ফন্ট সাইজ:
থিম:
শুধু বলো ভালোবাসি

৩৭তম পর্ব

লেখক: মুহসানাত নুসাইবা
#শুধু_বলো_ভালোবাসি
#মুহসানাত_নুসাইবা
৩৭.
তুহিন হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ছোঁ মেরে ফোনটা কেড়ে নিলো। চোখ নামিয়ে ছবিগুলো একে একে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো সে। প্রতিটা ছবিতে মনোযোগী দৃষ্টি গেঁথে দেওয়ার পর হঠাৎ বলদের মতো ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে উঠলো। অবাক বিস্ময়ে মুখ ভরে উঠলো তার হাসিতে।
"আরেহ! এটা তো ভাই, তুমি!"
বলতে বলতেই ফোনটা উঁচু করে ধরলো সে। দৃষ্টি ঘুরে গেলো উজানের দিকে।
উজান অত্যন্ত গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তুহিনের হাসি মুহূর্তেই সরে গেলো।
চোখ চোখ পিটপিট করে বললো,
"আরেহ, এটা তুমি কিভাবে হলে ভাই?" 
উজান গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলো,
"সেটাই তো চিন্তা করছি। এটা আমি কিভাবে হলাম? আমার তো কিছুই মনে নেই!"
তুহিন একদম থতমত খেয়ে বললো,
"মনে নেই মানে কি? এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তুমি। তোমার চোখ লালচে, পুরো নেশাগ্রস্ত চাহনি নিয়ে তুমি হায়াতের দিকে তাকিয়ে আছো! এখন যদি বলো তোমার কিছু মনে নেই!"
কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতেই হঠাৎ থেমে গেলো তুহিন। গিললো এক বড়ো ঢোক। বুঝতে পারলো ভুল সময়ে ভুল কথা বলে ফেলেছে। উজানের দাঁত কটমট করছে।
এবার অভ্র ঠান্ডা মাথায় ভেবে বললো,
"এটা কবের ছবি হতে পারে?"
উজান বিরক্ত হয়ে গর্জে উঠলো,
"কবের মানে কি? আমি তো এমন কোথাও যাই না, এমন কাজ করি না। আমার প্রতিটা সময় হয় বাড়িতে নয় অফিসে কেটে যায়। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব? সব থেকে বড়ো কথা, আমি মরে গেলেও এমন জঘন্য কাজ করবো না!"
তুহিন আবারো বোকামি করে ফেলে বললো,
"কিন্তু তুমি তো এমন জঘন্য কাজ করছো, ভাই।"
ঝড়ের মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো উজান। দাঁত চেপে গর্জে উঠলো,
"তোর মুখের ওপর বোমা মারবো তুহিন, যদি আর একটা শব্দ উচ্চারণ করিস!"
অভ্র এবার গম্ভীর হয়ে বললো,
"এক্স্যাক্টলি! তুই কোথাও যাস না। আবার ছবিটাও কোনো এডিট করা না। তাহলে এর মানে দাঁড়াচ্ছে, অন্য কিছু ঘটছে আমাদের চোখের আড়ালে।"
তারা তিনজনই মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো।
উজান আসলে বুঝেছিলো ছবিগুলো এডিট না, তারপরও নিশ্চিত হবার জন্য ডিজিটাল ফরেনসিক এক্সপার্ট দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছিলো। কিন্তু রিপোর্ট এসেছে, ছবির একটাও এডিট নয়। সবকিছু আসল!
সেই মুহূর্তেই উজানের ভরসার শেষ আশাটুকুও নিভে গিয়েছিলো। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কিভাবে সম্ভব এমনটা!
অভ্র আবার জিজ্ঞেস করলো,
"উজান, ভালো করে মনে কর। হয়তো কোনো ঘটনা ঘটেছে যেটা তুই ভুলে গেছিস।"
উজান মাথার ভেতর হাজারবার ঘাঁটাঘাঁটি করলো, কিন্তু কিছুই মনে পড়লো না। উল্টো মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। অসহ্য রকমের মেজাজ খারাপ হয়ে উঠলো।
হঠাৎই অভ্র তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
"কালকে… তুই তো নাহিদের বাসাতেই ছিলি, তাই না? আর কোথাও যাসনি তো?"
উজান মাথা নাড়িয়ে 'না' বুঝালো। হঠাৎ কিছু একটা আন্দাজ করতেই চমকে উঠে অভ্রর দিকে তাকালো। অভ্রও অবাক চোখে তাকালো। 
তুহিনও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
উজানের ঠোঁট ফাঁক হলো, 
"কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব?"
অভ্র বাঁকা হাসি দিয়ে বললো,
"এই দুনিয়ায় সব সম্ভব, বাপ। চল, আমার সাথে।"
তুহিন দ্বিধাভরা গলায় বললো,
"কিন্ত নাহিদ ভাই এমন করবে? আমার বিশ্বাস হয় না।"
অভ্র তুহিনের মাথায় চাঁটি মেরে বললো,
"চল, সামনে গেলেই বিশ্বাস ভেঙে যাবে।"
তারা তিনজন ব্রিজ থেকে নেমে এলো।
তারা রওনা হলো নাহিদের বাড়ির দিকে।
____
অসময়ে নিজের বাড়িতে উজান, তুহিন আর অভ্রকে দেখে নাহিদ অবাক হয়ে গেলো। তবু স্বাভাবিকতা দেখিয়ে তিনজনকে ভেতরে ঢুকতে দিলো।
তিনজন সোফায় বসলো। 
উজান পা তুলে পায়ের উপর পা রেখে বসেছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাহিদের দিকে তাকিয়ে আছে। নাহিদ শুকনো ঢোক গিলে কণ্ঠ পরিষ্কার করে জিজ্ঞেস করলো,
"কোনো সমস্যা, উজান?"
উজান সরাসরি তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো,
"কাল রাতে কি হয়েছিলো?"
নাহিদের মুখে হালকা এক টান পড়লো। সেই টান সে হাসি দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করলো।
"কি হবে?"
উজানের চোখের ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে। অথচ তার কণ্ঠ এতটাই শান্ত, সেই শান্ত কণ্ঠই নাহিদের গা শিউরে তুললো।
"আমিও জানি তুই জানিস কাল কি হয়েছিলো। এখন নিজের মুখে সবটা স্বীকার কর, নাহিদ। কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাই না আমি।"
নাহিদ কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে চোখ ঘুরিয়ে অভ্রর দিকে তাকালো।
উজান আবার বললো,
"দ্রুত বল। হাতে সময় নেই।"
নাহিদ কৃত্রিমভাবে চোখ বিস্মিত করে বললো,
"উজান, তুই কি বলছিস? আমি আসলেই কিছু বুঝতে পারছি না।"
উজানের ধৈর্য্য ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে।  মুহূর্তের ভেতরে হাত উঠিয়ে জোরে আঘাত করলো টি-টেবিলের উপর। কাঁচের গ্লাসটা কেঁপে উঠে থরথর করে বাজলো।
উজান হিসহিস করে বললো,
"দ্রুত সত্যিটা বল নাহিদ। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না!"
অভ্র এবার বিরক্ত হয়ে দাঁত চেপে উঠলো,
"আরেহ বাপ! বলে ফেল সবটা। হুদাই এতো নাটক করতেছিস কেন? আমরাও জানি তুই জানিস কি ঘটেছিলো। তাহলে এতো ড্রামা কিসের? এখন সব বলবি নাকি আমরা ব্যাবস্থা নেবো?"
নাহিদের দৃষ্টি গেলো অভ্রর হাতে পিস্তলের দিকে। নাহিদের রুহু অব্দি কেঁপে উঠলো। এই বংশের পুরুষ গুলোর বিশ্বাস নেই। যখন তখন যা খুশি করে ফেলতে পারে। 
সে হাত কচলাতে কচলাতে শুকনো ঢোক গিলে অবশেষে বলতে শুরু করলো,
"উজান যখন আমাদের বাড়িতে আসে, তখন রায়হান ভাই ফোন দিয়েছিলো আমাকে। উজান আসছে এটা শুনেই সে ফোন রেখে দেয়। পরে হায়াত ফোন দেয় আমাকে। তার প্লানের কথা জানায়। সে জানায় তোর খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিতে, সাথে কিছুটা ড্রাগসও। তুই হাত দিয়ে খেতে পারছিলি না বলে তোকে আমি খায়িয়ে দিয়েছিলাম। তোকে যখন  নিজের হাতে খায়িয়ে দিয়েছিলাম। খাবারে ড্রাগস মিশানো ছিলো। 
তুই খাওয়ার পর ড্রাগ কাজ শুরু করে দেয়। ততক্ষনে হায়াত চলে আসে আমাদের বাড়িতে। বাড়িতে বাবা-মা কেও ছিলো না বলে আরো সুবিধা হয়েছিলো।
তুই ঘরে গেলে হায়াত তোর ঘরে ঢোকে। তখন সুযোগ বুঝে এই ছবিগুলো তোলে। ঘুমের ওষুধের কারণে তুই কিছুই টের পাসনি। এর বেশি আর কিছু হয়নি। ছবি তোলার পর হায়াত বেরিয়ে যায়।"
এই পুরোটা সময় উজান স্থির হয়ে শুনছিলো। একটা পাথরের মূর্তির ন্যায়। তার প্রিয় বন্ধু, যার উপর সে জীবনভর ভরসা করেছে, সে-ই তাকে এইভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিলো!
উজান থেমে থেমে, ফাঁকা গলায় বললো,
"এতে তোর লাভ হলো কি, নাহিদ? তুই তো আমার সব থেকে কাছের বন্ধু ছিলি। তুই কেনো করলি আমার সাথে এমনটা? নিজের হাতে বিষ খাওয়ালি আমাকে?"
নাহিদের চোখে এবার কুৎসিত রাগ ভেসে উঠলো। দাঁত চেপে গর্জে উঠলো,
"মানি না আমি তোকে আমার বন্ধু হিসেবে। সারাজীবন তোকে আমি সহ্য করতে পারিনি। সব কিছুতে তুই এগিয়ে থাকতি। পড়াশোনা, খেলাধুলা, মানুষজনের ভালোবাসা, সবকিছুতে। তোকে আমার মেরে ফেলতে ইচ্ছে করতো। তোর সুখ আমি সহ্য করতে পারিনি কোনোদিন!"
নাহিদের কথা শেষ হতে না হতেই উজানের চোখ বন্ধ হয়ে গেলো। বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা,আর প্রতারণার শূল গেঁথে গেলো। যে মানুষটাকে সে নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবেসেছে, বিশ্বাস করেছে, সেই মানুষটা আজ তার পায়ের নিচের মাটি টেনে নিয়েছে।
হঠাৎ করেই যেন সব বাঁধ ভেঙে গেলো। উজান উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে নাহিদকে লাথি মারলো। নাহিদ সোফাসহ পেছনে ছিটকে পড়লো।
উজানের তেড়ে গিয়ে পরপর কয়েকটা লাথি মারলো নাহিদকে।
চিৎকার করে উঠলো,
"তোর মতো জানোয়ারের মরে যাওয়া উচিত। তুই বন্ধুত্বের নামে কলঙ্ক, নাহিদ! তুই… তুই… তুই আমার সামনে আর আসবি না। তোকে যদি আমি আবার আমার সামনে দেখি সেখানেই খুন করে আসবো!"
শেষ কথাটা বলেই উজান আরেকটা লাথি মারলো। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরে এসে রাস্তায় দাঁড়াতেই ঠান্ডা হাওয়া তার মুখে এসে লাগলো। সেই হাওয়া তার বুকের আগুনকে একটুও শান্ত করতে পারলো না। 
জীবনে প্রথমবার উজান বুঝলো, 
প্রিয় মানুষের ধোকা যে কোনো বিষের চেয়ে গভীর আর যন্ত্রণাদায়ক।
____
নিজের বাড়িতে এসে অস্থির পায়ে ঘরে ঢুকলো উজান। রুহানী বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। হাতে একটা উপন্যাসের বই। রুহানীকে দেখে উজানের বুক ভারি হয়ে আসলো। মনে হলো সে রুহানীকে ধোঁকা দিচ্ছে। তার মিথ্যা বলা একদমই উচিত হয়নি। তার কেমন অস্থির লাগছে। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে রুহানীকে জরিয়ে ধরলো। উজানের কান্ডে রুহানী হকচকিয়ে উঠলো। সেও দুই হাত বারিয়ে উজানকে জরিয়ে ধরলো। 
রুহানী ডেকে উঠলো, "উজান ভাই? শরীর খারাপ লাগছে?"
"রুহানী আমাকে মাপ করে দিস।" উজানের কন্ঠ কেঁপে উঠলো।
উজানের কথায় রুহানী থমকে গেলো। সে এমন কিছু শুনতে চায় না যেটা সে শুনতে পারবে না। সে উজানের মুখ দুই হাত দিয়ে ধরে তার বুক থেকে উঠালো। উজানের চোখের দিকে তাকিয়ে তার উত্তর খুজতে শুরু করলো। রুহানী ফিসফিসিয়ে বললো,
"দয়া করে এমন কিছু বলবেন না যেটা আমি শুনতে পারবো না, উজান ভাই।"
উজান রুহানীর চোখে চোখ রাখার সাহস পাচ্ছে না। সে চোখ নিচু করে ফেললো। উজানের কাজে রুহানীর হতভম্ব হয়ে গেলো। উজান ভাই তার চোখে চোখ রাখছে না! এমনটা তো কখনো হয়নি! কিন্ত আজ এমনটা হলো! কিন্ত কেনো? অজান্তেই রুহানীর চোখ থেকে জল গরিয়ে পরলো। গলা কাঁপতে শুরু করলো।
অনেক্ষন পর উজান ফিসফিসিয়ে বললো, "যদি বলি ওই ছবি গুলো এডিট না?"
রুহানী শরীর দৃশ্যমান রুপে কেঁপে উঠলো। উজানের মুখ থেকে হাত ফসকে গেলো। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারলো না। অনেক কষ্ট করে উচ্চারণ করলো,
"ওই ছবি গুলো আসল ছিলো? তার মানে..তার মানে... কেনো করলেন এমনটা আমার সাথে, উজান ভাই?"
উজান অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে জবান দিলো, "এমন কিছু করিনি, রুহানী। আমার অগোচরে এসব হয়েছে। আমাকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে, জান।"
উজানের কন্ঠটা খুব অসহায় শোনালো। রুহানীর ভ্রু কুঁচকে গেলো,
"মানে?"
উজান রুহানীকে সবটা খুলে বললো। সবটা শুনে রুহানীর মনে হলো সে কোনো দুঃস্বপ্নের রাজ্যে চলে এসেছে। এগুলো সত্যি হতেই পারে না। মানু্‌ষ এভাবেও ধোঁকা দিতে পারে? নাহিদ ভাইয়া উজানের সাথে এমনটা করতে পারে? তাদের তো সেই ছোটো বেলা থেকে বন্ধুত্ব  ছিলো! কিভাবে পারলো নাহিদ ভাইয়া এমনটা করতে? একবারও বুক কাঁঁপলো না তার? নিজের হাতেই বিষ খাওয়াতে পারলো? 
রুহানী হঠাৎ উজানের কাছে আবদার করলো, "উজান ভাই। আমার একটা আবদার পুরোন করতে পারবেন? আপনি তো আমার জন্য সব করতে পারেন। এবার নাহয় আরেকটা আবদার পুরোন করে দিন।"
উজান জিজ্ঞেস করলো, "কি?"
রুহানী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো উজানের দিকে। 
____
ক্লাব ঘরে বসে অভ্র কাজ করছিলো। ঠিক তখন উজান কোনো আগাম বাত্রা ছাড়া ওখানে হাজির হলো। সোজা অভ্রর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,
"আমার হায়াতকে লাগবে।"
আচানক উজানের এমন কথায় অভ্র চমকে উঠলো। মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো,
"তাহলে রুহানীর কি হবে?"
চলবে....
এই রাত বেরাতে গল্প দেওয়ার অভ্যাস আমার কোনোদিনও যাবে না। ধন্যবাদ।😊

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন