ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার রিদ ভাই

২য় পর্ব

লেখক: jimiya kazi

আমার রিদ ভাই
লেখিকা — জিমিয়া কাজী
পর্ব ৬–৮
সাবিহার স্বীকারোক্তি
—আমি জুঁইয়ের জন্মদাত্রী মা।
সাবিহার কথাটা শুনে খান বাড়ির সবাই যেন পাথর হয়ে গেল।
জুঁই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেছে। যেন সে ঠিক বুঝতেই পারছে না, এই মুহূর্তে কী শুনল।
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে আমিনার দিকে গেল।
—আম্মা...
আমিনা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।
জুঁই আবার ডাকল,
—আম্মা, উনি কি সত্যি কথা বলছেন?
আমিনার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
জুঁই এবার কাঁপা গলায় বলল,
—আপনি চুপ করে আছেন কেন?
আমিনা চোখ তুলে তাকালেন। চোখ ভরা পানি।
—জুঁই, আমি তোকে কখনো মিথ্যা বলতে চাইনি।
জুঁইয়ের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
—কিন্তু আপনি তো আমাকে বলেছেন, আপনি আমার মা।
আমিনা এগিয়ে এসে তার হাত ধরতে চাইলেন।
—তুই আমার মেয়ে।
জুঁই হাত সরিয়ে নিল।
—তাহলে উনি?
সাবিহা চোখের পানি মুছে বললেন,
—আমি তোকে জন্ম দিয়েছি মা।
জুঁই কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
তার মাথায় যেন একসঙ্গে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
—তাহলে আমি কে?
আমিনা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।
তিনি জুঁইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—তুই আমার জুঁই। আমার মেয়ে। তোকে আমি জন্ম না দিলেও তোকে নিজের বুকের ভেতর রেখে বড় করেছি।
জুঁইও কাঁদতে লাগল।
—আপনি আমাকে আগে বলেননি কেন?
—ভয় পেয়েছিলাম।
—কিসের ভয়?
—তোকে হারানোর ভয়।
জুঁই আমিনার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,
—আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
আমিনা চোখ বন্ধ করে মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
সাবিহা দূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন।
তার চোখেও পানি।
—আমি জানতাম, তুই আমিনাকে ছেড়ে যাবি না।
জুঁই চোখ মুছে সাবিহার দিকে তাকাল।
—আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?
সাবিহা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোর কাছ থেকে দূরে থাকা আমার ইচ্ছা ছিল না।
—তাহলে?
—পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছিল।
রিজ এতক্ষণ নীরবে সব শুনছিল।
সে এবার সামনে এসে বলল,
—সবকিছু শুরু থেকে বলুন।
সাবিহা রিজের দিকে তাকালেন।
—তুই সুলাইমানের বড় ছেলে, তাই না?
—হ্যাঁ।
—তাহলে তোর জানার অধিকার আছে।
সাবিহা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
—ষোলো বছর আগে আমার স্বামী একটা ব্যবসায়িক সমস্যায় পড়েছিল। কিছু মানুষ আমাদের সম্পত্তি দখল করতে চাইছিল। তাদের সঙ্গে সেলিমের পরিবারেরও যোগাযোগ ছিল।
রিজের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
—সেলিমের পরিবার?
—হ্যাঁ।
জুঁই ভয়ে বলল,
—কিন্তু তারা আমাকে কেন বিয়ে করতে চায়?
সাবিহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—শুধু বিয়ের জন্য নয়।
রিজ জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে?
—তোর বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির একটা অংশ এখনো জুঁইয়ের নামে আছে।
ঘরে নীরবতা।
জুঁই হতভম্ব।
—আমার নামে?
সাবিহা মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ।
রিজ বলল,
—তাহলে সেলিমের আসল উদ্দেশ্য সম্পত্তি?
—সম্ভবত।
রিজের মুঠি শক্ত হয়ে গেল।
—আমি জুঁইকে ব্যবহার করতে দেব না।
জুঁই ধীরে বলল,
—রিজ ভাই...
রিজ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ভয় পাস না। তোর পাশে আমি আছি।
ঠিক তখন বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
সবাই দরজার দিকে তাকাল।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে একজন যুবক ভেতরে ঢুকল।
কাঁধে ভ্রমণের ব্যাগ। মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে হাসি।
—দাদি কোথায়?
দাদি দ্রুত এগিয়ে এলেন।
—রিদ!
যুবক দাদিকে জড়িয়ে ধরল।
—দাদি, কেমন আছেন?
—তুই এতদিন পর এলি!
—এইবার তো এসে গেলাম।
রিজ এগিয়ে এসে ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরল।
—কখন এলি?
রিদ হাসল।
—এইমাত্র।
রিদ খান—রিজের আপন ছোট ভাই।
দীর্ঘদিন বিদেশে পড়াশোনা করার কারণে সে পরিবারের কাছ থেকে দূরে ছিল। স্বভাবে রিজের চেয়ে অনেক শান্ত ও হাসিখুশি। কিন্তু চোখের সামনে কোনো অন্যায় দেখলে সে সহজে চুপ থাকে না।
রিদ চারপাশে তাকিয়ে বুঝল, বাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক নয়।
তার চোখ গিয়ে থামল জুঁইয়ের মুখে।
—জুঁই কাঁদছে কেন?
কেউ উত্তর দিল না।
রিদ ধীরে জুঁইয়ের কাছে গিয়ে বলল,
—কী হয়েছে?
জুঁই মাথা নিচু করে রইল।
রিজ বলল,
—অনেক কিছু হয়েছে।
রিদ ভাইয়ের দিকে তাকাল।
—আমাকে বলো।
রিজ সবকিছু খুলে বলল।
রিদ মন দিয়ে শুনল।
সাবিহার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আপনি জুঁইয়ের মা?
—হ্যাঁ।
রিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—তাহলে আজ থেকে জুঁইয়ের জন্য সত্যিটা খুঁজে বের করা আমাদের দুজনের দায়িত্ব।
রিজ মাথা নাড়ল।
—ঠিক বলেছিস।
রাতের খাবারের পর রিদ নিজের ঘরে গেল।
ব্যাগ খুলতে গিয়ে একটা পুরোনো ফাইল তার হাতে এল।
ফাইলটা দেখে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
বিদেশে যাওয়ার আগে এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে ফাইলটি দিয়েছিল।
তখন সে বিষয়টা বুঝতে পারেনি।
কিন্তু আজকের ঘটনার পর ফাইলটার গুরুত্ব বুঝতে পারল।
রিদ ফাইল নিয়ে রিজের ঘরে গেল।
—ভাই।
রিজ তাকাল।
—কী?
রিদ ফাইলটা টেবিলে রাখল।
—এটা দেখ।
রিজ ফাইল খুলে কয়েকটি কাগজ বের করল।
একটা নথিতে জুঁইয়ের বাবার নাম লেখা।
রিজের চোখ আটকে গেল।
—এটা কোথায় পেলি?
—বিদেশে যাওয়ার আগে।
—তুই আগে আমাকে দেখাসনি কেন?
—তখন জানতাম না এটা এত গুরুত্বপূর্ণ।
রিজ কাগজ পড়তে পড়তে থেমে গেল।
—এখানে তো একটা পুরোনো বাড়ির কথা লেখা।
রিদ বলল,
—হ্যাঁ। আর একটা ঘরের কথা।
—কী ঘর?
—যে ঘরের চাবি নাকি জুঁইয়ের কাছে থাকার কথা।
দুজনেই একসঙ্গে জুঁইয়ের দিকে তাকাল।
জুঁইকে ডাকলে আমিনা প্রথমে আপত্তি করলেন।
কিন্তু পরে একটি ছোট পুরোনো বাক্স এনে তার হাতে দিলেন।
—এটা তোর বাবার কাছ থেকে পাওয়া।
জুঁই বাক্স খুলল।
ভেতরে একটি ছোট চাবি।
সঙ্গে ভাঁজ করা কাগজ।
রিদ কাগজটা খুলে পড়ল।
সেখানে লেখা—
“যেদিন আমার মেয়ে সত্যিটা জানবে, সেদিন পুরোনো বাড়ির দরজা খুলবে।”
জুঁই কাঁপা গলায় বলল,
—কোন পুরোনো বাড়ি?
সাবিহা চোখ নামিয়ে বললেন,
—তোর জন্মের বাড়ি।
রিজ বলল,
—আমরা সেখানে যাব।
সুলাইমান এতক্ষণ চুপ ছিলেন।
তিনি হঠাৎ বললেন,
—না।
রিজ বাবার দিকে তাকাল।
—কেন?
—ওই বাড়িতে যাওয়া নিরাপদ নয়।
রিদ বলল,
—তাহলে এতদিন কী লুকিয়ে রেখেছেন?
সুলাইমান চুপ।
রিজ এবার দৃঢ় গলায় বলল,
—বাবা, আমরা আর থামব না।
সুলাইমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—তোরা যদি সত্যিই যেতে চাস, তাহলে একটা কথা মনে রাখিস। ওই বাড়ির ভেতরে যা পাবি, তার সবকিছু বিশ্বাস করিস না।
রিদ বলল,
—কেন?
সুলাইমান উত্তর দিলেন না।
পরদিন ভোরে রিজ ও রিদ পুরোনো বাড়ির উদ্দেশে বের হলো।
জুঁইও যেতে চাইল।
রিজ বলল,
—তুই বাড়িতে থাক।
জুঁই মাথা নাড়ল।
—না। আমার জীবন নিয়ে রহস্য। সত্যিটা জানার অধিকার আমারও আছে।
রিদ মৃদু হেসে বলল,
—ওকে যেতে দাও ভাই।
রিজ কিছুক্ষণ জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
—ঠিক আছে। কিন্তু আমার কাছ থেকে এক পা দূরে যাবি না।
জুঁই মাথা নাড়ল।
তিনজন রওনা হলো।
পুরোনো বাড়িটা ছিল শহর থেকে অনেক দূরে।
বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই জুঁই অদ্ভুত এক অনুভূতি পেল।
সে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—এই জায়গাটা আমার পরিচিত মনে হচ্ছে।
সাবিহা তাদের সঙ্গে আসেননি।
রিজ বলল,
—কী মনে পড়ছে?
জুঁই চোখ বন্ধ করল।
—একটা বড় উঠোন...
রিদ বলল,
—আর?
—একজন মহিলা আমাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রিজ ও রিদ একে অপরের দিকে তাকাল।
জুঁই ধীরে বলল,
—আর একটা লাল দরজা।
তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকল।
পেছনের ঘরের দরজায় একটি পুরোনো তালা।
রিজ চাবিটা জুঁইয়ের হাতে দিল।
—তুই খুল।
জুঁই কাঁপা হাতে চাবিটা তালায় ঢোকাল।
ক্লিক।
দরজা খুলে গেল।
ঘরের ভেতরে ধুলো জমে আছে।
রিদ টর্চ জ্বালিয়ে চারপাশ দেখল।
একটা পুরোনো আলমারি।
রিজ সেটা খুলতেই একটা ডায়েরি পড়ে গেল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“আমার মেয়ের জন্য।”
জুঁই ডায়েরিটা হাতে নিয়ে কাঁপতে লাগল।
রিদ বলল,
—খুলে দেখ।
জুঁই প্রথম পাতা খুলল।
তারপর দ্বিতীয় পাতা।
কয়েক লাইন পড়তেই তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
—রিজ ভাই...
—কী লেখা?
জুঁই কাঁপা গলায় পড়ল,
—“যদি কোনোদিন আমার মেয়ে এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে তাকে বলো—তার মায়ের কাছ থেকে তাকে দূরে রাখার কারণ ছিল...”
বাকিটা ছেঁড়া।
রিজ ডায়েরিটা হাতে নিল।
ঠিক তখন বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
রিদ সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।
—আমরা এখানে একা নই।
রিজ জুঁইকে নিজের পেছনে সরিয়ে দিল।
বাইরে থেকে ধীরে ধীরে দরজার হাতল নড়ল।
একজনের কণ্ঠ শোনা গেল—
—জুঁই... এত বছর পর অবশেষে তুই ফিরে এলি।
তিনজনই স্থির হয়ে গেল।
রিজ দরজার সামনে দাঁড়াল।
রিদ পাশে এসে দাঁড়াল।
আর জুঁই ভয়ে ডায়েরিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।
চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন