ফন্ট সাইজ:
থিম:
ইলশেগুঁড়ি

১ম পর্ব

লেখক: নূপুর ইসলাম

#ইলশেগুঁড়ি

#নূপুর_ইসলাম
তিথি সিএনজিতে বসেই উঁকি দিলো । তার চোখের সামনে বিশাল কালো রঙের গেইট। গেইটা এতোই বিশাল যে ভিতরের কিছু দেখাতো ভালোই বুঝাও যাচ্ছে না। গেইটের পাশেই বাগান বিলাস গাছ। অর্ধেক গেইট ই গোলাপী ফুলে ঢেকে আছে। তার মধ্যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। তিথির এত ভালো লাগলো। সে খুব অল্পতেই মুগ্ধ হয়। এই মুগ্ধতা দেখে তিথির মা প্রায়ই বলতো "এত সহজে মুগ্ধ হতে নেই। এই সহজ জিনিসগুলোই পরে বড় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 
তিথির অবশ্য তা মনে হয় না। তার মনে হয় এই ছোট ছোট মুগ্ধতা গুলোই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। যখন মানুষের এই মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছেও শেষ হয়ে যায়। তার মায়েরও কি শেষ হয়ে গিয়েছিল। কি জানি? তিথি জানে না। তবে তার মা কোন কিছুতেই মুগ্ধ হতো না। তিথি কোন কিছু দেখে যখন বলতো, " দেখ দেখ মা কত সুন্দর"। তখন তার মা বিরস মুখে বলতো, " হুম সুন্দর "। এই সুন্দরের মধ্যে না থাকতো মুগ্ধতা, না থাকতো কোন আগ্রহ। 
তিথি সিএনজি থেকে নেমে দাঁড়ালো। এক এক করে নিজের ব্যাগ দুটো নামালো। ব্যাগ নামাতে গিয়ে সে নেয়ে ঘেমে একাকার । তার তুলনায় তার ব্যাগ অনেকটাই ভারী।
 তিথি সোজা হয়ে দাঁড়ালো। গেইট টার দিকে আবার তাকালো। তার মা তাকে নিয়ে এই বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। আর সে এসেছে দুই দুইটা ব্যাগ নিয়ে। এত বড় বাড়ি, এত বড়লোক মানুষ। তবুও তার মাকে পাঁচ ছয় বছরের সংসার জীবনে নেয়ার মতো কিছুই দিতে পারেনি।
তিথি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ফেলে ব্যাগগুলোকে টেনেটুনে গেইটের সাইডে আনলো। এখন বৃষ্টি ভালোই পড়ছে। ভিজে গেলে সর্বনাশ। 
তাই সাইড করে গেইটের আশ পাশে তাকালো। গেইটের সাইড দেওয়ালে একটা সাদা রঙের সুইচ। তিথি এগিয়ে কয়েক বার চাপ দিলো। কোন শব্দ হলো কিনা বুঝতে পারল না। তাই তার মিহি গলায় কতক্ষণ ডাকাডাকি করলো। শেষমেষ উপায় না পেয়ে ধরাম ধরাম করে গেইটে কয়েকটা বাড়িও মারলো। কোন হেলদোল নেই।
তিথি তার মার কাছে শুনেছে, গেইটের পরেই বিশাল লন। তাই তার শব্দ বাড়ি পর্যন্ত যাবে না সে জানে। তবে দারোয়ান থাকার কথা। শুনছেনা কেন কে জানে? তিথি এক সাইডে দাঁড়ালো। গেইটের উপরে সিসি ক্যামেরা লাগানো । মনিটরে কেউ না কেউ তাকে অবশ্যই দেখবে। তাই অপেক্ষা করতে লাগলো। 
নোমান অনেক্ষণ ধরেই তিথিকে দেখছে। সে বের হয়েছে তিথি আসার একটু আগে। তার একটা পার্সেল আসার কথা। অবশ্য বের না হলেও তার কাছে পৌঁছে যেত। তবে পার্সেল টা একটু ব্যক্তিগত তাই নিজেই বের হয়েছে। বের হওয়ার একটু পরেই সিএনজিটা বাড়ির সামনে এসে থেমেছে। সে অবশ্য প্রথমে মাথা ঘামায় নি। দাদুর গ্রামের অনেক আত্মীয় - স্বজনই আছে। তারা হঠাৎ হঠাৎ এসে হাজির হয়। কখনো আসে ডাক্তার দেখাতে, কখনো আসে ঢাকা শহর ঘুরতে, আবার কখনো কখনো আসে এমনি এমনি, বলে দাদুকে দেখতে এসেছে । একেকজন কে তো দাদু চিনতেও পারে না। তবুও তারা কিছুদিন মেহমানের মতো থাকে। বিস্ময়ভড়া চোখে তাদের ঘর বাড়ি, আসবাবপত্র , জীবন যাত্রা দেখে। আর যাওয়ার সময় কিছু না কিছু তাদের পুটলিতে ভরে নিয়ে যায়। এতে অবশ্য কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই। শুধু হালিমা খালা কিছুদিন রাগে গজগজ করেন। 
নোমান এবারও এরকমই ভেবেছিল। তবে তার ভাবনাকে ভুল করে দিয়ে উঁকি দিলো ছোট খাটো মুখের শ্যামলা বরণ একটা মেয়ে।যার মুখে দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তির ছাপ, এলোমেলো মাথায় লম্বা বেণী। বয়স কত হবে কে জানে। তবে তার কাছে ছোটই মনে হলো। যে কিনা উঁকি দিয়েই থমকে গেছে। সাধারণ এক গুচ্ছ ফুল দেখে তার চোখে মুখে মুগ্ধতা উপচে পড়ছে। আর সেই মুগ্ধতা ভরা চোখ,মুখ দেখে নোমান ও কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়েছিল। 
নোমান আয়েশি ভঙিতে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লো। সেই থমকে যাওয়া থেকেই এতক্ষণ এই মেয়ের কান্ডকারখানা দেখছিল। জামান ভাই ভিতরে কি করছে, কে জানে? বের হওয়ার সময়তো গেইটের পাশেই দেখেছিল। বাথরুম টাথরুমেও যেতে পারে। তার আবার নতুন নতুন ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। সেই টেনশনে দরকার পরুক আর না পরুক সে থাকে দৌড়ের উপর । তা না হলে, গেট নিয়ে এই মেয়ে যে ঝাকাঝাকি করেছে। এতক্ষণে তো জামাল ভাইয়ের লাঠি নিয়ে দৌড়ে আসার কথা। মেয়েটার অবশ্য ভাগ্য খারাপ। এসেই পড়েছে এক ঝুলাঝুলির মধ্যে। এরকম সচারচর হয় না। জামান ভাই খুবই নিষ্ঠ দারোয়ান। সে তার চাকরি আর এই গেইটকে খুবই ভালোবাসে। এই গেইট নিয়ে কেউ ঝাকাঝাকি করবে আর সে চুপচাপ বসে থাকবে এটা অসম্ভব। 
নোমান এগিয়ে গেল। মেয়েটিকে ঝুলাঝুলি থেকে বের করা দরকার। কেমন জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মায়া লাগছে। এটা অবশ্য নতুন না। তার সবার জন্যই মায়া লাগে। দাদুর ভাস্য মতে আমি হচ্ছি মায়ার সাগর। আমার শুধু মন না! হাত,পা,চোখ,নাক, মুখ সব কিছুই মায়ায় টইটুম্বুর।
তাই এই বৃষ্টির মধ্যে তাদের বাড়ির সামনে একটা মেয়ে তার পুটলি পাটলি নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আর সে চুপচাপ তাঁকিয়ে দেখবে ।এটা কি হয়?
তাই এগিয়ে গেল। এগিয়ে যেতে যেতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। মেয়েটার আদল কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে । এই চোখ, এই নাক, এই ঠোঁটের পাশে তিল। কোথায় দেখেছে সে? 
______
তিথি ড্রইংরুমে স্বাভাবিক ভাবেই বসে আছে। এতক্ষণ যে মনে ভয় ছিল তা এখন কেটে গেছে। তবে অস্বস্তি আছে। কারণ অনেক গুলো মানুষ গোল গোল চোখে তার দিকে তাঁকিয়ে আছে।
সেই তাকানোর মাঝেই সে পাশে তাঁকালো! তাকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি মুছলেন মরিয়ম বানু। যে কিনা সম্পর্কে তার দাদু। আর কারো পরিচয় অবশ্য এখনো জানে না। না জানার ই কথা। তার মা যখন তাকে নিয়ে চলে যায়, তখন তার বয়স ছিল চার বছর। 
তিথি চোখ ফিরিয়ে একবার আশে পাশে তাঁকালো। তাকাতেই নোমান নামের ছেলেটার সাথে চোখাচোখি হলো। এই ছেলেটা তার কি হয় সে এখনো বুঝতে পরছে না। যখন চুপচাপ গেইটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন কোথা থেকে যেন এই ছেলে এসে হাজির। এক হাতে ছাতা আরেক হাতে সিগারেট। সে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাঁকিয়ে আছে।
 তিথির ভয়,অস্বস্তি দুটোই এক সাথে হতে লাগলো। তাই কি করবে বুঝে উঠে পারল না। এত এত বিপদে সেতো আগে কখনো পড়েনি। সব কিছু থেকে তার মা আড়াল করে রাখতো। এই প্রথমই একা এভাবে চলা। বলতে গেলে সেভাবে একাও অবশ্য না । ঢাকা পর্যন্ত নুরুল মামা এসেছেন। নুরুল মামা হচ্ছেন মায়ের দূরস্পর্কের ভাই। আমাদের সব বিপদে আপদে তিনিই তো থাকতেন পাশে। সিনএনজিতেও তুলে দিয়েছেন। শুধু বাড়ি পর্যন্ত আসেন নি। কেন আসেন নি তিথি জানে না। সিনএনজিতে বসে যখন তিথি মলিন ভাবে তাঁকালো, তখন পরমস্নেহে মাথায় হাত রেখে বিরসমুখে বললেন, " ভয় নেই! সিএনজি তোকে একেবারে ঠিক জায়গাই নিয়ে যাবে। আর সেখানে গিয়ে শুধু তোর আর তোর মায়ের নাম বলবি। ব্যস আর কিছু বলার বা করার দরকার নেই। এইটুকুই যথেষ্ট। বুঝেছিস? 
তিথি শুধু মাথা ঝাকিয়েছে। কি আর বলবে। তার ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। আর হয়েছেও তাই। 
প্রথমে তিথি খুব দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছে । এই ছেলে কি এই বাড়িরই কেউ? এর কাছেই কি তাদের নাম বলবে? আবার যদি বাইরের কেউ হয়। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসেছে। হলে হবে! নামই তো! নামতো নিয়ে আর বেচে খাবে না। চান্সতো নেওয়াই যায়। এমনিতেই চুপচাপ দাঁড়িয়েই আছে। কিছুতো করতেই হবে।তাছাড়া দেখতে তো ভদ্র টাইপই মনে হয়। তাই সে অনেক চিন্তা ভাবনা করে মুখ খুললো, অস্বস্তি ভরা গলায় বলল,"-- আমি তিথি! তাইয়্যেবার মেয়ে তিথি। 
সাথে সাথেই ছেলেটা অবাক হয়ে গেছে। মুখ হা হয়ে গেছে, হাত থেকে সিগারেটাও পড়ে গেছে।
তিথি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে, ড্যাবড্যাব করে তাঁকিয়ে রইল। কি বা করবে সে। তবে ছেলেটা যে বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছে, সে ঠিক বুঝতে পারছে। 
কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটা নড়ে উঠলে, কিছু না বলেই ঘুরে হন্তদন্ত হয়ে গেইটে জোড়ে জোড়ে কয়েকটা লাথি মারলো।আর তার সাথে সাথেই গেইট খুলে গেল। গেইট খুলতেই ছেলেটা এক প্রকার দৌড়ে ভিতরে চলে গেল।
আর সে হতম্বভ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো । মন মনে মনে বলল,"-- কি হলো?
 শুধু আমি না! হতম্বভ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আরো একজন। সে সম্ভবতো দারোয়ান। তার হাতে মোটা একটা লাঠি। তাকে দেখে আমার প্রথম যে কথাটা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো, তা হলো , --"এই বাসায় কি এভাবেই গেইট খোলার নিয়ম, নাকি আজকে আমাকে দেখে স্পেশাল ট্রিক এপ্লাই করা হয়েছে? " 
তিথি হতম্বভ হয়ে বসে আছে। সাথে একটু লজ্জাও লাগছে। ছিঃ! মানুষ যে এত নির্লজ্জ কিভাবে হয় সে বুঝতে পারে না। সকালে তার ঘুম ভেঙেছে পাখির কিচিকিচি শব্দে। ঘুম ভেঙেই সে অবাক! ঢাকা শহর আর পাখি?
 তার ঘুম ভাঙা উচিত ছিল কাকের কা কা শব্দে। অবশ্য এটা অভিজাত এলাকা। তবুও! সে শব্দের খোঁজে বারান্দায় আসলো। এই বাড়ি বিশাল জায়গা নিয়ে করা। বারান্দাও করা হয়েছে মন মতো করে। বারান্দায় আসতেই তার মুখ হা আর চোখ ছানাবানা । 
বাড়ির পেছনে কয়েকটা বড় বড় পাখির খাঁচা। তার মধ্যে হরেক রকমের পাখি। তিথি মুগ্ধে বাক্য হারা হয়ে গেল। তার কাছে গিয়ে দেখতে ইচ্ছা হলো। সে তাড়াতাড়ি নিচে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই ঝটকাটা খেলো। 
তার পাশের বারান্দায় নোমান দাঁড়িয়ে আছে । সে তার বড় চাচার ছেলে। তার এক হাতে সিগারেট আরেক হাতে পেনটিং ব্রাস। মনোযোগ দিয়ে কিছু আঁকতে চেষ্টা করছে। করুক ! এটা কোন সমস্যা না। সমস্যা হলো! এভাবে নেংটো হয়ে আকার মানে কি? এভাবে কি কোন বিশেষ ছবি আঁকা যায়? কি জানি? বড় লোকদের বড় বড় কারবার। তবুও এইরকম একটা ছোট্ট তোয়ালেতে? সিরিয়াসলি! তাও যেটা কিনা উপর থেকে বিপদসীমার নিচে আর নিচে থেকে বিপদসীমার উপরে। নিজেরও তো একটা স্বস্তি আছে নাকি। এত টাকা পয়সা তোয়ালে কিনবে শাড়ির সমান সমান তা না কিনেছে রুমালের মতো। ছিঃ! 
 সে ধীরে ধীরে কেটে পড়তে চাইলো। আর মনে মনে আল্লাহ, আল্লাহ করল। এই ছেলে যেন তাকে না দেখে। দেখলে লজ্জায় শেষ। এদের না থাক তার তো আছে। ছিঃ ছিঃ। 
তিথি রুমে এসে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানালো।এই বাসায় আরো কত কি যে দেখতে হবে কে জানে। কালকে রাতেও দেখলো। খাবার টেবিলে যখন সবার সাথে পরিচয় হলো।তখন দেখলো নিধি নামের মেয়েটাকে। যে কিনা বড় চাচার ছোট মেয়ে। সে খেতে এসেছে লেগিংস আর হাতা কাটা টপস জাতীয় কিছু পরে। তার এতো লজ্জা লাগলো। 
খাবার টেবিলে তখন বড় চাচা, ছোট চাচা, নোমান সবাই ছিল। এরা এতে অভ্যস্ত। এদের মহলে হয়তো এগুলো সহজ ব্যাপার। কিন্তু সে তো না। আচ্ছা সে যদি এখানেই বেড়ে উঠতো সেও কি এমন নির্লজ্জ হতো? নাকি তার মা এখানেও সব সময়ের মতো তাকে আগলে রাখতো। হয়তো রাখতো! 
তিথি মন খারাপ করে খাটে বসলো। তার স্থান হয়েছে বিলাসবহুল একটা রুমে। যেই রুমে বিলাসিতার ছড়াছড়ি। তবুও তার শান্তি লাগছে না। তার তো শান্তি লাগতো তাদের টিনের চালের ছোট্ট একটা ঘরে। যেখানে ছিলো ছোট্ট একটা খাট, ছোট্ট একটা আলমারি, আর একটা পড়ার টেবিল। তবুও কি যে শান্তি। এই শান্তি কি বাবা নামের মানুষ টি দিতে পাড়বে? বাবা! হ্যাঁ বাবা! এই মানুষটাকে তিথি এখনো দেখেনি। দেখার ইচ্ছা আছে এমনও না। মা তো কখনো তাকে বেঁধে রাখে নি। জ্ঞান হওয়ার পরে মা তাকে সবই বলেছে। আর সাথে এও বলেছে। তুমি যদি বাবার কাছে যেতে চাও যেতে পার। কোন বাঁধা নেই। সে আসেনি! কেন আসবে? তার বাবার জীবনে কি সত্যিই তাদের প্রয়োজন ছিল? 
দরজার টোকার শব্দে তার ধ্যান ভাঙলো। হালিমা খালা ডাকছেন। তিনি হচ্ছেন কাজের লোকদের হেড। কন্ঠে মধু মেখে বলছেন, " -- আম্মা উঠছেন? অনেক বেলা হইছে, নাস্তা করবেন না। আপনের আব্বাও আইছে । তিনি আপনার জন্য বসে আছে। দেখা করবেন না ? 
তিথি উত্তর দিলো না। তবে হাসলো! কাজের লোকেরা অতি সহজে বুঝে যায় কার কদর কতটুকু। এই যে হালিমা খালা একদিনেই বুঝে গেছে। এই সিধে সাদা, মলিন কামিজ পরা মেয়েটা, যেন তেন না। এই বাড়ির মেজ ছেলে মাহবুবের মেয়ে! বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাহবুব আহমেদের একমাত্র মেয়ে। যে কিনা একাই আহমেদ গ্রুপ অফ ইন্ডস্ট্রিকে টেনে এই পর্যন্ত এনেছেন। আর তার টাকায় ই সবাই গা ভাসিয়ে বিলাসিতায় সাতার কাটছে ।
______
তিথি নিচে নামলো দুপুরেরও পরে। বাসায় বলতে গেলে কেউই নেই। দাদু আর বড় চাচি ড্রইং রুমে বসে আছে। তিথি নামতে নামতে বড় চাচিকে দেখলো। তার নাম রেহনুমা। রুপে রুপান্বিত গুণে গুণান্বিত সে। দেখতে ছোট খাটো একটা পুতুলের মতো। তাকে দেখে বয়স বোঝার উপায় নেই। এই পুরো বাড়ি তার ইশারায় চলে। মন্ত্র মুগ্ধের মতো সবাইকে মুগ্ধ করে রেখেছেন। 
তার মতো তার দু মেয়ে আর বংশের একমাত্র প্রদীপ নোমান তিনজনেই হয়েছে দুধে আলতা গায়ের রংয়ের। এই অহংকারেই সম্ভাবতো তিনি মাটি দিয়ে হাঁটেন না। বাড়িতে আরো একটা বউ থাকলেও বাড়ির একমাত্র কর্ত্রী সে। তার হুকুম ছাড়া এ বাড়ির একটা জিনিসও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাবে না।
তিথি তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। তাকে দেখেই রেহনুমা বলল, "-- কি ব্যাপার বলতো তিথি? তোমার কথা শুনে তোমার বাবা সব কাজ টাজ ফেলে ইমার্জেন্সি টিকিট নিয়ে দুবাই থেকে ব্যাক করল। আর তুমি দরজা আটকে বসে আছো। কত ডাকাডাকি, তোমার খবর নেই। তুমিতো দেখি তোমার মায়েই মতো। যা ইচ্ছে হয় তাই করো। 
তিথি কিছু বলল না। সে এক দৃষ্টিতে চাচির চিন্তিত মুখটা দেখলো। আমার দরজা না খোলায় হয়তো বাবার চেয়ে চাচিই বেশি কষ্ট পেয়েছেন। 
-- আহ্! রেহনুমা! চুপ থাকো তো ! হয়তো দাদু ভাই ঘুমাচ্ছিলো। অচেনা জায়গা, রাতে হয়তো ভালো ঘুম হয়নি। এই হালিমা কোথায় গেছিস? টেবিলে তাড়াতাড়ি খাবার দে । সকাল থেকে মেয়েটা না খাওয়া। 
-- আপনিও না মা! একদিনেই নাতনীর স্নেহে অন্ধ হয়ে গেছেন। তার টা দেখছেন অথচ নিজের ছেলের টা চোখে পড়ছে না। মাহবুবও তো দুপুরে বলতে গেলে খেলোই না। 
-- আহ্! বাদ দাও তো। আয় দাদু ভাই, আয়! আমার সাথে আয়। বলেই মরিয়ম বানু উঠতে গেলেন। 
-- আপনি বসুন! আমি দেখছি। বলেই তিথি আবার উপরে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল ।
-- আবার কোথায় যাচ্ছিস ! খাবি না?
-- খাবো! আপনার ছেলেকে নিয়ে আসি।
রেহনুমা মুখ বাঁকালো। বাঁকিয়ে বলল, "--- মাহবুবের খাওয়া খাদ্যে সব কিছুই টাইম টু টাইম। একদম নিয়ম মাফিক। নিয়মের বাইরে সে যাবে না। তুমি বরং খেয়ে নাও। পরে গিয়ে বাবার সাথে দেখা করো। লং জার্নি করে এসেছে। এবার একটু আরাম করুক। সকাল থেকেতো তোমার জন্য অপেক্ষাই করল। 
তিথি শুনেও শুনলো না। সে আস্তে আস্তে উপরে উঠতে লাগলো। আর মনে মনে বলল,-- নিয়ম! নিয়মের নিয়মইতো ভাঙা ।"
 সে এগিয়ে গেল। দরজার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে টলমলে পানি। সে ধীরে ধীরে চোখের পানি মুছলো। একেই বলে বুঝি রক্ত। স্নেহ নেই, ভালোবাসা নেই, সামান্য চোখের দেখাটাও নেই। তবুও এই টানের কতো জ্বালাপোড়া। 
তিথি মৃদু ভাবে দরজায় টোকা দিলো। ভেতর থেকে ভারী তবে মোলায়েম একটা শব্দ ভেসে এলো --- এসো!
তিথি ভিতরে ঢুকলো! মাহবুব ইজিচেয়ারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। তাকে দেখলে কেউ বলবে না সে তার বাবা। এখনো সুন্দর, লম্বা চওড়া সুদর্শন যুবক। শুধু চুলগুলো সাইডে হালকা পাক ধরেছে। তিথি হয়েছে একদম তার মায়ের মতো। 
তিথি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ফেলতেই তার চোখ পড়লো দেওয়ালে টানানো একটা ছবির উপর। ছবিটা তার মায়ের। বিয়ের ছবি! মা বধু বেসে লজ্জায় নিচু হয়ে বসে আছে। কি মায়াময় একটা মুখ!  
-- খেয়েছো?
তিথি ধীর গলায় বলল, -- না।
-- তুমি সকাল থেকে দরজা আটকে ছিলে কেন? নোমানতো বললো তুমি উঠেছো। 
তিথি দাঁতে দাঁত চাপলো। ওহ! ছেলেটা তাহলে তাকে দেখেছে। তবে মুখে কিছু বলল না।
-- দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো! 
 তিথি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মাহবুবের ইজি চেয়ারের ঠিক সামনে খাটে পা তুলে বসলো।  
মাহবুব চোখ বন্ধ করেই একটু হাসলো। এভাবে তাইয়্যেবা বসতো। সে কখনো ঘরে জুতো পরে থাকতে পারতো না। খালি পায়ে ঘর ভরে হাঁটা হাঁটি করতো আবার সেই পায়েই খাটে উঠে পরতো। সে এসব দেখতে পারতো না। এর জন্যও মেয়েটা যে কতো কথা শুনতো। 
  
-- এতদিন কোথায় ছিলে?
-- ফরিদপুর! ফরিদপুরের মফস্বল একটা গ্রামে।
-- আমি যতটুকু জানি তোমার মায়ের তেমন কোন আত্মীয় স্বজন ছিল না। সেখানে কিভাবে?
-- হয়তো আপনার জানার মধ্যে ভুল ছিল। বা এমনও হতে পারে আপনি কখনো জানতেই চান নি।
মাহবুব চোখ তুলে তাকালো। তাকিয়েই কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। তার মনে হলো তার সামনে তাইয়্যেবা বসে আছে।
সে উঠে বসলো। তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। বসে বলল,"-- ওখানে পানি আছে। আমাকে এক গ্লাস পানি দাও।
তিথি নড়লো না। যেমন বসে আছে তেমনি বসে রইল। 
মাহবুব ঢোক গিললো। আর অবাক হয়ে তাঁকিয়ে রইল। তার সামনে বসা এই মেয়েটা দেখতে হুবুহ তাইয়্যেবার মতো হলেও। আসলে সে তাইয়্যেবার মতো না। কোথায় যেন একটু, সে আর ভাবতে পারল না। সে এক সময় চাইতো তার সন্তান হবে তার মতো। তাহলে! এখন কেন ভয় পাচ্ছে? সে বিরসভাবে বলল,--
-- তাইয়্যেবা কোথায়?
-- সেটা জানার অধিকার কি আপনার আছে?
-- আমি তাকে অনেক খুঁজেছি।
-- কেন? 
মাহবুব এই কেনর উত্তর খুঁজে পেল না । সত্যি তো কেন? এক ছাদের নিচে থেকেই সে করেছিল যোজন যোজন দূরত্ব আর যখন সত্যিই দূরত্বে গেল তখন খুঁজেছিল কেন? সে কথা ঘোরালো। 
-- তুমি কি ফরিদপুর থেকে একা এসেছো?
-- না। 
-- কার সাথে এসেছো?
তিথি উত্তর দিলো না। সে তাঁকিয়ে আছে বাবা নামক মানুষটার দিকে। কি সুন্দন স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে। যেন তিথি তার আশে পাশেই বড় হয়েছে। প্রায় তাদের এমন মান অভিমান চলে। আবার ঠিক হয়ে যায়। 
মাহবুব দীর্ঘশ্বাস ফেললো! এই মেয়ে নিজের ইচ্ছের বাইরে একটা উত্তরও দেবে না। যতটুকু সে জানাতে চায় ততটুকুই সে বলবে। এটা সে বুঝতে পারছে। সে নিজেও এমন। 
মাহবুব উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে বলল, --- এসো খাবে, সকাল থেকে তুমি না খেয়ে আছো। 
তিথি নির্বিকার ভাবে বলল ---- আমি এখানেই খাবো! এই রুমে, এই খাটে এবং আপনিও আমার সাথে খাবেন। 
মাহবুব কিছুক্ষণ নিরবে তাঁকিয়ে রইল। তাইয়্যেবা বিয়ের পরপর এরকম বাইনা করত। তবে তার বায়না কখনও গ্রহনযোগ্য হয়নি।
মাহবুব বাইরে বেরিয়ে আসলো। এসে উপর থেকে চেঁচিয়ে বলল,"--- হালিমা! হালিমা!
হালিমা দৌড়ে এলো। তার হাত, পা কাঁপছে। মেজ স্যারের কন্ঠ এই বাড়ির কোন দেওয়ালে শুনছে কিনা সন্দেহ। আর আজ কি হলো? 
-- আমার আর তিথির খাবার রুমে নিয়ে এসো।
তিথি রুমে বসেই মুচকি হাসলো! 
 আর এদিকে মরিয়ম বানু আবাক হলেন। আর রেহনুমা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার মনে হলো তাইয়্যেবা ফিরে এসেছে আর তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। 
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন