ফন্ট সাইজ:
থিম:
ছদ্মবেশ

৯ম পর্ব

লেখক: মেহেদী হাসান রিয়াদ

#ছদ্মবেশ (পর্ব ৯)

#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ 
সন্ধ্যার পর নির্জন রাস্তা দিয়ে ছুটছে একটা অ্যাম্বুলেন্স। কিছু দূর যাওয়ার পর রাস্তায় একটা গাছ পড়ে থাকায় ব্রেক চাপলো গাড়ি। সামনে কিছু মানুষ গাছটা কাটছে রাস্তা থেকে সরানোর জন্য।
ড্রাইভার মাথা বের করে সামনে তাকালো। ঝড় নেই তুফান নেই, গাছ পড়লো কোথা থেকে? অ্যাম্বুলেন্স থেকে একজন বেরিয়ে এসে লোকগুলোর কাছে গিয়ে বলে,
 "ভাই কতক্ষণ লাগবে আর?"
ওদের মাঝে একজন গাছটা কাটতে কাটতে বলে,
 "ভাই আর ১০-১৫ মিনিটের মতো লাগবে। একটু অপেক্ষা করুন।"
তখন অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার মাথা বের করে বলে,
 "ভাই গাড়িতে রোগী আছে। ইমার্জেন্সি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। একটু তাড়াতাড়ি করুন।"
পেছন থেকে আরেকটা গাড়ি এসে হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে বলে,
 "অন্ধ নাকি আপনি? দেখছেন সামনে একটু প্রব্লেম হয়েছে। আর এটাও জানেন গাড়িতে রোগী আছে। তাহলে আহাম্মকের মতো হর্ন দিয়ে যাচ্ছেন কেন বার বার?"
রুশান গাড়ি থেকে নেমে বলে,
 "সরি ভাই। আমি জানতাম না বিষয়টা। আই’ম রিয়েলি সরি।"
লোকটা একটা সিগারেট ধরিয়ে আর কিছু না বলে আবার গাড়িতে গিয়ে বসে। রুশান এবার এগিয়ে এসে গাড়ির জানালায় ভর দিয়ে বলে,
 "ভাইয়া সিগারেট যে ধরালেন, তাও আবার গাড়িতে উঠলেন, পেছনে যে রোগী আছে সেই খবর কি ভুলে গেছেন? ধোঁয়ার গন্ধে রোগীর সমস্যাও তো হতে পারে তাই না।"
বলেই একটা হাসি দেয় রুশান। লোকটা তর্ক করলো না। চুপচাপ গাড়ি থেকে নামলো, একটু দূরে গিয়ে সিগারেট শেষ করবে এই উদ্দেশ্যে। রুশান এক হাতে লোকটাকে থামিয়ে বলে,
 "দাঁড়ান, কথা শেষ হয়নি। গাড়ি চেক করবো আমরা।"
লোকটার চোখেমুখে এবার ভয়ের ছাপ ফুটে উঠলো। এবার গাছ কাটার লোকগুলো একটা একটা পিস্তল বের করে ঘিরে ধরলো অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারসহ বাকি দুজনকে। ভেতর থেকে আরেকজনকে বের করলো, মোট চারজন মানুষ তারা। দুজন অ্যাম্বুলেন্স চেক করে ভেতরে দেখে ৭টা ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে ভেতরে। সবাইকে ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে। সবগুলোই স্টুডেন্ট। বয়স ১২ থেকে ১৮-এর মাঝে হবে। এদেরকে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। হয়তো আজকের রাত পার হলে ছেলেগুলোর কোনো হদিসও পাওয়া যেত না।
যেই চারজনকে আটক করেছে তাদের মাঝে একজন সুযোগ পেয়ে দৌড়ে অনেকটা পথ পার হয়ে গেলো। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারলো না। রুশান লোকটার মাথার পেছনে শুট করতেই ছিটকে রাস্তার পাশে জমিনে গিয়ে পড়লো লোকটা। বাকি তিনজনকে গাড়িতে উঠিয়ে নিলো। আর লাশটাকে সরিয়ে নিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক করে চলে গেলো তারা। কয়েকজন অ্যাম্বুলেন্সটা নিয়ে ছুটলো আর রুশান কয়েকজন বাকি তিনজনকে নিয়ে ছুটলো।
রাত তখন ১২টা। অন্ধকার একটা ঘরে একটা লাইটের নিচে লোকগুলোকে বেঁধে সামনে বসে আছে রুশান। রুশানের পাশের লোকটা ঢক ঢক করে ঠান্ডা পানি গিলছে। সারা শরীরে ঘাম তার। এই তিনজনের উপর অলরেডি দুইটা লাঠি ভেঙেছে সে। তবুও লোকগুলোর কিছু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। রুশান অনেকক্ষণ যাবৎ প্রশ্ন করেও কোনো টু শব্দ বের করতে পারেনি।
শেষে রুশান একটু বাকা হেসে বলে,
 "জীবনের মায়া নেই তোদের?"
লোকগুলো এখনো নিশ্চুপ। এর মাঝেই অন্য একটা লোক রুশানের দিকে এগিয়ে এসে মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বলে,
 "স্যার আপনার ফোন।"
রুশান ফোন নিয়ে কিছুটা দূরে চলে যায়। ওপাশ থেকে কেউ বলে,
 "স্যার, ছেলেগুলোর জ্ঞান ফিরেছে। তবে এখনো কিছু বলতে পারছে না ঠিকভাবে।"
রুশান ঠান্ডা মাথায় বলে,
 "ওদেরকে এখন কোনো প্রেশার দেবে না। আগে ভালোভাবে সুস্থ হোক, তারপর কথা বলার চেষ্টা করবে। এটা জানতে হবে যে, ওদেরকে কি কিডন্যাপ করা হয়েছে? নাকি কোনো ফাঁদে ফেলে এমনটা করেছে। ফাঁদে ফেলে এমনটা করে থাকলে কারা ওদের সাথে মিশে ফাঁদে ফেলেছিলো তাদের সম্পর্কে জানা যাবে। মনে রেখো, প্রত্যেকটা তথ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যেই তিনজনের কাছ থেকে কথা বের করার চেষ্টা করছি, মনে হয় না ওদের থেকে কিছু জানতে পারবো। কারণ এর আগেও যতজনকে ধরেছিলাম, কেউই মুখ খোলেনি। সো, তুমি ওদিক থেকে কিছু তথ্য কালেক্ট করার চেষ্টা করো।"
 "ওকে স্যার,,,"
পরদিন কলেজ থেকে ফিরছে রাজ, নিবিড়, নিলয় ও তুষার। এর মাঝে তুষার বলে,
 "চল আজ বাইরে কোথাও খাই।"
সাথে নিলয়ও তাল মিলায়। পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
 "হ্যাঁ দোস্ত, তাই করি চল। ক্ষুধাও লাগছে খুব।"
নিবিড় ফোন টিপতে টিপতে বলে,
 "বুদ্ধিটা যেহেতু তুষারের, তাই তুষারই খাওয়াবে আজ।"
তুষার দাঁড়িয়ে বলে,
 "ভাই বিশ্বাস কর, পকেট একেবারে খালি।"
নিলয় বলে,
 "নিবিড়ের তো ব্যবসা ভালোই চলে। ওর বাবুরাই ওকে চালায়। তাই আজ নিবিড়ই খাওয়াবে।"
নিবিড় কিছুটা দূরে তাকিয়ে তারপর বলে,
 "ওকে ফাইন, আজকে আমিই খাওয়াবো। তবে কোথা থেকে খাওয়াবো, বা কিভাবে খাওয়াবো তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবি না কেউ। তোদেরকে খাওয়ালেই হলো।"
নিলয় বলে,
 "আমাদের তো এত কিছু জানার দরকার নেই। আমরা খেতে পারলেই হলো।"
নিবিড় আবার বলে,
 "ওখানে গিয়ে কিন্তু কেউ কোনো কথা বলতে পারবি না যে, খাব না এখান থেকে চল। একদম চুপ থাকবি সবাই।"
তুষার হেসে বলে,
 "ভাই, আমরা কখনোই খাওয়াকে না বলিনি।"
 "তাহলে আয় আমার সাথে।"
কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে একটা বিয়েবাড়িতে ঢুকে গেলো নিবিড়। বাকিরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেও নিবিড়ের ইশারায় নিরুপায় হয়ে ঢুকে গেলো তারাও। কারণ আশেপাশের মানুষগুলো তাকিয়ে ছিলো তাদের দিকে। নিবিড়ের পেছন পেছন বাড়িতে ঢুকে গেলো তারাও। দেখে বর স্টেজে বসে আছে। আর বউ মনে হয় এখনো ঘরে। নিবিড় পকেটে হাত ঢুকিয়ে বরের পাশে গিয়ে বসে বলে,
 "কেমন আছেন দুলাভাই? আমরা চারজনই কিন্তু সম্পর্কে আপনার শালা হই। আপু মানে যিনি কনে, তার কাজিন হই আমরা।"
বরও একটু চালাক ছিলো। আস্তে করে বলে,
 "কিন্তু আমার বউয়ের তো কোনো কাজিন নেই। আমি যতদূর জানি।"
নিবিড় একটু হেসে বলে,
 "আরে, আপন না, দূরসম্পর্কের কাজিন হই। আচ্ছা থাকেন হ্যাঁ, পরে কথা হবে। বলেই সেখান থেকে উঠে গেলো নিবিড়।"
নিলয় ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
 "ভাই, তুই কি আজ আমাদের সবাইকে মার খাওয়াবি?"
নিবিড় হাত দিয়ে থামিয়ে বলে,
 "চুপচাপ থাক, আর আমি কি করি দেখতে থাক শুধু।"
নিলয় আবার বলে,
 "ভাই আমার ভয় হচ্ছে খুব, বউয়ের কাজিন বলে পরিচয় দিলি, আমরা তো বউকে তাও জানি না। তারচেয়ে ভালো চল, সময় থাকতে কেটে পড়ি।"
 "আরে, আমরা ঢুকে পড়েছি। ভয় পাস না, আমার উপর ভরসা রাখ।"
বলেই ঘরের ভেতরে চলে গেলো নিবিড়। ওখানে একটা মেয়ে তাকে থামিয়ে বলে,
 "আপনাকে তো চিনলাম না। আপনি কোন পক্ষের?"
নিবিড় ভাবলো এটা হয়তো এই বাড়ির মেয়ে, তাই বুক ফুলিয়ে বললো,
 "আমি বরপক্ষের। কনে দেখতে যাচ্ছি।"
মেয়েটা বলে,
 "আমি বরের বোন হই, কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না।"
নিবিড় এবার আমতা আমতা করে বলে,
 "বরের সব বন্ধুদেরকে আপনি চিনেন নাকি আজব।"
বলেই তাকে সরিয়ে হাঁটতে লাগলো। সবাই বরের বন্ধুরা কনে দেখতে এসেছে বলে পথ ফাঁকা করে দিলো। নিবিড় কনের পাশে গিয়ে বলে,
 "কেমন আছেন ভাবি? আমি কিন্তু সম্পর্কে আপনার দেবর হই।"
বউ লজ্জায় কথা না বলে চুপ করে আছে। নিবিড় হেসে বলে,
 "বাহ্ ভাবি তো দেখি খুবই লজ্জাবতী।"
বরপক্ষের সাথে দেখা হলে বলে আমরা কনেপক্ষের। আর কনেপক্ষের কাছে গিয়ে বললো, আমরা বরপক্ষের। এভাবে সবার সাথে পরিচিত হয়ে খাবার টেবিলে বসলো নিবিড়। পাশে বাকি তিনজনও বসলো। পেট পুরে খাওয়া শুরু করলো সবাই। খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়ালো নিবিড়। যাওয়ার সময় কনেপক্ষের একজনের সাথে দেখা হলে নিবিড় বলে,
 "আমরা একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি।"
বলেই চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো তারা। বের হতেই নিলয় বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগলো। তারপর বলে,
 "ভাই আরেকটু হলে আমার জানটা বেরিয়ে যেত। ধরা খেলে আজ একটা মারও মাটিতে পড়তো না।"
নিবিড় হেসে বলে,
 "বললাম না, আমার উপর ভরসা রাখলে কিছু হবে না।"
তখন তুষার বলে,
 "ভাই, নীল জামা পরা মেয়েটা দেখেছিস? মারাত্মক সুন্দরী। আমি তো যাওয়ার পর চোখই সরাতে পারিনি। ইশ, তার সাথে যদি একবার কথা বলতে পারতাম!"
তখনই নিবিড় হেসে দিলো। হাসতে হাসতে নিজের ফোনটা বের করে তাদেরকে দেখিয়ে বলে,
"তোর দেখা সেই সুন্দরী থেকে অলরেডি আমি নাম্বারও নিয়ে ফেলেছি।"
নিলয় মাথায় হাত দিয়ে বলে,
 "ভাই, কেমনে পারিস তুই?"
নিবিড় হেসে হেসে হাঁটা ধরলো। নিলয় পেছন পেছন হেঁটে বলে,
 "ভাই, বল না কিভাবে নাম্বার নিলি? মেয়েটাকে সত্যিই আমারও ভালো লাগছিলো।"
নাম্বার নেওয়ার মুহূর্তটা…
এমনিতেই নিবিড়কে দেখলে অনেক মেয়েই ফিদা হয়ে তাকিয়ে থাকে। ওদের ফ্রেন্ড মহলে সবচেয়ে ড্যাশিং ও স্মার্ট ছেলেটা হলো নিবিড়। যেটা তার মেয়ে পটানোটা অনেকটাই ইজি করে দেয়।
ওখানে যখন তুষার, নিলয় এরা বরের সাথে ছবি তুলছিলো, নিবিড় তাকিয়ে ছিলো ওই মেয়েটার দিকে। মেয়েটাও বারবার নিবিড়ের দিকে তাকাচ্ছিলো। আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তাই নিবিড়ের কনফিডেন্সটা আরো বেড়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর মেয়েটার সামনে গিয়ে বলে,
 "বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত আপু। আপনার ফোনে কি টাকা আছে?"
মেয়েটা একটু ভ্রু কুচকে নিবিড়ের দিকে তাকালে, নিবিড় অসহায় ভঙ্গিতে বলে,
 "আসলে আপু আমার ফোনটা খুঁজে পাচ্ছি না। একটা কল দিয়ে দেখতাম। আমার ফোনটা হারালে অনেক সর্বনাশ হয়ে যাবে আপু। প্লিজ হেল্পটা করুন…"
মেয়েটা এবার নিবিড়ের দিকে একটু ভালোভাবে তাকিয়ে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলে,
 "এত বড় ছেলে, নিজের ফোন সামলে রাখতে পারেন না? এই নিন, তাড়াতাড়ি করুন।"
নিবিড় ফোন পেয়েই নিজের নাম্বারে ফোন দিয়ে দিলো। কিন্তু নিবিড়ের ফোন অন্য কোথাও না, তার পকেটেই বাজতে লাগলো। মেয়েটা এবার রেগে নিজের ফোন কেড়ে নিয়ে বলে,
 "ফাজলামি করেন আমার সাথে?"
নিবিড় এবার পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করতে করতে বলে,
 "আসলে আপু, সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে আপনাকে দেখার পর থেকে। এত সুন্দর ও মায়ার অধিকারিণী আপনি, যা আমার চোখে দ্বিতীয়টা ধরা পড়েনি। তাই নিজেকে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। সত্যিই আপু, আপনার চোখের দিকে তাকালে আমার মতো যে কোনো ছেলেই ওই চোখে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে মুহূর্তেই। যেন ওটা চোখ নয়, এক স্পষ্ট মায়াজাল। আর হ্যাঁ, আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। আপনি এই প্রশংসারই যোগ্য।"
To be continued…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন