নুসরাত জাহান
রাত তখন প্রায় আড়াইটা। পুরো বাড়িটা ঘুমে নিস্তব্ধ। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন রাতটা নিজের সমস্ত শব্দ গুটিয়ে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও একটা ঘরের আলো তখনও জ্বলছিল।
ঘরের বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে মেহরিমা আনু। সামনে খোলা একটা উপন্যাস। এক হাতে বইটা ধরে অন্য হাত দিয়ে পাতা উল্টাচ্ছে সে। চোখ দুটো ঘুমে ভার হয়ে এলেও বইটা বন্ধ করার কোনো ইচ্ছাই যেন তার নেই। গল্পটা এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে এখন বই বন্ধ করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
আনু বিড়বিড় করে বলল, “আর মাত্র একটা chapter... এই chapter শেষ করেই ঘুমাব।”
কথাটা বলার সময়ই সে জানত, এটা তার নিজের কাছেই বলা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। কারণ এই ‘আর একটা chapter’ কথাটা সে গত এক ঘণ্টায় কমপক্ষে পাঁচবার বলেছে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলল আনু। “আরে! এত রাত হয়ে গেছে!”
কিছুক্ষণ বইটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। তারপর আবার বইয়ের পাতায় চোখ পড়তেই মুখটা কেমন মায়াবী হয়ে গেল।
“কিন্তু এখন তো আসল রহস্যটা খুলবে...”
ব্যস। আবার বইয়ে ডুবে গেল সে।
বাইরে হালকা বাতাসে জানালার পর্দা নড়ছে। দূরে কোথাও একটা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। আর আনু নিজের চারপাশের পৃথিবী ভুলে গল্পের ভেতরে হারিয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত কখন যে বইটা বুকের ওপর রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও জানল না।
সকাল।
জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঘরে ঢুকে পড়েছে অনেক আগেই। আনুর ঘুম অবশ্য তখনও ভাঙেনি।
হঠাৎ দরজায় কয়েকবার টোকা পড়ল।
“আপু?”
কোনো উত্তর নেই।
আবার টোকা।
“আপু, উঠো!”
এবারও কোনো সাড়া নেই।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকল আনুর ছোট বোন মাইশা। বিছানার দিকে তাকিয়ে মাইশা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বইটা এখনও আনুর বুকের ওপর পড়ে আছে।
মাইশা বুঝে গেল সব।
“আবার রাত জেগে বই পড়েছে!”
সে এগিয়ে গিয়ে আনুর কাঁধ নাড়তে লাগল।
“আপু... আপু ওঠো!”
আনু ঘুমের মধ্যেই বিরক্ত হয়ে বলল, “উফ্... পাঁচ মিনিট...”
“পাঁচ মিনিট না! অনেক বেলা হয়ে গেছে!”
“হতে দাও...”
মাইশা এবার চিৎকার করে বলল, “আপু! তোমার কোচিং!”
এক মুহূর্তে আনুর চোখ খুলে গেল।
“কী?!”
সে লাফ দিয়ে উঠে বসল। চোখ কচলাতে কচলাতে দেয়ালে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকাতেই তার মুখের রং বদলে গেল।
“সাড়ে নয়টা?!”
মাইশা হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “হুম।”
“আমাকে আগে ডাকিসনি কেন?!”
“আমি তো কতবার ডাকলাম! তুমি উঠোনি।”
আনু তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল।
“ইশ্! আজকে শেষ!”
মাইশা হেসে বলল, “কাল রাত কয়টা পর্যন্ত বই পড়ছিলে?”
আনু কোনো উত্তর দিল না। কারণ উত্তরটা দিলে নিজের কাছেই লজ্জা লাগবে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো ঘর এলোমেলো করে ফেলল আনু। এক হাতে চিরুনি, অন্য হাতে ওড়না। টেবিলের ওপর বই খুঁজছে, আবার নিজের ফোন খুঁজছে। কখনো বিছানার নিচে তাকাচ্ছে, কখনো বালিশের পাশে।
শেষে মাইশা বলল, “আপু, ফোনটা তোমার হাতেই।”
আনু থেমে নিজের হাতের দিকে তাকাল। তারপর মাইশার দিকে তাকিয়ে বলল, “চুপ।”
মাইশা হেসে উঠল।
“রাত জেগে বই পড়লে এমনই হয়।”
আনু মুখ বাঁকিয়ে বলল, “বেশি কথা বলিস না। তুই এখনো ছোট।”
“আমি ছোট, কিন্তু তুমি বড় হয়েও ঘুমকাতুরে।”
“মাইশা!”
“আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি।”
মাইশা বেরিয়ে যেতেই আনু আয়নার সামনে দাঁড়াল। চোখে ঘুমের ছাপ স্পষ্ট। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে।
নিজের দিকে তাকিয়ে আনু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আজকে কোচিং মিস।”
তারপর একটু থেমে নিজেই হাসল।
“যাক, একটা দিন না গেলে কী হবে!”
কথাটা বললেও ভেতরে ভেতরে সে জানত, তার কোচিংয়ের শিক্ষক এই ব্যাপারে এতটা সহজ হবেন না।
নিচে নাস্তার টেবিলে আনুর আম্মু সালমা আক্তার বসে ছিলেন। আনু সিঁড়ি দিয়ে নামতেই তার আম্মু ঘড়ির দিকে তাকালেন।
“এত দেরি করে উঠলি?”
আনু চুপচাপ চেয়ার টেনে বসে বলল, “আম্মু... একটু ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।”
পাশ থেকে মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “একটু না, অনেক!”
আনু চোখ রাঙিয়ে তাকাল।
“তুই না চুপ করবি?”
সালমা আক্তার হেসে বললেন, “রাতে আবার বই পড়ছিলি?”
আনু এবার আর মিথ্যা বলল না।
“হুম।”
“কত রাত পর্যন্ত?”
আনু নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই... বেশি না।”
মাইশা ফিসফিস করে বলল, “আড়াইটা।”
“মাইশা!”
টেবিলের সবাই হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই আনুর ছোট ভাই আদনান দৌড়ে এসে বলল, “আপু, তুমি আজকে কোচিংয়ে যাওনি?”
“না।”
“কেন?”
“ঘুম।”
আদনান অবাক হয়ে বলল, “ঘুমের জন্য কেউ কোচিং মিস করে?”
আনু ভ্রু কুঁচকে বলল, “তুই চুপচাপ নাস্তা কর।”
আদনান হাসতে হাসতে নাস্তা করতে শুরু করল।
এই ছোট্ট পরিবারটার মধ্যে এমনই ছিল প্রতিদিনের সকাল। ঝগড়া, হাসাহাসি, বকা—সবকিছুর মাঝেও একটা অদ্ভুত উষ্ণতা ছিল।
আনুর আব্বু মাহবুবুর রহমান ব্যাপারী তখন ব্যবসার কাজে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “পড়াশোনার ব্যাপারে কিন্তু অবহেলা করিস না মা।”
আনু মাথা নেড়ে বলল, “না আব্বু।”
তিনি মৃদু হেসে বেরিয়ে গেলেন।
আনু জানত, তার আব্বু খুব কঠোর মানুষ নন। কিন্তু পড়াশোনা আর দায়িত্বের ব্যাপারে তিনি কখনো ছাড় দেন না।
নাস্তা শেষ করে আনু নিজের ঘরে ফিরে এল। ফোনটা হাতে নিতেই একের পর এক notification।
সবচেয়ে ওপরে—
তনু: “মহারানী, আজকে কোচিংয়ে আসবি না?”
তার নিচে—
খুকু: “আনু ফোন ধর। স্যার আজকে খুব রাগে আছে।”
আনু তাড়াতাড়ি তনুকে কল দিল। দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে তনুর গলা—
“অবশেষে মহারানীর ঘুম ভাঙল?”
আনু বলল, “হ্যাঁ রে... ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে।”
“কেন?”
“বই পড়তে পড়তে রাত হয়ে গেছিল।”
খুকুর গলা পাশ থেকে শোনা গেল, “আমি বলেছিলাম না, একদিন এই বইয়ের জন্য তুই বিপদে পড়বি!”
আনু হেসে বলল, “আচ্ছা বাবা, আর হবে না।”
তনু বলল, “শুন, আজকে স্যার একটা নতুন topic শুরু করেছে। তুই miss করলি।”
“তোর খাতা থেকে দেখে নেব।”
“ঠিক আছে। কিন্তু কাল যেন আসিস।”
“আসব।”
কল কেটে আনু কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জানালার বাইরে তাকাল।
সকালটা অদ্ভুত সুন্দর। আকাশ পরিষ্কার। দূরের গাছগুলো বাতাসে দুলছে। পাখির ডাক ভেসে আসছে।
আনুর মনে হলো, আজকের দিনটা হয়তো অন্য দিনের মতোই সাধারণ।
সে জানত না—এই সাধারণ সকালটার পর থেকেই তার জীবনে এমন কিছু ঘটনার শুরু হবে, যেগুলো ধীরে ধীরে তার পরিচিত পৃথিবীটাকেই বদলে দেবে।
কিছু মানুষ তার জীবনে আসবে। কিছু মানুষ হারিয়ে যাবে। কিছু সত্য সামনে আসবে। আর কিছু রহস্য...
যেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাকে নিজের অতীতের এমন কিছু দরজায় পৌঁছাতে হবে, যেগুলো এতদিন বন্ধই ছিল।
আর সেই গল্পের কোথাও—
শহরের অন্য প্রান্তে, নিজের অজান্তেই বসে আছে এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে আনুর পথ একদিন অদ্ভুতভাবে মিলে যাবে।
আবরার মাহমুদ খান।
কিন্তু তাদের দেখা হওয়ার গল্পটা আজ নয়।
আজ শুধু গল্পের প্রথম সকাল।
আর কখনো কখনো...
একটা সাধারণ সকালই হয়ে ওঠে পুরো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুরু।
চলবে.......