#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
#পর্ব_১
বাড়ি জুড়ে হৈ হৈ উন্মাদনা। চারিদিকে লাল নীল সবুজ মরিচবাতির সমারোহ। হবে নাই বা কেন! খান বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে পরশু। আজ মেহেদি রাত। বাচ্চারা সবদিকে ছুটাছুটি করছে,,মেয়েরা সাজতে ব্যাস্ত,,মহিলারা নানান কর্মে ব্যাস্ত। খান বাড়ির বড় কর্তা হুমায়ন খানের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে আরিয়ানা সানিয়া আর ছোট মেয়ে মেহেক সাইনা।
আজ আরিয়ানার মেহেদি রাত। মেহেদি আর্টিস্টরা তার দু হাতে মেহেদি পরাচ্ছে নিখুতভাবে। মেহেক সবে ইন্টার শেষ করল। সে হাতে আরো মেহেদির ডালা নিয়ে দৌড়ে আরিয়ানার কাছে আসছে। মেহেক বরাবরই দুরন্তপনায় পটু। এমন কোনো কাজ নাই যে তার দ্বারা হয় না। সবকিছুতেও ভালই দক্ষ।
মেহেক যেই না আসতে নিবে সেই সময় কোথা থেকে উদয় হলো নিলয়। মেহেক দু চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে নিলয়ের পানে। নিলয় হেসে দু গালে হাত রেখে মিষ্টি করে হাসলো।
কিরে কি খবর? এত জোড়ে ছুটছিস কেনো? পড়ে গেলে পা ভাঙবে। তখন কেউ তোর মতন ল্যাংড়াকে বিয়ে করবে??
নিলয়ের কথায় মেহেকের খুশি খুশি মনটা হঠাৎই নিভে গেল।
ভাইয়া! এভাবে বলো না। আপুর কাছেই ছুটছিলাম। আপু ত হাতে মেহেদি নিচ্ছে। বাকিদের ত এখনো দেওয়া হয় নি। তাই যাচ্ছিলাম বাকিদের মেহেদি পরিয়ে দিতে।
খান বাড়ির দুই ছেলে হুমায়ন খান আর নাহিন খান। হুমায়ন খানের দুই মেয়েই। আর নাহিন খানের এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে নিলয় অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার্স করেছে। বোনের বিয়ে তাই পড়ালেখা মাথায় তুলে দেশে এসেছে ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে। নাহিন খানের দুই মেয়ে নিতু আর নুহা। নিতু বিবাহিত। নুহা এবার ক্লাস এইটে পড়ে।
মেহেক নিলয়ের সাথে কথা বলায় এতই ব্যাস্ত যে তার পাশে আরো দুইটা ছেলে এবং একটা মেয়ে আছে সে তাদের দেখছেই না।
হঠাৎ একজনের গম্ভীর আওয়াজে মেহেক না চাইতেও নিলয়ের পিছনে তাকায়। মেহেক হা হয়ে যায়। চোখ গুলো গোল গোল করে শুধু তাকিয়েই থাকে। নিলয়ের পিছনে ২ টা ছেলে আর একটা মেয়ে। দুইটা ছেলেই দেখতে অনেক হ্যান্ডসআম এন্ড কুল৷ কিন্তু নিলয়ের ডান পাশের ছেলেটা যেন একটু বেশিই সুন্দর৷
মেহেক পা থেকে শুরু করে মাথার চুল অব্ধি নজরবন্দি করছে। ছেলেটার চোখ গুলো ধুসর বাদামি। ভাসা ভাসা চোখ। কি ঘন পাপড়ি!! মাথার চুলগুলো বড্ড সিল্কি। কপাল বেয়ে কিছু চুল বাতাসে উড়ছে। পিছন দিকেও চুলগুলো ঘাড় ছুই ছুই। ঠোট যেন গোলাপের পাপড়ি!! এত্ত লাল!! গালে টোল!! ছেলেটা অফ হোয়াইট শার্ট আর কালো জিন্স প্যান্ট সাথে কাধে ব্যাগ নিয়ে এমন গেট আপে দাঁড়িয়ে যেন যে কেউ এক দেখায় দেখলেই বলবে এই ছেলে নিশ্চয়ই কোনো মডেল কিংবা সুপারস্টার।
এখানে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য আমাদের ইনভাইট করেছিস ডুড?
শেষ! মেহেকের সব ভাবনা চুরমার। যে ছেলে এত সুন্দর তার কথা এত কর্কশ কেন? পুরো মুডটাই নষ্ট করে দিল।
নিলয় পিছনে ফিরে আবার সামনে তাকালো মেহেকের উদ্দেশ্যে। মেহেক শূন্যদৃষ্টি নিয়ে নিলয়ের দিকেই তাকিয়ে আছে।
ও হচ্ছে এলিনা,, তারপর শুভ্র আর এ হচ্ছে নিকোলাস অলদ্রিন। মেহেক এবার তাকায় নিকোলাসের দিকে। নিকোলাস তখন থেকেই মেহেকের দিকে তাকিয়ে আছে। তার অভিব্যক্তি বুঝা যাচ্ছে না।
মেহেক হাসি হাসি মুখে তাদের নিয়ে ভেতরে গেল। সবাই এতদিন পর নিলয় কে দেখে আনন্দে আত্নহারা। নিলয়ের বন্ধুরা সব অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে তাদের ভালমতো আপ্যায়ন করা উচিত। সেই ভেবেই সবাই তাদের আপ্যায়ন করতেই ব্যাস্ত।
এত মরিয়া হবেন না। আমরা ঠিক আছি। একটু ফ্রেশ হয়েই আমরা মেহেদি নাইটে যোগ দিচ্ছি।
এলিনা হাসিমুখে কথা গুলো বলেই মেহেককে ডাক নিতে নেয়। তবে মেহেক নেই। হয়ত চলে গেছে। এলিনা নিলয়ের দিকে তাকায়। নিলয় তাদের সবাইকে নিয়ে দুতলা চলে যায়।
খান বাড়ির দুই ভাই একই বাড়িতে থাকে। দু তলা বাড়িটার প্রতিটা রুমে রুমেই আজ মানুষের আনাগোনা বেশি। তাই নিলয় আপাতত তার রুমেই সবাইকে নিয়ে গেল।
নিকোলাস সহ সবাই রেডি হয়ে প্রোগ্রামে আসে। এলিনা আর শুভ্র পিছনে। তারা কাপল। সদ্য বিয়ে হয়েছে। এখনো হানিমুন পিরিয়ড শেষ হচ্ছে না ওদের। এদিকে নিকোলাস তাদের দেখলেই মুখ অন্যত্র ফিরিয়ে নেয়। তার কাছে এসব আদিখ্যেতা ছাড়া আর কিছুই না। নিলয় ডেকোরেশন এর লোকদের সাথে কথা বলছিল৷ হঠাৎ স্টেজে আলো বন্ধ হয়ে গান বেজে উঠে এবং পরপরই আলোকিত হয়ে উঠে স্টেজ। নিকোলাস হঠাৎ আবার আলো আসায় চোখে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। যখন গানের আওয়াজ ভেসে আসে তখন আস্তে আস্তে চোখ খুলে। তার চোখ বিষ্ময়ে গোল গোল হয়ে আছে।
সামনের স্টেজে মেহেক নাচছে তারই কাজিনদের নিয়ে। নাচটা এতটাই পার্ফেক্ট আর প্রাণবন্ত যে নিলয়ও লোকদের সাথে কথা না বলেই স্টেজের দিকে চলে আসলো। নিকোলাসের কাধে কারো হাত অনুভব হতেই পাশে তাকিয়ে দেখে নিলয় হাসিমুখে স্টেজে তাকিয়ে আছে। নিকোলাসের ঠোট কিছুটা প্রশস্ত হয় তবে মুখের অভিব্যক্তিতে তা বুঝা যায় না।
হঠাৎ মেহেকের পিছন থেকে একটা ছেলে এগিয়ে এসে মেহেকের কোমড় জড়িয়ে ধরে। মেহেকও ছেলেটাকে দেখে হাসি হাসি মুখে নাচতে থাকে। ছেলেটা মেহেকের সাথে সুন্দর স্টেপ বাই স্টেপ নেচেই যাচ্ছে।
নিকোলাস পাশ ঘুরে কিছু বলার আগেই নিলয় বলে উঠে - ছেলেটার নাম রায়হান।সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মেহেক এই ছেলেকে পছন্দ করে। আরিয়ানার বিয়ে হয়ে গেলেই রায়হান তার ফ্যামিলি নিয়ে মেহেককে দেখতে আসতে পারে।
মুহুর্তেই নিকোলাসের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তার মুখ অগ্নিমুর্তী ধারণ করে। যদি নিলয় একবার পাশ ফিরে নিকোলাসকে দেখতো তাহলে নিশ্চিত নিলয় দেখা মাত্র সেখানেই ফিট হয়ে পরে যেত ভয়ে।
নিকোলাস আর এক মুহুর্তও সেখানে দাড়ালো না। নিলয় হঠাৎ নিকোলাসের এমন কান্ডে অবাকই হলো। নিকোলাস যাওয়ার সময় শুভ্র নিকোলাসের হাত ধরে। কি হয়েছে জানতে চাইলে নিকোলাস হাত ছাড়িয়ে চোখের ইশারায় মাথা নাড়িয়ে কিছু না বলে বাড়ির ভিতরে চলে যায়।
নিকোলাস নিলয়ের রুমে যেয়ে ফ্যান ছেড়ে বিছানায় বসে পরে। দুই হাত দিয়ে মাথার চুল খামচে ধরে রাখে। আর শব্দহীন অনবরত মুখে কি যেন বিড়বিড় করে বলতে থাকে।
চলবে