ফন্ট সাইজ:
থিম:
ফালাক (সিজন ২)

১৫তম পর্ব

লেখক: ইনায়া জারিশ

#ফালাক_সিজন_২

#লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব____১৫
"ফালাক...!"
প্রচণ্ড এক আতঙ্কের চিতৎকার দিয়ে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল সাদ!
সাদের পুরো শরীর বেয়ে ঘাম অঝোর ধারায় ঝরছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এত দ্রুত আর সজোরে আঘাত করছে যেন হাড়-মাংস ভেদ করে এখনই তা বাইরে ছিটকে বেরিয়ে আসবে!
সাদ দু-হাতে নিজের চুলগুলো খামচে ধরে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল।
বাইরে তখন নিঝুম রাত। পাশে রাখা টেবিলে ছাইদানি ভর্তি হয়ে আছে আধপোড়া সিগারেটের ফিল্টারে।
ওটা একটা স্বপ্ন ছিল! একটা নিদারুণ, নরকীয় দুঃস্বপ্ন!
কিন্তু স্বপ্নের সেই প্রতিটা মুহূর্ত—ফালাকের ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকার দৃশ্য, তার নিথর ফ্যাকাশে মুখ আর নিজের বুকের ভেতর ফালাককে হারিয়ে ফেলার পক্ষাঘাতগ্রস্ত যন্ত্রণা—সাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে দিয়ে গেছে।
সাদ বিছানা ছেড়ে ধুপ করে নিচে নেমে এলো। হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে একহাতে কপাল চেপে ধরল সে। —আজ সামান্য একটা দুঃস্বপ্নের ধাক্কায় সে পুরোপুরি নিঃস্ব, দেউলিয়া হয়ে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে!
সাদের ভেতরের শয়তানটা যেন এই প্রথম ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল।
সাদ বুঝতে পারল, এটা কেবল স্বপ্ন ছিল না; এটা তার নিজের বিষাক্ত সন্দেহ আর ভুল সিদ্ধান্তের চরম অভিশাপ, যা প্রতি রাতে তাকে তিলতিল করে গিলে খাচ্ছে। যদি সত্যিই ফালাকের কোনো ক্ষতি হয়ে যায়? যদি এই নিষ্ঠুর দুনিয়ার কোনো বিষাক্ত চোখ তার ফালাকের সম্মান আর অস্তিত্বকে কেড়ে নেয়? 
সাদ এক টানে টেবিল থেকে তার বাইকের চাবি আর ফোনটা তুলে নিল। 
"অনেক হয়েছে ফালাক... অনেক সময় দিয়েছি তোমাকে এই সাদ মির্জার বুকেই ফিরে আসতে হবে, চিরতরে!"
সাদের বাইকের তীব্র গর্জন রাতের বাতাস চিরে ছুটছে! সাদের পরনের কালো চামড়ার জ্যাকেটের পকেটে ফোনটা রাখা।
বাইকের চাকা সশব্দে একটা পরিত্যক্ত পুরনো ওয়্যারহাউজের সামনে এসে থামল। বাইক থেকে নেমে হেলমেটটা এক ঝটকায় খুলে বাইকের ওপর রেখে সাদ ভারী কদমে ভেতরে ঢুকে গেল।
ভেতরে আবছা লালচে আলো। গোল হয়ে বসে আছে সাদের কলেজ লাইফের পুরোনো, বিশ্বস্ত বন্ধুদের গ্যাং। কলেজ জীবনে যারা একসাথে মারামারি, অসামাজিক বদমাইশি আর শহরের বুক কাঁপানো রাজত্ব চালাত—আজ সাদের এক ডাকে তারা সবাই আবার এক জায়গায় হাজির।
সাদকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই তাদের মধ্যে একজন সিগারেট ঠোঁটে চেপে হেসে উঠল—
 "ডক্টর সাদ মির্জা! তোকে দেখে সত্যি অবাক হচ্ছি রে ভাই। যে ছেলে হাসপাতালে সিরিয়াস সার্জারি ছাড়া অন্য কিছু বুঝত না, সে কি না একটা মেয়ের পেছনে নজর রাখার জন্য পুরো শহরের প্রাইভেট স্পাই আর লোক পেছনে লাগিয়ে রেখেছে! ভাবীকে নিয়ে তোর এই উন্মাদনা দেখে তো আমাদের মাথা ঘুরছে!"
সাদ বন্ধুদের ইয়ার্কি শুনে বিন্দুমাত্র হাসল না। তার চোখেমুখে কোনো রসিকতার ছাপ নেই, কেবল রাজত্ব করছে এক দানবীয় তীব্রতা। সাদ টেবিলের ওপর দু-হাত ভর দিয়ে নিচু, থমথমে গলায় বলল—
" কাজের কথায় আয়।"
আরেকজন বন্ধু সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল—
 "বল, কী করতে হবে? এত রাতে এত জরুরি তলব কেন?"
সাদের মুখ থেকে বরফ শীতল শব্দ বের হয়ে এলো—
 "ওই পুরনো ভাড়াবাড়িটাকে উড়িয়ে দিতে হবে।"
কথাটা শোনামাত্রই পুরো ঘরে যেন বজ্রপাত হলো! বন্ধুরা একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে একজন বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল—
"কী বলছিস তুই সাদ?! ঘর উড়িয়ে দেওয়া মানে? বোমা মেরে পুরো বিল্ডিং ছাই করে দিবি নাকি?"
সাদ খুব ধীর গতিতে মাথা নাড়ল—
"হ্যাঁ। ঠিক তা-ই।"
"সাদ, তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?!" — প্রথম বন্ধুটি উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠল, — "এভাবে একটা বসতবাড়ি বোম দিয়ে ওড়ানো কোনো সমাধান হতে পারে না! এতে তো মহাবিপদ হবে!"
সাদের চোখের রক্তবর্ণ মণি দুটো অন্ধকারের মধ্যেও হিংস্রভাবে জ্বলে উঠল। সাদের গলার স্বর হিমাঙ্কের নিচে নেমে এলো—
 "না, এটাই একমাত্র সমাধান। ওই মেয়েকে নিজের আত্মসম্মানের অহংকার ভুলে আমার খাঁচায় ফেরাতে হলে ওর সেই অহংকারের ছাদটাই উপড়ে ফেলতে হবে। যে ঘরে ও একা থাকার সাহস পায়, যে আশ্রয় ওকে আমার থেকে দূরে রাখে—সেই আশ্রয়ের অস্তিত্বই আমি চুরমার করে দেব! ফালাককে আমার বুকেই ফিরে আসতে হবে, এর বাইরে অন্য কোনো অপশন নেই। তোরা যদি না পারিস, বল... আমি একাই করব।"
সাদের এই রূপ দেখে বন্ধুদের মুখের হাসির ছাপ পুরো মিলিয়ে গেল। তারা খুব ভালো করেই জানে— সাদ একরোখা। যে সিদ্ধান্ত সে নেয়, তার সামনে পুরো দুনিয়া ধ্বংস হয়ে গেলেও সে পিছু হটে না।
গ্যাংয়ের অন্যতম পুরোনো সদস্য সাদেক এগিয়ে এসে সাদের কাঁধে শক্ত করে হাত রাখল—
 "আরে সাদ! তুই আমাদের এভাবে বলছিস? তোর জন্য আমরা সব করতে পারি, আর এ তো সামান্য একটা বাড়ি! ভুলে গেছিস নাকি college life-এ আমরা একসাথে কত জাওড়ামি করেছি? ভাইয়ের বিপদে কাজ করব না তো কখন করব?"
বাকি বন্ধুরাও একযোগে হেসে উঠে সায় দিল—
"একদম! তোর রানীকে আবার তোর রাজপ্রাসাদে ফেরত নেওয়ার জন্য যদি পুরো গলি ওড়াতে হয়, সেটাই হবে। প্ল্যান বল সাদ, কখন কী করতে হবে!"
সাদের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, জয়ী হওয়ার হাসি। 
পরদিন দুপুরবেলা।
কলেজ শেষ করে ফালাক ধীর পায়ে নিজের ভাড়াবাসার গলিতে এসে ঢুকছিল। শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত, মনের ভেতরটাও অজানা অস্থিরতায় ধড়ফড় করছে। কিন্তু সে জানত না, তার সেই ছোট্ট একলা আশ্রয়ের ওপর আজ ডক্টর সাদ মির্জার বিষাক্ত মাস্টারপ্ল্যান ছায়া ফেলেছে।
ফালাক গলি পার হয়ে নিজের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাল।, ঠিক সেই মুহূর্তে—
"বোমমমম!"
এক বিকট প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠল! ফালাকের চোখ দুটো আতঙ্কে ছানাবড়া হয়ে গেল। বিস্ফোরণের তীব্র বাতাসের ঝাপটায় স ছিটকে পেছনে পড়ে গেল মাটির ওপর!
চোখের সামনেই মুহূর্তের মধ্যে ফালাকের ছোট্ট ভাড়াবাড়িটা আগুনে দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল! ফালাকের এতদিনের তিলতিল করে গড়ে তোলা জীবনের সব আশ্রয় ধূলিসাৎ হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। ইটের টুকরো আর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পুরো গলিটাকে গ্রাস করে নিল।
ফালাক বসে দু-হাতে কান চেপে ধরে আতঙ্কে কোঁকড়ে উঠল। 
 "আমার... আমার ঘর! এটা কীভাবে হলো?! গ্যাস সিলিন্ডার ব্লাস্ট হলো নাকি অন্য কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনা...!" — ফালাক ধোঁয়া আর আগুনের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
তার মনের ভেতর চরম অসহায়ত্ব আতঙ্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে! হঠাত দুর্ঘটনা—ফালাকের মানসিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি ভেঙে চুরমার করে দিল। এখন সে কোথায় যাবে? এই নির্জন রাস্তায়, নিঃস্ব অবস্থায় সে কীভাবে বাঁচবে?
ঠিক সেই সময়ে ধোঁয়া চিরে গর্জন করে এসে থামল একটা কালো ওডি কার!
গাড়ির দরজা খুলে ধীর ও ভারী কদমে নেমে এলো সাদ ।
যে নিজের মনের মতো করে দুনিয়া ছারখার করে দিয়ে তার শিকারকে ছিনিয়ে নিতে এসেছে!
ফালাক কান্নাভেজা ঝাপসা চোখে সাদের দীর্ঘ অবয়বটা দেখে শিউরে উঠল।
সাদ এক নজর জ্বলন্ত বাড়িটার দিকে তাকাল, তারপর এক চুল সময় নষ্ট না করে সোজা হেঁটে এলো মাটিতে বসে থাকা ফালাকের সামনে।
সাদ কোনো কথা বলল না। সে এক ঝটকায় হাঁটু গেড়ে বসে ফালাকের নরম কোমরটা নিজের লোহার মতো শক্ত বাহুতে পেঁচিয়ে ধরল। ফালাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাদ তাকে ছালার বস্তার মতো পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল!
 "ছাড়ুন!, কী করছেন?! ছাড়ুন আমাকে!" — 
"সাদের পাহাড়সম কাঠিন্যের কাছে ফালাকের সব প্রতিরোধ যেন খড়কুটোর মতো ভেসে গেল।
সাদ ফালাকের মুখের একদম কাছে নিজের ঠোঁট এনে করে বলল—
 "অনেক হয়েছে ফালাক। " 
সাদ জোর জবরদস্তি করে ফালাককে গাড়ির পেছনের সিটে ছুড়ে ফেলল এবং দরজায় চাইল্ড লক লাগিয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে সজোরে এক্সিলারেটরে চাপ দিল।
ফালাক গাড়ির জানালার কাঁচ পিটিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল। 
ফ্ল্যাটের দরজাটা সজোরে খুলতেই ফালাককে ভেতরের লিভিং রুমে একপ্রকার ছুড়ে ফেলল সাদ!
ফালাক মেঝের ওপর পড়ে গিয়ে নিজের কান্না চেপে উঠতে চাইল। তার পুরো শরীরটা ভয়ে কাঁপছে, চোখের কোণে জল থরথর করছে, আর মনের ভেতর নিজের শেষ আশ্রয়টুকু আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার সেই বিভীষিকা রূপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সাদ এক ঝটকায় কোটের বোতাম খুলে সেটা সোফায় ছুড়ে মারল। তার ধবধবে সাদা শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিতে নিতে সাদ ফালাকের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে এলো। সাদের চোখ জোড়া থেকে যেন আগুনের ফুলকি ঠিকরে বের হচ্ছে!
সাদ ফালাকের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। ফালাকের থুতনিটা নিজের আঙুল দিয়ে সজোরে উঁচিয়ে ধরে চরম আক্রোশে ও চিল্লিয়ে বলে উঠল—
 "অনেক তো হলো, ফালাক! অনেক করেছ নিজের একলা থাকার বাহাদুরি! যখন এখান থেকে চলে গেলে ? কোনো বাধা দিয়েছিলাম? কিচ্ছু বলিনি! 
ফালাক ভয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলে শিউরে উঠল।
সাদ ফালাকের ফ্যাকাশে মুখের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে চিল্লিয়ে বলতে লাগল—
 "এখন দেখেছো ? দেখেছো পরিণতি কি পরিমাণ ভয়ংকর হতে পারে?! নিজের চোখে দেখলে তো? ঘরটাই আর আস্ত নেই! আস্ত বাড়িটাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে! যদি আজ তুমি ওই ঘরের ভেতর থাকতে ? যদি ওই বিস্ফোরণটা দশ মিনিট আগে হতো?! তুমি কি বেঁচে থাকতে ?!"
সাদ ফালাকের থুতনিটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। 
সাদ নিজের গলার টাইটা এক টানে ঢিলে করে দরজার দিকে ইঙ্গিত করে হুকুমের সুরে বরফশীতল গলায় বলল—
 "যাও! সোজা রুমে যাও!কান্না বন্ধ করো, না করলে ... তবে এর চেয়েও ভয়ংকর রূপ দেখবে আমার! গো টু ইওর রুম, নাউ!"
ফালাক উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে বেডরুমের দিকে হেঁটে গেল, আর পেছনে দাঁড়িয়ে রইল এক বিজয়ী, উগ্র প্রেমিক—ডক্টর সাদ মির্জা!
চলবে...
❤️ রাত ১০ টার দিকে আরেকটা পর্ব আসবে 
#উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন