#ছদ্মবেশ (পর্ব ৫)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ
"ফুচকা খাবি?"
রিকশা করে কলেজে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে হাইস্কুলটার সামনে একটা ফুচকার ছোট দোকান দেখে রিমিকে প্রশ্ন করলো রুশান। রিমির মন তখন ভিন্ন চিন্তায় ডুবে আছে। কারণ আজ পাঁচ দিন পর কলেজে যাচ্ছে সে। যেই ছেলেগুলোর ভয়ে এত দিন ঘরে বসেছিলো, তাদের সামনে দিয়েই রুশান নিয়ে যাচ্ছে তাকে। মনে একটাই প্রশ্ন, আচ্ছা তারা যদি কোনো ঝামেলা করে? রামিম ভাইয়ার মতো যদি রুশান ভাইয়াকেও মারে?
এসব চিন্তার মাঝে রুশানের এমন ফুচকার অফারে একটু চমকে উঠে রিমি। ভয়ার্ত চেহারায় দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে 'না' সূচক অসম্মতি জানায়। রুশান একটু হেসে রিকশা থামাতে বলে নেমে ফুচকার দোকানটায় চলে গেলো। কারণ সে ভালোই জানে, রিমি ফুচকা, আইসক্রিম, চটপটি, ঝালমুড়ি এইসব ছাইপাশ বেশি পছন্দ করে। আজ হয়তো ভয়ে আছে একটু।
তারপর আর কিছুটা গেলে মোড়ের সেই ছেলেগুলোকে দেখতে পায় রিমি। ভয়ে কাচুমাচু হয়ে মাথা নিচু করে রুশানের গা ঘেঁষে বসে সে। ছেলেগুলো সামনে এসে রুশান রিকশা থেকে নেমে ছেলেগুলোর সামনে দাঁড়ায়।
একটা ছেলে প্রথমে একটু হিরোগিরি দেখালেও রুশান পকেট থেকে বের করে একটা কার্ড তার সামনে ধরলে চুপসে যায় ছেলেটা। হাত দুটি এক করে মাথা নিচু করে রইলো সে। রুশান কার্ডটা পকেটে নিয়ে দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে ছেলেটাকে বলে,
"নিজের হাতে নিজের দুই গালে থাপ্পড় দাও।"
ছেলেটা চুপচাপ নিজের হাত দিয়ে নিজের দুই গালে থাপ্পড়াতে লাগলো। রুশান এবার এক হাতে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
"তো রিমিকে আজ থেকে কিসের নজরে দেখবে শুনি?"
ছেলেটা মাথা নিচু অবস্থায় বললো,
"বোনের নজরে।"
রুশান তৎক্ষণাৎ ছেলেটার গালে কষে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলে,
"কিসের নজরে?"
ছেলেটা সোজা হয়ে বললো,
"জ্বি, মায়ের নজরে দেখবো।"
রুশান আবার দুই হাত পকেটে নিয়ে ছেলেটাকে বলে,
"যাও ওর কাছে গিয়ে বলো, মা আমাকে ক্ষমা করে দেন।"
ছেলেগুলো তাই করলো। রুশান রিকশায় উঠে বলে,
"আর যদি কখনো শুনি যে, ওর দিকে তাকিয়েও কেউ কথা বলছো, তাহলে কি হবে তা মুখে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। কাজের মাঝেই আমার আসল রূপটা দেখতে পাবে।"
বলেই রিকশায় উঠে রিমিকে নিয়ে আবার রওনা দিলো রুশান। রিমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
"ওরা আজ এমন ভীতু হয়ে আছে কেন?"
রুশান একটু হেসে বলে,
"বাঘ যতই ভয়ঙ্কর হোক, একবার শিকারীর ফাঁদে পড়লে তখনই বুঝতে পারে তার দৌড় কতটুকু। যাই হোক, আজ থেকে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবি। ওরা চোখ তুলেও তাকাবে না।"
.
.
ছাদে বসে এক হাতে সিগারেটের টানে ধোঁয়া উড়াচ্ছে তুষার। অন্য হাতে ফোন নিয়ে তাকিয়ে আছে প্রিয় মানুষটার মেসেজের আশায়। ছয় মাস হলো তাদের রিলেশন। সব কিছু ঠিকঠাকই ছিলো। কিন্তু কয়েকদিন ধরে সে খুব ইগনোর করছে তুষারকে।
গতকাল তো সরাসরিই বলে দিলো,
"দয়া করে আমাকে আর মেসেজ দিও না। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমার আশা ছেড়ে দাও। আর নিজের জীবন গুছিয়ে নাও। আমার থেকেও খুব ভালো একটা মেয়ে পাবে তুমি।"
এরকম আরো অনেক সান্ত্বনামূলক মেসেজ। যা পড়ে বার বার চোখের পানি মুছে আবার ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে তুষার। এক বসায় অলরেডি এক প্যাকেট সিগারেট শেষ তার। তবুও বুকের ভেতরটা আরো বেশি জ্বালা পোড়া করছে। মেয়েটা কেন করলো এমন? কেন জীবনে এসে আবার এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে? আমি তো তার সাথে কোনো দিন খারাপ ব্যবহারও করিনি। তাহলে কিসের শাস্তি দিলো এটা?
ভাবতে ভাবতে আবারও চোখের পানি মুছে নিলো তুষার।
,
,
আজ দুই দিন পর সুস্থ হলো নিবিড়। ওদিকে নিরা বার বার ফোন করে বলছে তার সাথে ইমিডিয়েটলি দেখা করতে। নিবিড়ও তাই চলে গেলো নিরার সাথে দেখা করতে। তাই যথা সময়ে চলে গেলো নির্দিষ্ট স্থানে। যেখানে নিরা আগে থেকেই এসে বসে ছিলো।
নিরা রেগে থাকলেও তা নিবিড়কে বুঝতে দিলো না। নিবিড়ের গালে হাত রেখে বললো,
"বাবু, তোমার ২ নাম্বার গার্লফ্রেন্ডের নাম যেন কি?"
নিরার চালাকি বুঝে উঠার আগেই নিবিড় আবেগে বলে ফেলে,
"পাখি..."
চট করে নিরা তার কলার চেপে ধরে বলে,
"তার মানে তোর আরো গার্লফ্রেন্ড আছে? একটা একটা নাম বলবি আজকে।"
নিবিড় নিজের বোকামি বুঝতে পেরে জিহ্বে কামড় কাটলো। তারপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বললো,
"আরে আমার পুরো কথাটা তো শুনবে নাকি।"
নিরা ওভাবে ধরা অবস্থাতেই বললো,
"কি বলবি বল।"
"আগে ছাড়ো, নাহলে বলবো কিভাবে।"
নিরা ছেড়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। নিবিড় আদুরে কণ্ঠে বলে,
"আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসাটাই হলো তুমি। আর পাখি বলতে বুঝিয়েছি তোমাকেই। তুমিই আমার পাখি, তুমিই আমার হাতি, জিরাফ সব। তাই বলে কি আদর করেও তোমাকে কিছু নিজের পছন্দ মতো নামে ডাকলে তুমি রাগ করছো? ঠিক আছে আর কখনো কোনো আদুরে নামে ডাকবো না।"
নিরা এবার অপরাধীর ন্যায় চেয়ে বললো,
"সত্যিই তো তোমার আর কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই?"
"এক কথা কয়বার বলবো? তুমিই আমার সব।"
"পরশু কার সাথে দেখা করতে গিয়ে মার খেয়েছো বলো?"
নিবিড় ভ্রু কুচকে বলে,
"তোমাকে এসব কে বলেছে?"
"যেই বলুক, আমি যেটা বলেছি তার উত্তর দাও।"
"তোমাকে এসব নিলয় বলেছে তাই না?"
"হুম, এখন বলো এটাও মিথ্যা।"
নিবিড় একটু হেসে বলে,
"কি একটা অবস্থা দেখো, বন্ধুদেরকে মজা করে কিছু বললেও বিপদ। পরশু ছিনতাইকারীর হাতে পড়েছিলাম। ওরা আমাকে মেরে আমার টাকা পয়সা সব নিয়ে গেছে। আর ওদেরকে এসব বলিনি কারণ লজ্জার বিষয় এটা। তাই বললাম যে তোমার সাথে দেখা করতে গিয়ে তোমার ভাইয়ের হাতে মার খেয়েছি। আর সে তোমার কাছেই এসে সব বলে দিলো?"
নিবিড়ের এমন ইমোশনে গলে গেলো নিরার মন। নিবিড়ের দিকে চেয়ে বলে,
"বাদ দাও ওসব। যা গেছে মালের উপর দিয়ে গেছে। জানের উপর দিয়ে যায়নি।"
নিবিড় একটু মন খারাপ করে বলে,
"এখন এই মাসের ভাড়া, খাওয়ার খরচ কোথা থেকে দিবো কিছুই বুঝতে পারছি না। এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি যে, না পারছি কাউকে বলতে।"
নিরা এবার পাশ থেকে কিছু টাকা বের করে নিবিড়কে দিয়ে বলে,
"এই নাও, আপাতত এটা দিয়ে চালাও। এর পরও লাগলে বলো, আমি পাঠিয়ে দিবো। তবুও মন খারাপ করো না প্লিজ। তোমাকে বিষণ্ন মনে একদম ভালো লাগে না।"
নিবিড় একটু ঢং করে বলে,
"তোমার থেকে এভাবে টাকা নিবো বিষয়টা একটু লজ্জাজনক।"
নিরা বলে,
"আরে তোমার আমার কি, হ্যা? বলো যে আমাদের।"
আচ্ছা তুমি যখন এত করে অনুরোধ করছো, না কিভাবে করি বলো? হাজার হোক তুমিই তো আমার সব। তবে হ্যা, সব টাকা কিন্তু বিয়ের পর শোধ দিয়ে দিবো। নিরা একটা হাসি টেনে ফোনের দিকে চেয়ে বলে,
"বাড়ি থেকে ফোন দিচ্ছে। আমাকে এখন যেতে হবে।"
নিবিড় বলে,
"চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।"
"না লাগবে না। সামনেই একটা রিকশা ডেকে উঠে যাবো। বাই বাই, ভালো থেকো। আর দয়া করে ফোন দিলে ধরবে।"
বলেই চলে গেলো নিরা। নিবিড় কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে এক গাল হেসে, টাকাগুলো দিয়ে বাতাস করতে থাকে গায়ে। চারদিকে চেয়ে তারপর টাকায় চুমু দিয়ে মানিব্যাগে নিয়ে হাঁটা ধরে সেও। এভাবেই চলে দিনকাল।
.
.
"এ মাসে কয়টা মানুষ সাপ্লাই হয়েছে?"
পায়ের উপর পা তুলে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কথাটা বললো নির্জন। পাশ থেকে একজন ভদ্রলোক স্মার্ট গেটআপ নিয়ে গলার টাইটা একটু নেড়ে চেড়ে বলে,
"স্যার বেশি না। ২১টা মাত্র।"
নির্জন আবারও সিগারেটের টান দিয়ে বলে,
"কালেকশন বাড়াতে হবে। প্রতি মাসে কম করে ৪০-৫০টা মানুষ কালেকশন করতে হবে।"
পাশের লোকটা আবার বলে,
"কি করবো স্যার। খুব সাবধানতার সাথে কাজগুলো করতে হয়। একবার এই ভেতরের খবর বাইরে চলে গেলে সব শেষ। প্ল্যান মাফিক করতে হবে সব।"
নির্জন এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
"প্রয়োজনে দলের সদস্য বাড়াও। সবার অ্যামাউন্ট বাড়িয়ে দাও। তবুও কালেকশন বাড়াতে হবে। তবে হ্যা, ওসব মানুষদেরকে টার্গেট করবে যারা খুবই অসহায়। যেন নিখোঁজ হয়ে গেলেও পরিবারের মানুষরা খুব বেশি তোলপাড় করতে না পারে। তবে প্ল্যানগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে, তাকে নিখোঁজ করা হয়েছে। সবাই জানবে নিখোঁজ হয়েছে, ব্যাস।"
লোকটা মাথা নাড়িয়ে বলে,
"জ্বি স্যার।"
.
.
গভীর রাতে কানে ইয়ারফোন গুঁজে একটা ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে রাজ। এখানে উঠার সময় নিজের প্রয়োজনীয় সবই নিয়ে এসেছে। ল্যাপটপে কাজ করছে আর প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ক্রাইমগুলো সম্পর্কে যতটুকু পারছে তথ্য কালেক্ট করছে। সারা দেশে কে এবং কিভাবে তার জাল ছড়িয়ে রেখেছে। কিভাবে এতগুলো মানুষ হারিয়ে যাওয়ার পরও কোনো প্রমাণ থাকে না। সবকিছু যেন তার কাছে শুধুই দুঃস্বপ্ন। যতবারই সে এই রহস্যের কাছে ঘনাতে চেয়েছে ততবারই যেন দুঃস্বপ্নের মতো ঘুম ভেঙে গিয়ে আবার সেই প্রথম ধাপেই ফিরে চলে আসে। তবে এবার প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নেমেছে সে। সবই বের করবে এবার। গর্ত থেকে টেনে তুলবে সেই বিষধর সাপটাকে। কারণ রাজ খুব কাছ থেকেই শুনেছে অসহায় মানুষদের কান্না।
To be continue........