#তুমিময়_এক_অদ্ভুত_নেশা
লেখনীতে_ #রুপা
পর্বঃ ৪
••
ভার্সিটি থেকে ফিরে সায়রা আর আরিশা দুজনেই গোসল করে, দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আসরের আজানের পর তাদের ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠে দুজন নামাজ পড়ে নিচে নেমে এল। নিচে নেমেই সায়রা চমকে গেল। তার এই চমকের কারণ হলো তার সেই প্রিয় বিড়ালটি, যা সায়রার ভাইয়া যাওয়ার আগে তাকে এনে দিয়েছিল। সায়রা তার আর ভাইয়ার নামের সাথে মিলিয়ে বিড়ালটার নাম রেখেছিল ‘স্নো’।
আহসান শাহরিয়ার একটি বাস্কেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বাস্কেটের ভেতরে গুটিসুটি মেরে বসে আছে ধবধবে সাদা লম্বা পশমযুক্ত বিড়াল ‘স্নো’। সায়রা দৌড়ে গিয়ে স্নো-কে বাস্কেট থেকে বের করে বুকে জড়িয়ে নিল। স্নো যেন তার পরিচিত বুকের ওম পেয়ে সায়রার গায়ে মাথা ঘষে মিউ মিউ করে উঠল। তা দেখে সায়রা হেসে আরও নিবিড়ভাবে স্নো-কে জড়িয়ে ধরল। তাকে ফিরে পেয়ে সায়রা অত্যন্ত খুশি হয়ে আহসান শাহরিয়ারকে ধন্যবাদ জানাল। সায়রাকে এমন প্রাণোচ্ছলভাবে হাসতে দেখে আহসান শাহরিয়ারও মুচকি হাসলেন। তিনি কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই আরিশা উত্তেজিত হয়ে সায়রার কাছ থেকে বিড়ালটি কেড়ে নিল এবং আদর করতে লাগল। সায়রার বাবা বিড়ালটি আহসান শাহরিয়ারের কাছে পাঠিয়েছেন। গত কয়েকদিনের এত সব ঝামেলার মাঝে সায়রার একদম মনেই ছিল না স্নোর কথা।
– “ফাইনালি স্নো এখন আমাদের সাথে পার্মানেন্টলি থাকবে! সারু চল, স্নোর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে আমাদের।”
– “আরু, থাকার ব্যবস্থা পরে করব। চল, আগে স্নো-কে কিছু খেতে দিই; কখন থেকে না খেয়ে আছে কে জানে!”
সায়রার কথায় সায় দিয়ে আরিশা বলল–
– “হুম, চল। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি কী আছে। এখন আপাতত ঘরোয়া কিছু খাওয়াই, কাল ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় ‘ক্যাট ফুড’ নিয়ে আসব।”
দুজনে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সেখানে শারমিন শাহরিয়ার বিকেলের নাস্তা তৈরি করছিলেন। ওদের দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন কেন এসেছে। দুজনেই জানাল, স্নো-কে খাওয়ানোর জন্য কিছু নিতে এসেছে। শারমিন শাহরিয়ার আরিশার কোলে স্নো-কে দেখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মেয়ে দুটোর আনন্দ দেখে আর কিছু বললেন না। তিনি ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে দিলেন। ওরা খুশি মনে দুধের বোতল আর একটি বাটি নিয়ে স্নো-কে খাওয়াতে বেরিয়ে গেল। ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শারমিন শাহরিয়ারের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সায়রা আর আরিশা ড্রয়িং রুমে বসে স্নো-কে দুধ খেতে দিল। ওরা দুজন সোফায় বসে মুগ্ধ হয়ে তা দেখছিল। ঠিক তখনই সেখানে প্রবেশ করল আরাভ। ড্রয়িং রুমের এই দৃশ্য দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে গটগট পায়ে সামনে এগিয়ে চিৎকার করে উঠল–
– “আম্মু! আম্মু, বাসায় এই বিড়াল কে নিয়ে এসেছে?”
আরাভের চিৎকারে স্নো ভয় পেয়ে দৌড়ে সায়রার কাছে চলে গেল। সায়রা আলতো করে ওকে কোলে তুলে নিল। চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শারমিন শাহরিয়ার। মাকে দেখেই আরাভ আবার বলে উঠল–
– “আম্মু, তুমি জানো বিড়ালের লোমে আমার মারাত্মক অ্যালার্জি, তার ওপর আমি এগুলো একদম সহ্য করতে পারি না! তাও এই বাড়িতে বিড়াল নিয়ে আসলে কেন?”
শারমিন শাহরিয়ার এই বিষয়টারই ভয় পাচ্ছিলেন। আরাভের বিড়ালে অ্যালার্জি আছে জেনেও মেয়ে দুটোর খুশি দেখে তিনি না করতে পারেননি। তিনি চিন্তিত মুখে একবার সায়রা আর আরিশার দিকে তাকালেন। সায়রা স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে আছে, কিন্তু আরিশা ভয়ে সায়রার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। তিনি আরাভের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন–
– “স্নো সায়রার বিড়াল। আমিই ওকে এখানে নিয়ে আসার অনুমতি দিয়েছি।”
মায়ের কথা শুনে আরাভ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার অ্যালার্জি আছে জানা সত্ত্বেও আম্মু এই মেয়েটার জন্য বিড়াল রাখার অনুমতি দিয়েছে! আরাভ নিজের রাগ সামলে নিয়ে মাকে উদ্দেশ্য করে বলল–
– “আম্মু, আমার বিড়ালে সমস্যা হয় জেনেও তুমি কীভাবে পারমিশন দিলে? এই বাড়িতে বিড়াল থাকতে পারবে না। যেখান থেকে নিয়ে এসেছে, সেখানেই ফেরত দিয়ে আসতে বলো।”
আরাভের কথা শুনে এতক্ষণ চুপ করে থাকা সায়রা বলে উঠল–
– “একদম না! আমার স্নো কোথাও যাবে না। আমি যতদিন এই বাড়িতে আছি, আমার স্নো-ও থাকবে। আমি চলে গেলে স্নো আমার সাথেই চলে যাবে।”
– “তা যাবে কখন তুমি আর তোমার সো-কল্ড স্নো?” আরাভ তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল।
– “সেটা তো আপনিই ভালো জানেন!” সায়রা সটান জবাব দিল।
আরাভ পালটা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই শারমিন শাহরিয়ার দুজনকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। তিনি কড়া স্বরে বললেন–
– “আরাভ, তোমার সমস্যা হলে তুমি বিড়াল থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু সায়রা আর তার বিড়াল এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না।”
মায়ের কথা শুনে আরাভ রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে গটগট শব্দে সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে গেল। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শারমিন শাহরিয়ার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সায়রা আর আরিশা স্নো-কে নিয়ে নিজেদের রুমে চলে গেল।
________
বারান্দায় আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাভ। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা, বাইরে হিমশীতল বাতাস বইছে; কিন্তু আরাভের সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে ভার্সিটির কিছু কাজ শেষ করে কফি হাতে বারান্দায় এসেছে সে। কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর কী যেন গভীরভাবে ভাবছে। কফি শেষ করে ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুকে একটি আইডিতে ঢুকল—আইডিটার নাম ‘মায়াপরীর ছায়া’। আরাভের প্রতিদিনের কাজই এটা; যখনই কাজ থেকে একটু অবসর পায়, তখনই ফেসবুকে ঢুকে চেক করে আইডিটি অ্যাক্টিভ হয়েছে কি না। আরাভের প্রতিদিনের কাজ এটা; যখনই কাজ থেকে একটু ফ্রি হয়, তখনই ফেসবুকে ঢুকে চেক করে আইডি অ্যাক্টিভ হয়েছে কি না। কিন্তু প্রতিদিনের মতো আজকেও হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আরাভ।
সে দূর আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে; যে দৃষ্টিতে পাহাড়সমান শূন্যতা। আরাভ বিড়বিড় করে বলল–
– “তুই কোথায় দোস্ত? কোথায় নিয়ে গেছিস আমার মায়াপরীকে? চারটা বছর হতে চলল, আমি এখনো তোদের খোঁজ পাইনি। আমার জানা সবজায়গাতেই খুঁজেছি তোদের!”
আরাভ একটু থেমে আবারও বলল–
– “তুই ঠিক করেই ছিলি যে আমাদের কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে যাবি! তাই তো তুই তোর পরিবার সম্পর্কে সব লুকিয়ে গিয়েছিলি। এই জন্যই তুই কোনোদিন আমাদের তোদের বাসায় নিয়ে যাসনি—যাতে তুই চলে গেলে আমরা তোর খোঁজ না নিতে পারি। পরিবারের কথা উঠলেই এড়িয়ে চলতি; শুধু একটা বিষয়ে সব সময় কথা বলতি, সেটা তোর বোনের ব্যাপারে। মায়াপরীর কথা তোর মুখে এমনভাবে শুনেছি যে, না দেখেই তার মায়ায় ডুবেছি। তুই তো চলে গেছিস তোর বোনকে নিয়ে, কিন্তু তোর বোনের মায়া আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।”
এসব ভাবতে ভাবতে কত সময় পেরিয়ে গেল, তার কোনো হদিস নেই আরাভের। এখন রাত ১০টা বাজে। কিছুক্ষণ আগে আরিশা এসে আরাভকে রাতের খাবারের জন্য ডেকে গেছে। আরাভ নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে খাবার খেতে চলে গেল।”
_______
খাবার টেবিলে বসে রাতের খাবার খাচ্ছে আহসান শাহরিয়ার, আরিশা আর সায়রা। শারমিন শাহরিয়ার সবাইকে পরম মমতায় খাবার পরিবেশন করছেন। এরই মাঝে আরাভ এসে সায়রার ঠিক সামনের চেয়ারটা টেনে বসল। সায়রা একবার চোখ তুলে তাকাল, পরক্ষণেই আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিল। আরাভের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিঃশব্দে নিজের খাওয়া শেষ করে রুমে চলে গেল।
শারমিন শাহরিয়ার ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি খুব করে চান যেন আরাভ সায়রাকে মেনে নেয়। একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে দুজনকেই সমান চেষ্টা করতে হয়, কিন্তু ওদের সম্পর্কে কেউ কারোর জন্য ন্যূনতম ছাড় দিচ্ছে না। শারমিন শাহরিয়ার মনে মনে ঠিক করলেন, তিনি নিজেই এবার ওদের সম্পর্কটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করবেন। আর সেটা করতে হলে সবার আগে সায়রাকে আরাভের রুমে শিফট করতে হবে। দুজন এক রুমে থাকলে অন্তত একে অপরের মুখোমুখি হবে; কথা না বলুক, ঝগড়া তো করবে! আর কথা বা তর্ক যাই হোক না কেন, তাতেই সম্পর্ক সহজ হওয়ার পথ তৈরি হয়। তিনি মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলেন, যেভাবেই হোক ছেলে-বউয়ের এই দূরত্ব তিনি কমিয়ে আনবেন।
••
সময় তার আপন গতিতে চলমান। আজ সায়রা ও আরাভের বিয়ের সাতটি দিন কেটে গেছে। এই সাত দিনে বাহ্যিকভাবে কিছুই বদলায়নি। সায়রা তার নিয়ম মতোই ভার্সিটিতে যাচ্ছে; আরিশা ও মাইশার সাথে দুষ্টুমি আর আড্ডায় তার দিন কেটে যায়। বাড়িতে ফিরলে শ্বশুর-শাশুড়ির অকৃত্রিম আদর, আরিশার সাথে গল্প আর প্রিয় বিড়াল স্নোর সাথে খেলা করেই সময় কাটে তার। রাতে যখন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের কথা মনে করে সায়রা, তখন সে আর একা থাকে না; ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সঙ্গ দেয় আরিশা। এভাবেই কাটছে সায়রার দিনগুলো।
অন্যদিকে আরাভের দিন কাটছে প্রচণ্ড ব্যস্ততায়। সকালে ভার্সিটি, আর ক্লাস শেষ করে সোজা অফিস। আগে অফিসে ফুল-টাইম সময় দিলেও এখন ভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে জয়েন করার পর শুধু বিকেলের শিফটে অফিস যায় সে। অফিস থেকে ফিরে তারও একটাই রুটিন—রাতে নিভৃতে বসে ফেসবুকে ‘মায়াপরীর ছায়া’ আইডিটি চেক করা। আইডিটা আজও অ্যাক্টিভ হলো কি না, তা দেখে হতাশ হওয়া আর নিখোঁজ বন্ধুর ওপর অভিমান করে মনে মনে একরাশ অভিযোগ জমা করাই যেন তার নিয়তি। পাশে বসে সেই কথাগুলো শোনার মতো কেউ নেই তার। এভাবেই কাটছে সবার দিন।
তবে আজ শাহরিয়ার ভিলাতে এক খুশির আমেজ বিরাজ করছে। কারণ, আজ আরাভের নানি দিলোয়ারা বেগম আসছেন। শারমিন শাহরিয়ার নিজেই ওনাকে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন। তিনি জানেন, এই বৃদ্ধা নানিই আসলেই আরাভের রুমে সায়রাকে শিফট করতে পারবেন। শারমিন শাহরিয়ার ওনাকে সবকিছু খুলে বলেছেন, তাই নানিও নাতি-বউয়ের দূরত্ব ঘুচাতে এক মাস থাকার পরিকল্পনা নিয়েই আসছেন।
– “আরাভ, আমি চাই না আমার মা—মানে তোমার নানি—এখানে এসে দেখুক যে তার নাতি আর নাতবউ আলাদা রুমে থাকে। তিনি তোমার বিয়ের খবর শুনেই নাতবউকে দেখতে আসছেন। নানি যতদিন এই বাড়িতে আছেন, ততদিন তোমাকে আর সায়রাকে একই রুমে থাকতে হবে। নানি চলে যাওয়ার পর তোমার যা মন চায় করো।”
আরাভকে নিজের রুমে ডেকে কথাগুলো বললেন শারমিন শাহরিয়ার। মায়ের কথা শুনে আরাভ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। এরপর মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল–
– “আম্মু, যে সম্পর্ক আমি মানি না বা যে সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, লোকদেখানো সেই নাটক করার তো কোনো মানে হয় না!”
আরাভের কথা শুনে শারমিন শাহরিয়ার মোটেও বিচলিত হলেন না। তিনি এবার আরও কড়া স্বরে বললেন–
– “সম্পর্কটা তুমি মানো না কিংবা এর ভবিষ্যৎ নেই, সেটা তুমি আর আমি জানি। বাইরের কেউ তা জানে না, আর আমি সেটা জানাতেও চাই না। তাই যেটা বলছি সেটা শোনো—আমি লিমাকে দিয়ে সায়রার জামাকাপড় তোমার রুমে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার মা এখানে আসার পর আমি কোনো অপ্রীতিকর তামাশা দেখতে চাই না।”
মায়ের কথা শুনে আরাভ এবার বেশ বিরক্ত হলো। সে কিঞ্চিৎ তিক্ত স্বরে বলল–
– “আম্মু, যখন সব তোমার ইচ্ছামতোই হবে, তাহলে আমাকে ডেকে এনে কেন বলছো?”
– “যাতে পরবর্তীতে তুমি কোনো ঝামেলা না করো, সেই সতর্কতা দেওয়ার জন্যই তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।”
আরাভ আর কিছু বলল না; রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। এখন ওই মেয়েটার সাথে রুম শেয়ার করতে হবে—এটা ভাবতেই তার রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে! সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে ধুপধাপ পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শারমিন শাহরিয়ার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনে মনে ভাবলেন–
– “এবার সবকিছু আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে গেলেই হয়।”
________
দিলোয়ারা বেগমের সামনে কাঁচুমাচু হয়ে বসে আছে সায়রা, পাশে আরিশা। নানি আসার পর সায়রা ওনাকে সালাম দিল। বাড়ির সবার সাথে কুশল বিনিময় করার পর থেকেই নানি সায়রাকে ওনার সামনে বসিয়ে রেখেছেন; ওনার নাকি নাতবউকে মন ভরে দেখতে হবে। অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর উনি বললেন–
– “মাশাআল্লাহ! নাতবউ তো একদম পরীর মতো। কী মায়াবী মুখ! এই মুখের দিকে তাকালে আর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দায়।”
নানির কথা শুনে সায়রা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। কিন্তু পরক্ষণেই ওনার কথাটা ভেবে মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল সে। মায়াবী মুখ দিয়ে কী লাভ, যেখানে নিজের স্বামী বাসর রাতেই তাকে অস্বীকার করে? তবে মনের সেই তিক্ততা নানিকে বুঝতে দিল না সে।
দিলোয়ারা বেগম আবারও বললেন–
– “নাতবউ, তুই এসব কী পরে আছিস? নতুন বিয়ে হয়েছে, সবসময় শাড়ি পরে সেজেগুজে থাকবি। তা না করে এসব কী পরে আছিস? শোন নাতবউ, সবসময় পরিপাটি থাকবি আর বরকে নিজের আঁচলে বেঁধে রাখবি।”
সায়রা কিছু বলল না, চুপচাপ সবকিছু শুনল। তার এখন মাথা নিচু করে শোনা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। সায়রা চুপ থাকলেও চুপ থাকল না আরিশা। সে এবার একটু অভিমানী সুরে বলল–
– “নানি! তুমিও আম্মুর মতো সারুকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেছ? এতক্ষণ ধরে আমিও সারুর পাশে বসে আছি, অথচ আমার সাথে একটা কথাও বললে না! শুধু সারুর সাথেই কথা বলছ?”
আরিশার এমন নাটকীয় ভঙ্গি দেখে সায়রা মুখ টিপে হাসতে লাগল। আরিশা সেটা দেখেও দেখল না; সে ভেবেছিল নানি নিশ্চয়ই তাকে এখন 'ভুল হয়ে গেছে' বলে বুকে টেনে নেবেন। কিন্তু আরিশার ভাবনায় জল ঢেলে দিয়ে উনি বলে উঠলেন–
– “তুই একদম আমার নাতবউকে হিংসে করবি না। তোকে ছোটবেলা থেকে আদর করা কি কম হয়েছে? এখন সব আদর আমার নাতবউ পাবে। তুই তোর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তখন ওখানকার সবার সোহাগী হোস।”
কথাটা শোনা মাত্রই আরিশার মুখটা চুপসে গেল। তা দেখে সায়রা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না; সে শব্দ করে হেসে দিল। সাথে দিলোয়ারা বেগমও হাসতে লাগলেন। তাঁদের হাসতে দেখে প্রথমে আরিশা রাগ করে মুখ ফিরিয়ে রাখল, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেও হেসে দিল। হাসতে হাসতে সায়রা এবার আরিশার কাছে আরও চেপে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল–
– “চিন্তা করিস না আরু। বাসায় সবাই তাদের আদর আমাকে ভাগ করে দিলেও, আমার সব আদর শুধু তোর জন্য। সবাই আমাকে আদর করবে আর আমি সেই আদর তোকে পুষিয়ে দেব।”
কথাগুলো শুনে আরিশা সায়রাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল–
– “আই লাভ ইউ সারু! একমাত্র তুই-ই আমাকে ভালোবাসিস, আর কেউ আমাকে ভালোবাসে না।”
সায়রাও আরিশাকে জড়িয়ে ধরল। পাশে বসে দিলোয়ারা বেগম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ওদের দিকে। কে বলবে এরা ননদ-ভাবি? বাইরের মানুষ দেখলে নির্ঘাত বলবে ওরা দুই বোন।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে শারমিন শাহরিয়ারও এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যটি দেখছিলেন। ওনার মনে হলো, সত্যি ওনার দুই মেয়ে। তিনি এবার এগিয়ে এসে তাঁর মাকে গল্প থামিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে নিতে বললেন; ওনার জন্য নিচতলায় রুম রেডি করে রাখা হয়েছে। দিলোয়ারা বেগম ফ্রেশ হতে চলে যেতেই সায়রা পেছন থেকে শারমিন শাহরিয়ারকে জড়িয়ে ধরে বলল–
– “আম্মু, নানুমনি কতদিন থাকবেন? ওনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে! আমি, আরিশা আর নানুমনি মিলে অনেক গল্প করতে পারব।”
শারমিন শাহরিয়ার সায়রার কথা শুনে মুচকি হাসলেন। সায়রার মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন–
– “তোর নানুমনি এবার অনেকদিন থাকবেন রে মা। রোজার ঈদের পরেই যাবেন।”
আরিশা খুশিতে চিৎকার করে উঠল–
– “ইয়াহু! তার মানে নানুমনি পুরো দেড় মাস থাকবেন! সারু, আমরা দেড় মাস ধরে নানুমিনির কাছে কত সুন্দর সুন্দর গল্প শুনতে পারব, একবার ভেবে দেখ!”
আরিশার কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়ল সায়রা। দুই মেয়ের এমন অকৃত্রিম খুশি দেখে শারমিন শাহরিয়ারের মনটাও ভরে গেল। তিনি দুজনকে বসতে বলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন; মায়ের জন্য পছন্দের কিছু খাবার রাঁধতে হবে।
________
রাত এখন এগারোটা। সবাই রাতের খাবার খেয়ে ড্রয়িং রুমে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিল, শুধু সেখানে ছিল না আরাভ। আড্ডা শেষে সবাই যার যার রুমে চলে গেল ঘুমাতে। কিন্তু বিপাকে পড়ল সায়রা। তার শাশুড়ি যাওয়ার আগে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, নানুমনি যতদিন এ বাড়িতে আছেন, সায়রাকে আরাভের রুমেই থাকতে হবে।
সায়রা অনেকক্ষণ ধরেই আরাভের রুমের সামনে পায়চারি করছে। অবশেষে আর বেশি কিছু না ভেবে সে দরজায় টোকা দিল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দিল আরাভ। দরজাটা খোলার সাথে সাথেই সায়রার নাকে এল আরাভের ব্যবহৃত দামী পারফিউম আর কড়া কফির একটা মিশ্র ঘ্রাণ। রুমের ভেতরটা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ, শুধু এসির মৃদু গুঞ্জন সেই নিস্তব্ধতাকে আরও রহস্যময় করে তুলছে।
সায়রাকে দেখে মুহূর্তেই আরাভের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে দরজা ছেড়ে পাশে সরে দাঁড়াল সায়রাকে রুমে প্রবেশ করার সুযোগ দিতে। সায়রা যখন পা বাড়িয়ে ভেতরে ঢুকল, তার মনে হলো সে যেন কোনো এক অদৃশ্য দেয়ালের ভেতর প্রবেশ করল। আরাভ দরজার পাশেই পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সায়রা তার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় আরাভের স্থির দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা অনুভব করতে পারল। সেই চাউনিতে কোনো দয়া নেই, বরং আছে এক ধরণের চ্যালেঞ্জ। রুমের বাতাস যেন ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে; এক ধরণের অজানা অস্বস্তি আর ভয়ের শীতল স্রোত সায়রার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল।
আরাভের এমন আচরণ দেখে অবাক হলো সায়রা। সে মনে মনে বলল–
– “এই ম্যানার্সলেস লোকটা এত সহজে রুম শেয়ার করতে রাজি হয়ে গেল কীভাবে?”
আবার ভাবল, – “যেভাবেই রাজি হোক, আমার কী! এখন নানুমনি যতদিন আছেন, এই লোকটাকে চোখের সামনে সহ্য করতে হবে—এটাই বড় কথা।”
সে আর কিছু না ভেবে রুমে ঢুকে আলমারি থেকে একটা ওভারসাইজ টি-শার্ট, প্লাজো আর ওড়না নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। শারমিন শাহরিয়ার আগেই লিমাকে দিয়ে সায়রার সব কাপড় এই আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছেন। সায়রা ভেতরে যেতেই তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে এক ক্রুর হাসি হাসল আরাভ। তারপর বিড়বিড় করে বলল–
– “তোমার অনেক সাহস, তাই না? এই সাহস কীভাবে ভাঙতে হয়, তা আমি ভালো করেই জানি। ভার্সিটিতে আর বাড়িতে আমাকে অপমান করার ফল তোমাকে আজ বুঝিয়ে দেব আমি!”
চলবে….