#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
২৯.
"শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি যে তোর কখনো বাচ্চা হবে না, রুহানী। কিন্ত আমার বাচ্চা লাগবে। আমি বাবা ডাক শুনতে চাই। সারাজীবন তো এমন থাকা যায় না তাই না? তাই আমাকে এই বিয়ে করতেই হবে। কিন্ত আমি তোকে অনেক ভালোবাসি, রুহানী। আমি আরেকটা বিয়ে করলেও তোর ভালোবাসা কখনো কমবে না।"
স্তব্ধ হয়ে সামনে বিয়ের শেরওয়ানি পরিধান উজান ভাইকে দেখছে রুহানী। চোখ দিয়ে অবিরত পানি পরছে তার। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে সামনে শেরওয়ানি পরিধান করে দাঁড়িয়ে আছে তার উজান ভাই। কিন্ত তার জন্য না! অন্য কারো জন্য! একমাত্র...একমাত্র তার বাচ্চা হবে না বলে তাকে এভাবে বলতে পারলো উজান ভাই? তাকে ছেড়ে অন্যজনকে বিয়ে করতে পারবে উজান ভাই? নিঃশ্বাস আটকে আসছে তার। মনে হচ্ছে...মনে হচ্ছে সে এখনই মরে যাবে। এই দুনিয়াতে বেঁচে থাকার তার কোনো অধিকার নেই।
উজান তাকে ফেলে সামনে হেটে গেলো। স্টেজে বধূ সেজে বসে আছে একটা মেয়ে। বুক পযন্ত ঘোমটা টানা। উজান ধীর পায়ে স্টেজে উঠে গেলো। আশেপাশের সবাই হাত তালি দিয়ে উঠলো। রুহানী অবাক চোখে সবাইকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। স্টেজের সামনে হামিদা, রফিকুল সাহেব দাঁড়িয়ে হাসছেন। তুহিন, অভ্র, আয়েশা, ইসরাত, রাসেল, মেজো চাচা, মেজো চাচি, সেজো চাচা, সেজো চাচি সবার মুখে হাসি। সবাই মহা আনন্দে আছে। তার দিকে কেও ফিরেও তাকাচ্ছে না। রুহানী উজানের দিকে তাকালো। উজান তার নতুন বউয়ের পাশে গিয়ে বসেছে। মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে মেয়েটার ঘোমটাটা তার দুই হাত দিয়ে আস্তে করে উঠিয়ে দিলো। রুহানী চমকালো, থমকালো। হায়াত! ঘোমটা খুলতেই হায়াত উজানের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলো। রুহানী হাত দিয়ে বুক খামচে ধরলো। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তখন স্টেজে কাজি সাহেব উঠে আসলেন। উজানকে কবুল বলতে বললে উজান এক পল রুহানীর দিকে তাকালো। খুব অবহেলায় চোখ সরিয়ে নিয়ে হায়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
"আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"
রুহানী আচমকা হাটু গেড়ে নিচে বসে পরলো। চেঁচিয়ে উঠলো
"আল্লাহ!"
ঠিক তখনই 'আল্লাহ' বলে চিৎকার করে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে বসলো রুহানী। চোখ ঘুরিয়ে অস্থির ভাবে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
তার চিৎকারে সুমাইয়ার ঘুমও হাওয়া হয়ে গেলো। ধরফর করে উঠে বসলো।
"কি হয়েছে, রুহানী?" রুহানীর বাহু ঝাকিয়ে বলে উঠলো সুমাইয়া।
রুহানী জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। কপাল গড়িয়ে ঘাম মুখে বেয়ে পরছে। গলা ঘামে ভিজে গিয়েছে। হাত কাপছে। গলা শুখিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে যেনো। সুমাইয়া আবারও ডাকলো।
"পানি...পানি খাবো।"
রুহানী কোনো রকম মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলো।
সুমাইয়া উঠে গ্লাসে পানি এনে দিলো। রুহানী এক নিশ্বাসে পানিটুকু খেয়ে ফেললো। রুহানী স্বপ্নের কথা ভাবতেই গা শিরশির করে উঠলো। এটা বাস্তবে হলে সে মরেই যাবে। একদম বাঁচবে না সে। সুমাইয়ার দিকে তাকালো সে। সুমাইয়া তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। রুহানীর কি হলো সে জানে না, আচমকা সুমাইয়াকে জরিয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো। সুমাইয়া থমকে গেলো। অস্থির হয়ে উঠলো।
"রুহানি? রুহানী কি হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেনো?"
সুমাইয়া ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করলো। কিন্ত তার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ছিলো না রুহানী।
কিছুক্ষন পর শান্ত হয়ে সবটা বললো সে সুমাইয়াকে। সুমাইয়া সব শুনার পর বলে উঠলো,
"আরেহ পাগল! উজান ভাই মরে গেলেও এমন কিছু করবেন না। সে তোকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসে। এমনটা কখনোই হবে না। এটা শুধু মাত্র একটা স্বপ্ন। একদম চিন্তা করিস না, সোনা।"
আরো অনেক শান্তনা দিয়ে রুহানীকে আবার ঘুম পারিয়ে দিলো সুমাইয়া। তখন রাত দুইটা বাজে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সুমাইয়া উজান ভাইকে ফোন করে সবটা বললো। উজান সবটা শুনে অস্থির হয়ে পরলো। সাথে সাথে ফ্লাইটের টিকিট কেটে ফেললো। তার আরো তিনদিন পরে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্ত এগুলো শোনার পর এই তিনদিন সে কিছুতেই থাকতে পারবে না। তার বউ তাকে নিয়ে এতো বিপদজনক একটা স্বপ্ন দেখেছে এটা খুবই বেদনাদায়ক তার জন্য। সে কি এমন মানুষ? পৃথিবী উলটে গেলেও সে কখনো তার বউয়ের থেকে উল্টাবে না। আর তাকে নিয়েই কিনা তার বউ এমন একটা স্বপ্ন দেখলো! এর একটা বিহিত করতেই হবে। সে এখানে এসেছে প্রায় দেড় মাসের মতো। কিছু ইম্পর্টেন্ট কাজের জন্য নির্ধারিত সময় বাদেও আরো কিছুদিন থাকা লেগেছে তার।
কফির গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে সামনে তাকালো উজান। ছাদ থেকে ফ্লোর পযন্ত কাচের দেওয়ালের এপার থেকে ওপার সব দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে বাহিরের গাড়ি চলাল দেখলো। সে এখন একটা কফিশপে বসে আছে। গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিতেই একটা মেয়ে হেলতে দুলতে এসে তার সামনের চেয়ারে বসলো। উজান এক পল তাকালো সেদিকে। মেয়েটা একটা লাল রঙের হাটু পযন্ত স্লিভলেস ড্রেস পরে আছে। উজান আবার রাস্তার দিকে তাকালো। মেয়েটা কেশে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো। মেয়েটা থাইল্যান্ডের।
"excuse me?" মেয়টা ডেকে উঠল।
উজান সেদিকে তাকিয়ে দুই হাত একত্রে করে মাপ চাওয়ার মতো করলো। ইংরেজিতে বলে উঠলো,
"I am married. Please go away from here. If my wife finds out about this, she will kill me."
(অনুবাদ: আমি বিবাহিত। প্লিজ যান এখান থেকে। আমার বউ এই ব্যাপারে কিছু জানলে আমাকে খুন করবে।)
মেয়েটা হকচকিয়ে উঠলো উজানের কান্ডে। সে বেশ অবাক হলো তার এমন প্রতিক্রিয়ায়। চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো। আজকাল এমন মানুষ আছে? মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে কিছু বলতে গেলে, উজান বিরক্তিতে ঠাস করে চেয়ার থেকে উঠে কফিশপ থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো। এমনিতেই তার বউ তাকে নিয়ে উলটা পালটা স্বপ্ন দেখছে। এখন আবার এই আপদ কোথা থেকে আসছে আল্লাহ জানে। যত্তসব।
____
উদাস ভাবে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে রুহানী। তার কিছুই ভালো লাগছে না। মাথা থেকে কিছুতেই সেই স্বপ্ন নামাতে পারছে না সে। হঠাৎ এমন স্বপ্ন দেখার মানে কি? সে তো এমন কিছু কখনোই ভাবেনি যার কারনে স্বপ্নে এমনটা আসবে। তাহলে? আর ওই হায়াতই কেন? অন্য কোনো মেয়ে কেনো ছিলো না? দুনিয়াতে কি মেয়ের অভাব পরেছে? হায়াতই কেনো? কেনো? কেনো? কেনো?
উদাসীন হয়ে অদূরে তাকিয়ে রুহানী গেয়ে উঠলো,
"ও মোর বানিয়া বন্ধুরে একটা তাবিজ বানাইয়া দে। একটা মাদুলি বানাইয়া দে।
ওরে মরিয়া গিয়াছে, বিয়ার সোয়ামি স্বপনে আইসে।
ওরে মরিয়া গিয়াছে, বিয়ার সোয়ামি স্বপনে আইসে।"
এখানে স্বামী মারা গিয়েছে বলেছে কিন্ত সে তো মারা গিয়েছে স্বপ্ন দেখেনি। সে স্বপনে দেখেছে উজান তাকে ছেড়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেছে। সেই হিসেবে তো মরেই গিয়েছে তাই না? রুহানীর চোখ ভরে উঠলো। গলা কাপছে। মাথা উচু করে আকাশের দিকে তাকালো। আল্লাহর কাছে ফরমায়েশ করলো,
"আল্লাহ! এমন দিন দেখার আগে আমার মৃত্যু দিও, তবুও এমন দিন দেখিও না কখনো।"
____
উজান আসবে শুনে বাড়িতে উৎসব শুরু হয়েছে যেনো। উজানের প্রিয় সব ধরনের রান্না করা হয়েছে। রাত আটটার নাগাদ উজান বাড়ি আসলো। সাদা শার্টে উজানকে বাড়ির মেইন দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে রুহানীর চোখ ভরে উঠলো। স্বপ্নের প্রতিটা দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সে দেখলো, শেরওয়ানি পরিহিত উজানের পাশে লাল টকটকে শাড়ি পরে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে হায়াত। রুহানীর হাত কেঁপে উঠলো। আচমকা সিঁড়িতে বসেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। তার কান্ডে হকচকিয়ে গেলো সবাই। উজান দ্রুত এগিয়ে এসে জরিয়ে ধরলো তাকে। উজানকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে রুহানী কেঁদে উঠলো। তার চোখের পানিতে শার্ট ভিজে গেলো উজানের।
"চলে এসেছি তো আমি। কাঁদিস না। আরেহ থাম নারে বাবা!" উজান বললো। হঠাৎ অনুভব করলো রুহানীর তাকে ছেড়ে দিয়েছে। উজান নিজের হাতের বাধন ঢিল করতেই তার হাতের উপরে পরে গেলো রুহানী। হকচকিয়ে ধরে বসলো উজান।
"রুহানী!" উজান চমকে ডেকে উঠলো।
হামিদা দৌঁড়ে আসলেন।
"কি হলো এটা! জ্ঞান হারালো কেনো হঠাৎ ও?
চিন্তিত কন্ঠে বলে উঠলেন হামিদা।
"অতি উত্তেজনায় হয়তো জ্ঞান হারিয়েছে।" সুমাইয়া বলে উঠলো।
উজান কোলে তুলে নিলো রুহানীকে। গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। মুখটা শুখিয়ে গিয়েছে একদম। চোখের নিচে কালো হয়ে গিয়েছে। আগের থেকে অনেকটা শুখিয়ে গিয়েছে।
ঘরে এনে বিছানায় শুয়িয়ে দিলো। সে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে আছে কিন্ত বাহিরে একদম স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। তার হাত কাঁপছে।
ঘরে বাড়ির সকলে উপস্থিত আছে। উজান সবার দিকে একবার তাকিয়ে পারিবারিক ডাক্তারকে ফোন দিলো। এভাবে হঠাৎ জ্ঞান হারানোর কোনো কারন খুজে পাচ্ছে না কেও।
কিছুক্ষনে ভেতরে ডাক্তার চলে আসলো। ডাক্তার এসে রুহানীকে চেক করলেন কিছুক্ষন। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন।
চলবে...
( আজকের পর্বটা কেমন খাপছাড়া লাগছে। তবুও ছোটো করে দিলাম। কেমন হয়েছে যানাবেন।ভুলক্রুটি হলে মাপ করবেন।