#ফালাক_সিজন_২
#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব____৫
ফালাক সাদের চোখের দিকে নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
"খাবারটা টেবিলে রাখা আছে। আপনার রাগ হলে আমাকে পরে শাস্তি দেবেন, কিন্তু শরীরের ক্ষতি করবেন না। বাইরে যা-ই ঘটুক, আপনি একজন ডক্টর... আপনার ঠান্ডা মাথা দরকার। আমি এখনই চলে যাচ্ছি, কেউ আমাকে আর দেখবে না।"
কথাগুলো শেষ করে ফালাক খুব ধীর পায়ে কেবিনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজা খোলার আগে সে এক মুহূর্তের জন্য থামল। শাড়ির আঁচলটা মাথায় সুন্দর করে টেনে দিয়ে পেছনে ফিরে সাদের দিকে তাকাল।
সাদ নিজের কেবিনের মাঝখানে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল।
ফালাক দরজাটা আলতো করে খুলে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার আগে টিফিন টিফিন ক্যারিয়ারটা টেবিলের ওপর রেখে গেছে সে। ফালাক চাইলে আজকে পুরো হসপিটালের সবার সামনে সাদের ওপর চিৎকার করতে পারত, তার ওপর রাগ ঝাড়তে পারত। কিন্তু মেয়েটা তা করল না! সে সাদের উগ্র আচরণ সহ্য করেও তার খেয়াল রাখল,
সাদ চেয়ারটায় বসে পড়ল। টেবিলের ওপর রাখা টিফিন বক্সটার দিকে সাদের চোখ গেল।
_______________
সন্ধ্যা ঘনিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে এলো সাদ।
চাবি বের করে নিজের হাতেই লক খুলে ভেতরে ঢুকল সাদ।
ভেতরে ঢুকতেই পুরো ড্রয়িংরুমটা নিস্তব্ধ। রান্নাঘর থেকে রান্নার সুবাস ভেসে আসছে, পুরো ঘর পরিপাটি করে সাজানো।
সাদ ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখতে পেল ফালাককে। ফালাক তখনো সেই গোলাপি শাড়িটা বদলায়নি। তবে শাড়ির আঁচলটা সুন্দর করে কোমরে পেঁচিয়ে কাজ করছে!
সাদের পায়ের শব্দে ফালাক কাজ থামিয়ে উঠে দাঁড়াল।
"আপনি চলে এসেছেন? ... রাতের খাবারও তৈরি।"
ফালাক খুব ধীর কদমে সাদের কাছে এগিয়ে এসে সাদের হাত থেকে কোট আর ল্যাপটপ ব্যাগটা নিজের হাতে তুলে নিল। "মুখ-হাত ধুয়ে টেবিলে আসুন।
সাদ নিঃশব্দে ফালাকের পিছু পিছু হেঁটে নিজের ঘরের দিকে গেল। ফালাকের এই নিভৃত সহনশীলতা কীভাবে যেন ডক্টর সাদ মির্জার বিষাক্ত রাগকে একটু একটু করে গলিয়ে দিচ্ছে, অথচ সে তা মুখে স্বীকার করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছে।
সাদ ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে
ঠিক তখনই বেডরুমের দরজার শব্দ হলো।
ফালাক মুখ-হাত ধুয়ে শাড়ি চেঞ্জ করে বের হয়ে এসেছে। দুপুরের গোলাপি শাড়িটা ছেড়ে সে এখন পরেছে হালকা, একটা শাড়ি। খোলা ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, আর ভেজা চুলের দু-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে তার ঘাড়ে। ফালাকের মুখটা যেন ভোরের স্নিগ্ধ কুয়াশার মতো অপ্সরী লাগছে। তার চেহারায় কোনো কৃত্রিম সাজ নেই, আছে কেবল অমলিন শুভ্রতা।
সাদ অজান্তেই চামচ হাতে নিয়ে ফালাকের দিকে তাকাল।
খেতে খেতেই সাদের চোখ দুটো থমকে গেল ফালাকের ওপর। সাদের মতো একজন কঠোর ও অহংকারী মানুষের দৃষ্টিতেও ফালাককে আজ অবিশ্বাস্য রকমের স্নিগ্ধ ও সুন্দর লাগছে । কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো সাজ নেই, তবুও মেয়েটার স্বাভাবিক রূপ আর তার ভেতরের আত্মিক শান্ত ভাবটা যেন পুরো ঘরটাকে আলো করে রেখেছে।
ফালাক ডাইনিং স্পেসে এসে সাদের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। সাদের এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দেখে সে সামান্য দ্বিধায় পড়ে গেল। নিজের ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে একপাশে সরিয়ে বলল—
"খাবার কি ঠিক আছে? নাকি অন্য কিছু বানিয়ে দেব?"
ফালাকের মিষ্টি কণ্ঠস্বরে সাদের হুশ ফিরল। সে চট করে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে প্লেটের দিকে তাকাল। গলায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে, নিজেকে সামলে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল—
"না, ঠিক আছে। অহেতুক সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ডিস্টার্ব করবে না। নিজের কাজ করো ।"
"আচ্ছা।"
ফালাক নিঃশব্দে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল বাকি জিনিসপত্র গোছানোর জন্য। আর ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা সাদ —প্রতিটি লোকমা মুখে নেওয়ার সাথে সাথে আড়চোখে ফালাকের স্নিগ্ধ, অপরূপ অবয়বটার দিকে তাকাতে বাধ্য হচ্ছিল, যা তার গম্ভীর্যের শক্ত বরফকে একটু একটু করে গলিয়ে দিচ্ছিল।
_______________
সাদ ফালাক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমের ঘোরে সাদ পাশ ফিরল।পাশ ফেরার পর পর-ই সাদের নাক এসে থামল ফালাকের ঠিক কাঁধ আর চুলের খুব কাছাকাছি। ঘুমের আবেশেই সাদের নাসারন্ধ্রে আছড়ে পড়ল ফালাকের চুলের সুবাস! ফালাকের শরীরের ঘ্রান!
সাদের অবচেতন মন যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ঘুমের ঘোরেই সাদের হাত দুটো আলতো করে ফালাকের দিকে প্রসারিত হলো। অস্ফুটে, খুব নিচু গলায় ফালাকের নামটা উচ্চারণ করে উঠল—
"ফালাক..."
সাদ ঘুমের গভীর আবেশেই ফালাকের পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলোর আরও কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেল।
"আহঃ... কীসের ঘ্রাণ এটা..." — মনে মনে আবেশে ডুবে গেল সাদ।
না চাইতেও, কোনো এক অজানা টানে সাদ দীর্ঘ এক দীর্ঘশ্বাস টেনে ফালাকের চুলের সুবাস বুক ভরে নিজের ভেতরে নিতে লাগল। তার ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি, উগ্রতা রাগ যেন সেই সুবাসের মোহে এক মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। ডক্টর সাদ মির্জার বিষাক্ত মনে এই সুবাসটা শান্তি এনে দিচ্ছিল, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
হঠাৎ করেই এই অস্বাভাবিক ব্যবহারে সাদের ঘুমের আবেশ কেটে গেল!
চোখ পুরোপুরি না খুললেও সেন্স ফিরে এলো—সে বুঝতে পারল সে কী করছে!
সাদের পুরো শরীর মুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। চোখ দুটো চমকে গিয়ে বড় বড় হয়ে ফুটল।
"হোয়াট দ্য...! আমি এসব কী করছি?!" — মনে মনে এক চাবুকের মতো ধাক্কা খেল সাদ।
তার ইগো সজাগ হয়ে উঠল। সে কীভাবে একটা মেয়ের এত কাছাকাছি যেতে পারে, যাকে সে এতদিন চরম অবহেলা আর তাচ্ছিল্য করে এসেছে!
সাদ তড়িঘড়ি করে, নিজেকে সামলে নিয়ে এক ঝটকায় ফালাকের কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরে গেল। তবে হঠাৎ এভাবে সরে গেলেও ফালাকের মোহনীয় সুবাস তখনও সাদের নাসারন্ধ্রে লেগে ছিল, আর তার শক্ত বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত ভালোবাসার টানের তোলপাড় চালিয়ে যাচ্ছে!
সাদ আড়চোখে ফালাকের দিকে তাকাল।
ফালাক ঘুমে আচ্ছন্ন। ফালাকের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে সাদ দূরে সরে গিয়েও যেন সরে যেতে পারছে না। সাদের মন এক নতুন টানাপোড়েন—যেখানে অহংকার দূরে ঠেলতে চাইছে, আর ফালাকের এই মায়াবী রূপ তাকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে।
______________
সাদের ঘুম যেন উড়ে গেছে তার চোখ থেকে। ভোর হয়ে আসতেই সাদ বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎই থমকে দাঁড়াল। বিছানায় ঘুমিয়ে আছে ফালাক। ঘুমের ঘোরে গা থেকে শাড়ির আঁচলটা কিছুটা সরে গেছে।
সাদের চোখ আটকে গেল ফালাকের উন্মুক্ত কোমরের দিকে।ঘন নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর সাদের যেন নিশ্বাস থমকে গেল, প্রাণ যাওয়ার জোগাড়! ফালাকের ফর্সা, নিখুঁত কোমর সুগঠিত অবয়ব—সাদের মনে হলো এত অবিশ্বাস্য রকমের সৌন্দর্য তার চোখের সামনে কীভাবে এতদিন আড়ালে রয়ে গেল?
আগে সবসময় রাগের চোখে ফালাকের দিকে তাকিয়েছিল বলেই সে মেয়েটার এই অপরূপ রূপ, এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য খেয়াল করেনি! আজ যখন উগ্রতার পর্দাটা একটু সরেছে, স্বাভাবিক দৃষ্টিতে ফালাককে পৃথিবীর সবচেয়ে মোহনীয় কোনো কবিতার মতো লাগছে।
সাদ একটা শুকনো ঢোক গিলল। তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে আসছে। সে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু অবাধ্য চোখ দুটো যেন কিছুতেই সরতে চাইছে না।
সাদ মনে মনে ফালাককে অস্ফুটে বকে উঠল—
"বেখেয়াল একটা মেয়ে! কীভাবে ঘুমাতে হয় সেই জ্ঞানটুকুও নেই? এভাবে কেউ শাড়ির আঁচল ফেলে ঘুমায় নাকি?!"
নিজের মনের ভেতরে চলতে থাকা উন্মাদনা সহ্য করতে না পেরে সাদ ধুপধাপ পা ফেলে বেডরুম থেকে বের হয়ে সোজা বারান্দায় চলে গেল।
বারান্দার ঠান্ডা বাতাস এসে সাদের মুখে-বুকে আছড়ে পড়ল। কিন্তু সাদের বুকের ভেতরে যে ঝড় শুরু হয়েছে, তা শান্ত করার ক্ষমতা এই ঠান্ডা বাতাসেরও যেন নেই।
তার বুকের বাঁ পাশে হৃদপিণ্ডটা অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে হাতুড়ি পেটার মতো পিটছে।
সাদ আকাশের খোলা তারাদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল। তার চোখ-মুখে চরম বিভ্রান্তি আর টানাপোড়েন।
"এসব কী হচ্ছে আমার সাথে?!" — মনে মনে চিৎকার করে উঠল সাদ। "যে মেয়েটাকে আমি ঘৃণা করতে চেয়েছিলাম, যাকে অবহেলা করে দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিলাম... সেই মেয়েটার একটা ছোঁয়া, একটা ঘ্রাণ আর এক ঝলক রূপ আমাকে এভাবে উন্মাদ বানিয়ে দিচ্ছে কেন!"
চলবে.....
#গল্পফ্যাক্ট #উপন্যাস #উপন্যাস_প্রেমী