ফন্ট সাইজ:
থিম:
গোধুলির রক্তিম শিখা

২৩তম পর্ব

লেখক: পরিনিতা

#গোধূলির_রক্তিম_শিখা

#লেখনীতে_পরিনিতা 
প্রেমা পাশেই এসে বসলো ফুলের,তবে একটু দূরে। তার পড়নে অনিকের শহর থেকে আনা সে সবুজ রঙা শাড়ি। 
ফুলেদের ঘরে আজ মানুষের অভাব নেই। মেয়েটা চুপচাপ ঘোমটা মুড়িয়ে বসে আছে। ফুলের ঘোমটায় ছোট আয়না বসানো, পাথর ও রয়েছে। জ্বলজ্বল করছে। হাতে গায়ের মেহেদীর ঘাড় রঙ ধরেছে, দুধে আলতা রঙা হাতে কি অমায়িক না লাগছে। প্রেমা দূরে বসেই বারবার আড়চোখে ফুলের হাতখানা দেখছে। তাছাড়া আর কিছু ই দেখা যাচ্ছে না। তখনই টুসু এলো। আলতা পড়িয়ে দিতে লাগলো ফুলের পায়ে। প্রেমা দূরে থেকে চুপচাপ সবটা দেখছে। ফুল মেয়েটা ভীষন সুন্দর। এ মেয়েকে এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য কোন পুরুষের নেই। তা-ই তো মেয়েটা অনিককে পেলো।
প্রেমার এসব ভাবনার মাঝেই তার মা ফাইমা বেগম এলেন। খাবার খাওয়ার জন্য মেয়েকে নিয়ে গেলেন তিনি। 
ফাইমা বেগম অনিককে নিজের ছেলের মতই ভালোবাসে। শুরুতে প্রেমাকে অনিক বিয়ে করবে না বলে ওনার খারাপ লেগেছিলো বটে। তবে পরে তিনি নিজেকে বুঝ দিলেন, জোর করে যদি ওনারা প্রেমা আর অনিককে বিয়েও দিয়ে দিতেন তবে কোনদিন ও ওরা প্রকৃত অর্থে সুখী হত না। শুধু দু'জনে সম্পর্কটার বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়াতো। তাই আর খারাপ লাগা কাজ করে না। বরং যা হচ্ছে তাতেই তিনি খুশি।
অনিকের বউকেও দেখে এসেছেন তিনি। মেয়েটা বেশ হাসি-হাসি মুখ করে কথা বলেছে। 
ফাইমা বেগম প্রেমাকে ফিসফিস করে বললেন,
" অনিকের বউটা দেখতে মেলা সুন্দর না?"
প্রেমা আলতো হেঁসে বললো, 
" দেখতেই তো পেলাম না মুখটা। তুমি ই তো খেতে নিয়ে এলে।"
ফাইমা বেগম মেয়েকে নিয়ে পাশাপাশি চেয়ারে বসে বললেন,
" আগে খাইয়া নে তারপর দেখিস। আর বউ তো আমাদের ই। বাড়িতে গেলে এমনেই সারাদিন দেখবি।"
সবাই খাওয়া শুরু করলো।
করিম আলী এক গরীব মালি। ছেলে আর তার সঞ্চয়কৃত অর্থ দিয়েই বিয়ের আয়োজন করেছেন ক্ষুদ্র পরিসরে। হোসেন হাওলাদার বলে দিয়েছেন বেশি কেউ যাবে না। 
তেমন কেউ আসেও নি তাই। অনিকরা তিন বন্ধু। প্রেমা আর তার মা। আর হোসেন হাওলাদার এর সাথে তিনজন। সে তিনজনের সাথে এলাকার চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ ও আছেন। কারণ তার সঙ্গে চেয়ারম্যান এর বেশ সুসম্পর্ক। আর হোসেন হাওলাদার এর দুঃসম্পর্কের এক বোন ও এসেছে।
গরুর মাংস আর রুই মাছ, ও সবজির আয়োজন করেছেন।
খাওয়া শেষে হোসেন হাওলাদার বোন বললেন,
" কি আয়োজন করছে! খাওনডা একটুও ভাল্লাগে না। পোলারে বড়লোক জায়গায় বিয়া করাইতি। বিয়াত কি এত কম আয়োজন করে?খাইতেই তো পারি না।"
করিম আলী এদিক হয়েই যাচ্ছিলেন। মহিলার সে ঝাঁঝালো কথা কানে এলো। এ মূহুর্তে একজন মালি নয় তিনি একজন মেয়ের বাবা। এ বাবার খুব কষ্ট হলো মনে। চোখে দু ফোঁটা পানি চলে এলো। আশেপাশের সবাইর দিকে তাকিয়ে সে কান্না চেপে গেলেন তিনি। গলায় ঝুলানো গামছায় মুখ মুছলেন। অতঃপর চলে যেতে নিলেই কানে এলো হোসেন হাওলাদারের গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বরে বলা কথাগুলো,
" একজন বাবা তার সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে মেয়ের বিয়েতে আয়োজন করে। আমরা তো খাচ্ছি সবাই ভাত-মাংস, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ আসলে সে কন্যার বাবার মাথায় ঘাম পায়ে পেলা অর্থ। কোন মেয়ের বাবাকে বলতে নেই, খাবারে এত কম ক্যান বা খেতে ভালো হয়নি। আমরা তার রক্তে রোজগারের অর্থে খেয়েছি। "
করিম আলী মুখে এবার আলতো হাসির রেখা দেখা দিলো। ভেতরের দিকে গেলেন তিনি।
_____________
প্রেমা সাবান দিয়ে হাত ধুয়েমুছে আনমনে আসতে গেলেই কারো সাথে ধাক্কা খেলো। পড়তে গিয়ে ও পড়লো না।তাকাতেই দেখলো যে মানুষটার সাথে তার কিছুক্ষণ আগে ধাক্কা লাগলো সে আর কেউ নয়, রাসেল।
প্রেমা আমতাআমতা করে বললো, 
" দেখতে পাইনি ভাইয়া।"
রাসেল প্রেমাকে বললো,
" সমস্যা নাই। আমি ও দুঃখিত, খেয়াল করি নি তোমাকে। খাবার খেয়েছো?"
প্রেমা উপরনিচ মাথা নাড়লো। তারপর পাশ কেটে চলে আসলো সেখান থেকে। রাসেল ও চলে গেলো। 
____________
চলে আসলো বিদায় মূহুর্ত। বিয়ে-বিয়ে সাজময় পরিবেশ এতক্ষণ অব্দি ও বেশ হাসিখুশি ছিলো। কিন্তু যখন ই বিদায় মূহুর্তের আগমন ঘটলো তখনই যেনো সব কেমন থম মেরে রইলো। 
বিকেল হয়ে এসেছে প্রায়।
অনিককে আর ফুলকে পাশাপাশি বসানো হলো ঘরে। ফুলের মা ফারবিন বেগম মেয়ে-জামাইকে দুধ ভাত খাওয়াবেন। ভদ্রমহিলা ভাতে হাত দেওয়া মাত্র ই চোখের সমস্ত পানি যেনো নদীর মত বইতে চাইলো। কিন্তু তিনি নিজেকে বুজ দিলেন এই বলে, কিছুতেই মেয়ের সামনে আজ কাঁদবেন না। মেয়েকে হাসিমুখে বিদায় দেবেন তিনি। মনোবল ক্ষুন্ন করতে চান তিনি তার ফুলের। এক লোকটা ভাত তুলে অনিকের মুখে দিলো। পরে মেয়ের মুখেও দিলেন। ফুল তার আম্মার দিকে তাকালো। কিন্তু তার আম্মা যে চোখে চোখ মেলাচ্ছে না আজ তার সাথে। কেনো মেলাচ্ছে না। তা সে খুব ভালো করেই জানে। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে রেখে যে তিনি কান্না চেপে রেখেছেন তা সে খুব ভালো ই বুঝতে পারছে। 
এর মধ্যে বাইরে তাড়া দিতে লাগলো,
" সন্ধ্যা হইয়া আসতেছে।বউ নিয়া তো বাড়িতে যাওন লাগবো। তাড়াতাড়ি করেন আপনারা।"
টুসু ফুলের হাত ধরে নামালো চকি থেকে। ফুল ঠায় দাঁড়িয়ে এক পা ও এগোচ্ছে না। টুসু জিজ্ঞাসা করলো, 
" দাঁড়িয়ে গেলি যে?"
ফুল কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো, 
" আম্মা। কই তুমি। সামনে এসো। "
ফারবিন বেগম সামনে এলেন। মা-মেয়েতে চোখে চোখ পড়তেই কোন শব্দ ছাড়াই কাঁদছেন। ফারবিন বেগম মেয়ের মাথায় একটা চুমু দিয়ে বললেন,
" পরের বাড়ি, পরের ঘর, পরের বাড়ির বাসিন্দা। তাগোরে আপন কইরা নিও আম্মা। "
এরপর অনিকের হাতটা ধরে বললো, 
" আমার মাইয়াডা এক জনমে অনেক কানছে আব্বা। এইবার তো আশা রাখতাম ই পারি। কও আব্বা পারি না?"
অনিক শাশুড়ীর দুহাত ধরে আশ্বাস দিলো। তারপর বউ নিয়ে বের হলো ঘর থেকে। উঠানের মাঝেই করিম আলী দাঁড়িয়ে আছেন। একটু দূরে ফয়সাল আছে। 
করিম আলী এগিয়ে এসে ই মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে মুছে দিয়ে বললো,
" যাও আম্মা।"
ফুল আর সইতে পারলো না। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। মেয়েরা বরাবরই বাবার আদুরে। ছোটবেলা থেকেই সমস্ত আহ্লাদে আটখানার একমাত্র আস্তানা ঘাকে 'বাবা' নামক বটবৃক্ষ। বিদায় বেলাতেও এ বিষাদের শেষ নেই। 
কাঁদতে কাঁদতে মাথার ঘোমটাটা পড়ে যেতে নিলেই প্রেমা এসে ঘোমটাটা টেনে দিলো। ফুলের কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গিয়েছে। নাকের ডগা লাল হয়েছে ভীষণ। 
করিম আলী মেয়েকে অনিকের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,
" নিয়া যাও আব্বা আমার ফুলেরে। দোষ করলে বুঝাইও হেয় অবুঝ না। তোমার বুঝ মানবো। কান্দাইও না আব্বা, আমার বুকে পীড়া লাগে আমার ফুলে কানলে। কোনদিন যদি মনে হয়ও, যে ওরে আর সহ্য করতে পারতাছো না বা মূল্যহীন লাগে আব্বা তবুও গায়ে হাত তুইলো না। আমার আম্মারে আমার দরজায় আইন্যা দিয়া যাইও। যাও আব্বা নিয়া যাও।"
অনিক শশুরকে ও আশ্বাস দিলো। পাশে থাকা ঘোমটায় আবৃত তার নববধূর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললো, 
" হৃদয়ের হৃদয় স্পন্দনকে আপনি হেলাফেলা করবো বলছেন? তাহলে আমি অনিকের অস্ত্বিত্বই যে বিলীন হয়ে যাবে।"
ফয়সাল বোনের জন্য আনা পালকির সামনে এসে দাড়িয়েছে। চোখমুখ লাল তার। 
ফুল ভাইকে জড়িয়ে ধরলো। ভাই-বোনেতে সে কি কান্না। কিন্তু কেউ টু শব্দটাও করছে না। এদের কান্না দেখে সবার চোখে পানি এসে গেলো। ফুল ভাইকে কিছু বলতে গেলো,
" ও বাড়িতে যা..."
পরক্ষণেই কিছু একটা মনে করেই চুপ হয়ে গেলো। অনিক সাথে সাথে ফয়সালকে একহাত দিয়ে আগলে রেখে বললো,
" চলো আমাদের সাথে। বোনকে দিয়ে এসো। "
ফয়সাল আমতাআমতা করে বললো, 
" আমি যাইতাম? "
অনিক বললো,
" হ্যাঁ তুমি ই শালাবাবু।"
ফুলকে টুসু পালকিতে বসিয়ে দিলো। বেশ সুন্দর কারুকার্য করা একটা পালকি।
ফুল উঠেই টুসুর দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিতে গেলেই টুসু বললো,
" এই বেডি আমাকে একদম কাঁদানোর চেষ্টা করবি না। আমি তোর লগেই তোর জামাইর বাড়িত যাইতাছি। যা যা ভাগ।"
ফুল টুসুর কথায় আলতো হাসলো। ভরসা পেলো সে।
চারজন বেহারা মিলে পালকি কাঁদে তুলে নিলো। পেছন পেছন অনিক সহ বাকি সবাই আসছে। বাড়ির বাকি মেয়েসদস্যরা গরুর গাড়ি চড়ে রওনা দিয়েছে। 
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে। শীতের দিনে শেষ বিকেলে রোদের অন্তিম পর্যার এখন। চারেদিকে চলছে জুড়ে গোধূলি লগ্নের ছড়াছড়ি। আর ঠিক গোধূলির রক্তিম শিখা'র মতই আজ পালকি চড়ে লাল টুকটুকে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে, পায়ে আলতা মেখে এক রমনি ছুটছে তার জীবনের নব্য সূচনায়। উঁকি দিয়ে একবার নিজের বাড়ির দিকে তাকালো। অশ্রুমাখা সে দু-চোখ জোড়ায় আবারও অশ্রু টলটল করে উঠলো।
__________
হাওলাদার বাড়িতে নতুন বউ এসেছে। চারদিক থেকে সবাই মাস্টারের ছেরার বউ দেখতে এসেছে। আশেপাশে বাড়ির সব মেয়ে ঝি এ রাও এসেছে। 
ফুলকে নিয়ে পাটার উপরে দাড় করানো হয়েছে। তারপর এক কলসি পানি এসে পায়ে ঢেলেছে। এটা এখনকার গ্রাম্য রীতিনীতি। এরপর বউকে ঘরে তুলেছে ফাইমা বেগম। 
সামনের রুমে ফুলকে বসানো হয়েছে। প্রেমা এসে ফয়সালকে বসিয়ে দিলো ফুলের পাশে। এরপর বললো,
" এইযে পিচ্চি বেয়াই। তোমার বোনকে আমরা লুকিয়ে ফেলি নি। লুকিয়ে ফেললেও ফেলতে পারি। ও তো এখন আমাদের ই।"
প্রেমার কথায় সবাই হেঁসে ফেললো। প্রেমা এরপর এদিকটায় আসতেই নুরুন্নেছা বেগম (অনিকের মা) এক প্লেট মিষ্টির থালা প্রেমার হাতে দিয়ে বললো, 
" যা গিয়ে ভাবি আর ওর ভাইকে সহ সবাইকে খাইয়ে আয়।"
প্রেমা ভ্রু কুঁচকে বললো, 
" ক্যান তুমি গেলে কি সমস্যা? এসেছে পর্যন্ত বউ দেখতে অব্দি ও এলে না। মেয়েটা সব ছেড়ে ছুঁড়ে এখানে এসেছে। তোমাদের এমন আচরণের মানে কি?"
নুরুন্নেছা বেগম বললেন,
" দেখার জন্য তো সারাজীবন ই পড়ে আছে। যা বলছি কর তা।"
বলেই তিনি রান্নাঘরের দিকে গেলেন। রান্না চাপিয়েছেন তিনি সবার জন্য। 
___________
রাত বেশ হয়েছে। ফুল বর্তমানে অনিকের রুমে বসে আছে। একটু আগেই ফাইমা বেগম এখানে এসে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছেন তাকে। 
পুরো রুম জুড়ে ফুলের গন্ধ মউমউ করছে। খাটের চারপাশটা রজনীগন্ধা, গাধা ফুল, ও লাল গোলাপ দিয়ে সাজানো হয়েছে। বিছানায় গোলাপ ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে।
টুসু এলো। ফুলকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো,
" কি ময়নাপাখি কি হালছাল?"
বলেই একটা চোখ টিপ দিলো। 
ফুল ওর ইঙ্গিত কিছুটা বুঝলো। ফুল থতমত খেয়ে টুসুকে বললো,
" বিয়ের পর থেকে তোর মুখের লাজ শরম সব কোথায় চলে গিয়েছে টুসু?"
টুসু চিন্তাভাবনা করার ভান করে বললো,
" ও ওহ, মুখের লজ্জাশরম তো আমার বোয়ালমাছের কোলে দিয়ে এসেছি। "
ফুল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। টুসু ওকে একটা ধাক্কা দিয়ে ভেংচি কেটে বললো,
" ভ্রমর আসবে একটু পর গুনগুন করতে তখন দেখবো লজ্জাশরম কই যায় তোমার। ভাগ বেদ্দপ ছেমড়ি। "
বলেই চলে গেলো ফুলকে আবারও একা রেখে। একটু পর দরজা ঠেলে অনিক এলো। ফুল বিছানায় মাঝামাঝি বরাবর বসে আছে বড় ঘোমটা টেনে। 
অনিক দরজা আটকে এসে বসলো পাশেই। কিছুক্ষণ চললো পিনপিনে নিরবতা। তারপর তার নববধুর ঘোমটা খুললো। ঘোমটা খুলতেই সে চাঁদমুখখানা অনিকের সামনে দৃশ্যমান হলো। তার হৃদয়ের হৃদয়হরণী অবশেষে তার ঘরে।
অনিক হাতের মুঠোয় করে ফুলের হাতে কিছু একটা দিলো। ফুল দেখলো একজোড়া নুপুর। 
অনিক ফুলের আলতারঙা পায়ে তা পড়িয়ে পড়িয়ে দিতে দিতে বললো,
" আমার প্রথম রোজগার করার টাকায় কেনা। সবার জন্য কিনেছি কিছু না কিছু। আপনার জন্য ও কিনলাম। পছন্দ হয়েছে?"
ফুল উপর-নীচ মাথা নাড়লো। 
অনিক হটাৎ ফুলের হাত ধরে টেনে ধরে বললো, 
" চলুন।"
ফুল উৎসুক হয়ে বললো,
" কোথায় যাবো?"
অনিক কিছুর জবাব না দিয়েই তার রুমের ওপাশের দরজা দিয়ে বারান্দায় দাঁড়ালো। যেখান থেকে শীতের কুয়াশায় ঘেরা আকাশে উঠা অর্ধচন্দ্রকে দেখা যাচ্ছে। সাথে ক'টা তারা জ্বলজ্বল ও করছে।
অনিক ফুলের হাত ধরলো শক্ত করে। দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলো। অনিক ভাবলো হাত ধরাতে হয়তো ফুলের খারাপ লাগছে তাই ছেড়ে দিতে গেলেই ফুল অনিকের হাত শক্ত করে ধরলো। অনিক ও হালকা হেঁসে হাতের বন্ধন দৃঢ় করলো। 
অনিক নিরবতা ভেঙে বললো, 
" এখানে কেনো এনেছি তা জিজ্ঞাসা করবেন না?"
ফুল সাথে সাথে ই বললো,
" কেনো?"
অনিক ফুলের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললো,
" বাইরে চাঁদকে আমার ব্যাক্তিগত চাঁদকে দেখাবো বলে এনেছি। বাইরের অন্ধকার আকাশের চাদঁতে হিংসা করাতে আপনাকে এনেছি। দেখুক সে আমার চাঁদকে। দেখুক অনিকের হৃদয়ের হৃদয়হরণীকে।"
ফুল আলতো হেঁসে ফেললো, 
" এবার একটু বেশি ই হয়ে গেলো না?"
অনিক ও হেঁসে বললো, 
" আরও বেশি কিছু বলা উচিত ছিলো। কিন্তু আমি বর্ণনা দিতে অক্ষম। আমার শব্দভান্ডারে এ মূহুর্তের বর্ণনা দিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ শব্দের বেশ অভাব।"
আবারও চললো পিনপিনে নিরবতা। নিরবতা ভেঙে ফুল বললো,
" আচ্ছা আপনি শহরে কিসের কাজ করছেন?"
অনিক হেসে বললো, 
" না জেনেই 'কবুল' পড়ে নিলেন আমার নামে?"
ফুল বললো,
" বিশ্বাস ছিলো যে। তবে না বলতে চাইলেও কিছু মনে করবো না।"
অনিক তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো,
" না বলার মত কিছুই নেই। প্রথমে বহুদিন কাজ পাইনি। অনেক জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেছি, না খেয়েও ছিলাম। পনেরো দিন পরে একটা কোম্পানিতে চাকরি হয়েছে। বেতন বারো হাজার। এতে চলবে না? বছর শেষে বাড়বে বলেছে।"
ফুল সাথে সাথে ই বললো, 
" আমি সন্তুষ্ট এতেই। আপনার দেওয়া মোট কাপড় মোটা চালের ভাত খেয়েই আমি মাটির নিচে যেতে চাই।"
অনিক আর ফুল দুজনেই আকাশের দিকে তাকালো। চাঁদটা ভাসতে থাকা মেঘে ঢেকে গিয়েছে।
ফুল বললো,
" আপনি আমাকে তুমি করে বলুন। আপনি টা বেমানান লাগছে ভীষণ। "
হটাৎ ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। শীতের সময়কার অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি। 
অনিক ফুলকে নিয়ে ঘরে এলো আবার।
বাইরে বেশ বাতাস বইছে। হিম বাতাস। সে শীতল বাতাসে গা কাটা দিয়ে যাচ্ছে। হারিকেনের টিমটিমে আলো জ্বলছে।
ফুল খাটের পশ্চিম দিকটায় গিয়ে বসলো। অনিককে বসলো। 
অনিক তার হাতটা বিছিয়ে দিতেই ফুল অনিকের ইশারা বুঝলো। ফুল ও অন্যদিকে ফিরে অনিকের হাতের উপর মাথা রেখে ওর পাশেই শুয়ে পড়লো। 
অনিকের বাম হাতটা ফুলের চুলে বিচরণ করছে। চুলের খোপাটা অনিক খুলে দিলো। ফুলের চুলের সুভাস তাকে উষ্কে দিচ্ছে আজ। অস্বস্তি হচ্ছে তার ভীষণ। 
হটাৎ আকাশে মেঘে গর্জে উঠলো। অকস্মাৎ হওয়াতে ফুল আরও কাছে চলে আসলো অনিকের। তাদের মধ্যকার দূরত্ব গুছলো। অনিকের গরম নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে তার ঘাড়ে। ফুল কেঁপে উঠছে বারবার। 
অনিক ফুলের কানের কাছটায় গিয়ে ফিসফিস করে বললো, 
" আজ যদি আমি একটু অভদ্র হই তাহলে কি খুব বড় অন্যায় করে ফেলবো বউ?"
অনিকের মুকে 'বউ' সম্মোধন শুনে ফুলের সর্বাঙ্গে যেনো শিহরণ বয়ে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও ফুলের থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে অনিক দূরে সরে যেতে নিলেই ফুল আস্তে করে বললো, 
" না।"
অনিক আবারও বললো, 
" কি?"
ফুল লজ্জামাখা কন্ঠে উচ্চারণ করলো,
" না অন্যায় হবে না।"
সম্মতি পাওয়া মাত্র ই অনিক ফুলকে ওপাশ থেকে নিজের ফিরালো। পাশে থাকা হারিকেনের আবছা আলোতে স্পষ্ট ফুলকে দেখা যাচ্ছে। 
অনিক তার বধুকে তার জীবনের সর্বপ্রথম চুম্বন উপহার দিলো। অনিকের ফুলের কপালে দীর্ঘ চুম্বন করলো। এ চুম্বন ছিলো সম্মানের, আশ্বাসের, ভরসার, হ্যাঁ একজীবন ভরসার।
চোখে চোখ পড়তেই ফুল দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো।
হাতের ভাজের নিচে মুখ লুকিয়ে সেভাবেই মেয়েটা বললো,
"দয়া করে আলোটা নিভিয়ে ফেলুন। আমার অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। "
অনিক তার বঁধুর কথায় আলতো হেঁসে হারিকেনের চিমনিটা নিচে ফেললো। সারারুম জুড়ে এবার শুধু অন্ধকার। 
অনিক ফুলের গলার ভাজে তার অধর ছোয়ালো। শাড়ির আঁচলে হাত রাখলো। শাড়ির আঁচল সরাতেই ফুল অনিকের ঘাড়ের দিকটায় খামচে ধরলো। 
এক হালাল বন্ধনের পবিত্রতার সুবাস যেনো চারদিকে বইতে লাগলো। বাইরে অনাকাঙ্ক্ষিত শীতের আকাশের বৃষ্টি ও তাদের একে-অপরকে পাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত মতই। 
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন