“ সন্ধ্যার ভায়োলিন ”— ০৭
#লেখিকা #বৃষ্টি_ইসলাম
#পর্ব_০৭
আব্র ভাইয়ের ব্যপারে কেউ কোন খোঁজ রাখে না। ঐদিন আজমল খানের হুঙ্কারের পর কেউ আব্রর কথা বাড়িতে তুলতে পারে নি। তবে আলিনা খানআব্রর ব্যপারে আশাফের সাহায্য অনেক খোঁজ করেছে। সবার থেকে লুকিয়ে অবশ্য।
আজ অহু ভার্সিটি হতে সহপাঠিদের সাথে টু্্যরে যাবে। যার দরুন সুন্দর একটা নীল এবং সাদার মিশ্রনের চুরিদার পরেছে অহু। সাথে মেচিং করে হিজাব বেধেছে!
অহু যখন নিজের কক্ষ থেকে বেড়িয়ে সিড়ি দিয়ে নিচে নামছে। হাতে চুরি পরছে নীল রঙের রেশমি চুরি। তখনই ড্রয়িং এর করিডোর থেকে অহুর কানে উচ্চ শব্দ ভেসে আসে। অহু পা বাড়িয়ে এগোয় সে পানে। পৌঁছে দেখলো লেন লাইন নম্বরের কারোর ফোন এসেছে। ওটাই বেজে চলেছে এতক্ষণ যাবত। অহু নিশ্বাস ফেললো। টেলিফোনে হাতে তুললো।
কল রিসিভ করে —হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কোনো অচেনা পুরুষালী কন্ঠঃ স্বর ভেসে আসলো।
“ বিকেল পাঁচটা বাজে যেনো, এয়ারপোর্টে আমার জন্য গাড়ি পৌঁছে যায় ”— unknown
অহু কিছুটা অবাক হলো, ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রতুত্তর করলো।
“ আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন ভাইয়া। এটা কোন ট্যাক্সি সেন্টার নয়। যে আপনার জন্য এয়ারপোর্টে গাড়ি পৌঁছে দিবো। যত্তসব! ”—
এই বলে অহু ফোনটা কেটে দিলো। দাঁড়িয়ে না থেকে আর দ্রুতখান মহল থেকে বেরিয়ে গেলো।
কল কেটে দেওয়ার পরেও অবিরত ফোন এসেই চলেছে। অবশেষ নিহার আম্মু কিচেন থেকে বেড়িয়ে আসলেন। কলটা উঠালেন তিনি আওয়াজ করলেন।
“ হ্যালো কে ? ”—
“ আমি আব্র, #আররাব_খান_আব্র ”—
নিহার আম্মু'র আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। তিনি চট জলদি করে মহলের বাহিরে বের হলেন। ড্রাইভারকে বলে রাখলেন বিকেল ৪টার ভিতরে যেন গাড়ি এয়ারপোর্টে পৌঁছে যায়। এবং সবাইকে ডাকতে লাগলেন চেঁচিয়ে।
মহলে অবশ্য বড় কর্তারা নেই। ছোটজন আছেন মানে অহুর বাবা। বাকি দুজন বিজনেসের কাজে চট্টগ্রামে এবং অপরজন দেশের বাহিরে রয়েছেন। আব্রর কথা শুনতেই আলিনা খান খুশিতে দিশেহারা হয়ে গেলেন। এবার আব্র মহলে ফিরলে তিনি আর আব্রকে দূরে যেতে দিবেন না।
[০২.]~
বিকেল ৫:৩৭,
ধূসর রঙের ফুলহাতার শার্ট এবং তার উপর কালো রঙের ব্লেজার পড়া। কালো প্যান্ট ইন করা। চোখে কালো সানগ্লাস। হাতে চকচক করছে ব্রান্ডের ওয়াচ। আন্ডার কাটিং চুল গুলো ভীড় জমিয়েছে কপালে।
এই লুকে যদি অহু আব্রকে দেখতো তাহলে সেখানেই নিশ্চিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো।
আব্র'কে দেখে আলিনা খান দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে ঝাপটে ধরলেন। এতদিন পর ছেলেকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। কীসের রাগ আর কীসের অভিমান?
আব্রও তার মাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে লাগলো। আব্ররও ভীষন খারাপ লাগছিলো এতদিন পরে সবাইকে কাছে পেয়ে। আব্র "খান মহলে"প্রবেশ করলো।
অন্দর মহলে প্রবেশ করে কাঠের সোফাতে গিয়ে বসলো।
অহু’র আম্মিজান আব্র'র জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে আসলেন। আব্র আবার চা পছন্দ করে না।
আব্র কফি খেতে খেতে প্রথমেই নিহার মা'কে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুড়লেন,
“ কাকিমা তোমার আগে ফোন টা কে রিসিভ করে ছিলো? ”—
“ মনেহয় অহু রিসিভ করে ছিলো। ”—
আব্র চোয়াল খিঁচলো, আওড়ালো।
“ অহু এখন কোথায়? ”— এই প্রথম আব্র অহুর নাম নিলো।
জবাব আসলে,
“ অহু তো মহলে নেই। ভার্সিটিতে গিয়েছে। কেন কি হয়েছে? ”—
আব্র সংক্ষিপ্ত জবাব করলো।
“ না কিছু না। ”— আব্র আর কথা না বাড়িয়ে। বাড়ির সবার সাথে টুকটাক কথা বলে নিজের রুমে আসলো। সঙ্গে আসলেন আলিনা খান।।
আব্র ভাই এতদিন কোথায় ছিল? কেন বাড়ি থেকে ঐদিন চলে গিয়েছিল? কাওকে না বলে এই বিষয়ে কেউ কোন প্রশ্ন করলো না!
--------------
সন্ধ্যায় ৮:৩০ এ টু্্যর থেকে মহলে ফিরেছে অহু। জার্নি করায় অহুকে ক্লান্ত লাগছে বেশ। অহু সিড়ি দিয়ে উপরে উঠছে দোতলায়। উঠার সময় অহুর আম্মি বলে উঠলো নিচ তলা হতে।
“ কিরে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছিস নাকি? চা করে দিব? আর শোন একটা কথা... ”—
অহু তার মায়ের পুরো কথা না শুনে মাঝখানে কথা থামিয়ে দিলো। আওড়ালো,
“ আমি এখন কিছু শুনতে পারবো না। আম্মি খুব ক্লান্ত লাগছে। চা করে দিতে হবে না। আমি এখন রেস্ট নিব একটু। যদি ডিনার করতে না আসি তাহলে প্লিজ ডাক দিও না। প্লিজ আম্মি।
বলেই অহু সিড়ির রেলিং বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। দৈবাৎ অহু'র নজর আশাফ'কে বন্দী করলো। বুলি ছুড়লো হাসি ফুটিয়ে,
“ আরে আশাফ ভাইয়া কখন এসেছেন? কেমন আছেন? ”—
আশাফ প্রতুত্তরে হাসলো। জবাব দিলো,
“ এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুই কেমন আছিস তোর পড়াশোনার কি খবর? ”—
“ ”এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আচ্ছা পরে কথা বলব এখন আসি ভাইয়া। ”—
বলে অহু নিজের কক্ষের অন্দরে প্রবেশ করলো। অহু এখনো জানেনা আব্র লন্ডন থেকে মহলে ফিরেছে। রুমে গিয়ে কাধ থেকে ব্যাগটা ফেলে দিয়ে শটাং করে পালঙ্কে শুয়ে পরলো। পরনের পোষাকও পরিবর্তন করলো না।
[০৩.]~
রাত ১০টা, খান মহল।
আলিনা খান আব্রকে ডেকে ঘুম থেকে তুললেন ডিনার করার জন্য।
আব্রও ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে যায়। গিয়ে দেখে আশাফ এসেছে। আশাফের সাথে অনেকক্ষন কথা বলে। সবাই ডিনার করতে বসে যায়। তখন অনুপস্থিত ছিলো অহু।
আব্র দেখলো অহু'র আব্বু আসছে। আব্র তার ছোট কাককে সালাম দিলো।
“ আসালামু আলাইকুম, কাকা কেমন আছেন?”—
আশাফাক খান জবাব করলেন গম্ভীর কন্ঠে,
“ ওয়ালাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? ”— অভিমান চেপে ধরে
আব্র সেটা বুঝতেও পারলো ক্ষনিকেই।
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। বসুন, এক সাথে ডিনার করি। ”—
আশফাক খান একটা চেয়ার টেনে বসে পরলো।
আব্র আর আশফাক খান টুকটাক কথা বলতে লাগলো ভোজন শালায় বসে।
অতপরঃ,
খাবার খেয়ে রুমে চলে গেলো আব্র। রুমে গিয়ে কতক্ষণ আশাফের সাথে কথা বললো.......
~
~
রাত ০১ টার দিকে অহুর ঘুম ভেঙ্গে যায়।
অহু নিচে হলে গিয়ে দেখে কেউ নেই। সমস্ত লাইট অফ করা সবাই ঘুমাচ্ছে!
অহু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আস্তে আস্তে হাটা ধরল ছাদের দিকে। এখন ঘুমাতে ও পারবে না। বোরিং লাগছিলো, কেউ জেগেও৷নেই যে কথা বলবে।
ছাদে উঠলো অহু পরোখ করলো, ছাদের কার্নিশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার অবয়ব দেখা যাচ্ছে না।
“তবে সে যে স্মোক করছে সেটা হাওয়ায় মিশে যাওয়া ধোয়ার কারণে বুঝা যাচ্ছে!লোকটির ডান হাতে সিগারেট, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাল স্ফুলিঙ্গ রাতের অন্ধাকারে জল জল করছে! ”
অহু ভাবলো, এটা আর কেউ না আশাফ। আশাফ ভাইয়া সিগারেট টানছে। যার দরুন হাতে নাতে ধরতে গুটি গুটি পায়ে নৈশব্দে সামনে আগালো। অহু- অবয়বটির থেকে আর কিছু স্থানের দুরত্ব!
যখন ঐ অহু ‘ভাইয়া’ বলে চিল্লায় উঠবে।
দৈবাৎ সামনে থাকা অবয়বটি হঠাৎ পেছন ফিরে তাকায়। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। এক পলকে দুই জোড়া চোখ আটকে যায় একে অপরের গভীরতায়। সেই চোখের মাঝখানে তখন সিগারেটের ধোঁয়া এক স্বচ্ছ দেয়াল তুলে দেয়। দুই ওষ্ঠের ফাঁক দিয়ে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়ার রেখা বিভাজন টেনে দেয় অতীত আর বর্তমানের মাঝে, বাস্তব আর কল্পনার অন্তরালে।
দুজনেই স্তব্ধ। দুজনের বুকের গভীরে ধুকধুক শব্দ ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। বিশ্ব থেমে যায়, শহরের কোলাহল স্তব্ধ হয়। রাতের আকাশের পাখিরাও উড়তে ভুলে যায় হয়তো এই মুহূর্তে। অহু’র হৃদয়ে অনুরণিত হয় অজস্র স্পন্দন। বক্ষস্থলে শিরশিরে কাঁপুনি নেমে আসে। পাজরের ভেতর হঠাৎ করে ভূমিকম্প জন্ম নেয়।
এই কাকে দেখছে অহু?
যাকে এতদিন ধরে কেবল কল্পনায় রেখেছে,। যার প্রতিচ্ছবিতে মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। যার চোখে তাকিয়ে হাজারটা প্রশ্ন করতে চেয়েছিল। যার চেহারায় সৌন্দর্যের এক অনির্বচনীয় ভাষা ছিল। আজ হঠাৎ করেই তাকেই তো দেখছে অহু! সামনাসামনি!
এদিকে,
আব্র’র চোখের সামনে সেই চন্দ্রাবালা দাঁড়িয়ে অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই, ঠোঁটে কেবল সিগারেটের ধোঁয়ার রেখা। আর সেই ধোঁয়ার আড়ালে, অহু’র মনে জেগে ওঠে সহস্র অনুভূতির ঢেউ। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে, কিছু বলতে চায়, কিছু ছুঁয়ে দিতে চায়, কিন্তু ঠোঁট কাঁপে, শব্দ হয় না।
অবশ্য আব্র’র অবস্থাটাও খুব ব্যতিক্রম কিছু নয়। বরং অহু’র চেয়েও অনেক বেশি বিক্ষিপ্ত, অনেক বেশি অভিভূত সে। দীর্ঘ আট বছর পর সে দেখছে এই অহু’কে। একটা দীর্ঘশ্বাস বুকের গহীনে জমে উঠে “এই কি সেই অহু?”
কী অপরূপ রূপ ধারণ করেছে সে!
আব্র’র চোখে ধরা দেয় মন ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্য। নীলচে চুড়িদার পরে দাঁড়িয়ে আছে অহু। শরতের দমকা হাওয়ায় তার গলার ওড়না খেলা করছে। কাঁধ পর্যন্ত নামা ছোট ছোট চুলগুলো বাতাসে উড়ছে বারবার। চোখের সাদা মণি আজও ঠিক আগের মতোই গভীর, নিষ্পাপ। ধবধবে ফর্সা মুখে নাকের ডগায় ছোট্ট এক তিল। ওষ্ঠজোড়া নরম, কাঁপছে , চোখের পাপড়িগুলো ঘন হয়ে উঠেছে।
আব্র অনুভব করে এই মেয়েটার এক চাহনিতেই পৃথিবীর যেকোনো পুরুষ বিভোর হয়ে পড়তে পারে। তবুও… এই অহু যেন অন্য কেউ আজ। এই অহু হয়তো আর চেনে না তাকে।
অথচ সে জানে, সে তো আব্র’র হৃদয়ের প্রতিটা কোণায় আজও গেঁথে আছে! এই ভাবনা বুকের ভিতরেই ঝড় তোলে। হঠাৎই আব্র চমকে ওঠে।
চোখ তুলে দেখে তার সামনে কেউ নেই।
অহু নেই!
কোথায় গেল?
হয়তো অহু ছিল, হয়তো শুধু এক মরীচিকা ছিল সে। হয়তো বাস্তব, হয়তো স্মৃতির ধোঁয়া। শুধু বাতাসে এখনো ঘুরে বেড়ায় সিগারেটের শেষ ধোঁয়াগুলো। আর আব্র দাঁড়িয়ে থাকে, বিমুগ্ধ, শূন্যতায় চোখ রেখে। একটা মুহূর্তের প্রেম, আর আট বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার মাঝে বন্দি হয়ে।
#চলবে #পাঠক?