ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুধু বলো ভালোবাসি

১৬তম পর্ব

লেখক: মুহসানাত নুসাইবা
#শুধু_বলো_ভালোবাসি 
#মুহসানাত_নুসাইবা
১৬.
রুহানীর পরীক্ষা শেষ হয়েছে আজকে। পরীক্ষার চাপ কাটতেই তার মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। কয়েকদিন ধরেই ব্যাগপত্র গুছাচ্ছে সে। অনেক দিন পর নানুবাড়ি যাবে বলে কথা। নানুবাড়ি মানেই তার জন্য অন্যরকম আনন্দ, নতুন পরিবেশ আর ছোটবেলার অনেক স্মৃতি। ভ্রমণের সেই উত্তেজনায় মুখর পুরো বাড়ি। কাল সকালে সবাই একসাথে রওনা হবে।রুহানী, উজান, তুহিন, ইসরাত, সুমাইয়া, সবার সাথে এবার অভ্রকেও নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাই মিলেমিশে যাওয়াতে আনন্দ যেন আরও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। সুমন আর হাফিজকে নেওয়া হচ্ছে না। তাদের পরিক্ষা কেবল শুরু হয়েছে। রায়হানকে হাজার বলেও রাজি করানো যায়নি। তার এগুলা ভালো লাগে না বলে। রায়হান চাপা স্বভাবের, কারো সাথে মিশে না তেমন, তাই কেও ওতো জোর করেনি আর।
রাতটা কাটতেই চাচ্ছে না আজকে! সকাল ভোরের দিকে রওনা হবে তারা। উত্তেজনায় রাতে ঘুম হলো না রুহানীর। অনেক রাতে ঘুমিয়েছে। হঠাৎ কারো ডাকে ঘুম ছুটলো তার। চোখ পিটপিট করে তাকাতেই মুখের উপর উজানের মুখটা দেখলো, যে তার উপর ঝুকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। 
উজান বললো, "যাবি না তুই?"
রুহানী বুঝতে পারলো না কিসের কথা বলছে উজান। কয়েকবার চোখ পিটপিট করে বলে উঠলো,
"কোথায় যাবো?"
"তোর শশুড় বাড়ি।"
রুহানী বলদের মতো হেসে বলে উঠলো, 
"আমি তো শশুড় বাড়িতেই আছি, ভাইয়া।"
উজানের কপালে চার হাত ভাজ পরলো।
গম্ভীর কন্ঠে বললো, 
"তোর স্বামী কে?"
রুহানী অবাক কন্ঠে বললো,
"কেন আপনি!"
"তাহলে ভাইয়া ডাকছিস কেন?"
রুহানী আবারও বলদের মতো হাসি দিয়ে বলে উঠলো, 
"আপনি তো আমার ভাইয়াই!"
উজান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ধমকে উঠলো,
"তুই উঠবি নাকি তোকে রেখে চলে যাবো?"
হঠাৎ রুহানীর সব মনে পরলো। লাফ দিয়ে উঠে বসলো। ঘড়িতে পাঁচটা বাজে। তারা বের হবে ছয়টায়। দ্রুত উঠে ওয়াশরুমে দৌড় দিলো। 
উজান রেডি হয়ে কাউচে বসে বাম পায়ের উপরে ডান পা তুলে বসে ফোন ঘাটছে। 
রুহানী বোরকা পরে হিজাব পরার সময় নাকে দৃষ্টিপাত করললো। 
ওইদিনের পরেরদিনই সে নাক ফুড়িয়েছিলো। প্রথমে খানিকটা ভয় পেয়েছিলো ঠিকই, তবে সবাই মিলে সাহস দেওয়াতে কাজটা সহজ মনে হয়েছিলো। প্রথম কিছুদিন হামিদা বেগম নিজেই একটি সোনার নাকফুল পরিয়ে দিয়েছিলেন তাকে। সেটা রুহানীর মুখে বেশ মানিয়েও গিয়েছিলো। তবে কিছুদিন পর নাকফুলটা খুলে নিয়েছেন তিনি। বলেছিলেন, নতুন একটা উজান দেবে তোকে।
কিন্ত উজান এখনো দেয়নি সেটা। আপাতত নাকে ছোটো একটা শলা ঢুকিয়ে রেখেছে। ছোটো পাঁচ টাকার নাকফুল পরতে চাইলেও হামিদা কখনো পরতে দেয়নি তাকে।
রুহানী হিজাবে শেষ পিনটা মেরে সরে আসলো। হঠাৎ উজান এসে দাঁড়ালো তার সামনে। রুহানী মাথা উচু করে তাকালো। উজান তার থেকে অনেক লম্বা। বুক সমান হবে সে উজানের। মাঝে মাঝে ভালোই লাগে তার এটার কারনে, সে মাথা উচু করে কথা বলবে আর উজান মাথা নিচু করে। আহ, শান্তি!
উজান পকেট থেকে ছোট্ট একটা লাল জুয়েলারি বক্স বের করলো। রুহানীর প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।
উজান বাক্সটা খুললো। ভেতরে রাখা ছিল ছোট্ট, ঝকঝকে একটা ডায়মন্ড নাকফুল! আলোয় সেটা ঝিলিক দিয়ে উঠলো। রুহানীর নিঃশ্বাস এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেলো। চোখ বিস্ফারিত করে তাকিয়ে রইলো। উজান ভাই তার জন্য নাকফুল এনেছে!
হঠাৎ উজান হাত বাড়িয়ে রুহানীর নাক ছুঁতে চাইলো। চমকে উঠে রুহানী এক পা পিছিয়ে গেলো।
উজান ধীরস্থির পায়ে আবার কাছে এল। 
রুহানী উজানের চোখের দিকে তাকালো। উজান তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
উজানের দৃষ্টি ছিল একদম শান্ত। সেই চোখে তাকাতে পারলো না রুহানী। চোখ নামিয়ে নিলো। উজান হাত বাড়িয়ে আলতো করে রুহানীর নাকের ডগা টেনে ধরলো। রুহানী অজানা এক কাঁপুনি থেকে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেললো।
সমস্ত পৃথিবী যেন সেই মুহূর্তে থমকে গেলো। ধীরে ধীরে, ভীষণ যত্ন নিয়ে উজান ডায়মন্ডের নাকফুলটা রুহানীর নাকে পরিয়ে দিলো। 
চোখ বন্ধ রেখেও রুহানী অনুভব করলো, তার মুখের গালে গরম বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে। হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠলো, শরীর কেঁপে উঠলো হালকা। উজান রুহানীর নাকফুল পরা নাকে কতক্ষন তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ দৃষ্টি গেলো রুহানীর কাপতে থাকা চোখের পাতায়, ঠোঁটের পাতায়। তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। শুকনো ঢোক গিললো। সরে আসলো সামনে থেকে।
সামনে কারো উপস্থিত না পেয়ে রুহানী চোখ পিটপিট করে তাকালো। দেখলো উজান নেই ঘরে। সে দ্রুত আয়নার সামনে গেলো। নিজেকে দেখেই চমকে উঠলো নিজে। নাকফুলে চমৎকার লাগছে তাকে!
এতোদিনে বউ বউ লাগছে তাকে। লজ্জায় লাল হয়ে গেলো সে।
____
নিচে নামতেই সবাই প্রশংসা করলো তার নাকফুলের। সুমাইয়া মিটিমিটি হেসে বললো,
"আজকে একটা ভাতার নেই বলে এমন ডায়মন্ডের নাকফুল গিফট পাই না।"
রুহানী ভ্রু তুলে বললো, "সারাক্ষন মানুষের পিছনে এভাবে লেগে থাকলে, ডায়মন্ড কেন একটা ভাতারও পাবি না কোনোদিন।"
"আমার ভাতার আমি নিজে গুছিয়ে নিতে পারবো, হুহ।"
বলেই গাড়িতে গিয়ে বসলো। 
তাদের যাওয়ার জন্য ভাড়া করা হয়েছে একটা মাইক্রোবাস। তারা মানুষ মোট সাতজন। প্রাইভেট কারে সাতজনের একসাথে যায়গা হবে না। দুটো কার নেওয়া লাগবে। এদিকে দুটো কার নিলে তাদের দুইভাগ হওয়া লাগবে, তারা আবার দুইভাগও হবে না। তাই শেষে একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করা হয়েছে।
সবাই একে একে মাইক্রোতে উঠে বসলো। সামনে ড্রাইভার পেছনের সিটে উজান, তুহিন আর অভ্র বসেছে। তাদের পেছনে রুহানী, ইসরাত, সুমাইয়া আর জয়নয়ব বেগম বসেছেন। 
সবার কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে মাইক্রোবাসটা ধীরে ধীরে গেটের বাইরে চলে এলো। সকালবেলা হালকা বাতাসে চারপাশটা একেবারেই ফ্রেশ লাগছিলো। গাড়ির ভেতর প্রথমে সবাই বেশ চনমনে থাকলেও, রাস্তায় কিছুটা যেতেই সবার চোখে ঘুম ভর করলো। নানি, ইসরাত, রুহানী আর সুমাইয়া একে একে ঘুমিয়ে গেলো। মাথা হেলিয়ে যে যেখানে জায়গা পেয়েছে, সেখানেই একটু আরাম করে ঘুমিয়ে পড়েছে। 
সামনের সিটে বসা উজান, তুহিন আর অভ্র এখনো একদম চাঙা। তিনজনের মাঝে হালকা গল্পগুজব চলছে। 
কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলো। গন্তব্যের পথ তখনও বাকি, ঘুম ভেঙে আস্তে আস্তে সবাই জেগে উঠলো। ক্লান্তি কেটে গিয়ে এবার যেনো সবার ভেতর নতুন করে উৎসাহ জেগে উঠলো। ভাবলো, এবার একটু আনন্দ করা যাক। গাড়িতে আগে থেকেই একটি ভালো মানের সাউন্ড বক্স লাগানো ছিলো। রুহানী নিজের ফোন বের করে ব্লুটুথ কানেক্ট করে নিলো। ইচ্ছা মতো গান বাজিয়ে তারাও গানের সাথে গলা মিলিয়ে গাইতে লাগলো। 
উজান ফোন চালাচ্ছে। উজানের দিকে তাকিয়ে রুহানী হঠাৎ গান পরিবর্তন করে দিলো।
এবার গান বাজছে,
~জ্যােতিষি, জ্যােতিষি, মন্ত্র পইড়া নাবিজ দ্যান,
জামাই যেনো বশে আসে মানে আমার চেয়ারম্যান।
জ্যােতিষি, জ্যােতিষি, মন্ত্র পইড়া নাবিজ দ্যান,
জামাই যেনো বশে আসে মানে আমার চেয়ারম্যান।
সামনে বসে থাকা উজান, তুহিন আর অভ্র ফট করে পেছনে তাদের দিকে তাকালো। সকলের ভ্রু কুঁচকে আছে। মেয়েরা সবাই দাঁত বের করে হেসে দিলো। ইসরাত, আমিন বলে দুই হাত দিয়ে মুখ ছুঁলো। বউয়ের কান্ডে তুহিন হতভম্ব হয়ে গেলো।
উজান রুহানীর ফোন থেকে ব্লুটুথ ডিসকানেক্টেড করে নিজের ফোনের সাথে কানেক্টেড করলো। এবার উজান বাজালো আরেকটা গান,
~সাধু বাবা, সাধু বাবা, সাধু বাবা, সাধু বাবা, সাধু বাদা, সাধু বাবা, আমায় একখান তাবিজ দ্যান।
আমার ঘরে আমি মেম্বার, আমার বউ চেয়ারম্যান। 
আমার খায় আমার পরে আমায় বলে আন্ডারস্টান্ড?
আমার ঘরে আমি মেম্বার আমার বউ চেয়ারম্যান!"
জয়নব গেমন হো হো করে হেসে উঠলেন।  সাথে তুহিন, ইসরাত, সুমাইয়াও হেসে উঠলো। রুহানীরও হাসি আসলো। অভ্র, উজান ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
____
দুপুর দেড়টার দিকে তারা কক্সবাজারে পৌঁছালো। কক্সবাজারের একটা গ্রাম স্টেটে তাদের নানা বাড়ি। 
বড়ো মামা, মেজো মামা এবং ছোটো মামা তিন জনেই একই ছাদের তলায় থাকেন। তাঁদের সঙ্গে থাকেন জয়নব বেগমও। পরিবারের সবাই মিলে বাপের পুরনো বাড়িটিকে নতুন করে সাজিয়েছেন, আরো বড়ো, আরো সুন্দর এবং প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। বড়ো, অনেকটা যায়গা নিয়ে বাড়িটি করা। উঠানটাও অনেক বড়ো।
রুহানীদের জন্য গেটে দাঁড়িয়ে আছে সব মামা-মামি, ইরা, সামিয়া, মিজান।
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন