#তুমিময়_এক_অদ্ভুত_নেশা
লেখনীতে_ #রুপা
পর্বঃ ৬
••
শাহরিয়ার ভিলা এখন পায়েসের সুগন্ধে ম ম করছে। দিলোয়ারা বেগম নিজেই পায়েস রান্না করছেন। গতকাল রাতে গল্পের ছলে আরিশা বলেছিল, নানুমনির হাতের পায়েস না কি দুনিয়ার সেরা! তখন সায়রা আদুরে গলায় বলেছিল— “নানুমনি, আমাকেও কি কোনোদিন তোমার হাতের সেই স্পেশাল পায়েস খাওয়াবে?” নাতবউয়ের সেই আবদার রাখতেই আজ রান্নাঘরে হাতা হাতে নেমে পড়েছেন তিনি। মনে মনে ভাবছেন, কখন ডাক আসে আর তিনি বাড়ি ফিরে যান তার ঠিক নেই, তাই যাওয়ার আগে মেয়েটাকে তৃপ্তি করে খাইয়ে যেতে চান। শারমিন শাহরিয়ার সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছেন আর নানি বেশ আয়েশ করে রান্নাটা করছেন।
এদিকে শারমিন শাহরিয়ার অস্থির হয়ে ড্রয়িং রুমে পায়চারি করছেন। মেয়ে দুটো এখনো ফিরছে না কেন? ভার্সিটি ছুটি হয়েছে প্রায় দেড় ঘণ্টা হয়ে গেল। আজ বাসার গাড়ি ওদের নিতে যায়নি, তাই দুশ্চিন্তাটা একটু বেশিই হচ্ছে। কোনো বিপদ হলো না তো? কিছুক্ষণ আগে আরাভকে কল করে জেনেছেন ছুটি অনেক আগেই হয়েছে। তবে ওরা কেন দেরি করছে, তা নিয়ে শারমিন বেগমের মনে অজানা এক কু ডাকছে।
– “মা, মেয়ে দুটোর কী হলো বলো তো? এখনো আসছে না কেন?” শারমিন বেগম উদগ্রীব হয়ে মায়ের কাছে জানতে চাইলেন।
দিলোয়ারা বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন। দুশ্চিন্তা ওনার মনেও দানা বাঁধছে, তবে মেয়েকে শান্ত করার জন্য বললেন–
– “শারমিন, অকারণ চিন্তা করিস না। কোথাও হয়তো জ্যামে আটকে গেছে। আজকে তো গাড়িও যায়নি ওদের আনতে, রিকশা বা সিএনজি পেতেও তো দেরি হতে পারে।”
– “কিন্তু মা, আমি আরাভকে ফোন করে বলেছিলাম ওদের সাথে করে নিয়ে আসতে। এখন তো আরাভও ফোন রিসিভ করছে না!”
শারমিন বেগমের গলার স্বর ক্রমশ ভারি হয়ে আসছে। একদিকে আরাভের ফোন না ধরা, আর অন্যদিকে মেয়ে দুটোর দেরি হওয়া—সব মিলিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তা শাহরিয়ার ভিলার আনন্দটুকুকে গিলে ফেলতে চাইছে।
________
স্কয়ার হাসপাতাল (Square Hospital)-এর করিডোরের চেয়ারে পাথরের মতো বসে আছে আরিশা আর মাইশা। ভেতরে ডাক্তারের কেবিনে সায়রাকে নিয়ে গেছে। ওদের কানে এখনো কিছুক্ষণ আগের সেই বিভীষিকাময় শব্দগুলো বাজছে।
রাস্তার অপর পাশ থেকে সায়রার দিকে ধেয়ে আসা যমদূত সমান ট্রাকটি তখন সায়রার একদম কাছাকাছি। আরিশা আর মাইশার ভয়ার্ত চিৎকার যেন বাতাসের শব্দকেও ছাপিয়ে গেল। সায়রা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ট্রাকের হেডলাইটের তীব্র আলোয় তার চোখের মণি স্থির। ঠিক সেই অন্তিম মুহূর্তে, চিতার বেগে একটা সুঠাম দেহ এসে সায়রাকে এক ঝটকায় টেনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। মুহূর্তের মধ্যে দুজনে রাস্তার ওপর দিয়ে ছিটকে গিয়ে ফুটপাতে আছড়ে পড়ল। সায়রা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, ট্রাকটি প্রচণ্ড শব্দে তার ঠিক পাশ কাটিয়ে চলে গেল—এক সেকেন্ডের এদিক-সেদিক হলেই সব শেষ হয়ে যেত!
রাস্তায় আছড়ে পড়ার কারণে সায়রার হাতের চামড়া ছিলে গেছে এবং কপালে কিছুটা কেটে রক্ত ঝরছে। লোকটার হাতও বেশ খানিকটা ছিলে গেছে, কিন্তু সে নিজের ক্ষতের দিকে না তাকিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে সায়রাকে নিয়ে উঠে বসল। এরপর কাঁপানো গলায় ডেকে উঠল–
– “ফুল! এই ফুল, তুই ঠিক আছিস?”
সায়রা ঘোরের মধ্যে অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মস্তিষ্ককে এই পরিচিত কণ্ঠস্বর চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। হঠাৎ কী মনে করে সায়রা লোকটাকে জড়িয়ে ধরে শুধু অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠল–
– “জিরাফ ভাই!”
আর কিছু বলতে পারল না সে, তার আগেই প্রচণ্ড ভয়ে ও ট্রমার চোটে জ্ঞান হারাল সায়রা।
অন্যদিকে, আরাভ ভার্সিটির গেট থেকে গাড়ি বের করে ড্রাইভ করতে করতে জানালার বাইরে আশেপাশে তাকাচ্ছিল। তার মা কল করে জানিয়েছেন আরিশা আর সায়রা এখনো বাসায় পৌঁছায়নি; তাই আরাভ যেন একটু দেখে ওরা আশেপাশে কোথাও আছে কি না। হঠাৎ তার চোখ গেল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিশা আর মাইশার দিকে। ওরা স্তম্ভিত হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। আরাভ তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে দেখল, মাঝরাস্তায় সায়রা অপরিচিত একটা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আছে! দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে আরাভের ভেতরে এক অজানা দহন শুরু হলো।
সায়রাকে নিশ্চুপ দেখে জারিফ অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল–
– “ফুল! খুব বেশি ব্যথা পেয়েছিস? চল, আমি তোকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। তোর কপালে আর হাতে ড্রেসিং করতে হবে।”
সায়রা কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটা যে জ্ঞান হারিয়েছে, তা জারিফ এবার বুঝতে পারল। তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিশা আর মাইশা তখনো বিস্ময়ে সায়রা আর এই অজানা প্রাণরক্ষকর্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারা আর দেরি না করে দৌড়ে সায়রার কাছে গিয়ে বলল–
– “সারু! ঠিক আছিস তো? আমরা তো ভয়ে প্রায় হার্ট অ্যাটাক করে বসতাম! আর একটু হলে কী যে হতো!”
মেয়েলি কণ্ঠে জারিফ চোখ তুলে তাকাল। সে আরিশা আর মাইশাকে লক্ষ্য করে বলল–
– “তোমরা নিশ্চয়ই ফুলের বন্ধু? চলো, ফুলের হাতে আর কপালে কেটে গেছে, এখনই ড্রেসিং করতে হবে; না হলে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে।”
জারিফ সায়রার মুখটা সামনে এনে দেখল মেয়েটা প্রচণ্ড ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। জারিফ আর কালক্ষেপণ না করে সায়রাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল এবং নিজের গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। পেছন ফিরে আরিশা আর মাইশাকে বলল–
– “তোমরা দুজনও আমার সাথে এসো। ফুল জ্ঞান হারিয়েছে, ওকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”
আরিশা আর মাইশা সায়রার অবস্থার কথা ভেবে বিনা বাক্যে জারিফের গাড়িতে গিয়ে বসল। আরিশা পেছনের সিটে সায়রার মাথাটা কোলে নিয়ে বসল আর মাইশা বসল সামনের সিটে। জারিফ অত্যন্ত দ্রুততায় গাড়ি নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হলো।
এদিকে কিছুটা দূরে গাড়িতে বসে থাকা আরাভ যখন দেখল এক অচেনা যুবক সায়রাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, তখন তার শক্ত চোয়াল রাগে আরও কঠোর হয়ে গেল। মুহূর্তেই তার ভেতরের সুপ্ত 'স্বামী সত্তা' জেগে উঠল। লোকটা সায়রাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কেনই বা সায়রা ওভাবে তার বুকে মাথা রেখেছে? আরাভ আর দেরি না করে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে জারিফের গাড়ির পিছু নিল।
________
জারিফের গাড়ি স্কয়ার হাসপাতালের সামনে এসে থামল। সে তড়িঘড়ি করে নেমে সায়রাকে আবারও কোলে তুলে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। জারিফ যখন সায়রাকে কোলে করে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছিল, তখন হাসপাতালের নার্স, ডাক্তার ও কর্মীরা সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের বিস্ময়ের কারণও যথেষ্ট। জারিফ এই হাসপাতালের একজন স্বনামধন্য হার্ট সার্জন। বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে সে এখানে জয়েন করেছে। সবাই তাকে চেনে একজন অত্যন্ত গম্ভীর এবং রাগী ডাক্তার হিসেবে। দুই মাস হলো সে এখানে আছে, কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া কারও সাথে কথা বলে না, বিশেষ করে মেয়েদের থেকে সব সময় দূরত্ব বজায় রেখে চলে। সেই কঠোর মেজাজের ডাক্তার আজ নিজের কোলে একটা মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ছুটছে—এটা সবার কাছেই এক অভাবনীয় দৃশ্য!
জারিফ সবার উৎসুক দৃষ্টি উপেক্ষা করে একটি কেবিনে ঢুকে সায়রাকে বেডে শুইয়ে দিল। তার পেছন পেছন নার্সরা ছুটে আসতেই জারিফ ধমকের সুরে বলল–
– “নার্স! ইমিডিয়েটলি ড্রেসিং করার ব্যবস্থা করুন।”
– “ওকে স্যার।”
নার্স দ্রুত ড্রেসিং করার সরঞ্জাম নিয়ে এসে কাজ শুরু করল। স্যাভলন দিয়ে সায়রার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করার সময় জ্বলে ওঠায় অবচেতন অবস্থায় সায়রা ব্যথায় মুখ কুঁচকে ফেলল। তা দেখে জারিফ নিজেকে সামলাতে না পেরে গর্জে উঠল–
– “ইডিয়ট! একটু সাবধানে করতে পারছেন না? ও ব্যথা পাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছেন না?”
নার্সটি জারিফের এমন উগ্র মেজাজে থতমত খেয়ে ভয়ে ভয়ে বলল–
– “সরি স্যার।”
– “যাও এখান থেকে! তোমাকে আর কিছু করতে হবে না, যা করার আমি নিজেই করছি।”
নার্সটি আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। জারিফ এবার পরম যত্নে সায়রার ক্ষতের ওপর আলতো করে ফুঁ দিতে দিতে ড্রেসিং করতে লাগল, যাতে সায়রা একটুও ব্যথা না পায়।
________
এদিকে বাইরে করিডোরে আরিশা আর মাইশা ভয়ে তটস্থ হয়ে বসে আছে। হঠাৎ আরাভের ডাকে তাদের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল। আরাভ দ্রুত হাসপাতালের ভেতরে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল কিছুটা দূরে আরিশা আর মাইশা বসে আছে, কিন্তু সায়রা নেই। সে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এসে আরিশাকে জিজ্ঞেস করল–
– “আরিশা! তোরা এখানে কেন? সায়রা কোথায়? আর ওই ছেলেটাই বা কে, যে সায়রাকে ওভাবে কোলে করে নিয়ে এসেছে?”
আরাভের চোখেমুখে উদ্বেগের চেয়েও বেশি যেন রাগের আভাস। আরিশা শুরু থেকে সবকিছু খুলে বলল—কীভাবে সায়রা আইসক্রিম আনতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়তে যাচ্ছিল আর ওই লোকটা কীভাবে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সায়রাকে বাঁচিয়েছে। তারপর দ্রুত এখানে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে।
সব শুনে আরাভ আরিশাকে আবারও জিজ্ঞেস করল–
– “ওর আঘাত কি খুব বেশি লেগেছে?”
– “কপালে আর হাতে বেশ খানিকটা কেটে গেছে। তবে ভাইয়া, লোকটা মনে হয় সারুকে (সায়রাকে) আগে থেকেই চেনে। সে সারুকে বারবার 'ফুল' বলে ডাকছিল আর ওর জন্য খুব অস্থির হয়ে পড়েছিল।”
আরিশার কথা শেষ হওয়ার আগেই মাইশা যোগ করল–
– “হ্যাঁ রে! দেখলি না লোকটার নিজের হাতও অনেকটা ছিলে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই; সে শুধু 'ফুল ফুল' বলে অস্থির হচ্ছিল। আর জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে সারুও লোকটাকে কী একটা নামে ডেকে জড়িয়ে ধরেছিল, তারপরই ও সেন্সলেস হয়ে গেল।”
আরিশা আর মাইশার কথাগুলো আরাভের মোটেও পছন্দ হলো না। সায়রাকে অন্য কেউ 'ফুল' বলে ডাকবে বা সায়রা অন্য কাউকে জড়িয়ে ধরবে—এটা ভাবতেই কেন যেন তার একদম ভালো লাগছে না। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আরিশাকে কড়া গলায় বলল–
– “তোদের জন্য আম্মু খুব টেনশন করছেন। আমাকে কল করে বারবার তোদের কথা জানতে চাইছিলো। আম্মুকে একটা কল করে সব জানিয়ে দে। আমি গেলাম।”
আরিশা কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু আরাভ সেসব শোনার প্রয়োজন মনে করল না। একরাশ বিরক্তি আর বুকের ভেতর অজানা দহন নিয়ে সে গটগট পায়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল।
••
সায়রা পিটপিট করে চোখ খুলে দেখল মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। সে এবার আশেপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল এটা হাসপাতালের একটি কেবিন। সায়রা এবার আস্তে আস্তে উঠে বসল। তাকে উঠতে দেখে নার্স এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল–
– “ম্যাম, আপনি কি এখন ঠিক আছেন? আপনার কি কিছু লাগবে?”
– “আমি ঠিক আছি, আমার কিছু লাগবে না।” সায়রা শান্ত গলায় উত্তর দিল।
– “ম্যাম আপনি একটু বসুন, আপনার জ্ঞান ফিরেছে—কথাটা আমি ডাক্তারকে জানিয়ে আসি।”
– “আচ্ছা!”
নার্সটি জারিফকে খবর দিতে চলে গেল। এদিকে সায়রা একাকী ভাবতে লাগল— আসলে কি ওটা 'জিরাফ ভাই' ছিল, নাকি আমি ভুল দেখেছি? আর আমাকে বাঁচালোই বা কে? সায়রার ভাবনার মাঝেই কেবিনে প্রবেশ করল আরিশা আর মাইশা। তারা এসেই সায়রার কাছে গিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল–
– “ঠিক আছিস তো সারু? আর একটু হলে তো আমাদের হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল!”
– “তোরা দুজন কি আসলেই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড?” সায়রা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল।
সায়রার কথা শুনে দুজনে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে একসাথে বলে উঠল–
– “মানে?”
– “মানে হচ্ছে, তোরা বললি—আর একটু হলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল! তার মানে আমি মরলে তারপর তোরা হার্ট অ্যাটাক করতি? আমি যে হাসপাতালে আসলাম, তা কিছুই না! তোরা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে আমার জ্ঞান হারানোর আগেই জ্ঞান হারালি না কেন? এই তোরা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হতেই পারিস না।”
সায়রার কথা শুনে আরিশা আর মাইশা বেশ বুঝতে পারল, সায়রা তাদের সাথে মজা করছে। এই গুরুতর অবস্থায় তার এমন রসিকতা দেখে ওরা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে শোনা গেল একটি পুরুষালি রাশভারী কণ্ঠ–
– “সিরিয়াস সময়ে মজা করার অভ্যাসটা এখনো গেল না তোর?”
পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে তড়াক করে দরজার দিকে তাকাল সায়রা। দেখল গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে জারিফ। তার মানে সায়রা ভুল দেখেনি! সত্যি তার 'জিরাফ ভাই' এখানে এসেছে। কিন্তু সে কখন আমেরিকা থেকে ফিরল? আর ফিরেই বা কেন তাকে জানাল না? সায়রা আর কিছু না ভেবে বিছানা থেকে নেমে একছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল জারিফকে। হঠাৎ সায়রার এমন ঝাপটে ধরায় জারিফ ভারসাম্য রাখতে না পেরে দুই পা পিছিয়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে সায়রাকেও পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল সে।
সায়রাকে ওভাবে ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরতে দেখে আরিশা আর মাইশা অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তারা কিছুক্ষণ আগেই জানতে পেরেছে এই লোকটা এই হাসপাতালের সেরা হার্ট সার্জন। কিন্তু এই গম্ভীর ডাক্তারের সাথে সায়রার এমন কী সম্পর্ক যে সে তাকে জড়িয়ে ধরল? তারা দুজনেই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
– “জিরাফ ভাই! তুমি কখন দেশে এসেছ? আর দেশে এসেছ অথচ আমাকে জানাওনি কেন?” সায়রা একটু অভিমানী স্বরে প্রশ্ন করল।
সায়রার মুখে নিজের নামের এমন বিকৃত রূপ শুনে জারিফ ভ্রু কুঁচকে সায়রাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর সায়রার মাথায় হালকা একটা গাট্টা মেরে বলল–
– “ওটা 'জিরাফ' নয়, জারিফ! এত বড় হয়েছিস অথচ এখনো নামটা শুদ্ধ করে বলতে পারিস না?”
সায়রা নিজের মাথায় হাত ডলা দিতে দিতে মুখ ফুলিয়ে বলল–
– “আমি যত বড়ই হই না কেন, তুমি আমার কাছে সব সময় আমার 'জিরাফ ভাই' হয়েই থাকবে। তোমার যখন বাচ্চা হবে, আমি তাদেরও বলব— তোদের বাবা হচ্ছে আমার জিরাফ ভাই!”
সায়রার এমন পাগলামি মাখা কথা শুনে জারিফ মুচকি হাসল। তারপর সায়রার দুই কাঁধ ধরে আলতো করে আবার বেডে বসিয়ে দিয়ে তার ক্ষতস্থানগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। সায়রা হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই বলে উঠল–
– “আচ্ছা জিরাফ ভাই, তুমি তখন আমার ভার্সিটির সামনে কী করছিলে?”
সায়রার কথা শুনে জারিফ মনে মনে বিড়বিড় করে বলল— ‘ফুল, আমেরিকা থেকে আসার পর সবার আগে তুই কোথায় আছিস সেটা বের করেছি। তোকে আড়াল থেকে আগলে রাখার জন্যই তোর ভার্সিটির কাছে এই হাসপাতালে জয়েন করেছি। প্রতিদিন তোর ছুটির সময় তুই ঠিকমতো বাসায় পৌঁছালি কি না, সেটা দেখার জন্যই ওদিকটায় দাঁড়িয়ে থাকি। এমনকি ওটি (OT) থাকলেও অন্য ডাক্তারকে দিয়ে আমি তোর ভার্সিটির সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আর তুই বলছিস আমি ওখানে কী করছিলাম!’
জারিফ নিজের মনের কথা মনে চেপে রেখেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল–
– “আমি এই হাসপাতালের একজন হার্ট সার্জন। ডিউটি শেষ করে ওদিক দিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখলাম একটা মেয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে আর অপর পাশ থেকে একটা ট্রাক ধেয়ে আসছে। তাই দ্রুত গিয়ে বাঁচালাম। কাছে গিয়ে দেখি ওটা আর কেউ নয়—তুই!’
এতক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা আরিশা এবার আরও বিস্ময় নিয়ে সায়রা আর জারিফের দিকে তাকিয়ে রইল। জারিফ আরিশার চাহনি দেখে সায়রার দিকে ফিরে বলল–
– “ফুল, তুই এখন এখানে চুপচাপ বসে থাক। আমি তোর ওষুধের নিয়মগুলো তোর বান্ধবীকে বুঝিয়ে দিয়ে আসছি।”
জারিফ কেবিন থেকে বের হতে হতে আরিশাকে ইশারায় তার পিছু নিতে বলল। আরিশাও কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে জারিফের পেছনে পেছনে গেল।
হাসপাতালের একদম একটি নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে জারিফ গম্ভীর গলায় আরিশাকে বলল–
– “যে কথাগুলো এখন তোকে বললাম, সেগুলো যেন কোনোভাবেই ফুল জানতে না পারে। যদি ও জানতে পারে, তবে তোকে আস্ত রাখব না আমি!”
আরিশা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল–
– “তুমি আমাকে চিনতে পেরেছিলে, তাই না?”
জারিফ আরিশার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সোজাসুজি উত্তর দিল–
– “হ্যাঁ, আমি তোকে প্রথম দেখাতেই চিনতে পেরেছি। তুই অবশ্য আমাকে চিনতে পারিসনি, আর চেনার কথাও নয়। যা বলেছি সেটা মনে রাখিস—এসব কথা ফুল যেন কোনোভাবেই না জানে। এমনকি বাসার কেউ যেন জানতে না পারে।”
– “আচ্ছা, কেউ জানতে পারবে না। আমি সারুকেও কিছু বলব না। কিন্তু তুমি কি আমাদের বাসায় যাবে না?” আরিশা কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল।
— “নাহ! তবে ওই বাড়ি থেকে আমরা ফুলকেও খুব তাড়াতাড়ি নিয়ে আসব।” জারিফের কণ্ঠে এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ফুটে উঠল।
আরিশা আর জারিফ আরও কিছুক্ষণ প্রয়োজনীয় কথা বলে কেবিনের দিকে ফিরে গেল। সায়রা আর মাইশাকে সব বুঝিয়ে দেওয়ার পর জারিফ তাদের তিনজনকে পৌঁছে দিতে চাইল। কিন্তু মাইশা জানাল তার বাসা কাছেই, তাই তাকে ড্রপ করতে হবে না। জারিফ এবার সায়রা আর আরিশাকে নিয়ে শাহরিয়ার ভিলার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
________
সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ছে। প্রকৃতির চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এক মায়াবী লাল আভা। গোধূলির এই মনোরম দৃশ্যটি দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। এখন ঘড়িতে সময় বিকাল সাড়ে পাঁচটা। কিছুক্ষণ আগেই জারিফ সায়রা আর আরিশাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গেছে। সায়রা অনেক জোর করেছিল যাতে জারিফ ভেতরে ঢুকে শারমিন শাহরিয়ারের সাথে দেখা করে। সায়রা জারিফের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইলেও সে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ভেতরে যায়নি। সায়রাকে অনেক বুঝিয়ে, পরে দেখা করার কথা দিয়ে সে তড়িঘড়ি করে চলে গেছে।
সায়রা ভেতরে ঢুকতেই শারমিন শাহরিয়ার এগিয়ে এসে তাকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিলেন। তাড়াতাড়ি জল খেতে দিয়ে অত্যন্ত অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন–
– “এসব কীভাবে হলো মা? একটু সাবধানে চলাফেরা করবি তো, অন্তত দেখে-শুনে পথ চলবি!”
– “আমি ঠিক আছি আম্মু, আমার খুব বেশি আঘাত লাগেনি।” সায়রা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
সায়রার কথা শুনে শারমিন শাহরিয়ার ধমক দিয়ে বললেন–
– “একদম চুপ! আমি দেখতেই পাচ্ছি কতটা আঘাত লেগেছে। তোমাকে আর সাফাই গাইতে হবে না।”
শাশুড়ির এমন আদুরে ধমক খেয়ে চুপ হয়ে গেল সায়রা। তাদের দুজনের এই অবস্থা দেখে দিলোয়ারা বেগম বলে উঠলেন–
– “হয়েছে রে শারমিন, নাতবউকে আর বকতে হবে না। নাতবউ, তুই যা তো—গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আমি তোর জন্য পায়েস রান্না করেছি।”
নানুমনির মুখে পায়েসের কথা শুনে এবার পাশ থেকে আরিশা ফোড়ন কাটল–
– “নানুমানি! সারু (সায়রা) একবার মুখ থেকে বের করতেই তুমি তার জন্য পায়েস রান্না করে ফেললে? আর আমি বললে তো বলো— ‘পরে রান্না করে খাওয়াব’। এটা তো একদম না-ইনসাফি! আমি এটা মানব না।”
আরিশার কথা শুনে দিলোয়ারা বেগম তার দিকে তাকিয়ে বললেন–
– “তোকে কতবার বলেছি আমার নাতবউকে হিংসে করবি না?”
– “ওহ হো! তোমরাই যে আমার সাথে অবিচার করছ, সেটা আমি বলব না?” আরিশা মুখ বাঁকিয়ে বলল।
শারমিন শাহরিয়ার মা আর মেয়ের এমন খুনসুটিতে এবার বিরক্ত হয়ে বললেন–
– “তোমরা দুজন থামবে? সায়রা সামনে আসতে না আসতেই তোমাদের শুরু হয়ে যায়। চুপ করো তো! দেখছ মেয়েটা অসুস্থ, এই অবস্থায় তাকে বসিয়ে রেখে তোমরা দুজন ঝগড়া করছ?”
শারমিন শাহরিয়ারের ধমক শুনে দুজনেই চুপ হয়ে গেল। আরিশা এবার সায়রাকে ধরে উপরে নিয়ে যেতে লাগল। আরিশা তাকে এমনভাবে জাপটে ধরেছে যে সায়রা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল–
– “আরু, আমার পায়ে তো ব্যথা লাগেনি! তুই এভাবে ধরে ধরে কেন নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে?”
– “চুপ কর! আম্মু দেখছিস না কীভাবে তাকিয়ে আছে?” আরিশা দাঁত চেপে উত্তর দিল।
আরিশার কথা শুনে সায়রা আড়চোখে দেখল—সত্যিই তার শাশুড়ি একদৃষ্টিতে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন। তা দেখে আর দেরি না করে তারা দ্রুত উপরে চলে গেল।
আরিশা আর সায়রা উপরে চলে যেতেই দিলোয়ারা বেগম ড্রয়িং রুমে শারমিন শাহরিয়ারের দিকে ফিরে নীচু স্বরে বললেন–
– “শারমিন, দেখেছিস? নাতবউয়ের মুখটা একদম 'ওর' মতো! এটা কীভাবে সম্ভব? মেয়েটাকে দেখলেই কেন জানি খুব আপন লাগে।”
মায়ের কথার জবাবে শারমিন শাহরিয়ার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন।
________
বারান্দায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরাভ। কিছুক্ষণ আগে সায়রা যখন জারিফকে হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে আসতে চাইছিল, সেই দৃশ্যটা সে ওপর থেকেই দেখেছে। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আরাভের মন এতটাই অশান্ত ছিল যে সে আর অফিসে যায়নি। সায়রা জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে জারিফকে জড়িয়ে ধরেছিল—সেই ছবিটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কেন জানি দৃশ্যটা তার মোটেও ভালো লাগছে না। এক অজানা অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আরাভ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল–
– “আমার এমন কেন লাগছে? সায়রাকে ওই ছেলেটার সাথে দেখে আমি কেন সহ্য করতে পারছি না? ও কি আমার বিবাহিতা স্ত্রী বলে? কিন্তু আমি তো নিজেই বিয়ের রাতে বলেছিলাম আমি এই সম্পর্ক মানি না! তবে আজ কেন এত অস্থির লাগছে? আমি তো নিজেকে কথা দিয়েছি মায়াপরী ফিরে এলেই সায়রাকে ডিভোর্স দিয়ে দেব। তাহলে এখন ও অন্য কাউকে জড়িয়ে ধরলে আমার কী যায় আসে?”
আরাভ নিজের ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠল। পরক্ষণেই আবার বলে উঠল–
– “ডিভোর্স দেব বলেছি, কিন্তু এখনো তো দিইনি! এর মধ্যেই অন্য ছেলেকে জড়িয়ে ধরছে! যদি সত্যি ডিভোর্স দিয়ে দিই, তবে ও কী করবে? ও কি ওই ছেলেটার কাছেই চলে যাবে?”
আরাভ আর কিছুই ভাবতে পারছে না। যত ভাবছে, জটগুলো তত বেশি পাকিয়ে যাচ্ছে। কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে সে অস্থির হয়ে বারান্দা ছেড়ে গটগট পায়ে নিজের রুমে চলে গেলো
চলবে,,,