#আশ্রয়_যদি_হয়_তোমাতে
#লেখনিতে_জয়া_সরকার
#[পর্ব_৪]
আদ্র – “কি হয়েছে মামনি?”
সামিরা –”একজন পুলিশ আরেকজন তোমার সমবয়সী ছেলে নাকি আমার সাথে দেখা করতে এসেছে ।”
আদ্র – “ ওহ । ওদের আসতে বলো মামনি। ওদের মধ্যে একজন অয়ন , আরেকজন পুলিশ অফিসার ইন্সপেক্টর শাহরিয়ার।”
সামিরা আদ্রের কথামতো তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে বললো –
— “ওনাদের ভেতরে আসতে বলো।”
কিছুক্ষণ পর সামিরার কেবিনে দুইজন যুবক ঢুকল। একজনের বয়স আদ্রের কাছাকাছি, আরেকজনের বয়স ত্রিশের মতো। তার গায়ে পুলিশের পোশাক। সামিরা বুঝতে পারল, তিনি নিশ্চয়ই কোনো পুলিশ অফিসার।
আদ্র ওদের দেখে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল।
পুলিশ অফিসার আদ্রের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন,
— “মিস্টার আরিয়ান চৌধুরী আদ্র, রাইট?”
আদ্র মাথা নেড়ে বলল,
— “ইয়েস।”
লোকটি হালকা হেসে বললেন,
— “আমি ইন্সপেক্টর শাহরিয়ার। ওয়নের বন্ধু। সো, আই’ম অলসো ইয়োর ফ্রেন্ড। তুমি আমাকে শাহরিয়ার বলেই ডাকতে পারো।”
আদ্র সংযত গলায় বলল –
— “আমি চেষ্টা করব।”
আদ্র – “মামনি মেহেরকে নিয়ে যাও । ওর মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করতে হবে ।”
মেহের – “আমারে কি নিয়া যাইতেছেন ?”
সামিরা নরম গলায় মেহেরের উদ্দেশ্য বলে উঠলো –
“মেহের মা , এদিকে আসো তো ।”
মেহের চোখে ভয় কিন্তু মনে দিদ্বা ছাড়াই সামিরার কাছে এগিয়ে গেলো ।
সামিরা মেহেরের মাথায় পরম ভালোবাসায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো –
“তোমার চাচি যে তোমাকে মারতো , তা আমরা কিভাবে জানবো বলো তো ।”
মেহের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো –
“ কেন , আমারে যেইখানডায় যেইখানডায় মারছে ? ওইখানে দাগ হয়ে আছে। আপনি দেখলেই , কইতে পারবেন।”
মেহেরের এমন সহজ সরল স্বীকারোক্তিতে উপস্থিত সবাই অসহায় চোখে তাকালো । মেয়েটা একদম সহজ সরল।
সামিরা –
“ এভাবে কেউ বিশ্বাস করবে না।”
মেহের ভ্রু কুঁচকে সামিরার দিকে তাকিয়ে বললো–
“কেন করবো না ? আমি কি মিথ্যা কইতাছি নাকি ।”
সামিরা – ঠিক, তুমি মিথ্যা বলছো নাকি সত্যি বলছো তার জন্যই তো পরিক্ষা করতে হবে। অনেকেই তো মিথ্যা বলতে পারে তাই না ?”
মেহের সামিরার দিকে তাকিয়ে বললো– “আমার চাচির মতো ?”
সামিরা উপর নিচ মাথা নাড়ালো অর্থাৎ হ্যাঁ।
– “যাবে না পরিক্ষা করতে?”
মেহের –
"যাবো । কিন্তু ব্যাথা দিবেন না তো ?”
সামিরা –
“তুমি বুঝতেই পারবে না ।”
– “আচ্ছা “
এইবলে মেহের আদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল –
“যামু?”
আদ্র হালকা হেসে বললো –
“হুম যাও ।”
মেহের –” আপনি চইলা যাইবেন না তো?”
আদ্র –”একদমই না”
মেহের – “আচ্ছা , তাইলে যাইগা কেমন ? আমি যামু আর আসমু । আপনি এইখানডায় কারান ।"
আদ্র মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
মেহেরকে নিয়ে সামিরা চলে গেলো ।
_____________________________________________
শাহরিয়ার এবার গম্ভীর হয়ে বললেন,
— “অয়নের কাছ থেকে আমি সব শুনেছি। কিন্তু আমরা এখনই মেহেরের চাচিকে ধরতে পারছি না। কারণ আমাদের হাতে কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। তবে আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছে, ছোটবেলাতেই মেহেরের মা-বাবা মারা যান। তখন থেকেই সে তার চাচা-চাচির সঙ্গে থাকত।
মেহেরের চাচা যখন বাড়িতে ছিলেন, তখন নাকি চাচি মেহেরের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন না। প্রায় দুই মাস হলো মেহেরের চাচা দেশের বাইরে গেছেন। তার পর থেকেই মেহেরের ওপর অত্যাচার শুরু হয়।
প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এইটুকুই জানা গেছে। আসল কারণ জানতে হলে তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। তবে আমার ধারণা… মেহেরের মা-বাবার সম্পত্তি মেহেরের নামে আছে। সেই কারণেই হয়তো তার চাচি তাকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।”
আদ্র এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। তার চোখে রাগ আর কষ্ট স্পষ্ট।
তবুও নিজেকে সংযত করে ধীর গলায় বলল,
— “আমি মেহেরকে মেডিকেল রিপোর্টের জন্য পাঠিয়ে তো দিলাম , রিপোর্ট হয়তো আজ অনেক রাতে আসবে। কিন্তু আজ আর এখানে থাকা সম্ভব না। রিপোর্ট আমাকে আগামীকাল সংগ্রহ করতে হবে। রিপোর্ট হাতে পেলেই আমি আপনাকে জানাব।
ওহ আরেকটা কথা , মেহেরকে কি তোমার কাছে রাখবে ?”
আদ্র সংক্ষিপ্ত করে উত্তর দিলো – হ্যাঁ,কেনো ?"
শাহরিয়ার –” না , তেমন কিছু না। তবে ,এখন তুমি মেহেরকে রাখতেই পারো । কিন্তু মেহের যদি তোমার কাছে থাকতে চাই তবেই , তুমি রাখতে পারবে । তার মানে মেহের যদি না চায় তাহলে ওকে আমাদের ফোর্স ওকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে ।”
আদ্র থমকালো । তার মাথায় একটা কথাই শুধু ঘুরপাক খেতে লাগলো
“ মেহের যদি তোমার কাছে থাকতে চাই , তবেই তুমি রাখতে পারবে । তার মানে মেহের যদি না চায় তাহলে , ওকে নিয়ে চলে যাবে ।"
শাহরিয়ার আবারো বললেন,
— “ওকে। তাহলে আজ উঠি। আবার দেখা হবে।”
শাহরিয়ার অয়নকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— “অয়ন, তাহলে আজ আসি।”
অয়ন হালকা হেসে বলল,
— “ওকে। সাবধানে যাবি।”
— “ইয়াহ, শিওর।”
শাহরিয়ার চলে যাওয়ার দিকে আদ্র আর অয়ন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তিনি কেবিন থেকে বের হতেই অয়ন আদ্রর কাঁধে হাত রাখল।
— “এখন মেহেরকে নিয়ে কোথায় যাবি?”
আদ্র নির্ভার কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
— “কোথায় আর… বাসায় যাব।”
অয়ন একটু দ্বিধায় বলল,
— “যদি আন্টি কিছু বলে?”
আদ্র শান্ত চোখে তাকিয়ে উত্তর দিল,
— “আম্মুর ওপর আমার বিশ্বাস আছে।”
অয়ন দৃঢ় কন্ঠে বললো –
“ তা তো আমারও আছে । কিন্তু আশেপাশের লোকজন কি বলবে ?”
আদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বললো –
“ I don't care about this useless society”.
অয়ন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ।
_________________________________________________
কিছুক্ষণ পর সামিরা আর মেহের এসে হাজির হলো ।
সামিহা এগিয়ে এসে আদ্রকে বলল,
— “রিপোর্ট কাল আসবে। তুমি মেহেরকে নিয়ে বাড়ি যাও।”
আদ্র মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
সে মেহেরকে নিয়ে বের হলো। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় আদ্র খেয়াল করল, মেহের চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এখন সে হালকা হেঁটে চলতে পারছে।
আদ্র নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
— “হাঁটতে পারবে? নাকি আমি…?”
মেহের তাড়াতাড়ি বলল,
— “না না, আমি একাই হাঁটতে পারমু । মামনিকে কন , আমি একাই হাইটা আইছি ।”
আদ্র একটু তাকিয়ে বলল,
— “ঠিক আছে… চলো।”
______________________________________
হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো তারা। বাইরে রাত নেমেছে। নরম হলুদ আলোয় হাসপাতালের সামনে সবকিছু যেন কেমন শান্ত ।
অয়ন সামনে এগিয়ে গেল। মাঝখানে মেহের, আর পেছনে আদ্র। মেহের ধীরে ধীরে হাঁটছিল। কিছুক্ষণ পর আদ্রও আস্তে আস্তে হাঁটছিল , কিন্তু পুরোপুরি পাশে এল না।
মেহের একবার পেছনে তাকিয়ে দেখল, আদ্র ফোনে কথা বলতে বলতে আসছে। সে থেমে গেল। দূর থেকেই আদ্র সেটা খেয়াল করল। ফোনের কথা শেষ করে সে মেহেরের কাছে এগিয়ে এল।
হাঁটতে হাঁটতেই আদ্র একবার মেহেরের দিকে তাকাল।
মেহের আস্তে বলল,
— “একটা কথা কইমু?”
— “বল।”
— “আপনি আমারে এত সাহায্য করতাছেন কেন? আপনি তো আমারে চিনেনও না…”
আদ্র যেন এই প্রশ্নের উত্তর আগেই ভেবে রেখেছিল। তাই একদম নির্লিপ্ত গলায় বলল,
— “আমার কোনো লাভ নেই, মেহের। বলতে পারো— জেদ। আমার মাথায় জেদ চেপে বসেছে, তোমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাব… যে জায়গায় গেলে তোমাকে আর কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না।”
মেহের অবাক হয়ে তাকাল।
— “ওও আচ্ছা ।"
— “হুম।”
মেহের একটু চুপ থেকে আবার বলল,
— “আপনার কোনো ছোট ভাইবোন নাই?”
আদ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “কেনো?”
— “না মানে… আমি যদি আপনার বাড়িতে থাকি, তাহলে কার সঙ্গে গল্প করমু?”
আদ্র হালকা হাসল,
— “থাকতে হলে গল্প করতেই হবে? সঙ্গীর সাথে গল্প না করে থাকা যায় না?”
মেহের মাথা নাড়িয়ে বলল,
– “না… মানুষ না তো একা কখনো থাকতে পারে আর নাতো একা বাঁচতে পারে । মানুষকে বাঁচতে আর থাকতে সঙ্গ দরকার।”
আদ্র তারা ভরা আকাশের পানে চেয়ে বললো –
" তুমি ভুল মেহের... মানুষ প্রিয়জনের অপেক্ষা করে বাঁচতেও পারে থাকতেও পারে ।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আদ্র বলল,
— “আমার একটা ছোট বোন আছে তো। নাম ইনিয়া। ও তোমার সমবয়সী।”
মেহেরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— “সত্যি?”
আদ্র মাথা নেড়ে বলল,
— “হুম… সত্যি।”
____________________________________
গাড়ির দরজা খুলে আদ্র মেহেরকে বসতে সাহায্য করল। মেহের চুপচাপ বসে রইল। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির আড়ালে এক অদ্ভুত ভরসাও আছে।
অয়ন –
“ ভাই সাবধানে যাস । আর বাসায় পৌঁছে আমাকে একটা কল করিস ।”
আদ্র –
“ গাড়িতে ওঠ ।”
অয়ন –
“কেনো ভাই , আজ না অন্য……
অয়ন এবার কিছুটা চি্ৎকার করে বললো–
“ অয়ন , আমি উঠতে বলছি । উঠবি কি না তাই বল ।”
অয়ন আর কোন কথা না বলে ড্রাইভিং সিটে বসে পরলো । আদ্র ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসে পরলো।
গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে আদ্র একবার আয়নায় তাকাল— মেহের জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। শহরের আলো তার চোখে পড়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
_______________________
গাড়ি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ল আদ্রদের বাড়ির এলাকায়।
গাড়ি গেটের সামনে থেমে হর্ন দিতেই ভেতর থেকে দারোয়ান মেইন গেট খুলে দিলো ।
রাতে বাড়িটির সামনের অংশ নরম হলুদ ও সাদা আলোয় আলোকিত। প্রতিটি দরজার উপরে ছোট ওয়াল লাইট জ্বলছে, যা দেয়ালে সুন্দর ছায়া ফেলছে। নিচতলার জানালাগুলো দিয়ে ভেতরের হালকা আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে।
উপরে দুই পাশের ব্যালকনিতে ছোট লাইট জ্বলছে। কাঁচের রেলিংয়ে আলো পড়ে চকচক করছে। ব্যালকনির টবের গাছগুলো আলোর ছোঁয়ায় স্পষ্ট দেখা যায়।
সামনের গেটের দু’পাশেও ছোট লাইট লাগানো, তাই প্রবেশপথ পরিষ্কার বোঝা যায়। টাইলস বসানো পথ আলোয় ঝকঝক করছে। চারপাশ একটু নীরব, আকাশে হয়তো হালকা তারা দেখা যাচ্ছে।
আদ্র মেহেরকে নিয়ে বাসার সামনে এসে দরজায় কলিং বেলটা বাজালো । সাথে সাথে দরজা খুলে গেলো ।
কিন্তু দরজার ওপাশের ব্যক্তিকে দেখতে আদ্র ভ্রু কুচকালো ।
– “আপনি !”
চলবে....