শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক আর মুক্তমনাদের জন্য।
বিদ্র - গল্পের নাইকা স্ট্রং পার্সোনালিটির। যারা গল্পে নাইকার ন্যাকামি পছন্দ করেন তাদের জন্য এই গল্প না।
কপি করা সম্পুর্ন নিষেধ।
#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
#পর্ব_১৮
পরদিন সন্ধ্যা। সিডনির সমুদ্রসৈকতে তখন গোধূলির ম্লান আলো। নীল জলরাশির গর্জনের মাঝে নিলয়, রিয়া, শুভ্র আর এলিনা আড্ডায় মেতে ছিল। নিকোলাস কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সিগার ফুঁকছিল, তার তীক্ষ্ণ নজর ছিল মেহেকের ওপর। কিন্তু ভিড়ের মাঝে এক মুহূর্তের জন্য রিয়া মেহেককে ডাক দিতেই নিকোলাসের নজর নড়ে যায়। আর ঠিক সেই সুযোগেই মেহেক ভিড়ের মিশে গিয়ে সবার আড়ালে চলে যায়।
মিনিট দশেক পর যখন নিকোলাস খেয়াল করল মেহেক নেই, মুহূর্তেই তার চেহারায় কালবৈশাখীর মেঘ জমে উঠল। সৈকতের বালুচর থেকে শুরু করে কটেজের অলিগলি সব জায়গায় খোঁজা হলো। নিলয় আর শুভ্র হাপিয়ে উঠে বলল,
- নিকোলাস, ও হয়তো কোথাও ভুল করে চলে গেছে, পুলিশে জানাই?
নিকোলাস কোনো উত্তর দিল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখের মণি আগুনের মতো লাল।
রাত ১২টা বেজে গেল, কিন্তু মেহেকের কোনো চিহ্ন নেই। নিকোলাস আর সহ্য করতে পারল না। সে ঝড়ের বেগে তার রোলস রয়েস কারটা নিয়ে একাই বেরিয়ে পড়ল সিডনির জনমানবহীন হাইওয়ের দিকে।
শহর থেকে অনেকটা দূরে, নির্জন এক রাস্তার মোড়ে আসতেই নিকোলাসের হেডলাইটের আলোয় একটা অবয়ব ফুটে উঠল। কেউ একজন উন্মাদের মতো দৌড়ে আসছে। গাড়িটা আরও একটু এগোতেই দেখল সেটা মেহেক! চুল এলোমেলো, পরণের কাপড়ের কিছু অংশ ছিড়ে গেছে। সে হাত নাড়িয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে।
নিকোলাস টায়ার জ্বালিয়ে ব্রেক কষল। গাড়ি থামতেই মেহেক ছিটকে এসে নিকোলাসকে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে।
মেহেক কাঁপতে কাঁপতে বলতে লাগল,
- আমাকে বাঁচান নিকোলাস! ওরা... ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। প্লিজ আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান!
নিকোলাস তাকে আগলে ধরল। তার শরীরের প্রতিটি শিরা তখন ক্রোধে কাঁপছে। সে শান্ত কিন্তু হিমশীতল স্বরে বলল,
- ভয় পেও না মিস্ট্রেস, আমি এসে গেছি। এখন কেউ তোমার একটা চুলও স্পর্শ করতে পারবে না।
মেহেকের পিছু পিছু অন্ধকার থেকে ৫-৬ জন মাতাল যুবক বেরিয়ে এল। তাদের হাতে মদের বোতল, চোখে কুৎসিত লালসা। তারা নিকোলাসকে লক্ষ্য করে চিৎকার করে বলল,
- ওকে ছেড়ে দাও মি. স্যুট-বুট! ও আমাদের শিকার, আমাদের আনন্দ মাটি করো না।
মেহেক ভয়ে নিকোলাসকে জড়িয়ে ধরল। নিকোলাস তার শক্তিশালী দুই হাত দিয়ে মেহেককে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। মেহেকের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে অত্যন্ত শান্ত আর মায়াবী স্বরে সে বলতে লাগল,
- হুশশশ... একদম ভয় পাবে না জান। তোমার নিকোলাস থাকতে পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাকে ছুঁতে পারবে না। জাস্ট এক মিনিট চোখ বন্ধ করে থাকো, আমি এই আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছি।
মেহেককে সাবধানে গাড়ির ভেতরে বসিয়ে নিকোলাস যখন দরজাটা বন্ধ করল, মুহূর্তেই তার চোখের সেই মায়া উধাও হয়ে গেল। সেখানে জায়গা করে নিল এক পৈশাচিক হিংস্রতা।
নিকোলাস ধীর পায়ে মাতালগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। প্রথম ছেলেটা যখন একটা মদের বোতল নিয়ে তার দিকে তেড়ে এল, নিকোলাস এক হাতে তার কবজিটা ধরে এমনভাবে মোচড় দিল যে হাড়গুলো মটমট করে ভেঙে চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। ছেলেটার আর্তনাদ শেষ হওয়ার আগেই নিকোলাস ভাঙা বোতলের একটা ধারালো টুকরো দিয়ে তার গালের একপাশ থেকে কান পর্যন্ত চিরে ফেলল।
বাকি চারজন ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু নিকোলাস আজ ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। সে যেন এক জ্যান্ত যমদূত। দ্বিতীয় ছেলেটার চুলের মুঠি ধরে সে সজোরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের সাথে আঘাত করতে লাগল। প্রতিবার আঘাতে খুলি ফেটে রক্ত ছিটকে আসছিল নিকোলাসের সাদা শার্টে। নিকোলাস হাসছিল এক ভয়ংকর, শীতল হাসি।
- তোরা জানতি না ও কার সম্পত্তি? নিকোলাস অলদ্রিনের জিনিসে হাত দেওয়ার সাহস তোদের হলো কী করে?
নিকোলাস চেচাল।
তৃতীয় জন পালানোর চেষ্টা করতেই নিকোলাস তাকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর বুট জুতো দিয়ে তার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে পা দিয়ে পিষতে লাগল। পাঁজরের হাড়গুলো ভাঙার মড়মড় শব্দ গাড়ির ভেতর থেকেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। নিকোলাস ঝুঁকে পড়ে ছেলেটার চোখে চোখ রেখে নিচু স্বরে বলল,
- আমার মেহেককে ছুঁতে চেয়েছিলে না? এই হাত দিয়ে?
বলেই সে ছেলেটার হাতটা রাস্তার ওপর রেখে নিজের বুট দিয়ে পিষে থেঁতলে দিল।
মাটিতে তখন রক্ত আর মাংসের দলা মিলেমিশে এক বিভৎস দৃশ্য তৈরি হয়েছে।
একজন যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিল, নিকোলাস তার ওপর কোনো দয়া না দেখিয়ে তার গলার টুঁটি চেপে ধরল যতক্ষণ না তার চোখের মণি উল্টে গেল। মেহেক স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো সাইকো কিলারও বোধহয় এত সূক্ষ্মভাবে আর ঠাণ্ডা মাথায় কাউকে যন্ত্রণা দেয় না।
গাড়ির কাঁচের ওপাশ থেকে মেহেক পাথর হয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। সে নিকোলাসকে ঘৃণা করত, ধ্বংস করতে চেয়েছিল কিন্তু এই মুহূর্তে নিকোলাসের এই দানবীয় রূপ তাকে স্তব্ধ করে দিল। যে নিকোলাস তাকে হুমকি দিয়েছিল, সেই নিকোলাসই আজ তার জন্য খুনি হতেও দ্বিধা করেনি।
সবশেষে নিকোলাস পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল। হাতে লেগে থাকা গরম রক্তগুলো খুব আয়েশ করে মুছল সে। পড়ে থাকা নিথর দেহগুলোর দিকে একবার ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে গাড়ির দিকে ফিরে এল।
গাড়িতে ঢুকে সে আবার সেই শান্ত, প্রেমিক নিকোলাস। মেহেকের ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া গাল দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে সে ফিসফিস করে বলল,
- সব শেষ মিস্টেস। ওরা আর কোনোদিন কাউকে বিরক্ত করার সাহস পাবে না। তুমি খুব ভয় পেয়ে গেছ, তাই না? চলো, এবার তোমাকে খুব যত্ন করে ঘুম পাড়িয়ে দেব।
মেহেক শিউরে উঠল। সে দেখল নিকোলাসের কপালে ছিটকে আসা রক্তের দাগ। যে মানুষটা তার জন্য আজ এই বিভৎসতা ঘটিয়েছে, সে তাকে রক্ষা করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে মেহেক এটাও বুঝে নিল—নিকোলাস অলদ্রিন কোনো সাধারণ মানুষ নয়, সে এক মরণফাঁদ। যার ভালোবাসা আর ঘৃণা, দুটোই সমান ভয়াবহ।
.................
সিডনির সমুদ্রের গর্জন তখন হোটেলের কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়ছে, ঠিক যেমন নিকোলাসের বুকের ভেতর আছড়ে পড়ছিল এক ভয়ংকর উন্মাদনা। ফ্লোরে পড়ে থাকা মেহেকের ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে নিকোলাস অট্টহাসি দিয়ে উঠল, কিন্তু সেই হাসির শেষটা ছিল এক দীর্ঘ আর্তনাদ।
নিকোলাস হাঁটু গেড়ে বসল ফ্লোরে, ওর নখের তীক্ষ্ণ চাপ মেহেকের কাঁধে আরও জেঁকে বসল। চোখের মণি দুটো টকটকে লাল। নিকোলাস ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলল,
- কেন মেহেক? এই নীল আকাশ, এই সমুদ্র, আমার এই বিশাল সাম্রাজ্য সবই তো তোমার পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়েছিলাম। তাও কেন পালাতে চেয়েছিলে? আমার ভালোবাসা কি তোমার কাছে জেলখানা মনে হয়?
মেহেক ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। ওর ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না। ও যে এই দানবীয় ভালোবাসার হাত থেকে মুক্তি চেয়েছিল, সেটা এখন ওর সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিকোলাসের রাগ যেন হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত বিষাদে রূপ নিল। ও মেহেকের কাঁধ ছেড়ে দিয়ে নিজের দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকল। হঠাৎ করেই ওর সারা শরীর কাঁপতে শুরু করল। নিকোলাস অঝোরে কাঁদছে, কিন্তু সেই কান্না কোনো সাধারণ মানুষের মতো নয়, এ যেন এক আহত পশুর গর্জন।
নিকোলাস কান্নার মাঝেই বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
- আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করো। তুমি মুক্তি চাও, তাই না? কিন্তু নিকোলাস অলদ্রিন কোনোদিন হারতে শেখেনি মিস্ট্রেস। শুনো মেয়ে তোমাকে আমি মা*রতেও পারব না, আবার অন্য কারও হতেও দেব না। যদি পালাতে চাও, তবে আমার নিশ্বাসটুকু সাথে করে নিয়ে যেও। কারণ তুমি ছাড়া এই নিকোলাস স্রেফ একটা জীবন্ত লাশ।
হঠাৎ নিকোলাস পাগলের মতো ঘরের কোণায় থাকা দামি ফুলদানিটা আছড়ে ভাঙল। কাঁচের টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সে এক টুকরো কাঁচ হাতে নিয়ে নিজের তালুতে চেপে ধরল। রক্ত চুইয়ে মেঝেতে পড়তে লাগল। মেহেক আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু নিকোলাস সেই রক্তমাখা হাত দিয়েই মেহেকের চিবুক ছুঁয়ে দিল।
নিকোলাস ফিসফিস করে বলল,
- দেখো মিস্ট্রেস, এই রক্তে যতটা বিষ আছে, তার চেয়েও বেশি আছে তোমার জন্য তৃষ্ণা। আজ থেকে এই ঘরটাই তোমার পৃথিবী। পালানোর চেষ্টা করলে নিকোলাস হয়তো ধ্বংস হবে, কিন্তু তার আগে তোমাকে সে নিজের অন্ধকারের সঙ্গী করে নেবে।
মেহেক ঘৃণায় চোখ মুখ খিচে রাখে। তারপর নিকোলাসের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে একছুটে ওয়াশরুমে চলে যায়।
মেহেকের সেই ঘৃণা আর নিকোলাসের উন্মত্ততার মাঝে রাতটা যেন এক বিষণ্ণ চাদরে ঢাকা পড়ে গেল। ওয়াশরুম থেকে ফিরে মেহেক যখন শুয়ে পড়ল।
ওর শরীরটা ভয়ের চোটে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে ছিল। ওদিকে নিকোলাস বেলকনিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে যাচ্ছে। নিকোলাসের মনের ভেতরে যে আগুন জ্বলছিল, সিগারেটের ধোঁয়া কি আর তা মেটাতে পারে?
মাঝরাতে হঠাৎ পরিবেশটা গুমোট হয়ে এল। সিডনির সমুদ্রের নোনা বাতাস আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মাঝে মেহেকের শরীরটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। হয়তো রাতের সেই বিভৎস অভিজ্ঞতা আর মানসিক যন্ত্রণার ধকল সইতে পারেনি ওর কোমল শরীরটা। জ্বরের ঘোরে মেহেক আবোল-তাবোল বকছে আর যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে।
নিকোলাস বেলকনি থেকে ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। মেহেকের অস্ফুট আর্তনাদ তার কানে আসতেই সে যেন নিজের সব রাগ ভুলে গেল। নিকোলাস দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে কাউচের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।
- মিস্ট্রেস? কী হয়েছে তোমার?
নিকোলাসের কণ্ঠে এখন আর সেই জেদ নেই, আছে এক বুক হাহাকার।
মেহেকের কপালে হাত দিতেই নিকোলাস চমকে উঠল। আগুনের মতো গরম গা। সে অস্থির হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সেই রাগী মানুষটা এক কোমল সেবকে পরিণত হলো। সারা রাত নিকোলাস এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করেনি। তোয়ালে ভিজিয়ে বারবার মেহেকের কপালে জলপট্টি দিচ্ছে, ওর গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিচ্ছে। একসময় যে হাত মেহেকের কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরেছিল, সেই হাতই এখন পরম মমতায় মেহেকের কপাল ছুঁয়ে থাকছে।
মেহেক জ্বরের ঘোরে যখনই চোখ মেলছে, দেখছে নিকোলাসকে। নিকোলাসের লাল হয়ে যাওয়া চোখগুলো এখন আর ভীতি ছড়াচ্ছে না, বরং সেখানে ঝরছে অপরিসীম করুণা আর ব্যাকুলতা।
সারা রাত জলপট্টি দিতে দিতে নিকোলাস মাঝেমধ্যে মেহেকের হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে বসে থাকছে, যেন ও প্রার্থনা করছে এই জ্বরটা তার নিজের শরীরে চলে আসুক।
শেষ রাতের দিকে মেহেকের জ্বর কিছুটা কমল।
মেহেক আধো-বোজা চোখে তাকিয়ে দেখল, সিডনির ভোরের আলো নিকোলাসের ক্লান্ত মুখে এসে পড়েছে। নিকোলাস তখন ওর মাথার কাছে বসে পরম নির্ভরতায় ওর চুলে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে।
মেহেক অবাক হয়ে ভাবল, যে মানুষটা কয়েক ঘণ্টা আগে ওকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল, সেই মানুষটাই এখন ওর প্রাণ বাঁচাতে এতটা ব্যাকুল! মেহেকের মনের গহীনে জমে থাকা ঘৃণার বরফটা যেন একটু হলেও গলতে শুরু করল।
মেহেক অপলক দৃষ্টিতে নিকোলাসের দিকে তাকিয়ে রইল। নিকোলাসকে দেখে আজ প্রথমবার ওর মনে হলো, এই মানুষটার ভেতরে এক ভয়ংকর দানব থাকলেও, সেই দানবটা আসলে ওর ভালোবাসার জন্যই কাঙাল। এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর মায়া এসে ভিড় করল মেহেকের মনে, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
ভোরের আলো যখন সিডনির আকাশকে ফিকে করে দিচ্ছে, তখন ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মেহেক জ্বরের ঘোরেই অপলক চেয়ে ছিল নিকোলাসের দিকে। নিকোলাস যখন দেখল মেহেক চোখ মেলেছে, ওর দীর্ঘ রাতের জমে থাকা সব উদ্বেগ যেন বাঁধ ভাঙা কান্নায় রূপ নিল। ও মুহূর্তেই মেহেককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের মাঝে মুখ লুকাল।
একরাশ আবেগ নিয়ে নিকোলাস ফিসফিস করে বলল,
- কেন আমাকে এতটা পাষাণ হতে বাধ্য করো মিস্ট্রেস? তোমাকে কষ্ট দিতে গিয়ে আমি নিজেই যে প্রতি মুহূর্তে শেষ হয়ে যাচ্ছি। তোমার ওই ঘৃণাভরা চোখের চেয়ে আমার মৃত্যুও অনেক ভালো।
মেহেক কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু নিকোলাসের শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এই প্রথম মানুষটার স্পর্শে ভয়ের চেয়ে মায়া বেশি কাজ করছিল।
নিকোলাস পরম মমতায় মেহেককে কাউচ থেকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেল।
- ঘুমাও মিস্ট্রেস, আমি আসছি। কিছু কাজ বাকি পড়ে আছে শেষ করে আসছি।
এইটুকু বলেই কোনো এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল নিকোলাস।
নিকোলাস যখন বাইরে বেরোল, তার চোখের সেই কোমলতা উধাও। সেখানে এখন জ্বলছে প্রতিশোধের দাবানল।
ব্রিসবেনের এক পরিত্যক্ত, স্যাঁতসেঁতে পুরনো বাড়িতে চার-পাঁচটা শরীর দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। এরা তারাই, যারা গতকাল রাতে মেহেকের ওপর হাত দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল।
নিকোলাস যখন সেখানে পৌঁছাল, ওর হাতে তখন ধারালো এক ছু*রি, যা ভোরের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠছে।
নিকোলাস কোনো কথা বলল না। তার নীরবতাই ছিল চরম আতঙ্কের নাম। নিকোলাস তাদের আধমরা দেহগুলো মেঝেতে টেনে হিঁচড়ে মাঝখানে নিয়ে এল। রক্তে মাখামাখি ঘরটাতে তখন শুধু নিকোলাসের বুটের শব্দ আর ওই লোকগুলোর গোঙানি।
শুরু হলো নিকোলাসের নারকীয় বিভৎসতা। সে একে একে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিকোলাস খুব ধীরগতিতে, অত্যন্ত নিপুণভাবে কাজটা করছিল। ও একবার ছুরি চালায় আর বলে,
- এই হাত দিয়ে ছুঁয়েছিলি ওকে? না কি এই চোখ দিয়ে তাকিয়েছিলি?
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল নিকোলাস। মাংস কা*টার মতো করে সে একেকজনের শরীরের অংশ আলাদা করতে লাগল। ঘরের দেয়ালে ছিটকে আসা তাজা র*ক্তে নিকোলাসের সাদা শার্টটা ভিজে সজারু হয়ে গেল, কিন্তু ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। যন্ত্রণায় লোকগুলো চিৎকার করতে চাইলেও নিকোলাস তাদের সেই সুযোগটুকুও দিচ্ছিল না। তার ভেতরকার হিংস্র পশুটা আজ পুরোপুরি উন্মত্ত।
প্রতিটি কো*প দেওয়ার সময় নিকোলাসের মনে পড়ছিল মেহেকের সেই ফ্যাকাশে মুখ আর কান্নার শব্দ। যে হাত মেহেককে ছুঁতে চেয়েছিল, সেই হাতগুলো সে আজ টু*করো টু*করো করে মাটিতে ছড়িয়ে দিল। সারারাত যে মানুষটা দেবদূতের মতো মেহেকের সেবা করেছিল, ভোরের আলোতে সেই মানুষটাই এখন এক পিশাচের রূপ ধারণ করে নিজের ক্রোধ আর ভালোবাসার চরম মূল্য আদায় করে নিল।
কাজ শেষ করে নিকোলাস রক্তমাখা ছু*রিখানা মাটিতে ফেলে দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখটা মুছল। তার চোখেমুখে এখন এক পৈশাচিক তৃপ্তি। ভালোবাসার মানুষকে রক্ষা করার জন্য নিকোলাস যেমন নিংড়ে দিতে পারে মমতা, ঠিক তেমনি তার অসম্মানকারীদের জন্য সে হয়ে উঠতে পারে সাক্ষাৎ নরক।
চলবে,,,