ফন্ট সাইজ:
থিম:
জারুল ফুলের কাব্য

৯ম পর্ব

লেখক: মাসফিত্রা মিমুই

#জারুল_ফুলের_কাব্য 

লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই 
[পর্ব:০৯]
নাস্তা সেরে নিচে বসে বড়ো ভাইয়ের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা চলছিল তৈমুরের। কথা শেষে উপরে উঠে নিজ কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখতে পেলো দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পেলো না তৈমুর। এ অসময় ঘরের দরজা আটকে কী করছে মেয়েটা? মায়ের কথায় রাগ করেছে কী? নানা ধরণের দুশ্চিন্তা নিয়েই দরজায় কড়া নাড়লো তৈমুর। একবার দুবার, বেশ কয়েকবার। তারপর আরো কয়েক সেকেন্ড তাকে বাইরে অপেক্ষা করিয়ে ভেতর থেকে দরজা খুলে গেলো। দরজা খোলা পেতেই দ্রুত হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করল সে। পুরো কক্ষটি পর্যবেক্ষণ করে ভীষণ অবাক হলো। লাগেজ আর জামা কাপড়ে এলোমেলো হয়ে আছে বিছানা। আলমারির দরজাগুলো হাট করে খোলা। তৈমুরের গুছিয়ে রাখা পোশাকগুলোর অবস্থাও করুণ। 
দরজা খুলে দিয়ে আবারো নিজের কাজে মগ্ন হয়ে গেলো উথমী। তৈমুর প্রশ্ন ছুঁড়লো,“এগুলোর এমন অবস্থা করেছেন কেনো?”
“দেখছেন না গুছাচ্ছি।”
“এভাবে অগোছালো করে?”
“হ্যাঁ, এদিকে একটু আসুন তো।”
স্ত্রীর ডাকে এগিয়ে আসে তৈমুর‌। তৎক্ষণাৎ তার হাতে কয়েকটি শাড়ি ধরিয়ে দেয় উথমী। বলে,”আপনি হচ্ছেন পুরুষ মানুষ। পুরুষ মানুষ এতো পোশাক দিয়ে কী করে, বলুন তো?”
“নারীরা যা করে, তাই।”
“তাই বলে এতো? যাই হোক, এই ভাঁজ করা শাড়িগুলো সুন্দর করে ওই হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখুন তো।”
বাধ্য স্বামীর মতো স্ত্রীর দেওয়া কাজটি করতে লাগলো তৈমুর। তার ফাঁকে ফাঁকে উথমীর হাবভাব বোঝারও চেষ্টা করল কিন্তু পারলো না। ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞেস করল,“আম্মার কথায় কী আপনি রাগ করেছেন?”
“না তো।”
“সত্যি বলছেন?”
“মিথ্যে বলার তো কোনো প্রয়োজন দেখছি না।”
মাথা নাড়ায় তৈমুর। শাড়িগুলো ঠিকঠাক করে রেখে বিছানার একপাশে জায়গা করে বসে পড়ে। অমন একটি ঘটনার পরেও যে তার স্ত্রী রাগ করেনি ব্যাপারটা যেনো কিছুতেই বিশ্বাস হলো না তৈমুরের। তবে কিছু বললো না। মনের কথা মনে চেপে রেখে চুপ রইলো। কিছুক্ষণ সমান তালে চললো নিরবতা। সব জামা-কাপড় গোছগাছ করে আলমারিতে রেখে বিছানা খালি করল উথমী। লাগেজগুলো খাটের নিচে ঢুকিয়ে এবার গেলো ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে। এই পুরোটা সময় নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে দেখে গেলো তৈমুর। 
ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই বদলে গেলো ঘরের পরিবেশ। সব গোছগাছ শেষে ক্লান্ত দেহখানা নিয়ে এসে বিছানায় বসে পড়ল উথমী। ঘরে এসি চলার পরেও এই স্বল্প কাজেই যেনো সে হাঁপিয়ে উঠেছে। তার এই ক্লান্তি দেখে খাটের পাশের ছোট্ট টেবিল থেকে পানির গ্লাসটি এনে তার সম্মুখে ধরলো তৈমুর। গ্লাসটি দেখে আর বিলম্ব না করে অর্ধেকটা পানি এক নিঃশ্বাসে পান করল উথমী। দম ছেড়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললো,“ধন্যবাদ।”
প্রত্যুত্তরে চুপ থাকে তৈমুর। গ্লাসটি যথাস্থানে রেখে এগিয়ে যায় টেবিলের দিকে। চেয়ার টেনে ল্যাপটপ খুলে বসে। পেছন থেকে হুট করেই উথমী ডাকে, “শুনুনু তৈমুর সাহেব।”
“বলুন।”
“আমি কিন্তু কোনোভাবেই চাকরিটা ছাড়বো না। বিয়ের আগেও আপনাকে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলাম।”
“আমিও স্পষ্ট করেই বলেছিলাম এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
“কিন্তু আপনার মা-বোনের চরম আপত্তি রয়েছে।এতো এতো নিয়ম-কানুন, পছন্দ-অপছন্দ আমার মোটেও ভালো লাগছে না। আমার ক্ষেত্রে উনাদের এমন আচরণের কারণ কী আমার বয়স? উনারা কী আপনার জন্য কোনো স্কুল, কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আনতে চেয়েছিল? যদি তাই চেয়ে থাকে তাহলে করে নিতেন। আমাকে মাঝখানে টেনে এনে এতো ঝামেলার কী প্রয়োজন ছিলো?”
“তার উত্তর শুরুতেই দিয়েছি।”
“উত্তর দিলেই তো হবে না। কয়েকদিন পর যখন ছুটি শেষ হয়ে যাবে তখন তো আমায় রোজ নিয়ম মাফিক কলেজে গিয়ে ক্লাস করাতে হবে। তখন কিন্তু আজকের মতো কিছু বলতে এলে আমি মানবো না।”
“আচ্ছা।”
এর বিপরীতে আর কিছুই বলার থাকে না উথমীর। তবে সব বিষয়কে এতো সহজভাবে নেওয়ার কারণে মাঝেমধ্যেই লোকটাকে দেখে ভীষণ আশ্চর্য হয় সে। তাই থম মেরে ওখানেই কিছুক্ষণ বসে থাকে। বসে থাকতে থাকতে হুট করেই লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। কখনো বা সিলিং এর পানে আবার কখনো বা তৈমুরের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। একসময় বিরক্ত হয়ে শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ায়। আর তারপর নিঃশব্দে কক্ষ থেকে বেরিয়ে চলে যায় নিচে। 
__________
দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে জোহানকে তৈরি করে দিলো জেবা। তুরাগ তৈরি হয়ে এতক্ষণে চলে গিয়েছে নিচে। ড্রাইভারের সাহায্যে ব্যাগপত্রগুলো উঠিয়ে রাখছে গাড়িতে। মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেতেই দৌড়ে দাদীর ঘরে চলে এলো জোহান। শাহানা তখন অলস দেহখানা নিয়ে বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। নাতির শব্দ পেতেই তৎক্ষণাৎ উঠে বসলেন তিনি।
পুত্রবধূকে দু চোখে সহ্য করতে না পারলেও ছেলের ঘরের নাতি উনার চোখের মণি। আর জোহানেরও যেনো সব আবদার তার দাদীর কাছে। ঘরে এসেই বিছানায় উঠে পা ঝুলিয়ে বসলো সে। শাহানা তার গাল টেনে জিজ্ঞেস করলেন,“কী ব্যাপার দাদু? এ অসময় আমার কাছে যে? আর এভাবে এতো সাজুগুজু করেছো কেনো?”
“কেনো আবার? তুমি জানো না? আজ বাবাই, আম্মু আর আমি তো বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। তাই তো তোমার থেকে বিদায় নিতে এলাম।”
“জানতাম তো। এখনি চলে যাবে?”
“হ্যাঁ, আম্মুর রেডি হওয়া শেষ হলেই চলে যাবো। তুমি নিচে চলো।”
নাতির জোরাজুরিতে দ্বিমত করতে পারলেন না শাহানা। বিছানা থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন নিজের আলমারির দিকে। আলমারির দরজা খুলে ভেতর থেকে একটা ছোটো বাক্স বের করে তার থেকে বের করলেন কচকচে হাজার টাকার একটি নোট। এগিয়ে এসে জোহানের পকেটে গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন,“এই টাকা দিয়ে তোমার যা ইচ্ছে তাই কিনে খেও। ঠিক আছে?”
চোখ দুটো চকচক করে উঠলো জোহানের। প্রত্যেকবার দাদার বাড়ি এলেই দাদী তার পকেটে এমন হাজার টাকার নোট গুঁজে দিয়ে এই এক কথাই বলে। তৎক্ষণাৎ দাদীকে জড়িয়ে ধরলো জোহান। আনন্দিত চিত্তে বললো,“তুমি খুব ভালো দাদী। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”
মুহূর্তেই আনন্দে পুলকিত হয়ে উঠলো শাহানার মন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,“চলো এবার নিচে যাই।”
“চলো।”
যেতে যেতে দাদী নাতির মধ্যে চললো আরো অনেক কথাবার্তা। বড়ো ভাই আর ভাবির থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালেন মঈনুদ্দিন। যোগ দিলেন তুরাগ আর তৈমুর দুই ভাইয়ের কথোপকথনের মধ্যে।
তৈরি হয়ে সবে সিঁড়ি বেয়ে নেমে অন্দরমহলে পা রেখেছে জেবা। তখনি শাশুড়ির সাথে তার চোখাচোখি হলো। ঠোঁটের কার্নিশে ফোটে উঠলো কৃত্রিম হাসির রেখা। এগিয়ে এলো আরো সম্মুখে। কোমল স্বরে বললো,“আমরা তবে আসছি আম্মা। নিজের যত্ন নিবেন। কোনো অসুবিধা হলে কিন্তু তুরাগ আর তৈমূরকে জানাবেন। তাছাড়া এখন থেকে আর আপনি একা নন। আপনার জন্য আপনার ছোটো পুত্রবধূ তো রেখেই যাচ্ছি।”
মুখশ্রী গম্ভীর করে রাখলেন শাহানা। কথাগুলো শুনেও না শোনার ভান করে ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন,“আমার নাতিকে দেখে রেখো।পারলে ওর পরীক্ষা শেষে আবার দিয়ে যেও।”
শাশুড়ির কথার বিপরীতে মাথা নাড়ায় জেবা। শাহানা আর কথা বাড়ান না। নাতিকে সঙ্গে নিয়ে সদর দরজা পেরিয়ে চলে যান বাইরে। তখনি রন্ধনশালা থেকে বেরিয়ে আসে উথমী। জেবাকে দেখতেই পেছন থেকে বলে ওঠে,“এখনি রওনা দিবেন নাকি ভাবী?”
কথাটা শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছাতেই সেদিক পানে ফিরে তাকায় জেবা। উত্তর দেয়,“হ্যাঁ এখনি বের হবো।”
কথাটা শুনে মন খারাপ হলো উথমীর। চুপসে গেলো মুখশ্রী। তার দিকে এগিয়ে এলো জেবা। মন খারাপ বুঝতে পেরে বললো,“ফোন নাম্বার তো দিয়েই গেলাম। যখন ইচ্ছে ফোন করবে আমায়। এখানে কোনো সমস্যা হলে তৈমুরকে জানাবে। একদম লজ্জা পাবে না। তৈমুর তোমার স্বামী। স্বামীর কাছে কোনো লজ্জা নেই। আর চিন্তা নেই আমিও ফোন করে খোঁজ খবর নিবো।”
উপরনিচ মাথা নাড়ায় উথমী। জেবা পুনরায় বলে, “মেয়েদের একটু মানিয়ে চলতে হয়, জানো তো? আজ সকালে যেভাবে আম্মার মুখের উপরে কথা বলে দিলে সেসব আর কখনো করবে না। সবসময় সব জায়গায় প্রতিবাদ চলে না। কিছু কিছু সময় উত্তর জেনেও চুপ থাকতে হয়। মন দিয়ে সংসার করো। মালতী ফুফু আছেন। উনাকে আমি সব বলে দিয়েছি। তোমায় সব বুঝিয়ে দিবেন উনি। ঠিক আছে?”
“হুম।”
মুচকি হেসে উথমীর গালে হাত রাখলো জেবা, “তাহলে চলি এবার। ভালো থেকো।” বিদায় নিয়ে এগোলো সদর দরজার দিকে। উথমীও আর সেখানে দাঁড়ালো না। তার পিছু পিছু সদর দরজা পর্যন্ত এসে থেমে গেলো।
মাকে দেখতেই তুরাগ এসে মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। তারপর একে একে জেবা, জোহান, মঈনুদ্দীন, করবী তারাও উঠে পড়ল গাড়িতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চলতে শুরু করল গাড়িটি। চলন্ত গাড়ির খোলা কাঁচ দিয়ে মাথা বের করে হাত নাড়ালো জোহান। নাতির কান্ডে মুচকি হেসে নিজেও হাত নাড়িয়ে বিদায় জানান শাহানা। কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকেন সেখানে। মনে মনে সকলের জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ প্রার্থনা করে বাড়ির ভেতরের দিকে পা বাড়ান। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সময় চট করে দেখা হয়ে যায় ছোটো পুত্রবধূর সঙ্গে। হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা মুহূর্তেই মলিন হয়ে ওঠে উনার। মেয়েটিকে সময়ে অসময়ে সামনে দেখতে পেলেই ভেতরে ভেতরে চরম বিরক্তবোধ করেন তিনি। এখনো তেমনটাই করলেন। তারপর মুখ বাঁকিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন সেখান থেকে।
উথমী নিরবে শুধু দেখলো ভদ্রমহিলার মুখভঙ্গি। তবে বিশেষ পাত্তা দিলো না। দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে।
বাড়ির সম্মুখ ধরে ইটের বাঁধাই করা একটি রাস্তা গিয়ে থেমেছে গেট পর্যন্ত। তার দু ধারে অসংখ্য ফুলের গাছ। সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। তার সাথে তাল মিলিয়ে যত্নে এবং পরিচর্যায় বাড়ন্ত গাছে ফোটা সুন্দর ফুলগুলোও‌ নেতিয়ে পড়েছে। সেই নেতানো ফুলগুলোই পরম যত্নে ছুঁয়ে দিলো উথমী। নাসারন্ধ্র দিয়ে শুঁকে নিলো ঘ্রাণ। ছোটো ছোটো কদম ফেলে চারিদিক দেখতে দেখতে উপভোগ করতে লাগলো প্রকৃতি। চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই শুধু সবুজ আর সবুজ। সেই সবুজের মধ্যেই রং বেরঙের নাম না জানা কতশত ফুল! উথমীর নিকট মনে হলো এ যেনো বাড়ি নয়, প্রকৃতির এক লীলাভূমি। বাড়ির পেছনের দিকে বিশাল বড়ো বড়ো গাছ। গাছের ডালে বাস করা পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত প্রকৃতি। 
গন্ধরাজ আর বেলী ফুলের গন্ধে মো মো করছে চারিদিক। গেটের পাশ দিয়ে লতা ছড়ানো মাধবীলতা গাছটি আগেই নজরে পড়েছিল উথমীর।তবে ভেতরটা যে এতোটা সুন্দর তা যেনো কল্পনাই করতে পারেনি সে। হাজারি গোলাপ গাছটায় ফুলে ফুলে ভরা। সেদিক পানে দৃষ্টি পড়তেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে গেলো তার ভেতরে। হাত বাড়ালো ফুলগুলো ছুঁয়ে দিতে। কিন্তু তার আগেই এক পুরুষালি হাত তার হাতের উপর দিয়ে গিয়ে গাছ থেকে ছিঁড়ে নিলো দুটো লাল রঙের ফুল। খানিকটা ভড়কে গেলো উথমী। তৎক্ষণাৎ পিছু ফিরে তাকালো। দৃষ্টিগোচর হলো পরিচিত মুখশ্রী।
তৈমুর হাতের ফুলগুলো থেকে একটা স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাথায় ঘোমটা দেওয়া ওড়নাটা সরিয়ে খোঁপা করা চুলগুলো একটানে খুলে ফেলে কানে গুঁজে দিলো অবশিষ্ট ফুলটি। কাজটি হয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে দ্রুত পায়ে সরে দাঁড়ালো। আকস্মিক ঘটনায় বোকা বনে গেলো উথমী। ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইলো। 
স্ত্রীর এমন চাহনিতে মনে মনে হাসলো তৈমুর। সাথে মেয়েটির সৌন্দর্যের প্রশংসাও করল বটে। তবে সামনা সামনি কিছুই যেনো বুঝতে দিলো না তাকে।অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে শুধালো,“তা এখানে কী করছেন ম্যাডাম?”
“তেমন কিছু না, দেখছিলাম জায়গাটা। আপনি কী করছেন?”
“আপনাকে দেখছিলাম।”
ভ্রু যুগল কিঞ্চিৎ কুঁচকালো উথমী। ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,“কী?”
“আপনাকে দেখেই এসেছি।”
“ওহ।”
ছোট্ট করে কথাটি বলে পুনরায় বাগান দেখায় মনোযোগ দিলো উথমী। বাড়িটির বা পাশে যেতেই নজরে পড়ল ফুলে ফুলে ভর্তি জারুল আর কৃষ্ণচূড়া গাছটির। গাছের নিচে অবস্থানরত সবুজ জমিনটা এখন বেগুনী আর লাল রঙেদের দখলে। দৃশ্যটি দেখে মুহূর্তেই চকচক করে উঠলো উথমীর আঁখিদ্বয়।উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলো,“বাহ! এখানে তো দেখছি জারুল আর কৃষ্ণচূড়া গাছও রয়েছে? সত্যি বলতে আপনাদের বাড়িটা কিন্তু অনেক সুন্দর।”
এতক্ষণ স্ত্রীর দিকেই নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো তৈমুর। আচমকা স্ত্রীর এমন ছটফটে, প্রাণবন্ত আচরণে সন্তর্পণে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গাছের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, “হুম, গাছটি আমার বাবার নিজ হাতে লাগানো। কৃষ্ণচূড়া আম্মার প্রিয় ফুল ছিলো বিদায় গ্ৰাম থেকে এনে লাগিয়েছিলেন গাছটি।”
“আর বাকিগুলো?”
“বাকিগুলো বলতে যার যখন যা ইচ্ছে হয়েছে তাই এনে লাগিয়েছে। আর এই জারুল গাছটি কলেজের এক বৃক্ষপ্রেমী স্যারের থেকে আমি উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম। তবে সেই স্যার তার বছর দুয়েক পরেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন কিন্তু উনার দেওয়া এই গাছটি ঠিকই রয়ে গেলো। প্রতিবছর সময় মতো ফুল দিচ্ছে, ফল দিচ্ছে।”
কথাটা শুনে সাময়িক মন খারাপ হলো উথমীর। সন্তর্পণে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,“তা এতো বড়ো বাগানের যত্ন নেয় কে? আপনি?”
“না, যত্ন নেওয়ার সময় কোথায়? এর জন্য আলাদা লোক রাখা আছে। বাড়ির ওপাশেই উনার থাকার জায়গা। বাগান পরিচর্যা, গেইট পাহারা দেওয়াই উনার কাজ। তবে জায়গাটা সবচেয়ে সুন্দর লাগে সকালে। নতুন নতুন ফুল ফোটে।”
চুপচাপ মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শোনে উথমী। আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে এবার তাকে তাড়া দেয় তৈমুর,“সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। একটুপর আজান হবে। এবার ভেতরে চলুন।”
ভেতরে যাওয়ার কথা শুনে মলিন হয়ে গেলো উথমীর মুখশ্রী। দ্রুত পায়ে গাছের দিকে যেতে যেতে বললো,
“দাঁড়ান সঙ্গে করে কয়েকটা ফুল নিয়ে নেই।”তারপর ছয় পাপড়ি বিশিষ্ট কয়েকটা বেগুনী রঙের ফুল তুলে নিলো হাতে। সামনে এসে হাত উঁচিয়ে বললো, “ফুলগুলো কি সুন্দর! তাই না?”
“হুম, একদম আপনার মতো।” কথাটা বলেই বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো তৈমুর। উথমী অবাক চাহনিতে লোকটির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুটা পথ এগিয়ে পথিমধ্যে থেমে গেলো তৈমুর। পিছু ফিরে ফের বললো,“কী হলো? দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? আজকে কী বাগানেই রাত্রিযাপন করার ইচ্ছে জেগেছে?”
দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোধক জবাব দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে তৈমুরের পায়ে পা মিলিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল উথমী।
চলবে ______

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন