ফন্ট সাইজ:
থিম:
ক্যাপ্টেন ভিহান অরভিদ

১২তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া

#ক্যাপ্টেন_ভিহান_আরভিদ 

#লেখনীতে_সাদিয়া 
#পর্ব_১২
[পোস্ট সামনে গেলে অবশ্যই রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন]
"আপনি আমার সাথে কোনো কথাই বলবেন না "
রায়হান খান সেই কখন থেকে আদরের স্ত্রী কে মানানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু উনার জেদি বউ কিছুতেই কথা মানতে রাজি নয়। মহিলাটা এমনিতে বেশ নরম তরম কিন্তু একবার রেগে গেলে বোম হয়ে থাকে। তাই স্ত্রী ভক্ত রায়হান খান সবসময় চেষ্টা করেন বউ যেন সব কিছুতে খুশি থাকে। ভালোবেসে পাওয়া আদরের বউ উনার। 
লোকে বলে ভালোবাসার মানুষ কে পেলে সময়ের সাথে সাথে তার কদর কমে যায়। মূল্যহীন হয়ে যায়। কিন্তু রায়হান খান উল্টো। ভালোবাসার নারীটিকে পাওয়ার পর তিনি আরো যত্নশীল হয়েছেন। দিনদিন স্ত্রীর প্রতি গভীর টান অনুভব করে এসেছেন। কে বলে ভালোবাসার মানুষ পেলে কদর কমে যায়? মানুষটাকে ঠিকঠাক ভাবে রাখতে জানলে, ভালোবাসায় শান দিলে সেই কদর দ্বিগুণ হয়। কথায় আছে যতনে রত্ন। ভালোবাটাকে যত্ন করলে সেটা তো রত্নে পরিণত হবেই। এই যে শুধু তিনি যে স্ত্রীকে কদর করে এমন তো নয়। বিয়ের পর থেকে আফসানা বেগম স্বামীর দায়িত্ব যেমন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তেমন উনার পরিবারের প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজের মনে করে পালন করে এসেছেন। স্বামীর কি চায়, কোনটায় সে সন্তুষ্ট কোনটায় রুষ্ট উনার সব খবরাখবর আফসানার নখদর্পণে। ভালোবাসার কদর কেবল একটা ব্যক্তিকে করলেই তো চলে না। ভালোবাসাটা হয় সমানে সমানে তাই কদরটাও সমানে সমানে হওয়া চাই। দুইটা মানুষ ভালোবাসাটাকে যত্ন করলে কদর করলে সেটা সতেজ থাকতে বাধ্য। 
রায়হান খান আবার আলমারির কাছে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর নিকট গেলেন। কাঁধে আলতো হাত রেখে বললেন, 
  "আমার আদরের আফসানা। গিন্নি রেগে আছো কেন বলো আমায়? আমাকে খুলে না বললে আমি বুঝবো কি করে?"
স্বামী সোহাগি মহিলা নরম হলেন। শ্লথ কন্ঠে আওড়ালেন, "আপনি দিন দিন বেখেয়ালি হয়ে যাচ্ছেন। আমার প্রতি বাড়ির প্রতি কোনো খেয়াল নেই আপনার।"
রায়হান খান স্ত্রী আদরের সহিত এনে বিছানায় বসালেন। কোমল ভাবে স্ত্রীর হাত দুটি ধরে প্রশ্ন করলেন, "গিন্নি কি করেছি আমি? আমার দ্বারা কোন ভুল হয়েছে খুলে বলো।"
অভিমানী কন্ঠে উত্তর দিলেন আফসানা বেগম, "খেয়াল থাকলে কি আর আমার বলে দিতে হতো?"
  "তুমি তো আমার অর্ধাঙ্গিনী। আমার সমস্ত ভুল ত্রুটি মনে করিয়ে দেওয়ার আমার আরেক সত্তা।"
এরপর আর এক বিন্দুও রাগ করে থাকতে পারলেন না আফসানা বেগম। স্বামীর মুখে শুনা মিষ্টি বুলি উনার সমস্ত রাগ পানি করে দেয়। নরম সুরে বললেন, 
  "আপনি সবসময় গ্রামবসী আর ব্যবসা নিয়ে থাকেন। এদিকে বাড়ির ছেলে মেয়েদের বিয়ের বয়স হয়েছে সেদিকে আপনার কোনো খেয়াল আছে বলেন? আমার ভিহান টার বয়স হচ্ছে। ২৭ পেড়িয়ে ২৮ হবে। বিয়ে শাদি লাগবে না?"
স্ত্রীর কথায় প্রথমে প্রফুল্ল চিত্ত থাকলেও এবার রায়হান খান কে বিষণ্ণ দেখালো। উনার চোখ মুখ আঁধার দেখালো। 
  "কি হলো? আপনি আবার কি ভাবছেন?"
অবচেতন মন নিয়ে জবাব দিলেন রায়হান খান, "রুশমির জন্যে একটা চিন্তা ভাবনা করছি। ওর অনার্সটা শেষ হলে না হয় পাকাপোক্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিবো। কিন্তু ভিহান.."
  "দেখুন চেয়ারম্যান সাহেব, আমি কিন্তু এসব নিয়ে কোনো ভণিতা শুনতে চাই না। আমি আমার ভিহান কে সুখী দেখতে চাই।"
  "দেখো গিন্নি, ও নিজের বিষয়টা নিজে ভালো বুঝে। বড় হয়েছে। ও কি করবে সেটা ওকে সিদ্ধান্ত নিতে দাও। আমার মনে হয় না ওকে এই বিষয় নিয়ে জোর করা দরকার।"
  "আমি এত কিছু বলতে চাই না। আর না পুরনো কিছু নিয়ে পড়ে থাকতে চাই। আমার ভিহানও এসব চায় না। সেটা আপনি ভালো করেই জানেন। ও নিজেই সেটা প্রকাশ করে দেয়। তবুও আপনি সেই পুরনো ঘটনা নিয়েই পড়ে থাকবেন? এসব কিছুর কোনো দাম নেই। আমার ভিহান নিজেই তো সেটা চায় না। ওসব বিষয় কারো মনে নেই। বাড়ির কেউ গুরুত্ব দেয় না। সবাই সবটা ভুলে গিয়েছে। আপনি কি বুঝতে পারেন না? আমি আমার ছেলের সুখী জীবন দেখতে চাই চেয়ারম্যান সাহেব। আপনি ওর সাথে কথা বলুন। আগের কথা ভুলে যান। আমার ছেলের সুখ আমার কাছে সবার আগে। আমার ছেলে যা চায় তা মেনে নিতে আমার কোনো আপত্তি নেই। যেখানে আমার ছেলেই এসব ভুলে গিয়েছে সেখানে আপনি কেন এখনো বিষয়টা ভুলতে পারছেন না? ও যদি বিষয়টাকে এত গুরুত্ব দিতো তবে তো ও নিজেই আমাদের সাথে এটা নিয়ে কথা বলতো সেটা তো আপনায় বুঝতে হবে।"
রায়হান খান কে বড্ড চিন্তিত দেখালো। উনার চোখ মুখে স্পষ্ট আঁধার দেখা গেলো। পুরনো মেঘ ধবধবে আকাশ কে যেন একটু একটু করে ধোঁয়াশায় মুড়িয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে চাইছে। 
জিদান ভয় ভয় নিয়েও ভাই কে ডাকছে। 
  "ভাইয়া, ও ভাইয়া উঠো।"
  "জ্বালাস না আমায়। ভোরে ঘুমিয়েছি।"
নিজের খুব প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ভিহান ফজরের পরেই ঘুমিয়েছে। আর এদিকে জিদান ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে। 
  "ভাইয়া উঠো।"
  "নো।"
  "না উঠলে তুমিই মারা খাবে.. না মানে লস খাবে।"
 "...
  "ভাইয়া, চলে যাচ্ছি তো উঠো।"
  "জাহান্নামে যা।"
  "বোনু কে সাথে নিয়ে যাচ্ছি।"
  "পুতে ফেলবো একেবারে।"
জিদান ভাইয়া কে মনে মনে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিলো। পরক্ষণে বলল, "ভাইয়া আজো কিন্তু ড্রাইভার আসেনি।"
  "...
  "আমি কি বলছি শুনতে পাচ্ছো তুমি?"
  "ড্রাইভার আসেনি তো কি হয়েছে? তুই আছিস।"
ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল ভিহান। 
  "হ্যাঁ ফ্রি কামলা তো আছেই।"
জিদান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরক্ষণে আবারও ভাই এর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "ভাইয়া বোনু কে বাইকে উঠাতে চাইলে এখুনি ঘুম ছেড়ে উঠে পড়ো। আর যদি বোনু কে একা ছাড়তে চাও তো তোমার ব্যাপার। আমি ওদের নিয়ে চলে যাচ্ছি।"
ভিহানের চোখটা লেগেও শান্তি পেলো না। ঘুমঘুম চোখ নিয়ে সে তাকালো ভাই এর দিকে। এদিকে জিদান আগে থেকে নিজেকে সর্তক জায়গায় সরিয়ে নিয়ে বলল, 
  "ঠিক আছে ভাইয়া তুমি বরং ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দোষ ক... না মানে বলতে চাইছি বোনু কে নিয়ে স্বপ্ন দে.."
কথাটা শেষ করার আগেই ভিহান ক্ষিপ্ত ভাবে বালিশটা ছুঁড়ে দিলো ওর মুখের উপর। জিদান দ্রুত করে সেটা ধরল। বালিশটা সোফায় রাখতে রাখতে ভদ্র সুরে বলল, 
  "নো প্রবলেম আমি চলে যাচ্ছি।"
সদ্য কাঁচা ঘুম ভাঙ্গা ভিহানের মেজাজ চটে আছে। ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠল, "আয় দুটো লাথি খেয়ে যা রাবিশ।" 
ব্রেকফাস্ট করার পরপরই জিদান তাড়া দিলো ওদের। কালকের মতোই সামি রাফি গিয়ে বসলো গাড়িতে। কিন্তু কামিলি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইতিউতি করছিলো। যেন কালকের ভুল আজ আর না করতে হয় তাকে। বারবার ভেতরে উঁকি দিচ্ছিলো কারো আসার অপেক্ষায়। রুশমি বিষয়টা সবটা দেখে কপাল কুঁচকে নিলো। জানতে চাইলো, 
  "কিরে? এভাবে উঁকিঝুঁকি করে কি দেখছিস?"
কামিলি একটু থতবত খেলো। হাসার চেষ্টা করে বলল, "ওই আরকি রাহার আসার অপেক্ষা করছিলাম।"
পাশ থেকে জিদান হিরো হিরো একটা ভাব নিয়ে এসে চুপচাপ কামিলির হাতটা চেঁপে ধরল। ওকে টেনে নিয়ে হাটতে হাটতে বলল, "জনদরদী দুই পয়সার নেত্রী আমার, তোকে এত ভাবতে বলা হয়নি। বোনু ভাইয়ার সাথে আসবে।"
ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলেই এক প্রকার ঠেলে কামেলি কে বসিয়ে দিলো গাড়িতে। দেখা গেলো রুশমিও পিছু পিছু ঠোঁট টিপে হেসে গাড়িতে বসল। এই জিদান ভাইয়াটাও না যতক্ষণ সামনে থাকবে ততক্ষণ বিনোদন দিবে। 
গাড়িতে বসে কামেলি জিদানের উপর রেগে গেলো। চেঁচিয়ে বলল, "তুমি এভাবে আমায় জোর করে কেন এনেছো জিদান ভাই?"
জিদান জবাব দিলো না। যেন শুনলোই না। কামিলি আরো চিৎকার করে উঠল, "আমার কথা শুনতে পাচ্ছো তুমি? কি জিজ্ঞেস করলাম তোমায়?"
জিদান অনায়াসে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, "কানের গুঁড়ায় মশার মতো ভেনভেন করিস না। এক থাপ্পড়ে ভর্তা বানাবো নয়তো কয়েল দিয়ে একেবারে জ্বা'লিয়ে পু'ড়িয়ে দিবো ঝগড়ুটে শাঁকচুন্নি।"
কামিলি এবার গলা ছেড়ে চিৎকার করলো। রাগে গাড়ি থেকে নামার আগেই জিদান স্টার্ট দিলো। গাড়ি ঘুরাতেই সিটবেল না পড়ায় কামিলি জানালায় গিয়ে বাড়ি গেলো। তা দেখে জিদান চিবিয়ে বলল, 
  
  "ডেমড়ি কোথাকার বড়দের সম্মান দিতে জানিস না। মজা বুঝ এবার।"
রাহা ব্যাগ নিয়ে এসে দেখলো গাড়ি চলে গেছে। ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে যেই আবার ভেতরে ঢুকতে গেলো ওমনি শক্তপোক্ত এক খাম্বার সাথে ধাক্কা লাগলো তার কপাল। মুহূর্তে ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে কপালে হাত চেঁপে ধরলো, 
  "উফফ মরার মাথা, আমার কপালটা গিলে নিলো রে..."
বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকাতেই ভিহান ভাই কে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হকচকিয়ে গেলো মেয়েটা। কপালে হাত দিয়ে বড়বড় চোখে তাকালো। ভিহান ভাই অবিচল নয়নে তার দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে। হিসহিস করে বলল সে, "শুধু কপাল না পুরো তোকেই গিলে ফেলার ক্ষমতা আছে আমার।"
ঘোরাচ্ছন্ন রাহা সেই কথা শুনলো কিনা বুঝা গেলো না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে রুক্ষ গলায় ভিহান বলল আবারও, "এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আগে কোনোদিন দেখিসনি?"
রাহা বোকার মতো ঘোরে আচ্ছন্ন থেকে মাথা নাড়ালো। কালো মোটা ফ্রেমের সানগ্লাসে ভিহান ভাই এর মুখটা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে দেখতে দেখতে বলল মিহি গলায়, 
  "আপনায় খুব সুন্দর লাগছে ভিহান ভাই।"
এক মুহূর্তের জন্যে মনে হলো ভিহান নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। ওর পৌরুষ্য সত্তা ঢিপঢিপ করে উঠল। ভেতরের অনুভূতি গুলি ছলাৎ করে উঠতেই চোয়াল শক্ত করে বুঝি সেটা দমন করার চেষ্টা করলো সে। 
  "আমার ধৈর্য আর সংযমের আর কত পরীক্ষা নিবি তুই?"
  "হ্যাঁ?"
রাহা এখনো যেন সুন্দর এক ভ্রমে আছে। মিষ্টিমিষ্টি কিছু অনুভূতি তাকে দোল খায়িয়ে দিচ্ছে। অপলক চোখে সে তাকিয়ে আছে ভিহান ভাই এর দিকে। ভিহানও নেশা নেশা চোখে রাহার পানে তাকিয়ে থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠে। লাগামছাড়া অনুভূতি ক্ষ্যাপাটে হয়ে পড়ে তার। নিজেকে সংযত করার আপ্রাণ চেষ্টায় মাথাটা খানিক ঘুরিয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে আলতো করে ঘষতে আরম্ভ করে। 
বোকা রাহার স্তম্ভিত ফিরতেই হকচকিয়ে যায় সে। ভীষণ বিব্রতও অনুভব করে। আমতাআমতা করে বলে, "আ আসলে আপনাকে কোরিয়ান আর্টিস্টের মতো লাগছে। এটাই বলতে চাইছিলাম।"
রাহা দ্রুত করে ভেতরে ঢুকতে চাইলে ভিহান পিছন থেকে ওর ঘাড়ের ব্যাগ মুঠো করে ধরে। হঠাৎ হুড়মুড় করে থমকে যায় মেয়েটা। ভিহান ওভাবে দাঁড়িয়ে গম্ভীর সুরে প্রশ্ন করলো, 
  "কোথায় যাচ্ছিস?"
  "ভেতরে?"
ভিহান এরপর রাহার কাঁধের ব্যাগ কিছুটা উঁচুতে চেঁপে ধরেই ওকে টেনে নিয়ে আসে নিজের সামনে। তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে এরপর, 
  "তো ভেতরে কেন যাচ্ছিলি?"
ছোট্ট কিউট বেড়ালের বাচ্চার মতো রাহা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর মুখের দিকে। রাহার ওই বেড়াল বেড়াল ফেস দেখে ভিহানের হাসি পেলে সে ঘাড় ঘুরিয়ে নেয়। 
  "ইউ আর লুকিং লাইক আ বেবি ক্যাট।"
ভিহানের হাতের মুঠোয় কাঁধের ব্যাগটা ঝুলন্ত অবস্থাতেই বলল রাহা, 
  "কিছু বলছেন?"
  "তোর মতো স্টুপিড কে কি বলার থাকবে?" 
  "আব্বু কে বলবো আমায় দিয়ে আসতে কলেজে। ওরা আমায় ফেলে চলে গিয়েছে।"
  "মেজো চাচ্চু কে বলার প্রয়োজন নেই।"
এরপরই ভিহান ওর ব্যাগ মুঠো ভরে নিয়ে যায় বাইকের কাছে। 
 
  "তাহলে আমি যাবো কি করে? হেটে হেটে নাকি?"
ভিহান জবাব দিলো না। বাইকের সামনে এসে রাহার ব্যাগ ছেড়ে দিলো। পকেট থেকে চাবি বের করতে করতে বলল আদেশ সুরে, 
  "এক বিন্দু ভণিতা না করে উঠে বোস। তোর ন্যাকামি সহ্য করতে পারবো না এই মুহূর্তে।"
ভিহান যেন নিজের মনের বিপরীতে গিয়েই রুক্ষ স্বরে বলল কথাটা। গোয়ার এক রুখা ছেলেটা যে এই মেয়ের এসব আহ্লাদী নীরবে নিভৃতে কতটা উপভোগ করে মনে মনে তা আর কেউ জানেও না। রাহার তিল থেকে তিল পরিমাণ আদুরে ভাব ভিহানের মনে অদ্ভুত প্রশান্তি দিলেও বাহির থেকে নিজেকে দেখায় একদম রুক্ষ নির্বিকার আর কঠিন।
আদুর ভঙ্গিতে গাল ফুলিয়ে বলল রাহা,
  "আমি মুটেও ভণিতা করি না ভিহান ভাই। আমি খুব ভদ্র মেয়ে।"
  "হ্যাঁ সেটাই, বিশ্ব সেরা।"
  "তাহলে তো আমাকে এওয়ার্ড দেওয়া দরকার ভিহান ভাই। এখনো কেন দিচ্ছে না বলেন তো?"
  "ওই, তোর মতো প্রতিবন্ধী কে এখনো ওরা খুঁজে পাচ্ছে না তাই।"
ভিহান ঘাড় বাঁকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল। 
রাহা মুখটা পাংশুটে করে প্রত্যুত্তর করলো, "আপনি আমায় আবারও অপমান করছেন।"
ভিহান কিছু না বলে বাইকে উঠে বসল। এরপর রাহার কব্জি তে ধরে টেনে বাইকের পিছনে এনে ক্ষীণ গলায় বলল, 
  "যে এখনো মানই বুঝে না তার আবার অপমান কিসের মাথামোটা স্টুপিড।"
এরপর রাহা কে জোর করেই বসিয়ে বাইক টান দিলো। অল্পতে অভিমান করা রাহা আর কোনো কথা বলল না। গাল ফুলিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে রইল বাইকের পিছনে। লুকিং গ্লাসে বার কয়েক ভিহান সেটা পর্যবেক্ষণ করলেও আগবাড়িয়ে কিছু বলতে গেলো না। 
হঠাৎ কিছুক্ষণ পর পিছন থেকে রাহা ভিহানের পেট খামছে ধরে লঘু আওয়াজে বলল, "থামান ভিহান ভাই। দয়া করে থামান।" 
ভিহানও অতর্কিত ভাবেই গাড়ি ব্রেক কষলো। ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো রাহা মাথা নিচু করে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। ভ্রুকুটি করে প্রশ্ন করলো ভিহান, 
  "কি হয়েছে ইডিয়েট, এমন খামছা খামছি করছিস কেন?" 
রাহা জবাব দিলো না। যেন এক দলা অস্বস্তি হজম করে মেয়েটা না পারতে বসে আছে। ঘন কালো আঁধারে রাহার মুখটা ছেয়ে আছে দেখে শঙ্কিত হয় ভিহান। বুকটা মুচড় দিয়ে উঠল। সে দ্রুত করে বাইক থেকে নামলো। ভ্রুকুঞ্চন করে জানতে চাইলো, 
  "কি হয়েছে? মুখটা কালো হয়ে গিয়েছে কেন?"
রাহা উত্তর করলো না। মাথাটা আরো নুয়ে নিলো। বাইকে বসে থেকেই আঙ্গুল কচলাতে লাগলো অনবরত। ভেতরটা খানিক ব্যগ্র হলো ভিহানের। 
  "কথা বল মেয়ে। কি হয়েছে? মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন?"
অস্বস্তিতে রাহা জবাব দিতে পারলো না। সবসময় খামখেয়ালি করা তার স্বভাব। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের বোকামিতে নিজেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই বুঝি মা তাকে এসব নিয়ে এত বকে। লজ্জা অস্বস্তিতে মাটিতে মিশে যেতে মন চাইলো। 
ভিহান রাস্তার আশপাশ তাকালো। পরক্ষণে নরম গলায় ডাকল, 
  "তাকা আমার দিকে। রাহা লুক এট মি।"
রাহা তাকালো না। ক্ষীণ গলায় বলল, "আ..আমি বাড়ি যাবো ভিহান ভাই।"
কপাল আরো কুঁচকে এলো ভিহানের। সন্দিহানি কন্ঠে জানতে চাইলো, "কলেজ এসে বাড়ি যাবি কেন?"
মাথা নিচু করে তেজহীন গলায় বলল রাহা, "আমায় বাড়ি নিয়ে চলুন ভিহান ভাই। আমি বাড়ি যাবো।"
এবার বুঝি আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলো না ভিহান। ধমকে বলে উঠল, "নাম গাড়ি থেকে। বল কি হয়েছে?"
রাহা নামতে চাইলো না। উল্টে গাড়ি আরো আঁকড়ে ধরলো। তবে যেহেতু গাড়ি স্ট্যান্ড করা ছিলো তাই ঠিক করে বসা অবস্থাতেও ছিলো না। 
  "কলেজ যেতে চাইছিস না কেন? সমস্যা কি? কলেজে কোনো প্রবলেম?"
  "...
  "কিরে জবাব দিচ্ছিস না কেন? কেন যাবি না বলবি তো।"
  "আমি শুধু বাড়ি যাবো ভিহান ভাই।"
 "স্টুপিড এদিকে আয় তুই" বলেই গাড়িতে ঠেস দিয়ে থাকা রাহার হাত টেনে রাস্তার এক পাশে নিজের কাছে নিয়ে এলো ভিহান। এতেই মেয়েটা আরো জমে গেলো। অস্বাভাবিক ভাবে নিজের কাপড় টানতে শুরু করলো। তা দেখেই কপাল কুঁচকে এলো ভিহানের। সে তাকালো রাহার মুখের দিকে। মেয়েটা লজ্জায় অস্বস্তিতে দলা পাকিয়ে যেতে চাইছে দেখে সন্দেহ হলো তার। সে এক পা এগিয়ে এসে কোমল স্বরে বলল, 
  "রাহা কি হয়েছে বল আমায়।"
মেয়েটার মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে গিয়েছে ওই নরম সুরে। থুতনি বুকের সাথে মিশিয়ে লঘু আওয়াজে বলল, "আমি বাড়ি যাবো প্লিজ।"
রাহার হাবভাব দেখে ভিহানের একবারও সেসব কিছু মাথায় এলো না। পরক্ষণে বাইকের কালো সিটটা খানিক ভিজে দেখেই চমকে উঠল সে। সেদিকে সেকেন্ড কয়েক সূক্ষ্ম নজরে তাকিয়ে থেকে মস্তিষ্ক সজাগ হলো তার। অস্বস্তিতে গাঁইগুঁই করা রাহার পানে। বিষয়টা ধরতে আর একটুও সময় লাগলো না তার। নিজের উপর বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চেঁপে বলে উঠল, "ড্যাম।"
দ্রুত নিজের গায়ের কালো শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে তাকালো বিচলিত রাহার পানে। মেয়েটার উপর প্রচণ্ড রাগ লাগছে ওর। কোন গাধা নিজের এসবের ডেট নিজে মনে রাখে না? ভিহানের ইচ্ছা হলো মেয়েটার গালে ঠাটিয়ে একটা চড় লাগাতে। 
"স্টুপিড" বলতে বলতে শার্ট হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলো রাহার একেবারে কাছে। খানিক ঝুঁকে নিজের শার্টটা রাহার কোমরে বেঁধে দিতে দিতে তীক্ষ্ণ নয়নে তাকালো মেয়েটার মুখের দিকে। 
লজ্জায় রাহা আর চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেলো না। দাঁত খিঁচে শুধু দাঁড়িয়ে রইল। আশেপাশের অনেকে চোরাচোখে তাদের এমন দৃশ্য দেখছিলো। 
শার্টটা বেঁধে দিয়ে ভিহান পিষে কন্ঠে বলল, "ইডিয়েট একটা।"
রাহা কোনো জবাব দিলো না। যেন শ্বাস নিতেও ভুলে গেলো। নিজের নির্বুদ্ধিতায় নিজের উপরই বিরক্ত হচ্ছে সে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও একবার সন্দেহ হয়েছিলো কিন্তু চেক করেনি আলসেমি তে। এমনিতেও তার পিরিয়ড ডেট আরো ১০ দিন বাকি। যদিও এর পিরিয়ড সার্কেল সবার মতো নিয়মিত নয়। কোনো মাসে গ্যাপ দিলেও আবার পরের মাসে দেখা যায় দুইবারও হয়ে যায়। সে কারণে এতটা গুরুত্ব না দিয়ে বের হয়ে আসাই ওর লজ্জার কারণ হলো আজ। 
আড়চোখে দেখল ভিহান ভাই উদোম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই লোককে সেন্টু গেঞ্জি পড়তে সে খুব কমই দেখেছে। আজও যে শুধু শার্টই গায়ে দিয়ে এসেছিলো তা বুঝায় যায়। আর ৫ মিনিট দূরেই কলেজ। তাই রাস্তা দিয়ে অনেক মেয়েরাই যাওয়ার সময় এমন দৃশ্য দেখে কানাঘুষা শুরু করেছে। কেউ মিটিমিটি হেসে ছবিও তুলছে ভিহান ভাই এর উদোম শরীরের। কি নির্লজ্জ মেয়ে দেখো। রাহা আড়চোখে সেসব বিরক্ত আর রাগ নিয়ে দেখছে। অথচ ওই মেয়েরা যাকে দেখছে তার বিন্দুমাত্র কোনো হেলদোল নেই। মানুষটা হয়তো দেখলোও না তাকে কিছু কিছু নির্লজ্জ মেয়ে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। 
ভিহানের গায়ে কালো একটা প্যান্ট ছাড়া আর কিছু নেই। আবার অসভ্য বেটার আন্ডারওয়্যারের মোটা বেল্ট প্যান্টের উপর দিয়েই দেখা যাচ্ছে। ওই খাঁজকাটা ফুলো বডির সাথে এভাবে যে লোকটাকে বড্ড আকর্ষণীয় আর লোভনীয় দেখাচ্ছে তা উনার দিকে লুচু নজরে তাকিয়ে থাকা মেয়েদের হাসি দেখলেই বুঝা যায়। রাহা একটু আগের সমস্ত লজ্জা অস্বস্তি ভুলে গিয়ে গরম চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে ওই মেয়েদের দিকে। ওর হাবভাব এমন যে এখুনি গিয়ে ওদের চুল টেনে ধরে। 
ভিহান আর কোনো কথা বলল না। রাহার হাত চেঁপে ধরে ওকে নিয়ে বাইকে উঠে বসল। ওই রকম গায়ে শুধু একটা প্যান্ট জড়িয়ে খালি গায়েই বাইক স্টার্ট দিলো সে। এদিকে আবার আন্ডারওয়্যারের অংশও মেদহীন পেট আর কোমরের দিক থেকে দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা মেয়ে ফিদা হয়ে তাকিয়ে আছে ওভাবে ভিহান ভাই কে বাইক চালাতে দেখে। 
রাহা ক্ষিপ্ত নজরে ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে কিড়িমিড়ি কন্ঠে বলল, "অসভ্য নির্লজ্জ মেয়েছেলে। জীবনে যেন ছেলে দেখেনি। শাঁকচুন্নির দলেরা আরেকবার তাকাস শুধু চোখ একদম গেলে দিবো।"
রাহার ফুঁসতে থাকা কন্ঠ বোধহয় ভিহান শুনতে পেলো। তাই তো কেমন ঠোঁট কামড়ে হাসতে লাগল ছেলেটা গাড়ি চালাতে চালাতেই। মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছুঁয়ে গেলো। রাহা কি তাকে নিয়ে জেলাস? ওই পিচ্চি গাধাটা হঠাৎ রাগলো কেন? ভিহান গাড়ি চালাতে চালাতে কিছু ভাবতে লাগলো। মনে মনে বলে উঠল, 
  "তুই যখন ভালোবাসতে শিখে যাবি না তুনরা, তখন ভয়ংকর ভাবে ভালোবাসবি আমায়। দুনিয়া ছিঁড়েখুঁড়ে ভালোবাসা যাকে বলে তেমন ভাবে ভালোবাসবি আমাকে। সেই ব্যবস্থা আমি ভিহান নিজ হাতে তৈরি করে দিবো তোকে। কথা দিলাম।"
একটা দোকানের সামনে এসে বাইক থামালো ভিহান। রাহার দিকে আঙ্গুল তুলে শাসিয়ে বলল, "নামবি না বাইক থেকে।" 
রাহার বসার সুবিধার্থে ভিহান ডাবল স্ট্যান্ড করে রাখল বাইকটা। রাহা ওভাবেই সুন্দর করে বসে রইল বাইকে। বাঁকাচোখে তাকিয়ে দেখল ভিহান ভাই কে খালি গায়ে দেখে অনেকে কেমন করে করে তাকিয়ে আছে। ছেলে মেয়ে মহিলা বুড়ো সহ তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ চোখে। রাহা কিছু বলল না। অসভ্য ছেলে, একেবারে খবিশ একটা লোক। মনে মনে বকতে লাগলো ভিহান ভাই কে। 
হাতে একটা শপিং নিয়ে এসে ভিহান আবারও বাইক শার্ট দিলো। গাড়ি একেবারে বাড়ির সামনে আসতেই বিরক্ত তেতো মুখে রাহা নেমে পড়ল। 
  "কোথায় যাচ্ছিস দাঁড়া।"
রাহা জবাব দিলো না। কিন্তু খানিক রাগে ফোলা মুখটা নিয়ে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। ভিহান হাতে শপিং টা ধরিয়ে দিয়ে বলল, 
  "কোনটায় কম্ফোর্ট ফিল করিস জানি না তাই অনেক গুলি নিয়ে এসেছি।"
রাহা ঘুণাক্ষরেও জিজ্ঞেস করলো না কি এনেছে, কিসের কথা বলছে। বোধহয় তার কানে পৌঁছালোই না সে কথা। ভিহান ভাই এর দিকে ক্রুদ্ধ নয়নে তাকালো রাহা। আগাগোড়া খালি গায়ের লোকটাকে দেখে রাহা এক প্রকার টেনে নিয়ে নিলো শপিং টা। রাগি গলায় বলল, 
  "আপনি খুব অসভ্য ভিহান ভাই, খুবই নির্লজ্জ।"
এরপর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ালো না সে। হাতে শপিং নিয়ে গজগজ করতে করতে চলে গেলো ভেতরে। যাওয়ার আগে বলতে শুনা গেলো, "নিজের ওই মফিজ বডিটা সবাই কে দেখিয়ে এতো ভাব নেওয়ার কি আছে? কি যে ভাবে নিজেকে খোদা জানে। বেহায়া নির্লজ্জ লোক।"
রাহার এই রাগ দেখে ভিহানের একটুও রাগ লাগছে না। বরং আরো ভালো লাগছে। কোথাও যেন অদ্ভুত এক তৃপ্তি পাচ্ছে। মেয়েটা তাকে নিয়ে হিংসে অনুভব করছে? উপরের দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে মিটিমিটি হেসে বলতে লাগল ভিহান, 
  "আমার সামনে ব্যক্তিটা যদি হোস তুই, তবে আমি ভিহান দুনিয়ার সর্বোচ্চ নির্লজ্জের খাতায় নিজের নাম লিখাতেও রাজি আছি।"
চলমান....
আপনাদের কি মনে হয় রায়হান খান আর আফসানা বেগম কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন? কিছু কি অনুমান করতে পারেন?🤭

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন