#ক্যাপ্টেন_ভিহান_আরভিদ
#লেখনীতে_সাদিয়া
#পর্ব_২১ (প্রথমাংশ)
সেই কখন থেকে মাঠের এক কোণায় ঘাসের উপর থম মেরে বসে আছে রাহা। চোখ মুখের অবস্থা থমকে আছে। অনুভূতি শূন্য বস্তুর মতো কখন থেকে এক নজরে কোথায় তাকিয়ে আছে সে নিজেও বোধহয় জানে না। মেয়েটাকে দেখলে মনে হবে সে এখানে বসে আছে অথচ ডুবে গিয়েছে নিজ ভাবনা আর কল্পনায়। জড়বস্তুর মতো ওকে জমে থাকতে দেখে লুমামা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে। রাহা কে বাহু ছুঁয়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ডাকে,
"কিরে রাহা শুনছিস নাকি?"
চমকে ওঠে মেয়েটা। শরীর ঝাঁকিয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকায় পাশে। লুমামা কে দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
"মামার বাচ্চা মামা। এভাবে ডাকছিস কেন?"
"মনে হচ্ছে তুই নিজের কল্পনায় মেতে ওঠেছিস উনার সাথে?"
প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর কথায় একটু থতবত খায়। ইতিউতি করে কিছুটা। তা দেখে লুমামা ঠোঁট টিপে হাসে। মিষ্টি স্বরে বলে,
"সব শুনে আমার মনে হয় তুই ভিহান ভাই কে আসলেই পছন্দ করতে শুরু করেছিস।"
স্তব্ধ হয়ে গেলো রাহা। আবারও জমে গেলো বোধহয় সে। নিশ্বাসটা আটকে রাখলো মুখের ভেতরই। বুকে ধুকবুক ধুকবুক শব্দ আলোড়িত করে তুলল। কি ছন্দের তালে তালে নৃত্যে মেতেছে তার হৃদয়ের মিষ্টি ধ্বনিগুলি। বুকের গহীন থেকে ভেসে আসা সেই ধ্বনি মুহূর্তে অস্থির করে দিলো রাহার ভেতরটা। সেই সাথে শ্বাসের ঘনত্বও বাড়িয়ে দিলো দ্বিগুণ বেগে। চোখের পাতায় ভেসে গেলো কেবল ভিহান ভাই এর সুদর্শন ঘায়েল করা গম্ভীর মুখটা। রন্ধ্রে পৌঁছে গেলো ভিহান ভাই এর সেই চন্দন মেশানো সাফরানের সুঘ্রাণ টা। বুকের ঢিপঢিপ আরো বাড়লো ওর।
লুমামা মুচকি হাসতে হাসতে আলতো করে নাড়া দিলো ওকে।
"কিরে তুই তো দেখি আজ একটু পরপর ডুবছিস রে রাহা রানি।"
রাহার হৃদয়টা ছলকে ওঠল। এক মুহূর্তের জন্য নিজের ভাবনা গুলিকে ঝেড়ে বলল, "না, না। বাজে কথা বলছিস তুই। উনি.. উনি আমার চাচাতো ভাই হয়।"
"ইমম, ঢং। চাচাতো ভাই এর জন্যে মন আনচান আনচান করে আবার এখন সাধুগিরি দেখচ্ছিস?"
"....
"আমার কেন জানি মনে হয় ভিহান ভাইও তোকে পছন্দ করে।"
সর্বাঙ্গ ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠল রাহার। সে লাফিয়ে তাকালো পাশে। গলার স্বর উৎকণ্ঠায় ভরপুর রেখে প্রায় চিল্লিয়ে বলল, "পাগল হয়েছি তুই গাধা? মাথায় কলেরা হয়েছে তোর?"
লুমামা দাঁত কাটলো। মুখ মুচড়ে বলল, "পাগল আমি হতে যাবো কেন? গাধা তো তুই। কেউ যদি আমাকে পছন্দ করে তবে কি আমি বুঝবো না? ভিহান ভাই তোকে পছন্দ করে কিনা সেটা তো তুই ভালো বুঝবি ব্রেন হীন গাধা। আমি তো যা শুনলাম তাই বললাম।"
রাহা দমে গেলো। কপালে কয়েকটা ভাঁজ তুলে মুখটা শুকনো করে বলল, "উনি আমাকে পছন্দ করেন না। উনার মতো একটা জাঁদরেল লোক আমাকে পছন্দ করতেই পারেন না। উনি পছন্দ করলে কি আমি বুঝতাম না নাকি? সারাক্ষণ বকে। কিছু হলেই কান ধরিয়ে দাঁড় করে রাখে। একটুও ভালো করে কথা বলে না আমার সাথে। পছন্দ করলে কি এমন করতো? এসব কি পছন্দ করার নমুনা?"
"আর তোকে যে চকলেট এনে দেয়। তোর সব কিছু খেয়াল রাখে, তোকে যত্ন করে তার বেলায়?"
রাহার নিশ্বাস আটকে আসতে চায়। তবুও বহু প্রচেষ্টায় ঢোক গিলে নিজেকে শক্ত করে। কথা গুলি বড্ড বিশ্বাস করতে মন চাইলেও এক প্রকার নিজের বিরুদ্ধে গিয়েই উত্তর দিলো সে, "কারণ উনি এমনই। সবার ক্ষেত্রে। উনি প্রচন্ড দায়িত্বশীল। একটা নিখুঁত মানুষ। সবার সব কিছুতে উনার খেয়াল আছে। সবার জন্য চিন্তা করে। কামিলি আপু, রুশমি আপু সামি রাফি সবার জন্যে। উনি আমাকে পছন্দ করেন না।"
শেষের কথাটা রাহা ক্ষীণ সুরে বলল। লুমাম বলল এবার, "ঠিক আছে উনি তোকে পছন্দ করে কি না সেটা তো আস্তেআস্তে বুঝবি। কিন্তু তুই এটা তো স্বীকার করছিস তুই উনাকে পছন্দ করিস?"
রাহা উত্তর দিতে পারলো না। ঠাই বসে রইল এক জায়গায়। হৃদয়ে আন্দোলিত অনুভূতির তলে যেন ডুব দিলো।
স্কুল কলেজ থেকে সবাই তাড়াতাড়ি করে বাড়ি ফিরেছে। অফিসের কাজ শেষ করে জিদানও আগে আগে আজ চলে এসেছে বাড়ি। সবার পরে এসেছে ভিহান ভাই। এসেই তাদের তাড়া দেওয়া শুরু করেছে রেডি হওয়ার জন্যে। রাহা রুশমির কানের কাছে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করছে কি পরে যাবে। রুশমি সুন্দর একটা থ্রিপিজ পড়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কাজল দিচ্ছে। আর ওর কানের কাছে একই আলাপ করে যাচ্ছে রাহা,
"বলো না আপু কোনটা পরলে আমাকে বেশি সুন্দর লাগবে?"
এক কথা শুনতে শুনতে রুশমি প্রায় বিরক্ত। চোখ মুখ কুঁচকে তিক্ত সুরে বলল, "রাহা এবার থামবি তুই? সেই কখন থেকে এক ঝারি গেয়ে যাচ্ছিস। কেন বল তো? আগে তো এখনো কোথাও যাওয়ার সময় এত ঘ্যানঘ্যান করিস নি। হঠাৎ কি হলো তোর?"
রাহার মুখটা নেতিয়ে গেলো। মেয়েটা এত আদুরে। রাগ করলেও আদর করতে মন চায়। রুশমি ফিক করে হেসে দিলো ওর তুলতুলে মুখ পানে। কাছে টেনে ওর গাল দুটি টেনে বলল, "আমার লক্ষ্মী বোনটা পরীর মতো। যাই পরে তাতেই অপ্সরীর মতো লাগে।"
রাহা মুচকি হেসে জড়িয়ে ধরে রুশমি কে।
প্রায় দশ মিনিট ধরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ভিহান একটু পরপর হাতের ঘড়ি দেখছে। এখনো রাহা আর কামিলি আসেনি। গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভিহান। পাশেই গাড়ির ইঞ্জিনের উপর বসে ফোন টিপছে জিদান। বাগানের দিকে রুশমি ছবি তুলছে। তাকে ছবি তুলে দিচ্ছে সামি। ভাই এর ছবি তুলা মনোযোগ দিয়ে দেখছে রাফি।
তখুনি হাতের চুড়ি রিনিঝিনি শব্দ তুলে ছোট্ট একটা পরী স্বয়ং যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে খান বাড়িতে। সফট পীচ কালারের একটা চুড়িদার পরে ওড়নাটা কাঁধের এক পাশে ঝুলিয়ে রেখেছে। চুল গুলি একেবারে ভিহানের অনুভূতির মতো বাঁধনহারা করে হাতের উপর থাকা ওড়নাটা ঠিক করতে করতে সে এগিয়ে আসছে। মুখে লেগে আছে জ্যোৎস্নার এক ফালি ঝলমল করা কিরণ। বুকে ধক করে দৃশ্যটা যেন খামছে ধরল। ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে রইল ভিহান। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে দেখছে তার আদুরীটা কে। ছোট্ট বাটারফ্লাই টাকে পুরো যে এক টুকরো মোলায়েম মাখনের মতো লাগছে। এক দমকা হাওয়া উড়ে এসে লাগে ভিহানের ঠিক মাঝ বরাবর বুকের ভেতর। গলাটা শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। এক হীম বাতায়ন শরীরের লোমকূপে মিশে গেলো যেন ওর। চোখের স্থির অনড় বিমোহিত দৃষ্টি সেই আদর আদর মুখটার পানেই। নিজের কাছেই মনে হলো দৃঢ় সংযমে বড্ড আঘাত করছে ওই আদর মাখা প্রজাপতি টা। সেই প্রলয়কারী তীব্র আঘাত যেন তার সমস্ত ধৈর্য ধীরতা ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে চাইছে।
পাশ থেকে ভাইকে এতটা মুগ্ধ ভাবে জমে থাকতে দেখে জিদান ঠোঁট টিপে হাসে। গলা খাকড়ি দেয়। ভিহান এতেও যেন ভ্রম থেকে বের হয় না। এক নজরেই কেমন পাথরের মতো চেয়ে রয় ওদিক পানে। চোখে মুখে মিগধ সেই মুগ্ধতার রেশ খেলে যায়। কিছুক্ষণ বোধহয় ওর নিশ্বাসটা থমকে গিয়েছিলো ওর বেসামাল হৃদয়ের মতোই। ভিহান দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে পাশ ফিরে তাকালো বাগানের দিকটায়। হাতটা ঘাড়ে তুলে আলতো করে ঘষল কয়েকবার। নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো ধৈর্যশীল রুক্ষ গোছের ছেলেটা। আচমকা হুট করে একটু ঠোঁট প্রসারিত করে সে। পরক্ষণে ঘাড় ঢলতে ঢলতেই মাতাল ব্যক্তির মতো আধোআধো নজরে তাকালো রাহার দিকে। ওর দিকে বিমোহিত নেশা নেশা দৃষ্টিটা রেখেই ঠোঁট দুটি সামান্য ফাঁক করে অতি সামান্য স্বরে বিরবির করে বলতে লাগল,
"Nashe si chadh gayi oye,
kudi nashe si chadh gayi
patang si lad gayi oye
kudi patang si lad gayi
o udti patang jaise
mast malang jaise
masti si chadh gayi hamko turant asie
lagti karent jaise
abhi abhi utra ho net se torrent jaise
Nashe si chadh gayi oye,
kudi nashe si chadh gayi
ভাই এর এমন স্বরে গান শুনে ঠোঁট টিপে হাসে জিদান। আয়ে হায়ে! ভাই এর গানের কি মানে। কিয়া বাত হে! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ভাই এর ধ্যান ধরা সেই বিমুগ্ধ চাউনি। পরক্ষণে পর্যবেক্ষণ করে আবার ছোট্ট মেয়েটাকেও।
ভিহান ভাই এর সামনে এসে চুপটি করে দাঁড়ায় রাহা। ভেতরটা কেমন ছটফট করে ওর। এক মিগধ অস্থিরতা তাকে হাঁসফাঁস করে দেয়। কিছু লজ্জা কিছু উদ্বিগ্নতা তাকে স্থির থাকতে দেয় না। জিদান ভাই এর কাছে দাঁড়িয়ে বারবার সামনের উড়ন্ত চুল গুলিকে কানের পাশে গুঁজে দেয় আর চোখ তুলে তাকায় ভিহান ভাই এর দিকে। ভিহান তা দেখে মুচকি হাসে। ওর নেতিয়ে রাখা আইলাইনার মাখা চোখের দিকে গাঢ় নজরে চেয়ে থাকতে থাকতে আপন মনে বিড়বিড় করে,
"আমি তোর মাঝে ডুবেছি আদুরী, নিজেকে হারিয়েছি। নিজের সমস্ত সত্তা তোর নামে করে দিয়ে হয়েছি নিস্ব। নিজের সর্বস্ব হারিয়ে এই জাহানে ভিহান তোর মাঝে তলিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এ থেকে বাঁচার পথ কি তবে?"
নিজ মনে প্রশ্ন আওড়ে যায় তবে উত্তরের আশা করেনা সে। কারণ এই কঠিন প্রশ্নের সহজ উত্তর কত বছর আগেই জানা হয়ে গিয়েছে তার। এর পরিত্রাণ কিংবা মুক্তির পথ তো কেবল তুনরা খান রাহা স্বয়ং। তার আদুরী তার বাটারফ্লাই। ওই লিটল গার্লটা।
ভিহান রাহার আদুর মাখা নেশা নেশা মুখের দিকে স্নিগ্ধ নজরে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে আবারও,
"এই অকূল দরিয়ায় আমার নিজের বলতে তুই ছাড়া কিছুই নেই রে রাহা।"
এরপর পরপরই জিদান চেঁচামেচি শুরু করে দিলো।
"কামেলির বাচ্চা। এই কামিলি? শাঁকচুন্নি তোরে ফালাইয়াই চইলা যাইতাছি। তুই ঘরে বইসা মুড়ি খা, মগা।"
তখুনি কামিলি চুল ঠিক করতে করতে এগিয়ে এলো। জিদান ভাই কে দেখে মুখ মুচড়ালো। তাকে সঙ্গ দিয়ে জিদানও মেয়েদের মতো কামিলিকে দেখে মুখ ভেংচি কাটলো। যেন বুঝিয়ে দিলো 'তোর মুখ ভেংচানো কে ধারধারি না আমি।' কামিলি টাস্কি খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল বোধহয়।
রুশমি ছবি তুলা শেষ করে এগিয়ে এলো সবার মাঝে। জিদান ভাই কে বলল, "আমাদের সবার একটা ছবি তুলে দাও ভাইয়া।"
জিদান বিরক্ত মুখে বলল, "তো আমি কি চ্যালচ্যালাইয়া পড়লাম আসমান থেইকা? সবসময় আমারে কামলা বানানোর ধান্ধায় মরো তোমরা না? যা সর সেলফি তুলমু।"
'চল তুলি সেলফি, চল তুলি সেলফি' গানটা গাইতে গাইতে জিদান একটু সামনে চলে গেলো। হাতটা উপরে তুলে সবাই কে ফ্রেম বন্দি করলো ও। রাহা দাঁড়িয়ে ছিলো কামিলির পাশে। ওর পাশে রুশমি পরে ভিহান ভাই। জিদান নাক কুঁচকে বলল,
"বোনু তোকে দেখা যাচ্ছে না রে পিচ্চি। ভাইয়ার পাশে যা তুই।"
কামিলি ফোঁড়ন কেটে বলল, "কোথায় দেখা যাচ্ছে না জিদান ভাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তুমি এভাবেই ছবি তুলো।"
"নাক বোঁচা পেত্নী তুই চুপ মার।"
জিদানের ধমকে কামিলি কিছু বলবে তার আগেই রুশমি নিজের জায়গা পাল্টে দিলো। রাহা কে এই পাশে দিয়ে রুশমি কামিলি কে নিয়ে নিজের জায়গা ঠিক মতো করল। রাহা ভীষণ অস্বস্তি বোধ করল হঠাৎ করেই। তাই তো ভিহান ভাই এর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়ালো। সামনে সামি রাফি। পোজ টা আসলেই খাপছাড়া দেখাচ্ছে ওদের জন্য। তার সুযোগ নিয়েই জিদান বলল ক্যামেরায় তাকিয়ে থেকে,
"পিচ্চু তুই আরেকটু ভাইয়ার দিকে যা।"
রাহা হাবলার মতো তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। এদিকে ভিহান ভাই এর মুখ এখন বেশ স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। প্যান্টের পকেট থেকে নিজের হাত বের করে রাহা কে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো নিঃশব্দে। রাহাও বোকার মতো চমকে ওঠল। সে ভাবেই নি এমন টা হবে।
জিদান চিৎকার করে "পারফেক্ট" বলেই ক্লিক করল। রাহা এখনো যেন নিজের চিন্তা থেকে সরতে পারেনি। তাই তো নির্বোধের মতো তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর দিকে। এই পর্যায়ে ভিহান ভাইও তাকালো ওর দিকে। সেকেন্ড দুই পর ইশারা করল সামনে তাকানোর। লজ্জায় মিশে যাওয়ার উপক্রম রাহা তৎক্ষণাৎ তাকালো জিদান ভাই এর ফোনের দিকে।
বেশ কয়েকটা ছবি তুলে তারা যখন রওনা দিবে তখন ভিহানের ফোনটা বেজে ওঠে। ফোন হাতে নিয়ে সে কিছুটা দূরে চলে যায়।
কামিলি আগ বাড়িয়ে জানতে চায়, "গাড়ি কয়টা নেওয়া হবে? আর কে কোন গাড়িতে যাচ্ছে?"
ছবি দেখতে দেখতে জিদান আড়চোখে তাকালো কামিলির দিকে। শিষ বাজানো থামিয়ে বলল, "আর কিছু জানি না তবে ভাইয়া এই গাড়ি নিবে এটা আমায় বলেছে।"
ব্যস, কামিলি আর কোনো দিক না তাকিয়ে সোজা সামনে গিয়ে বসে পড়ল। রুশমি কিছুটা বিরক্ত হলো। ওর চোখ দুটি কুঁচকে রইল। সে কিছু না বলেই গেলো পিছনের সিটে। রাহা ঢুকবে তার আগেই সামি রাফি গিয়ে দখল করে নিলো ওদের জায়গা।
রাহা বোধহয় কিছুটা বিরক্ত হলো। সে অসন্তুষ্ট গলায় বলল, "খেলবো না আমি। তোমরা সবসময় আমার সাথে এমন করো। আমাকে না নিয়ে আগে আগেই গাড়িতে গিয়ে ওঠে বসো তোমরা। যেন আমাকে তোমাদের চোখের লাগে না।"
"রিলাক্স বোনু। তুই আরাম করে যেতে পারবি। একেবারে বিদেশএএএ.."
কথা শেষ করে ভিহান এগিয়ে এলো। জিদান কে বলল, "কোথায় যেতে হবে মনে আছে তো?"
বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচু করে জবাব দিলো জিদান, "পাক্কা।"
"ওকে ফাইন। বের হো তাহলে।"
"আমি এই গাড়িতে সবার সাথে যাবো। সামি তুই নেমে আয়। আমাকে রুশমি আপুর সাথে বসতে দে।"
নাক মুখ ফুলিয়ে বলল রাহা।
ভেতর থেকে সামি কিছু বলবে তার আগে জিদান চোখ পাকায়। এতে ছেলেটা না করে। নেমেও আসে না। রাহা জেদ দেখিয়ে ওঠতে গেলে চুলে টান খায়। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে ভিহান ভাই তর্জনীতে ওর চুল পেঁচিয়ে ধরে খুব সাবলীল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কিছুই হয়নি। রাহা হতবাক হয়ে গেলো। বিস্ময় আর উদ্বেগ নিয়ে তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর তর্জনী আঙ্গুলে পেঁচিয়ে থাকা নিজের চুলের দিকে।
বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে থেকে ভিহান জিদানের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল এবারে, "তো, সাবধানে যাস। আমি পিছনেই আছি।"
"ওকে ব্রো। ইনজয় দ্যা মোমেন্ট।"
বলতে বলতে জিদান চওড়া হেসে গাড়িতে গিয়ে ওঠে বসল। তা দেখে কামিলি নির্বাক হয়ে গেলো। চোখ বড়বড় করে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল জিদান ভাই এর দিকে। রুশমিও বেশ অবাক হলো। মুখে হাসি নিয়েও কপাল কুঁচকে চেয়ে রইল ছোট ভাইয়ার দিকে। তাদের কে তোয়াক্কা না করে এক টান দিয়ে ছুটল জিদান।
খান বাড়ির বিশাল গেইট দিয়ে ছুটে চলা গাড়ির পানে হতভম্ব নয়নে তাকিয়ে থেকে রাহা এবার পিছন ঘুরলো। খানিকটা বিরক্ত ভাব ফুটে ওঠল ওর মুখে। ও সবার সাথে আনন্দ টা মিস করে গেলো এই চিন্তায় কিঞ্চিৎ মেজাজও খারাপ হলো। জিদান ভাই, রুশমি আপু সব মিস করল। সেই বিরক্তির রেশ চিত্তে প্রতিফলিত হলো ওর বেশ খানিকটা। তিক্ত সুরে বলল,
"কি হলো এটা? কি করলেন আপনি?"
ভিহান ভাই যেন ওর কথা শুনেই নি এমন ভঙ্গিতে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে রইল পাহাড়ের মতো। ভিহান ভাই এর এত শান্ত আর গা ছাড়া ভাব দেখে বেশ খানিকটা রুষ্ট হলো রাহা। আনন্দ টা মিস হওয়ায় বেশ অসন্তুষ্ট সে।
বিরক্ত সুরেই বলল, "আমাকে ওদের সাথে যেতে দিলেন না কেন ভিহান ভাই?"
"তোকে আটকেছি?"
রাহা অবাক হয়। কপাল কুঁচকে বিস্ময় আর হতবাক রূপে তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর দিকে। পরক্ষণে নজর গেলো ওর চুল পেঁচিয়ে রাখা ভিহান ভাই এর আঙ্গুলের দিকে। কত বড় খাডাস হলে এত বড় মিথ্যে বলতে পারে? নিজেই চুলে আঙ্গুল পেঁচিয়ে তাকে আটকালো আবার বলছে উনি কিছু করেননি? তাকে আটকায়নি?
"ভিহান ভাই আপনি গভীর জলের একটা মাছ। আপনাকে দেখে যতটা শান্ত আর ভদ্র মনে হয় আপনি ঠিক ততটাই.."
"ততটাই কি?" বাম ভ্রু টা উঁচু করলো ভিহান ভাই, "বাকিটা শেষ কর।"
রাহা কোনো জবাব দিতে পারলো না। মেজাজ টা খিটখিট করছে। চোখমুখ বিরক্তিতে কুঁচকে সে এক পা এগিয়ে এলো। অসন্তুষ্ট চিত্তেই নিজের চুল খুলার চেষ্টা করলো ভিহান ভাই এর তর্জনী থেকে।
নিরলস ভঙ্গিমায় ভিহান চোখ নুয়িয়ে দেখে গেলো প্রেয়সীর বিরক্তমাখা রঙ্গিম মুখ। নিগূঢ় ভাবে হাসলোও বোধহয়। মনমনে বলল, "এমন বিরক্ত তুই স্টুপিড আমাকে সারাক্ষণই দিয়ে যাস তার বেলায়?"
চুল খুলে বিরক্তের সাথে মেজাজ দেখিয়ে বলল রাহা, "এখন আমি যাবো কি করে? আপনার মাথায় চড়ে?"
"চাইলে কাঁধে করেও যেতে পারিস। পুরাই ভিলেন স্টাইলে। আই হ্যাভ আ নো প্রবলেম।"
ভিহান ভাই ঘাড় বাঁকিয়ে নিলো। বাগানের পানে তাকিয়ে অন্য কিছু হয়তো দেখছিলো। এদিকে রাহা পুরো জমে গেলো এই কথা শুনে। চোখ দুটি বিস্ময়ে বড় হলো ওর। কাঁধে করে? ভিলেন স্টাইলে মানে? চোখের সামনে কিছু কিছু ভিডিয়োর দৃশ্য ভেসে ওঠল ওর। যেখানে ছেলেটা কিরকম ভাবে ঝাপটে কাঁধে তুলে নেয় মেয়েকে। দেখলে মনে হয় কিছুটা জোরপূর্বকই নিজের সাথে অধিকার বোধ দেখিয়ে কাঁধে চড়িয়ে নিয়েছে। ভিহান ভাই কি সেটার কথাই বলল? সেই ভাবনাতেই রাহা পুরো জমে ক্ষীর। নিজ কল্পনায় কতশত দৃশ্য এঁকে নিলো মেয়েটা। বুকের ভেতর থেকে প্রচন্ড তীব্র গতিতে করা ঢিপঢিপ ধ্বনি তার শ্বাস পর্যন্ত আটকে দেওয়ার ক্ষমতা ছিনিয়ে নিলো। আয় হায় কি সাংঘাতিক!
তার এসব হাবিজাবি কল্পনার মাঝেই ভিহান নিজের বাইক নিয়ে এলো। বাইকে বসে থেকে এক পা মাটিতে ঠেকিয়ে হুট করে হর্ন চাপল। তাতেই আত্মা উড়ে যাওয়ার উপায় রাহার। আচমকা এমন বিকট শব্দে প্রায় চিল্লিয়ে ওঠে কিছুটা দূরে সরে গেলো। ওর এমন কান্ডে ভিহান ঘাড় বাঁকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল।
রাহার আত্মা ধকধক করছে ভয়ে। বুকে খানিক থু থু দিয়ে সে কটমট করে তাকালো খাডাস লোকটার পানে।
"আপনি আসলেই একটা যাচ্ছেতা ভিহান ভাই।"
ভিহান উপরের দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে নিজের হাসি আটকানোর চেষ্টা করলো। কয়েকপল পরে তাকালো রাহার পানে। এবার মুখটা বেশ গম্ভীর থমথমে। চোখ সরু করে নিচু গলায় শুধালো,
"ভেবে বলছিস তো? রেখে যদি চলে যাই?"
রাহা গাল দুটি ফুলিয়ে ঘাড়টা ঘুরিয়ে নেয়। ওর লাল লাল গালের দিকে নজর পড়তেই ভেতরটা শুকিয়ে এলো ভিহানের। গলার এডামস অ্যাপল টা পরের উঠানামা করল অসহায় ভঙ্গিতে। ভেতরের বেপরোয়া পুরুষালী সত্তাটা ওই গালের পানে এক নজরে তাকিয়ে থেকে আপন মনে আওড়ে গেলো,
"পুরো মাখন মাখন চেরি।"
রাহা রাগে ফুঁসছে। ভিহানের ভেতর যেন আরো তপ্ত হতে চাইছে। ওই উত্তাপ নিশ্বাসের সাথে বের হচ্ছে। নিজের ধৈর্যের সর্বোচ্চ লাগাম টা টেনে ধরে ভিহান নিজেকে ধাতস্থ করলো। বাইকের স্টার্ট বাটন টা চেঁপে দিয়ে বড় গলায় বলল,
"হেই, ড্রামার ড্রাম ওঠে পর।"
রাহা ঠোঁট উল্টে বাইকে ওঠবে ওমন সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় সে। ছোট ছোট চোখে প্রশ্ন করে,
"আপনি কি বললেন এখুনি?"
ভিহান ভাই এটিটিউড নিয়ে চোখের রোদচশমাটা ঠিক করে জবাব দিলো, "যেটা তুই শুনেছিস একজেক্টলি সেটা।"
"আমি ঠিক করে শুনিনি। আপনি আবার বলুন তো আমায় কি বললেন? কি ডাকলেন?"
"এক কথা বারবার বলা পছন্দ নয় আমার। যাওয়ার হলে ওঠ। নয়তো আমি চললাম।"
রাহার রাগে শরীর কটমট করলো। কত বড় খবিশ লোক। রাগে ইচ্ছা হলো এখুনি বাড়ির ভেতরে চলে যেতে। পরক্ষণে আবার মনে পড়ল কি দরকার একটুক্ষণের জন্যে রাগ দেখিয়ে পুরোটা সময় আফসোস করার? রাগ করলো যে ঠকলো সে। তারচেয়ে চলে যাওয়াই ভালো। মজাটা নয়তো মিস হবে। কে যেন বলেছিলো, "রাগ করলে মানে তুমি হেরে গেলে।" আর রাহা হারবে? কিছুতেই না।
অগত্যা থমথমে মুখে বাইকে গিয়ে বসবে তার আগেই ভিহান ভাই ওর হাত চেঁপে ধরল। কপাল কুঁচকে রাহা তাকালো উনার দিক। তর্জনী আঙ্গুল উঁচু করে বলতে লাগল ভিহান ভাই, "লিসেন ইডিয়েট..."
তার কথা কেড়ে নিয়ে নিজ থেকেই বলল রাহা, "আপনার থেকে দূরে বসতে হবে এটাই তো?"
"ইয়েস।"
"আমি তো আপনার সাথে বসে যেতে চাইনি। আপনি কেন আমার চুল আটকে থামালেন তখন?"
"তোর হাসের পকপক শুনার মতো সময় নেই হাতে। জলদি ওঠ।"
রাহা মুখ মুচড়ে বিরক্তির সাথে বাইকে ওঠে বসল। জেদ্দি রাহা ভিহান ভাই এর থেকে বেশ দূরত্ব নিয়েই বসেছে। এবং কি উনাকে ধরলোও না।
খানিক মোটা গলায় ভিহান বলল এবার, "ইডিয়েট তোকে দূরত্ব নিয়ে বসতে বলেছি। তাই বলে না ধরে না।"
রাহাও রাগ নিয়ে উত্তর দিলো, "সব যদি আপনিই বলেন তো কি করে হবে?"
"এভাবেই। তোর কি মনে হয় তোর জন্যে আমি হসপিটাল যাবো?"
"আমি একবারও বলেছি আপনাকে সে কথা? কি করতে হবে আপনিই বলুন। একবার বলেন দূরত্ব নিয়ে বোস, আবার বলেন ধরে বোস। করবো টা কি আমি?"
রাহার রাগান্বিত চেহারা দেখার জন্যে লুকিং গ্লাসটা এমন করে ঘুরিয়ে রাখল যেন মেয়েটার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। ওর রাগ, রাগান্বিত মুখ সব কিছু যেন বড্ড উপভোগ্য লাগল ভিহানের কাছে। ঠোঁট মেলে স্ফীত হাসল।
আড়ালে মুচকি হেসে নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল, "কাঁধে হাত রেখে বোস।"
রাহা নীরবে কটমট করলো। ভিহান ভাই এর বিশাল কাঁধে নিজের ছোট্ট হাতটা রাখতেই ওই কাঁধে গলে যেন ওর হাত। সেদিক পানে চেয়ে রাহা মুখ মুচড়ালো। মনেমনে লুমামা কে ইচ্ছা মতো ঝাড়ল। মামার বাচ্চা মামা বলে কি না এই লোক তাকে পছন্দ করে? জীবনেও বিশ্বাস করবে না এই কথা রাহা।
ধীর গতিতে বাইক টান দিলো ভিহান। মৃদু বাতাস বইছে। সেই হাল্কা হাওয়া ওর লোমে লোমে গলিত হচ্ছে। হৃদয়টা প্রশান্তিতে মেতে ওঠেছে। ক্ষণে ক্ষণে দেখে চলছে রাহার আদুরে তুলতুলে মুখটা। মনে মনে আওড়ে গেলো ভিহান,
"তুই আমার সেই প্রশান্তির নাম রাহা, যে প্রশান্তি আমার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়া বিষকেও হজম করে শীতলতা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।"
চলমান...
সবাই রিয়েক্ট করে যাবেন। গল্প কেমন লাগছে জানাবেন। আর ভিহান ভাই কে কেমন লাগছে ১ লাইনে লিখে যাবেন।❤️