#প্রণয়ের_বৃষ্টি
#writer_nazmin
#Part_22
🚫 হ্যাশট্যাগ বিহীন কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ‼️
সকালের নরম আলো ধীরে ধীরে পুরো গ্রামটাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে।রাতের বৃষ্টির পর চারপাশ যেন আরও বেশি সতেজ লাগছে।গাছের পাতায় জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছে।
উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা।তার হাতে সেই পিঠার ব্যাগ, যেটা বৃদ্ধা নিজের হাতে তৈরি করে দিয়েছেন।
বৃদ্ধা বারবার চোখ মুছছেন। ওনার মনে হচ্ছে নিজের নাতি নাতনিদেরই বিদায় দিচ্ছেন।
"আবার আইসো মা। এই বুড়া বুড়িরে কিন্তু ভুইলা যাইও না। তুমরা আইলে এই আন্ধার ঘরটা আলো হইবো।"
মেঘলার চোখও ভিজে উঠলো।সে বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদি গলায় বললো,
"উঁহু ভুলবো কি করে। এই দাদু দাদি এত ভালোবাসা দিয়েছে যে, ওনাদের কি ভুলা যায়?"
বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতেও হেসে ফেললেন।
গেইটের সামনে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সবকিছু দেখছিলেন বৃদ্ধ ও আরিয়ান।বৃদ্ধ লোকটা এবার চোখ মুছে আরিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
"বাবা, স্বামী স্ত্রী সরসময় মিলমিশ কইরা থাইকো।বইনে আমগো বহুত ভালা।মাইয়াডারে কখনও কষ্ট দিও না।"
কথাটা শুনে আরিয়ান একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হেসে বললো,
"দোয়া করবেন দাদু।"
আরও কিছুক্ষণ সবার সাথে কথাবার্তা বলে গাড়িতে উঠে বসলো দুজন।
--------------
গ্রামটা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যেতে লাগলো।গাড়ির ভেতরে হালকা নীরবতা বিরাজমান।
মেঘলা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।ওর বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা।
ঠিক তখনই আরিয়ান গম্ভীর গলায় বললো,
"হাতের ব্যথা এখন কেমন?"
মেঘলা ওর মুখে এ কথা শুনে একটু অবাক হলো। তবু ছোট করে উত্তর দিলো,
"আগের চেয়ে ভালো।"
আরিয়ান ফের গম্ভীর গলায় বললো,
"রিসোর্টে গিয়েই ডক্টর দিয়ে চেকআপ করিয়ে নিবে।আর সমস্ত ওষুধ সময়মতো খাবে।"
মেঘলা ওর কথা গুলো মন দিয়ে শুনলো। এরপর ভ্রু কুঁচকে বললো,
"স্যার, আপনি কি এখন সবসময় এভাবেই কথা বলেন?"
আরিয়ান একপলক ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললো,
"মানে? কিভাবে?"
"এইযে ম্যাথ টিচারদের মতো।যেন অংক না পাড়া কোনো স্টুডেন্টের উপর রাগ ঝাড়ছেন।"
আরিয়ান সামনে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো,
"গাড়ি থেকে নেমে না যেতে চাইলে নিজের মুখটা একটু বন্ধ রাখো।"
মেঘলা কটমট করে মুখ ঘুরিয়ে ফেললো।
আরিয়ান আড়চোখে একবার তাকালো ওর দিকে।
অনেকদিন পর নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো।
--------------
রিসোর্টে ফিরতেই সন্ধ্যা নেমে গেছে পুরো পাহাড়জুড়ে।বৃষ্টির পর চারপাশে হালকা কুয়াশা জমেছে।রিসোর্টের সামনে লাগানো ছোট ছোট লাইটগুলো ভেজা পথের উপর পড়ে চিকচিক করছে।
গাড়িটা গেটের সামনে থামতেই রিসোর্টের ভেতর থেকে কয়েকজন স্টাফ দ্রুত বেরিয়ে এলো।তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগ।
সবচেয়ে আগে দৌড়ে এলো তিথি।মেঘলাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই সে প্রায় ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। ওকে ছেড়ে দিয়ে উদ্বেগভরা কণ্ঠে বললো,
"ও মাই গড! তুই ঠিক আছিস? জানিস আমরা কতটা ভয় পেয়েছিলাম!"
ওর গলা কাঁপছিল।
মেঘলা ক্লান্ত মুখে হালকা হাসলো।
"আমি ঠিক আছি রে।"
রাহুলও দ্রুত এগিয়ে এলো।
"ঠিক আছিস মানে? দুইদিন ধরে কোনো ফোন নেই, কোনো ইনফেকশন নেই! আমরা তো টেনশনে শেষ!"
তিথি তাড়াহুড়ো করে বললো,
"আমরা পুলিশেও ইনফর্ম করেছিলাম জানিস? পাহাড়ি রাস্তা, ঝড়বৃষ্টি কি না কি হয়ে গেছে ভাবছিলাম!"
মেঘলার চোখ অবাক হয়ে বড় হয়ে গেলো।
"পুলিশে?"
রাহুল মাথা নেড়ে বললো,
"হ্যাঁ! তুই আর স্যার কাউকেই ফোনে পাচ্ছিলাম না।পরশু রাত থেকে পুরো রিসোর্ট মাথায় উঠিয়ে ফেলেছিলাম আমরা।"
ঠিক তখনই তিথির চোখ গিয়ে আটকে গেল মেঘলার ব্যান্ডেজ করা হাতে।সে একদম থমকে গেল। চেঁচিয়ে উঠলো,
"এই এক মিনিট। এটা কি!"
সে আলতো করে মেঘলার হাত ধরলো। উত্তেজিত কণ্ঠে বললো,
"তোর হাতে ব্যান্ডেজ কেন? তুই ইনজুরড হয়েছিলি?"
মেঘলা কিছু বলার আগেই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
"সি নিডস রেস্ট নাও।"
সবাই ঘুরে তাকালো।আরিয়ান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।ওর চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।চোখ দুটো লালচে, যেন বহুক্ষণ ঘুম হয়নি।
ও একবার মেঘলার হাতের দিকে তাকালো।ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
তিথি কৌতুহলী কণ্ঠে বললো,
"স্যার আসলে কি হয়েছিল?"
আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো।মনে হলো আবার পুরো ঘটনাটা মাথায় ফিরে আসছে।
তারপর ধীরে বললো,
"গাড়িটা মাঝরাস্তায় নষ্ট হয়ে যায়। তারপর কিছু লোক আমাদের ঘিরে ধরে।"
তিথি আতঙ্কে মুখে হাত দিলো,
"হোয়াট!"
রাহুল দ্রুত বললো,
"তারপর? আপনারা পুলিশে কল করেননি?"
আরিয়ান গম্ভীর গলায় বললো,
"কি মনে হয় নেটওয়ার্ক ছিল সেখানে?"
রাহুল কাঁচুমাচু মুখ করে রইলো।
তিথি আস্তে করে বললো,
"পরে কি হয়েছিল স্যার?"
আরিয়ান ওদের সমস্ত ঘটনা খুলে বললো।সকলে তো অবাকের চরম সীমায়।তাও সকলে শুকরিয়া আদায় করলো যে ওদের কিছু হয়নি।
তিথি এবার মেঘলার হাত শক্ত করে ধরলো।ভয়ার্ত গলায় বললো,
"তুই জানিস আমরা কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম?"
মেঘলা মুচকি হেসে বললো,
"আমি তো ফিরে এসেছি।"
ঠিক তখনই আরিয়ান ঠান্ডা গলায় বললো,
"কিন্তু ওনাকে ইমিডিয়েটলি ডক্টরের থেকে চেকাপ নিতে হবে।"
তিথি আর রাহুল একে অপরের দিকে তাকালো।কারণ তাদের CEO-এর গলায় একটা চাপা দুশ্চিন্তা স্পষ্ট।
রাহুল আস্তে করে তিথিকে বললো,
"বসের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে উনি আমাদের চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলেন।"
তিথি ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বললো,
"আমার তো মনে হচ্ছে গল্পটা এখনও শেষ হয়নি বরং মাত্র শুরু হলো।"
ঠিক তখনই আরিয়ানের ঠান্ডা দৃষ্টি গিয়ে পড়লো ওদের উপর।দুজন সাথে সাথে চুপ হয়ে গেলো।
---------------
দুদিন পর-
ঢাকা শহর আবার আগের মতো ব্যস্ত।অফিস, মিটিং, কাজ সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে।কিন্তু কোথাও যেন কিছু একটা বদলে গেছে। হয়তো কোনো সুপ্ত অভিমান।
মেঘলা নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিল।ঠিক তখন পিয়ন এসে বললো,
"ম্যাম,সিইও স্যার আপনাকে কেবিনে ডাকছেন।"
বরাবরের মতোই এই নামটা শুনেই মেঘলার বুকটা কেমন যেন করে উঠলো।তাও নিজেকে সামলে সে ধীরে ধীরে আরিয়ানের কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো,
"কাম ইন।"
মেঘলা ভেতরে ঢুকলো।আরিয়ান ল্যাপটপে চোখ রেখে বললো,
"বসো।"
মেঘলা বসলো।আরিয়ান একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললো,
"এটা কালকের প্রেজেন্টেশনের জন্য।"
মেঘলা ফাইল নিতে গিয়ে বললো,
"ওকে স্যার।"
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
"হাতের ড্রেসিং করিয়েছো?"
মেঘলা অবাক হয়ে তাকালো।এই মানুষটা কি সত্যিই এত খেয়াল রাখে?তবুও ধীরে বললো,
"জি।"
আরিয়ান মাথা নেড়ে আবার কাজে মন দিলো।
কিন্তু মেঘলা বের হওয়ার সময় হঠাৎ বললো,
"স্যার।"
আরিয়ান তাকালো।মেঘলা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো,
"ধন্যবাদ।"
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বললো,
"সরি,কিসের জন্য?"
মেঘলা মৃদু হেসে বললো,
"সবকিছুর জন্য।"
কথাটা বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলো।
আরিয়ান চুপচাপ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তার বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো অস্থিরতা ফিরে আসছে।
চলবে...
💬 গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি লাইক কমেন্ট শেয়ার করবেন