আম_ইন_লাভ_উইথ_আ_ক্রিমিনাল
#সূচনা_পর্ব 🦋
#সাবিলা_সাবি ✍️
.
“তোমার কি একটুও লজ্জা করল না?”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠলেন লিওনার্দোর বাবা আর্থার হায়াস। তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দের সাথে মিশে ছিল অপমান, ক্ষোভ আর বহু বছরের অর্জিত সম্মান হারানোর প্রবল যন্ত্রণা।
“একজন আদর্শ সিআইডি অফিসার হয়ে পৃথিবীর অন্যতম কুখ্যাত আন্তর্জাতিক ক্রিমিনালের প্রেমে পড়েছো! যে মেয়ের নাম শুনলেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পুলিশবাহিনী সতর্ক হয়ে ওঠে, তাকেই তুমি ভালোবাসো?”
কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে কঠোরদৃষ্টির সেই পিতা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন নিজের আদরের সন্তানের দিকে।
মেঝেতে পড়ে থাকা লিওন ঠোঁটের রক্ত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। কফি-রঙা চোখে তখনও কোনো অনুতাপ নেই বরং ছিল অনড় একটা স্থিরতা।
“না। আমার লজ্জা লাগে না।”
লিওনের কণ্ঠস্বর শান্ত ছিলো কথাটা বলার সময় অথচ সেই শান্ত স্বরের আড়ালেও ফুটে উঠল একজন কঠোর সিআইডি অফিসারের অনড় মানসিকতা।
“কারণ ভালোবাসা কোনো ধর্ম, পরিচয় কিংবা অতীত মেনে হয় না। ও আমার জীবনের এমন একজন মানুষ, যার গভীর আঁধারের মাঝেও আমি নক্ষত্রের এক টুকরো আলো হয়ে থাকতে চাই। পুরো পৃথিবী যদি তাকে শুধু একজন অপরাধী হিসেবেই দেখে, অন্তত একজন মানুষ তো থাকুক, যে তাকে অপরাধী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখবে।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বজ্রপাতের মতো আরেকটা ঘুষি এসে আছড়ে পড়ল তার মুখের ওপর। ভারসাম্য হারিয়ে আবারও মেঝেতে পড়ে গেল লিওন, লন্ডন সিআইডির সেই দুর্ধর্ষ অফিসার, যার চোখে তখনও হার মানার কোনো ছাপ নেই।
আর্থার হায়াসের বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে জমে থাকা ক্ষোভ এবার আর বাঁধ মানল না। চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠলেও তা মুছে ফেলার কোনো চেষ্টা করলেন না তিনি। একত্রিশ বছরের সন্তানের গায়ে হাত তুলতে হচ্ছে তাঁকে, অথচ এই হাতেই তো একদিন সেই সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা আর নিজের ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া অহংকারের টানাপোড়েনে মানুষটা তখন ভেতর থেকে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছিলেন।
“কেন জন্মেছিলে তুমি? মরে গেলে না কেন? আমার সারা জীবনের অর্জিত সম্মান, আমার সততা আজ তুমি সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলে!”
দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসারের র*ক্তমাখা ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল বিষণ্ন হাসি।
পৃথিবীর চোখে ভাইপার একজন কুখ্যাত আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল। তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য অপ/রাধ, র/ক্ত আর অন্ধকারের গল্প। কিন্তু লিওনের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। তার চোখে ভাইপার শুধু একজন নারী, একজন মানুষ, যাকে সে পৃথিবীর সমস্ত ভয় আর ঘৃণার আড়াল থেকে আগলে রাখতে চায়। সবাই তার বিপক্ষে দাঁড়ালেও লিওন তার হাতটা ছাড়তে চায় না। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখতে চায়।
.
.
.
সেন্ট্রাল সিআইডি হেডকোয়ার্টারের কনফারেন্স রুমে তখন নেমে এসেছে ভারী নীরবতা।
কাঁচের বিশাল জানালার ওপারে জুলাইয়ের লন্ডন ডুবে আছে অবিরাম বৃষ্টিতে। ধূসর আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির ধারা কাঁচের গায়ে আছড়ে পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে নিচে। বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দের সঙ্গে মিশে আছে কক্ষের এসির মৃদু গুঞ্জন। ঠান্ডা, ধূসর সেই বিকেলে কনফারেন্স রুমের নীরবতাও আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
প্রজেক্টর স্ক্রিনের সামনে এক হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল ছয় ফুট দুই ইঞ্চির সেই দুর্ধর্ষ পুরুষ। আকাশি রঙের শার্টের সঙ্গে নিখুঁতভাবে বাঁধা নেভি-ব্লু টাই, পেছনে আঁচড়ানো ঘন কালো চুল, মুখজুড়ে হালকা ছাঁটা চাপ দাড়ি। চওড়া কাঁধ আর টানটান দেহভঙ্গিতে ফুটে উঠেছিল তার ব্যক্তিত্বের কঠোরতা, অথচ স্থির চোখজোড়ায় ছিল এমন এক আত্মবিশ্বাস, যা বছরের পর বছর দায়িত্ব আর ঝুঁকির ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে।
কফি-রঙা চোখজোড়ায় স্থির দৃষ্টি, কথা বলার সময় বাম ঠোঁটের ঠিক ওপরে থাকা ছোট্ট কালো তিলটিও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
বাড়তি কোনো আয়োজন ছাড়াই তাকে দেখলে প্রথম দৃষ্টিতে পরিপাটি, সুদর্শন একজন সিআইডি অফিসার বলেই মনে হবে। অথচ সেই শান্ত মুখাবয়বের আড়ালে গড়ে উঠেছে তীক্ষ্ণ এক মস্তিষ্ক, কঠোর প্রশিক্ষণে শানিত এক সত্তা আর অপরাধের গভীরতম অন্ধকারেও সত্য খুঁজে বের করার অদম্য ক্ষমতা।
নতুন জয়েন করেও নিজের দক্ষতা এবং একের পর এক জটিল কেস সমাধানের মাধ্যমে অল্প সময়েই পুরো ডিপার্টমেন্টের নজরে উঠে এসেছে আইনরক্ষার এই তরুণ যোদ্ধা।
বর্তমানে সে শুধু লন্ডনের একজন সিআইডি অফিসার নয়, ইন্টারপোলের নির্দেশে গঠিত বিশেষ আন্তর্জাতিক জয়েন্ট টাস্ক ফোর্সের চিফ ইনভেস্টিগেটরও। বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত এই টাস্ক ফোর্সের হয়ে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক অপরাধের তদন্ত ও অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব এখন তার কাঁধে।
তার সামনে থাকা প্রজেক্টর স্ক্রিনে কোনো মানুষের ছবি নেই। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর নিখুঁত রেখায় আঁকা ফণা তোলা একটি বিষাক্ত সাপের অবয়ব সেখানে।
ইন্টারপোল সেই অবয়বকে চেনে এক নামেই—স্নেক ভাইপার। আন্ডারওয়ার্ল্ডে যার পরিচয় এই কোডনেমেই।
কঠোরদৃষ্টির তদন্তকারী কথা বলা শুরু করতেই কক্ষের প্রতিটি মানুষ নীরব হয়ে গেল।
“গত তিন বছরে ইউরোপের চারটি বড় মা*র্ডার এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েকটি দুর্ভেদ্য সিন্ডিকেটের পতনের পেছনে এই একটি নাম জড়িয়ে আছে। বিষয়টা কোনো সাধারণ ক্রাইম নয়। তাই আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সকে এর পেছনে লাগানো হয়েছে।”
একবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে পুনরায় বলল,
“আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা কেউ জানি না ভাইপার আসলে কে। পুরুষ না নারী, তার আসল পরিচয় কী, কিংবা দেখতে কেমন—কোনোটাই নিশ্চিত নয়।”
টেবিলের সামনে বসে থাকা একজন প্রবীণ অফিসার ফাইল ওল্টাতে ওল্টাতে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন।
“বাট অফিসার লিওন, আন্ডারওয়ার্ল্ডে তো ওর বৈশিষ্ট্য নিয়ে কিছু গুজব ছড়ানো আছে?”
আঙুলের ফাঁকে থাকা মার্কার পেনটি ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর ঠুকল সেই কঠিনচেতা লিওনার্দো।
“অপরাধ জগতে গুজব দিয়ে সত্য ঢাকা যায় না, স্যার। হাতে সাপের ট্যাটু, আইব্রো পিয়ার্সিং কিংবা থুতনিতে কাটা দাগ, এসব সত্যিও হতে পারে, আবার আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য ছড়ানো গল্পও হতে পারে।”
কয়েক মুহূর্ত থেমে সে আবার বলল, “তবে আমাদের হাতে এখন সবচেয়ে বড় লিড একটাই। ভাইপার লন্ডনের মাটিতে পা রেখেছে।”
তার কণ্ঠস্বরে এবার আরও দৃঢ়তা নেমে এল।
“আর তাকে খুঁজে বের করাই আমার প্রথম কাজ।”
------
ব্রিফিং শেষ করে নিজের কেবিনে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় আটটা বেজে গেল। চেয়ারে বসার সঙ্গে সঙ্গেই ডেস্কের ওপর রাখা ফোনটি শব্দ করে কেঁপে উঠল।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা মিষ্টি ২২বছরের তরুনীর ছবি। ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল তরুণীর মিষ্টি অভিমানী কন্ঠস্বর,
“লিও! ভাইয়া, তুমি কি আজকেও রাত করে বাড়ি ফিরবে? মামিমা কিন্তু ডিনার টেবিলে তোমার পছন্দের খাবার নিয়ে বসে অপেক্ষা করছেন।”
তরুণীর কোমল কণ্ঠটা কর্নকুহুরে পৌঁছাতেই এতক্ষণকার দুর্ধর্ষ সিআইডি অফিসার লিওনের কঠোর মুখাবয়বে নেমে এলো কোমলতা। অধরের কোণে ফুটে উঠল ক্ষীণ হাসি।
সেই তরুণীর নাম হচ্ছে মায়া আর সম্পর্কে মায়া লিওনের ফুপাতো বোন। তবে এখন সে তার হবু বউও।
ছোটবেলায় এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় মায়ার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর লিওনের মা-বাবাই তাকে নিজেদের মেয়ের মতো করে আগলে রেখেছেন এতগুলো বছর। মায়ার প্রতি লিওনের মনে প্রেমের কোনো মাতাল করা উন্মাদনা নেই। আছে গভীর একটা দায়িত্ববোধ, মমতা এবং বড়দের শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান। আর সম্মানের খাতিরেই কিছুদিন আগে তাদের আংটি বদলও হয়েছে।
ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে লিওন বলল, “আসছি, মায়া। জাস্ট ফাইলগুলো গুছিয়েই বের হচ্ছি।”
ওপাশ থেকে মায়া হালকা হেসে বলল, “তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু! তোমার ওই ভাইপার ইদানীং আমার চেয়ে বেশি সময় পাচ্ছে তোমার কাছে।”
এই বলেই ফোনটা রেখে দিল মায়া।
কলটা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ফোনটি নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিল সেই আইনরক্ষক। ঠিক তখনই ডেস্কের এক কোণে তার দৃষ্টি আটকে গেল।
একটি ছোট কাঁচের পেপারওয়েট রাখা সেখানে। ভ্রু কিঞ্চিত কুঁচকে গেল তার। এক ঘণ্টা আগেও পুরো ডেস্কটা ফাঁকা ছিল। এই পেপারওয়েট সেখানে ছিল না।
কিছু না ভেবেই সাবধানে সেটি তুলে নিল সে। নিচে চাপা দেওয়া ছোট্ট একটি সাদা কাগজ বেরিয়ে এল।
ভাঁজ খুলতেই মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গেল তার মুখাবয়ব।
নীল কালিতে সুন্দর, কাটাকাটা অক্ষরে লেখা—
«লন্ডনের আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সে স্বাগতম, অফিসার লিওন। স্কাই-ব্লু শার্ট আর নেভি-ব্লু টাইতে তোমাকে আজ বড্ড সুদর্শন লাগছে। তবে তোমার ডেস্কে রাখা ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার চেয়ে প্রজেক্টর স্ক্রিনে থাকা ছবিটা কিন্তু বেশি আকর্ষণীয়। আর শিকারী যখন নিজেই শিকারের নজরে থাকে, খেলাটা তখন বেশি জমে, তাই না?»
চিরকুটের নিচে নিখুঁত করে আঁকা একটি ছোট বিষাক্ত সাপের চিহ্ন। হৃদস্পন্দন অজান্তেই কিছুটা বেড়ে গেল তার। চোখ ঘুরে গেল পুরো কেবিনজুড়ে।
না কেউ নেই আশেপাশে। তারপর ধীরে ধীরে দৃষ্টি গিয়ে থামল জানালার দিকে। বাইরে শুধু বৃষ্টির পর্দা আর জমাট অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে পড়লোনা।
সিআইডি অফিসের কড়া নিরাপত্তা পেরিয়ে কেউ তার ব্যক্তিগত কেবিনে ঢুকেছে। শুধু ঢোকেনি, তার ডেস্কে বসে চিরকুট রেখে গেছে। সে আজ কী পরেছে, সেটাও জানে। তার ডেস্কে মায়ার ছবির ফ্রেম আছে সেটাও জানে। এমনকি প্রজেক্টর স্ক্রিনে কী দেখানো হয়েছিল, তাও জানে।
চিরকুটটা আবারও চোখের সামনে তুলল সেই শীতলদৃষ্টির তদন্তকারী পুরুষটা।
‘সুদর্শন।’
এই একটা শব্দ তার মস্তিষ্কে আটকে রইল।
এটা নিছকই কোনো হুমকি নয়। যে লিখেছে, সে শুধু তাকে দেখেনি। বরং সে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে।
দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড চিরকুটের প্রতিটি শব্দ বিশ্লেষণ করল সে। শব্দচয়ন, বাক্যের ভঙ্গি আর লেখার সেই আত্মবিশ্বাসটা সবকিছু মিলিয়ে তার মনে একটাই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
ভাইপার কোনো পুরুষ অপরাধী নয়। ভাইপার একজন নারী অপরাধী।
কফি রঙা চোখজোড়া সরু হয়ে এল দুর্ধষ আইনরক্ষক পুরুষটির।
ঠিক সেই মুহূর্তে—সিআইডি অফিস থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরের একটি বিলাসবহুল টাউন হাউসের অন্ধকার কক্ষে বসে ছিল কেউ একজন।
কক্ষের একমাত্র আলোর উৎস ছিলো একটি বড় কম্পিউটার স্ক্রিন। আর স্ক্রিনে লাইভ দেখা যাচ্ছে সিআইডি অফিসার লিওনের কেবিন।
চিরকুট পড়ার পর আইনরক্ষকের মুখে ফুটে ওঠা প্রতিটি পরিবর্তন অন্ধকারে বসে থাকা মানুষটি গভীর মনোযোগে দেখছিল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল ক্ষীণ হাসি।
মনিটরের নীলচে আলোটা ধীরে ধীরে তার মুখাবয়ব স্পষ্ট করে তুলল। আধুনিক উলফ কাট চুল। এক ভ্রুতে পিয়ার্সিং। চোখের নিচে আর থুতনিতে গভীর কাটা দাগ আছে। বাম হাতের নরম চামড়ায় কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত পেঁচিয়ে আছে কুচকুচে কালো একটি সাপের ট্যাটু।
এই নারীটি আর কেউ নয়—স্বয়ং ভাইপার। সেই দুর্ধষ ক্রিমিনাল ভাইপার।
স্ক্রিনে সেই পরিচিত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে হাত বাড়াল সে। আঙুলের ডগা গিয়ে থামল স্ক্রিনে ভেসে থাকা কফি-রঙা চোখজোড়ার ওপর। কয়েক মুহূর্ত সেদিকেই তাকিয়ে রইল।
তারপর গলা খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কত বছর পর দেখলাম তোমাকে, বলো তো, দিলবার?”
কথাটুকু উচ্চারণ করতেই স্মৃতির দরজাটা খুলে গেল আস্তে আস্তে ।
সাত বছর আগের সেই ক্যাম্পাস লাইফ।
তখন এই অন্ধকার জগতের সম্রাজ্ঞী ফার্স্ট ইয়ারের একেবারে সাধারণ একটি মেয়ে ছিলো। সবসময় চুপচাপ থাকত কারো সাথে কথা বলতোনা। সবার আড়ালে থাকাই ছিল তার একমাত্র অভ্যাস।
আর সেই ক্যাম্পাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনিয়র ছিল এই দুর্ধর্ষ তরুণ সিআইডি অফিসার লিওন যার উপস্থিতিতেই অনায়াসে অসংখ্য নারীর চোখ আটকে যেত তার দিকে।
সেদিন বকুলতলার সেই পরিচিত আড্ডায় একঝাঁক ছেলেমেয়ের মাঝখানে বসে গিটার বাজাচ্ছিল লিওন। তার কণ্ঠস্বর থেকে ভেসে আসছিল সুরেলা গান—
‘মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো? চেনো না...
মেয়ে তুমি কি আকাশ চেনো? চেনো না...
তবে চিনবে কেমন করে এই আমাকে....’
সেই উদাসীন কণ্ঠস্বর আর গিটারের তারে ছড়িয়ে পড়া সুর সেদিন প্রথম মেয়েটার বুকের ভেতর একটা তীব্র ঝড় তুলেছিল। তপ্ত মরুভূমিতে আচমকা এক পশলা বৃষ্টি নামলে যেমন ধুলোমাখা পৃথিবী মুহূর্তে শীতল হয়ে আসে, তার ভেতরটাও ঠিক তেমনি গভীর প্রশান্তিতে ভরে উঠেছিল সেদিন লিওনকে প্রথম দেখায়।
ব্যস।
সেই একটি দিনই তার পুরো জগৎটা ওলটপালট করে দিয়েছিল। সেদিন থেকেই সেই সিনিয়র তরুণ পুরুষটি তার আড়ালে লুকিয়ে রাখা এক তীব্র আসক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এমন এক ভালো লাগা হয়ে উঠেছিলো, যাকে ছোঁয়া যায় না, অথচ মন থেকে মুছেও ফেলা যায় না।
তারপর থেকেই নিঃশব্দে দূর থেকে তাকে অনুসরণ করতে শুরু করেছিল সে। সেই শখের পুরুষের কখন কোন অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, কোন বিষয়ের নোট লাগবে—সবই তার নখদর্পণে থাকত।
অ্যাসাইনমেন্টের ভেতরের সম্পূর্ণ লেখা, এমনকি জটিল আর্টের কাজটুকুও সে নিজেই করে দিত।
ডান ও বাঁ—দুই হাতেই সমান দক্ষতায় লিখতে পারত সে। এই গোপন প্রতিভার কথা কেউ জানত না। লিওন যাতে কোনোদিন হাতের লেখা দেখেও সন্দেহ করতে না পারে, সেজন্য তার অ্যাসাইনমেন্টগুলো সে সবসময় বাঁ হাতে লিখত।
অনেকদিন ধরেই সেই অদৃশ্য মানুষটিকে খুঁজেছিল ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় সেই সিনিয়র। যে অদৃশ্য মানুষটি তার অ্যাসাইনমেন্ট করে দিত। কিন্তু কোনোদিন তার দেখা পায়নি।
আর তাদের প্রথম, একই সঙ্গে শেষ সরাসরি দেখা হওয়ার স্মৃতিটা আজও এই অপরাধীনি মেয়েটার মনে অমলিন হয়ে আছে।
সেদিন ক্যাম্পাসের এক নির্জন করিডোরে কয়েকজন উগ্র সিনিয়র তাকে ঘিরে ধরে র্যাগিং করছিল। ভয়ে আর অপমানে চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল তার।
ঠিক তখনই অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে এক টুকরো আলোর মতো সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সেই কঠোরচেতা তরুণ। এক ধমকে সিনিয়রদের সরিয়ে দিয়ে সে মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারপর মাথায় আলতো করে হাত রেখে নরম গলায় বলেছিল,
“সব ঠিক আছে। ভয় পেও না। এবার ক্লাসে যাও।”
সেদিনের সেই আলতো স্পর্শ, সেই অভয় দেওয়া কণ্ঠস্বর সেটুকুই ছিল তাদের প্রথম মুখোমুখি হওয়া।
আর সেটাই ছিলো শেষ।
কিন্তু এরপরই তার জীবনে নেমে এসেছিল এক প্রলয়ংকরী ঝড়। যে ঝড় তার চেনা পৃথিবীটাকে এক নিমেষে ছারখার করে দিয়েছিল। তারপর পৃথিবীর ওপর থেকে তার সমস্ত বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল।
আইনকে উপেক্ষা করে কীভাবে সে আন্ডারওয়ার্ল্ডের লেডি ডন হয়ে উঠল, কীভাবে নিজের পুরোনো পরিচয় মুছে ‘ভাইপার’ নামটাকে নিজের করে নিল—সেই অন্ধকার ইতিহাস এই পৃথিবীর কেউ জানে না।
ঠিক তখনই অন্ধকার কক্ষের দরজা শব্দ করে খুলে গেল। ভারী বুটের শব্দ তুলে ভেতরে ঢুকল এক দীর্ঘকায়, চওড়া কাঁধের পুরুষ। তার প্রতিটি পদক্ষেপে কক্ষের নীরবতাকে আরও ভারী হয়ে উঠছিল।
আলো জ্বলে উঠতেই মনিটরের সামনে বসে থাকা অন্ধকার জগতের রমণীর মুখ থেকে মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল কোমলতার শেষ ছাপটুকু। কয়েক মুহূর্ত আগেও স্মৃতির আবেশে ডুবে থাকা সেই চোখজোড়ায় ফিরে এল পরিচিত কঠোর শীতলতা।
ভেতরে ঢোকা মানুষটি এই অন্ধকার জগতের অন্যতম বড় মাথা—দানিয়েল।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের একচ্ছত্র সম্রাট দানিয়েল—ভাইপারের বস।
এই মানুষটাই একসময় নিজের হাতে তাকে গড়ে তুলেছিল। তার দক্ষতা, বুদ্ধি আর ভয়ংকর মানসিক দৃঢ়তাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি করেছিল আজকের ভাইপারকে। আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের হাতে তৈরি করা সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবেই সে তাকে দেখে।
অন্ধকার সাম্রাজ্যের সেই অধিপতি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মনিটরের সামনে দাঁড়াল। স্ক্রিনে তখনও লিওনের মুখ ভেসে আছে।
কয়েক মুহূর্ত সেই মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল অন্ধকারের অধিপতি পুরুষটির। গলা খাদে নামিয়ে সে বলল,
“এই নতুন সিআইডি অফিসারটা আমাদের ধরার জন্য বড় বেশি লাফালাফি করছে, ভাইপার। আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সের পাওয়ার পেয়েছে বলে ভাবছে, আমাদের হাতের নাগালে পেয়ে যাবে!”
কথার শেষদিকে তার স্বরে ক্রোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“ওকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া আমার জন্য কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার।”
এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা দুর্ধষ ক্রিমিনাল নারী এবার ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে ভয় নেই, দুর্বলতাও নেই; শুধু স্থির হয়ে আছে সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। দানিয়েলের খুব কাছে এসে থামল। পিয়ার্স করা ভ্রু সামান্য কুঁচকে সরাসরি তাকালো সামনে থাকা অন্ধকারদৃষ্টির পুরুষের চোখের দিকে তারপর শীতল স্বরে বলল,
“লিওনার্দো হায়াসকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবেন না, বস।”
এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল, “ওকে ধরার জাল আমি নিজে বুনেছি।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখে চোখ আটকে রইল। তারপর সেই দুর্ধর্ষ নারীর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ক্ষীণ হাসি।
“ও আমার শিকার।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল নিজের হাতে তৈরি করা এই একরোখা জেদি মেয়েটার দিকে। চোয়ালের রেখা শক্ত হয়ে উঠেছিল তার। কিন্তু পরক্ষণেই সেই কঠোর মুখে ফুটে উঠল ক্রূর হাসি।
ভাইপারের স্বভাব তার অজানা নয়। সে যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাকে সেখান থেকে সরানো সহজ নয়—এটা অন্ধকার সাম্রাজ্যের এই অধিপতি খুব ভালো করেই জানে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার কাঁধে ভারী একটি হাত রাখল সে। গলায় তখন আর আগের সেই রাগ নেই। বরং কথার ভেতর মিশে আছে চাপা সতর্কতা।
“ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো, ভাইপার শিকার যেন শেষমেশ শিকারীকেই গিলে না খায়।”
ভাইপার কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সেই নীরবতাটুকুই হয়ে রইল তার উত্তর।
দানিয়েলও আর কথা বাড়াল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল অন্ধকার করিডোরে।
কক্ষটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল সেই দুর্ধর্ষ নারী। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এসে আবার মনিটরের সামনে দাঁড়াল। স্ক্রিনে তখনও ভেসে আছে সেই চেনা মুখটা আর সেই শান্ত, বুদ্ধিদীপ্ত চোখজোড়া।
মনিটরের নীলচে আলোয় ভাইপারের মুখ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। চোখের নিচে আর থুতনির কাটা দাগগুলো আরও গভীর দেখাল।
ধীরে ধীরে হাত বাড়াল সে। আঙুলের ডগা আবারও গিয়ে থামল স্ক্রিনে ভেসে থাকা সেই কফি-রঙা চোখের ওপর।
কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। এই নারীই কিছুক্ষণ আগে দানিয়েলের সামনে দাঁড়িয়ে লিওনকে নিজের শিকার দাবি করেছে। অথচ এই মুহূর্তে সেই ভয়ংকর ভাইপারের চোখে আবারও ভেসে উঠল অন্য একটা পৃথিবী।
সাত বছর আগের সেই ক্যাম্পাস।
সেই করিডোর। সেই হাতের স্পর্শ। সেই আশ্বাস দেয়া কণ্ঠ। আর সেই মানুষটা—লিওন।
তার ঠোঁট সামান্যতম নড়ল। মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“একদিনও তোমাকে ভুলিনি, বাজপাখি।”
কথাটা বলার সময় তার চোখ দুটো স্থির রইল স্ক্রিনে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল বিষাক্ত হাসি।
“এবার আমি নিজেই আসব তোমার কাছে।”
কিয়ৎক্ষণ থামল সে। চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠল অটল প্রত্যয়।
“তবে সেই আগের মতো কোনো অসহায় মেয়ে হয়ে নয়।”
হাসিটা আরও গভীর হলো রমণীর।
“তোমার চিরশত্রু হয়ে।”
আবারও স্ক্রিনের দিকে সামান্য ঝুঁকে এল সে। লিওনের মুখের দিকে তাকিয়েই নিচু স্বরে বলল,
“দেখি, তোমার আইন আমাকে আটকায়…”
এক মুহূর্ত থামল সেই অন্ধকারের রাণী। তারপর ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসি রেখেই শেষ করল বাক্যাটা,
“নাকি আমার ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত তোমাকে হার মানায় বাজপাখি!”
(চলবে......)