা আপার খাবার প্লেটে দিয়া দিছি। বাকি খাবারগুলান কি কাল সকালে...
গামছায় হাত মোছার ব্যস্ততায় বললো নায়েব। আফরা খানম সন্দিহান দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন। অঙ্কুরের চেহারায় নায়েব কাকার উদ্দেশ্যে পুর্ন বিরক্তি। অদ্রি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো নায়েব সাহেবের দিকে। অঙ্কুর রান্না করেছে শুনেই থেমে আছে ও। আফরা খানম হাসি আটকে বললেন,
-চলুন নায়েব ভাই। খাবো। আহানা? তোমার ওঠার দরকার নেই। এখানেই খাবার দিচ্ছি হুম?
হতবিহব্বল চেহারায় মাথা নাড়লো অদ্রি। আফরা খানম,অঙ্কুর দুজনেই ডাইনিংয়ে বসে গেলো। অদ্রির সামনে নায়েব কাকা এসে ফ্রাইড রাইস দিয়ে গেলো। ডাইনিংয়ে বসে সালাদ মুখে পুরে অদ্রির দিকে তাকিয়ে অঙ্কুর। অদ্রি একপলক সামনে থাকা প্লেটটা দেখে অঙ্কুরের দিকে তাকিয়ে বুঝলো,সে সালাদ কম,ওকে চিবানোর ট্রেনিং নিচ্ছে। মাথা ঝেড়ে প্লেটটা হাতে নিলো ও। আগে খেয়ে বাচা জরুরি। তারপর না হয় অঙ্কুরের চাওনি থেকে বাচা যাবে। কিন্তু চামচে খাবার মুখে তুলতে গিয়েই হলো যতো সমস্যা। হাতের কনুইয়ে আঘাতের জায়গাটায় টান লাগছে বাজেভাবে। মুখ অবদি খাবার তুলতেই পারছে না ও। ওর খাওয়ার চেষ্টারত দশা দেখছে আর কাটা চামচে সালাদ নাড়াচাড়া করছে অঙ্কুর। ছেলের দৃষ্টি লক্ষ্য করে আফরা খানমও এবার অদ্রির দিকে তাকালেন। ওকে ওভাবে কষ্ট করতে দেখে হাতে লেগে থাকা খাবার ঝাড়লেন উনি। হাত ধুতে যাবেন,অঙ্কুর বলে উঠলো,
-উঠছো কেনো মা?
-দেখছিস মেয়েটা খেতে পারছে না,আমি এখানে খেয়ে নেবো? আগে ওকে খাইয়ে দিয়ে আসি,তারপর খাবো না হয়।
আফরা খানম উঠে দাড়াবেন,অঙ্কুর বললো,
-তুমি বসো। ও ওভাবেই খেয়ে নেবে। তোমার মেডিসিন নিতে হবে মা!
-তুই থাম! একদিন,একটু লেইট হলে কিছুই হবে না! আগে মেয়েটাকে খাইয়ে দিয়ে...
-ওকে তুমি বসো,আমি দেখছি।
ভ্রুকুচকে তাকালেন আফরা খানম। বললেন,
-কি দেখবি তুই?
-চুপচাপ নিজের খাবারটা খাও। তোমার মেডিসিনে কোনো অনিয়ম চাইনা আমি।
-কিন্তু অঙ্কুর...
অঙ্কুর নিজে উঠে দাড়িয়ে মাকে বসিয়ে দিলো এবার। আফরা খানম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে। অঙ্কুর সোজা এসে অদ্রির ডানপাশে বসলো। অদ্রি একবার দেখলো ওকে। তারপর আবারো খাবার মুখে তোলার চেষ্টা করতে লাগলো। আচমকাই ওর হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে নিলো অঙ্কুর। চামচ দিয়ে মাখিয়ে খাবার ওর মুখের সামনে তুলে বললো,
-একটা কথাও চাই না অদ্রি! ফিনিশ ইট!
বিস্ফোরিত চোখে তাকালো অদ্রি। ঘাড় ঘুরিয়ে ডাইনিংয়ে বসা আফরা খানমের দিকে তাকালো একবার। সে খাবার লেগে তাকা হাত তুলে বোঝালো,আমিও খাচ্ছি,নইলে আমিই খাইয়ে দিতাম তোমাকে। খেয়ে নাও অঙ্কুরের হাতেই।
অদ্রি আর কথা বাড়ায়নি। চুপচাপ খেতে লাগলো অঙ্কুরের হাতেই। বেচারা! মায়ের বাধ্যানুগত সন্তান এএসএ'র চেহারাটা দেখে খুবই হাসি পাচ্ছিলো ওর। খুব কষ্টে হাসি আটকেছে। খাওয়ানো শেষে পানিটাও ওকে খাইয়ে দিয়েছে অঙ্কুর। নিচদিক তাকিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষন বসে রইলো। উকিঝুকি দিয়ে ওর চেহারাটা দেখে অদ্রি হাত বাড়ালো সামনের সেন্টার টেবিলে থাকা টিস্যুবক্সের দিকে। বক্সটা একদম টেবিলের উল্টোদিকের কিনারায়। অদ্রি নড়চড়া করে আরেকটু এগিয়ে বসে ওটা ধরার চেষ্টা করতে যাবে,অঙ্কুর বা হাতে ওর ডান কাধটা ধরে একেবারে সোফার পেছনের দিকে লাগিয়ে দিলো। আরেকদফায় আতকে উঠলো অদ্রি। রাগী চেহারাটা বহাল রেখে টিস্যুবক্স থেকে অঙ্কুর নিজেই টিস্যু নিলো। অদ্রির অনেকটা কাছে চলে এসে আলতোভাবে ওর ঠোট মুছে দিতে দিতে রাগীস্বরে বললো,
-আমার লাইফে আসার পর থেকে একটার পর একটা বাড়াবাড়ি করে চলেছো। আর তাতে একের পর এক উল্টেপাল্টে যাচ্ছে আমার সবটা। সহ্য হচ্ছে না আমার এসব অদ্রি! এসবের কনসিকুয়েন্স তোমাকেও বেয়ার করতে হবে ! দেখে নিও! চুপচাপ তোমার সব বাড়াবাড়ি সয়ে যাবো,নিজেকে এভাবে এলোমেলো হয়ে যেতে দেখবো,এতোটা ভালোও আমি নই!
ওকে ছেড়ে উঠে চলে আসলো অঙ্কুর। অদ্রি এতোক্ষন একধ্যানে কথাগুলো বলা ঠোটজোড়ার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। ওই ওষ্ঠযুগলকে কতোটা কাছ থেকে,কতোটা নির্লজ্জের মতো দেখেছে ও,সেটা ওর বেড়ে যাওয়া হৃদস্পন্দন জানে। জোরে জোরে শ্বাস ছাড়লো কয়েকবার ও। খানিকটা সময় পর পাশে জ্বলতে থাকা মোবাইলটা চোখে পরলো ওর। তানহা কল করেছে। অঙ্কুরের দিকে তাকিয়ে দেখে,সে মাকে ওষুধ খাওয়াতে ব্যস্ত। অদ্রি ওর দিকে তাকিয়ে থেকেই ফোনটা কানে ধরে শান্তভাবে বলে উঠলো,
-আমি ফিরছি না তানহা। বাবা ফোন করলে বলিস তোর সাথেই আছি। রাতে ফিরবো না বাসায়। ঘন্টাখানেক পর কনফারেন্সে কথা বলিয়ে দিস। রাখছি এখন। বাই।
কলটা কেটে দিলো অদ্রি। অঙ্কুরের ' এতোটাও ভালো আমি নই ' এই কথাটায় থেমে গেছে ও। এমনিতেও অঙ্কুরকে ফলো করবে বলেই তো বেরিয়েছিলো ও। যেহেতু এই বাসাতেই এসেছে,ফাইল খোজার চেষ্টা করতে দোষের কি? অঙ্কুরের এই রাগের কারনটাও জানা বাকি ওর। সেটাও জানতে হবে ওকে। বেশ বুঝতে পারছে অদ্রি,ওর চাওয়াপুরন শুধু এই খানম ভিলাতে থেকেই সম্ভব। অন্যকোথাও,অন্য কোনোভাবে নয়!
#চলবে...
[ গল্প সম্পর্কিত আড্ডা দিতে জয়েন করুন মিথিমহল। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]