🌸 হিফজের পাতায় তুমি 🌸
পর্ব—১
“কানে ধরো!”
ছোট্ট আরহাম সঙ্গে সঙ্গে দুহাত দিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে গেল।
চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় বোন আয়রা।
“আপু… একটা সুযোগ দেও না প্লিজ! আর হবে না…!”
আরহাম কাঁদো কাঁদো গলায় বলল।
আয়রা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“এই কথা বলার পর আবারও বলেছো—‘আর হবে না’। তোমার এই ‘আর হবে না’ কথাটা আমি কতবার শুনেছি, হিসেব আছে?”
আরহাম মাথা নিচু করে ফেলল।
“জানি না…”
“জানো না?”
আয়রার গলা একটু শক্ত হতেই আরহামের চোখে পানি চলে এলো।
“আপু, সত্যি আর হবে না। এবার থেকে আমি মন দিয়ে পড়ব।”
আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে ছোট ভাইটার দিকে তাকিয়ে রইল।
রাগী মুখটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো।
আরহাম তার ছোট ভাই। বয়সও খুব বেশি নয়। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো হলেও দুষ্টুমির শেষ নেই। বই খুলে বসার পাঁচ মিনিট পরই তার চোখ চলে যায় জানালার বাইরে, কখনো খেলনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আবার কখনো সুযোগ পেলেই পালিয়ে যায়।
আয়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ঠিক আছে। কান থেকে হাত নামাও।”
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে কান ছেড়ে দিল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আজকের পড়া শেষ না করে উঠতে পারবে না।”
“আচ্ছা আপু।”
“বসো।”
আরহাম দ্রুত বই নিয়ে বসে গেল।
আয়রা তার সামনে বসে বই খুলে দিল।
“এই লাইনটা পড়ো।”
আরহাম পড়তে শুরু করল।
দু-এক লাইন ঠিকঠাক পড়ার পর আবার থেমে গেল।
আয়রা তাকাল।
“কী হলো?”
“ভুলে গেছি…”
“এইমাত্র তো পড়লে!”
“আবার ভুলে গেছি।”
আয়রা কপালে হাত দিল।
“আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দাও!”
আরহাম মুখ চেপে হাসতে লাগল।
“হাসছো কেন?”
“কিছু না আপু।”
“তোমার এই হাসিই একদিন তোমাকে শেষ করবে।”
আরহাম আবার বইয়ের দিকে তাকাল।
ঘরের এক কোণে বসে ছোট ভাইকে পড়াতে পড়াতে আয়রার নিজেরও সময় চলে যাচ্ছিল। আজ তাকে মাদরাসায় যেতে হবে। নিজের পড়াও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
আয়রার বয়স আঠারো বছর।
ছোটবেলা থেকেই দ্বীনি পরিবেশে বড় হয়েছে সে। মাত্র নয় বছর বয়সেই কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেছে। তার মায়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল—মেয়ের সিনায় কুরআন থাকবে।
আয়রা সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে।
এখনও প্রতিদিন নিজের হিফজের পড়া ঝালাই করে। পাশাপাশি হাদিসের কিতাব পড়তেও তার খুব ভালো লাগে।
আজও বের হওয়ার আগে তাকে সহিহ বুখারি শরিফ থেকে পড়া প্রস্তুত করতে হবে।
আরহামের পড়া শেষ করিয়ে আয়রা নিজের ঘরে চলে গেল।
বিছানার ওপর রাখা বুখারি শরিফটা হাতে তুলে নিল।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ বাইরে থেকে আরহামের কণ্ঠ—
“আপু!”
আয়রা চোখ বন্ধ করে বলল,
“আবার কী?”
“পানি খাব!”
“নিজে নিয়ে খাও।”
“আপু এনে দাও না…”
আয়রা বিরক্ত হয়ে বলল,
“আরহাম!”
“জি…”
“তুমি কি আমাকে পড়তে দেবে?”
“দেব।”
“তাহলে পানি নিজে নিয়ে খাও।”
“আচ্ছা…”
ছোট্ট পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।
আয়রার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
এই ছেলেটাকে যতই শাসন করুক, তার প্রতি ভালোবাসাটা কমে না।
কিছুক্ষণ পর আয়রা নিজের পড়া শেষ করল।
তারপর বোরকা ও নিকাব পরে প্রস্তুত হলো মাদরাসায় যাওয়ার জন্য। হাতে নিল বুখারি শরিফ।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে একবার পেছনে তাকাল।
আরহাম তখনও বই নিয়ে বসে আছে।
আয়রা বলল,
“আরহাম, আমি এসে যেন শুনতে পারি তুমি পড়া শিখেছো।”
আরহাম মাথা নেড়ে বলল,
“শিখব আপু।”
“ভালো ছেলে।”
আয়রা বেরিয়ে গেল।
_____
শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কালো রঙের একের পর এক গাড়ি এসে থামল।
সবচেয়ে মাঝের মার্সিডিজ গাড়ির দরজা খুলে নামল একজন যুবক।
কালো স্যুট, গম্ভীর মুখ, তীক্ষ্ণ চোখ।
আরিয়ান চৌধুরী।
চৌধুরী পরিবারের বড় ছেলে।
অঢেল সম্পদের মালিক। ব্যবসায়িক জগতে তার নাম যথেষ্ট পরিচিত। কিন্তু সম্পদের চেয়েও বেশি পরিচিত তার রাগী স্বভাবের জন্য।
তার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ অযথা কথা বলার সাহস পায় না।
আরিয়ান গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল দূরে।
একটি মেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
পরনে কালো বোরকা ও নিকাব।
হাতে একটি কিতাব।
মেয়েটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছে।
আরিয়ান থেমে গেল।
কেন থেমেছে—সে নিজেও জানে না।
মেয়েটির মুখ পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে।
অদ্ভুত শান্ত সেই চোখ।
আরিয়ান জীবনে অসংখ্য সুন্দরী মেয়ে দেখেছে। কিন্তু এই মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা তাকে এক মুহূর্তে থামিয়ে দিল।
সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই প্রশ্ন করল,
“ও কে?”
পাশে থাকা লোকটি অবাক হয়ে তাকাল।
আরিয়ান আবার কঠিন গলায় বলল,
“জিজ্ঞেস করেছি, মেয়েটা কে?”
লোকটি দ্রুত উত্তর খুঁজতে এগিয়ে গেল।
আরিয়ান তখনও তাকিয়ে আছে।
কিন্তু আয়রা?
সে কিছুই জানে না।
তার দৃষ্টি নিচু। হাতে বুখারি শরিফ। মনে শুধু মাদরাসার পড়া।
সে ধীরে ধীরে চলে গেল।
আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর লোকটি ফিরে এসে আরিয়ানের সামনে দাঁড়াল।
“স্যার, মেয়েটার নাম আয়রা। এখানকার একটা মাদরাসায় পড়ে।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“আয়রা?”
নামটা যেন অদ্ভুতভাবে তার কানে আটকে গেল।
“জি স্যার।”
“আর কিছু জানো?”
লোকটি একটু ইতস্তত করে বলল,
“শুনেছি, সে হাফেজা। খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে। নিয়মিত মাদরাসায় যায়।”
আরিয়ান আর কোনো কথা বলল না।
শুধু দূরে তাকিয়ে রইল। আয়রা ততক্ষণে অনেকটা দূরে চলে গেছে।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেই শান্ত চোখ দুটো।
অথচ আরিয়ান নিজেই বুঝতে পারছে না—মাত্র কয়েক মুহূর্তের দেখা একজন অপরিচিত মানুষকে নিয়ে তার এত ভাবনা কেন!
পাশ থেকে একজন বলল,
“স্যার, আমাদের যেতে হবে।”
আরিয়ান ধীর গলায় বলল,
“চলো।”
গাড়িতে উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল সে।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
কিন্তু তার চোখ যেন এখনও সেই পথেই আটকে আছে।
অন্যদিকে আয়রা মাদরাসায় পৌঁছে নিজের বান্ধবীর সঙ্গে ভেতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা তার মনেই নেই। তার মাথায় এখন শুধু আজকের পড়া।
ক্লাস শেষে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরল আয়রা।
দরজা খুলতেই আরহাম দৌড়ে এসে বলল,
“আপু! আমি আজ সব পড়া শিখেছি!”
আয়রা অবাক হয়ে তাকাল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ! তুমি পরীক্ষা নাও।”
আয়রা মুচকি হেসে বলল,
“বাহ! আজ তাহলে আমার ভাইটা মানুষ হয়েছে!”
আরহাম গাল ফুলিয়ে বলল,
“আমি সবসময়ই মানুষ ছিলাম!”
আয়রা হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“আচ্ছা, তাহলে দেখি আমার ভাই আজ সত্যিই কতটা মানুষ হয়েছে!”
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে খাতাটা এনে আয়রার সামনে বসে পড়ল। আয়রা একে একে তাকে প্রশ্ন করতে লাগল। আশ্চর্যের বিষয়, আজ আরহাম একটাও ভুল করল না।
“মাশাআল্লাহ! আজ তো সত্যিই সব শিখেছিস!”
আয়রার মুখে প্রশংসা শুনে আরহামের মুখটা আনন্দে ঝলমল করে উঠল।
“তাহলে আজ আমাকে বকা দিবে না?”
আয়রা হেসে বলল,
“না। আজকে বকা মাফ।”
“ইয়াহু!”
আরহাম খুশিতে এক লাফ দিল।
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে তাদের মা ডাকলেন,
“আয়রা, মা! হাত-মুখ ধুয়ে আয়। নাস্তা রেডি।”
“আচ্ছা আম্মু।”
আয়রা আরহামের হাত ধরে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
“চল, আগে হাত-মুখ ধুয়ে আসি। তারপর একসাথে নাস্তা করব।”
আরহাম মিষ্টি গলায় বলল,
“আপু, তুমি আমার সবচেয়ে ভালো আপু।”
আয়রা থেমে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“শুধু আজ পড়া শিখেছিস বলেই এসব বলছিস?”
“না! তুমি আমাকে বকা দিলেও তুমি ভালো।”
কথাটা শুনে আয়রার চোখেমুখে মায়া ছড়িয়ে পড়ল। ছোট্ট ভাইটার মাথায় আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“তুইও আমার খুব আদরের ভাই।”
_____
শহরের পিচঢালা রাস্তা পেরিয়ে আরিয়ানের গাড়ির বহর তখন তার বাড়ির সামনে এসে থামেছে।
গাড়ি থেকে নামতেই সবাই একটু দূরে সরে দাঁড়াল। আরিয়ান স্বভাবতই গম্ভীর। কিন্তু আজ তার মনের ভেতরটা অদ্ভুত রকম অস্থির।
নিজের ঘরে ঢুকে কোটটা খুলে সোফায় রাখল সে। তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
অজান্তেই আবার সেই মেয়েটার কথা মনে পড়ল।
“আয়রা…”
🌷চলবে...........😚