🌷 হিফজের পাতায় তুমি 🌷
পর্ব—৫
নতুন একটা সকালের সূচনা হলো।
ভোরের আকাশ তখনও পুরোপুরি উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে হালকা নীলের সঙ্গে মিশে আছে ফিকে কমলা রঙ। রাতের শেষ অন্ধকারটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, আর পাখিরা একে একে জেগে উঠছে।
মসজিদ থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই চারপাশের নীরবতা যেন আরও পবিত্র হয়ে উঠল।
আয়রার ঘুমও ভেঙে গেল সেই সুমধুর আজানের শব্দে।
চোখ মেলে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল।
ঘুম থেকে ওঠার পরও তার মুখে ছিল এক ধরনের শান্তি। সারারাত ঘুমানোর পর সাধারণত মানুষের চেহারায় যে ভারী ভাব থাকে, আয়রার মুখে তা খুব একটা দেখা যেত না।
জানালার পাশ দিয়ে আসা ভোরের মৃদু আলো তার মুখে পড়তেই তাকে আরও কোমল দেখাচ্ছিল।
আয়রা ওযু করে নামাজ আদায় করল।
নামাজ শেষে কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করে চুপচাপ বসে রইল।
তারপর জানালার পর্দা সরিয়ে দিল।
বাইরে ভোরের আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে।
আয়রা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসল।
আজকের সকালটা কেমন যেন অন্যরকম।
কেন, সে নিজেও জানে না।
হয়তো মনের ভেতর কোথাও কোনো অদৃশ্য অস্থিরতা জমে আছে।
হয়তো গত কয়েকদিনের কিছু ঘটনা এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
কিন্তু সে সেসব নিয়ে ভাবতে চাইল না।
আজ বাড়িতে মেহমান আসবে।
তার চাচারা অনেকদিন পর সবাইকে নিয়ে বেড়াতে আসছেন।
বাড়িটা নিশ্চয়ই আজ হাসি-আনন্দে ভরে উঠবে।
এই চিন্তায় আয়রার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল।
_________
ঘর থেকে বের হতেই রান্নাঘরের দিক থেকে মায়া বেগমের ব্যস্ত কণ্ঠ শোনা গেল।
“আয়রা মা, ঘুম থেকে উঠেছিস?”
“জি আম্মু।”
আয়রা রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, তার মা সকাল থেকেই নানা রকম রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
“আম্মু, এত কিছু?”
মায়া বেগম হেসে বললেন,
“তোর চাচারা আসবে, আর আমি কিছু রান্না করব না?”
আয়রা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“কী কী রান্না হবে?”
“অনেক কিছু। তুই বরং আমাকে একটু সাহায্য কর।”
“দাও।”
মায়ের সঙ্গে কাজে লেগে গেল আয়রা।
সকালটা এভাবেই ব্যস্ততায় কেটে যেতে লাগল।
কখনো রান্নাঘরে, কখনো ড্রয়িংরুমে, কখনো মেহমানদের জন্য ঘর গোছানো—
আয়রা সবকিছুতেই মাকে সাহায্য করছিল।
তার মধ্যে কোনো বিরক্তি ছিল না।
বরং আপন মানুষদের জন্য কিছু করতে পারলে তার মুখে আলাদা এক প্রশান্তি ফুটে উঠত।
আয়রার সৌন্দর্য শুধু তার মুখের গড়নে ছিল না।
তার সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল তার স্বভাব।
সে খুব বেশি কথা বলত না, কিন্তু যখন হাসত তখন তার মুখটা যেন হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠত।
তার চোখ দুটো ছিল শান্ত।
গভীর, স্বচ্ছ আর মায়াময়।
চোখে তাকালে মনে হতো সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই।
কাজল না পরলেও তার চোখের পাপড়িগুলো এমনিতেই ঘন ছিল। দীর্ঘ পাপড়ির নিচে থাকা সেই শান্ত চোখ দুটোতে সবসময় একটা লাজুক কোমলতা লেগে থাকত।
তার মুখের গড়ন ছিল পরিপাটি।
গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল, নরম ফর্সা—তবে সেই সৌন্দর্যের মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না।
মুখে সবসময় অতিরিক্ত সাজসজ্জা থাকত না।
বরং সাদামাটা থাকতেই তাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগত।
চুলগুলো সাধারণত পরিপাটি করে বাঁধা থাকত। কিছু চুল কপালের পাশে এসে পড়লে সে হাত দিয়ে সরিয়ে নিত।
আর তখন তার মুখে যে অল্প লজ্জা মেশানো স্বাভাবিক ভঙ্গিটা ফুটে উঠত—
সেটাই তাকে আরও মায়াবতী করে তুলত।
আয়রার সৌন্দর্য চোখে পড়ত।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি মনে থাকত তার শান্ত স্বভাব।
________
সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর।
হঠাৎ গেটের সামনে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
আরহাম আনন্দে চিৎকার করে ছুটে গেল।
“চাচ্চু এসেছে!”
আয়রা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আবার শুরু হলো।”
গেট খুলতেই একে একে সবাই ভেতরে ঢুকল।
বড় চাচা, চাচি, তাদের ছেলে রাফি আর মেয়ে নুসরাত।
নুসরাত গাড়ি থেকে নেমেই চিৎকার করে বলল,
“আয়রা কোথায়?”
আয়রা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
নুসরাত তাকে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
“তুই একটুও বদলাসনি!”
আয়রা হেসে বলল,
“তুইও না।”
“মিথ্যা বলছিস। আমি অনেক সুন্দর হয়েছি।”
আয়রা হাসতে হাসতে বলল,
“নিজের প্রশংসা নিজেই করিস?”
“অবশ্যই। অন্য কেউ করলে যদি কম করে?”
আয়রা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“তুই আসলেই আগের মতোই আছিস।”
নুসরাত তার হাত ধরে বলল,
“চল, অনেক গল্প আছে।”
________
সবার ব্যস্ততার মাঝেই রাফি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
সে প্রথমে সবার সঙ্গে কথা বলছিল।
তারপর হঠাৎ তার চোখ গিয়ে থেমে গেল আয়রার ওপর।
আয়রা তখন নুসরাতের সঙ্গে দাঁড়িয়ে হাসছিল।
সেই মুহূর্তে রাফির মনে হলো—
চারপাশের এত মানুষের মধ্যেও মেয়েটাকে আলাদা করে চোখে পড়ছে।
কোনো জাঁকজমক নেই।
কোনো বাড়তি সাজ নেই।
তবুও কী অদ্ভুত এক সৌন্দর্য!
আয়রার পরনে ছিল মেরুন কালারের থ্রি পিছ ।
হাটু সমান মাথার চুলগুলো সব ছাড়া।
মুখে খুব সামান্যই সাজ।
কিন্তু তার চোখের শান্ত দৃষ্টি আর ঠোঁটের কোণের মিষ্টি হাসিটুকুই যেন পুরো সৌন্দর্যের জন্য যথেষ্ট।
রাফি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল।
সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন।
নুসরাত পাশে এসে দাঁড়াতেই রাফি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
নুসরাত ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার আয়রার দিকে তাকাল।
তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটল।
“কী দেখছিলি?”
রাফি গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল।
“কিছু না।”
“কিছু না?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আয়রার দিকে তাকিয়ে ছিলি কেন?”
রাফি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
“এমনিই।”
নুসরাত হাসি চেপে বলল,
“ওহ, এমনিই!”
“চুপ কর।”
“কেন? সত্যি কথা বলছি।”
“নুসরাত, বেশি কথা বলিস না।”
“আচ্ছা, বলব না।”
কথাটা বললেও নুসরাতের চোখে তখন দুষ্টুমির ঝিলিক।
__________
আয়রা নুসরাতকে নিয়ে নিজের ঘরে গেল।
দরজা বন্ধ করেই নুসরাত বিছানায় বসে বলল,
“শোন, একটা কথা বলব?”
আয়রা চুলের খোঁপাটা ঠিক করতে করতে বলল,
“বল।”
“তোকে আজকে অনেক সুন্দর লাগছে।”
আয়রা অবাক হয়ে তাকাল।
“আজ?”
“হ্যাঁ।”
“প্রতিদিন কি সুন্দর লাগে না?”
নুসরাত চোখ বড় বড় করে বলল,
“ওমা! নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে এত আত্মবিশ্বাস?”
আয়রা হেসে ফেলল।
“তুই তো বললি।”
“আচ্ছা, একটা কথা সত্যি বল।”
“কী?”
“তুই জানিস, তুই দেখতে কতটা সুন্দর?”
আয়রা মাথা নাড়ল।
“এসব নিয়ে আমি ভাবি না।”
“সেটাই তো সমস্যা।”
“কী সমস্যা?”
“তুই জানিসই না, মানুষ তোকে দেখলে কী ভাবে।”
আয়রা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“তুই আবার শুরু করেছিস।”
নুসরাত হাসল।
“আচ্ছা, আর বলব না।”
কিন্তু সে জানত—
তার ভাই রাফি ঠিক কী ভাবছে।
________
দুপুরের খাবারের সময় সবাই একসঙ্গে বসেছে।
হাসি-ঠাট্টায় পুরো ঘর জমে উঠেছে।
রাফি খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল।
কিন্তু তার চোখ বারবার আয়রার দিকে চলে যাচ্ছিল।
আয়রা যখন কথা বলছিল, তার চোখের দিকে তাকাচ্ছিল সে।
আয়রা যখন হাসছিল, তখনও।
আয়রা যখন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে খাবার দিচ্ছিল, তখনও।
নুসরাত ব্যাপারটা খেয়াল করেছে বহুবার ।
একসময় সে ভাইয়ের পাশে গিয়ে খুব আস্তে বলল,
“তুই তো শেষ।”
রাফি বিরক্ত হয়ে বলল,
“কী?”
“কিছু না।”
“তুই সবসময় এমন করিস কেন?”
“তোর মুখটাই এমন হয়ে আছে।”
“কেমন?”
“যেন জীবনে প্রথমবার কাউকে দেখেছিস।”
রাফি কিছু বলল না।
শুধু চুপ করে রইল।
নুসরাত আবার বলল,
“এক দেখাতেই?”
রাফি এবার হালকা হেসে ফেলল।
“মেয়েটা ভালো।”
নুসরাত বলল,
“শুধু ভালো?”
রাফি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“অনেক শান্ত মনে হয়।”
নুসরাত মুচকি হেসে বলল,
“তোর পছন্দ হয়ে গেছে বুঝি?”
রাফি এবার আর উত্তর দিল না।
তার নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে গেল।
________
বিকেলে সবাই ছাদে বসেছে।
আকাশে তখন বিকেলের নরম আলো।
নুসরাত আর আয়রা পাশাপাশি বসে গল্প করছিল।
রাফি দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ নুসরাত বলল,
“আয়রা, তুই জানিস, আমার ভাই আজ খুব চুপচাপ?”
আয়রা অবাক হয়ে বলল,
“কেন?”
“জানি না।”
“তুই তো ওর বোন। তুই জানবি না?”
“ও তো আমার কথা শুনে না।”
আয়রা হেসে বলল,
“তোর মতো বোন থাকলে কে শুনবে?”
নুসরাত মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“দেখেছিস? তুইও আমার বিপক্ষে।”
আয়রা হেসে ফেলল।
এই হাসিটা দেখে রাফি আবার থেমে গেল।
কেন যেন মনে হলো—
এই মেয়েটার হাসিটা খুব আলাদা।
এটা খুব জোরে নয়।
খুব প্রকাশ্যও নয়।
কিন্তু একবার দেখলে মনে থেকে যায়।
_______
আরিয়ান চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে।
গাড়ির জানালার পাশে বসে সে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
শহরের পরিচিত রাস্তা একে একে পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
কাজের জন্য তাকে কয়েকদিন চট্টগ্রামে থাকতে হবে।
সামনে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং।
ব্যবসার বড় সিদ্ধান্ত।
কাজের চাপ কম নয়।
তবুও তার মনের কোথাও অদ্ভুতভাবে অন্য একটা চিন্তা জায়গা করে নিয়েছে।
আয়রা।
সেদিনের সেই মেয়েটা।
আরিয়ান নিজের অজান্তেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“কেন?”
সে নিজেকেই প্রশ্ন করল।
কেন মেয়েটার কথা মনে পড়ছে?
কোনো উত্তর নেই।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তারপর চোখ বন্ধ করল।
কালকের সেই দৃশ্য আবার মনে পড়ল।
মেয়েটার অস্থির চোখ।
তারপর নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়া।
আরিয়ান তাকে থামায়নি।
কথা বাড়ায়নি।
তার সঙ্গে কোনো সম্পর্কও নেই।
তবুও—
মেয়েটার চলে যাওয়ার দৃশ্যটা তার মনে আটকে আছে।
---
চট্টগ্রামে পৌঁছে আরিয়ান সরাসরি কাজের জায়গায় গেল।
সারাদিন ব্যস্ততা।
একটার পর একটা মিটিং।
ফাইল।
আলোচনা।
ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত।
কিন্তু দিনের শেষে যখন একা হলো—
তখন আবার সেই নামটা মনে পড়ল।
আয়রা।
অন্যদিকে আয়রা তখন নিজের পরিবারের মানুষদের নিয়ে ব্যস্ত।
চাচাতো ভাই-বোনদের হাসি-ঠাট্টা।
চাচিদের গল্প।
মায়ের সঙ্গে কাজ।
সব মিলিয়ে তার দিনটাও সুন্দরভাবে কেটে যাচ্ছিল।
কিন্তু সন্ধ্যার পর নিজের ঘরে এসে আয়রা জানালার পাশে দাঁড়াতেই হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল—
সেদিনের সেই ঘটনা।
আরিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠ।
তার চোখের সেই কঠিন দৃষ্টি।
আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিজেকেই বলল,
“কী অদ্ভুত মানুষ!”
এইটুকুই।
🌷চলবে.................😚