এইটা কোনো উপন্যাস নয়। সাধারণ একটা ফিকশনাল গল্প। যারা গল্পে নাইকার ন্যাকামি পছন্দ করেন তাদের জন্য এই গল্প না।
সাইকো রোমান্টিক থ্রিলার জনরা।
#হিয়া_জ্বলে_পিয়ার_দরদে
#নুসরাত_জাহান_ইভা
#পর্ব_২৪
পরদিন সকালে সূর্যের আলো যখন ব্রিসবেনের সেই বিলাসবহুল বেডরুমের ভারী পর্দা ভেদ করে ভেতরে এলো, নিকোলাসের ঘুম ভাঙলো এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে। তার পাশে মেহেক নেই, কিন্তু বালিশে তার গায়ের সেই পরিচিত সুবাস লেগে আছে।
মেহেক তখন নিচে বাগানে দাঁড়িয়ে। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি। মেহেক একদৃষ্টিতে দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। রাতে জেগে জেগে ভাবা সেই পুরনো স্মৃতিগুলো এখন তার মনের ভেতর পাথর হয়ে জমে গেছে। নিকোলাস পেছন থেকে এসে মেহেককে জড়িয়ে ধরলো, তার চিবুক মেহেকের কাঁধে রেখে খুব নরম গলায় বললো
- আজকের সকালটা এতো সুন্দর কেন জানো? কারণ কাল রাতে তুমি আমার পাশে ছিলে। তোমার মায়াবী মুখ,,চুল,, চোখ সবকিছুই যেন তোমাকে আমার কাছে আরও দামী করে তুলছে মিস্ট্রেস। আমি ঠিক করেছি, আজ সারাদিন আমি কোথাও যাবো না। শুধু আমরা দুজন থাকবো। একান্ত সময় কাটাবো।
মেহেক নিজের ভেতরে জমে থাকা ঘৃণাটাকে এক নিমিষে আড়াল করে ফেললো। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিকোলাসের চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিতে দিতে মায়াবী হাসি দিল।
- সারাদিন একসাথে থাকলে তো খুব ভালো হতো নিক। কিন্তু আজ যে আমার ভার্সিটি আছে!! ক্লাস হলেও মানা যেত কিন্তু আজ একটা এক্সাম আছে । কিছু করার নেই তুমি বরং আজ বাড়িতে বিশ্রাম নাও আমি দুপুরের মধ্যেই চলে আসব। যাও আরেকটু ঘুমাও ত এখন তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
নিকোলাস প্রথমে একটু অমত করতে চাইলেও মেহেকের ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারলো না। নিকোলাস মেহেকের কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে বললো,
- চলো আমি দিয়ে আসি তোমায়।
মেহেক চোখ ছোট ছোট করে তাকালে নিকোলাস মুচকি হেসে রুমে যাওয়া ধরে।
.........
ঘণ্টাখানেক পর মেহেক রায়হানের মুখোমুখি দাঁড়ালো। রায়হান আজ অনেক বেশি অস্থির। মেহেককে দেখেই সে এগিয়ে এসে বললো,
- কাল রাতটা কেমন কাটলো? নিকোলাস কি তোমাকে কোনো সন্দেহ করেছে?
মেহেক শান্ত গলায় উত্তর দিল,
- না। নিক যে আমায় বড্ড ভালবাসে রায়হান!! ছেলেটা যে বড্ড বিশ্বাস করে আমায়!!আচ্ছা এসব বাদ। রায়হান, আমাদের হাতে সময় কম। নিকোলাসের পরবর্তী ডিলটা কবে আর কোথায় হবে, সেটা কি তুমি বের করতে পেরেছ?
রায়হান তার ফোন থেকে একটা ম্যাপ বের করে দেখালো। রায়হানের চোখে একাধারে ঘৃণা আর মেহেকের জন্য তীব্র অধিকারবোধ লক্ষ্য করছে মেহেক।
- আগামী সপ্তাহে সিডনির একটা পোর্টে ওর সবচেয়ে বড় শিপমেন্ট আসছে। ওটা যদি পুলিশ দিয়ে রেইড করানো যায়, আই থিংক নিকোলাস পুরোপুরি পথে বসে যাবে। কিন্তু মেহেক,
রায়হান চুপ হয়ে গেল। মেহেক ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকালো।
- কিন্তু কি??
- তুমি কি পারবে নিকোলাসের ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডটা জোগাড় করতে? ওখানেই সব তথ্য আছে।
মেহেক রায়হানের চোখে চোখ রেখে শক্ত গলায় বললো
- আমি সব পারবো রায়হান। তুমি শুধু মনে রেখো, নিকোলাস যেন কোনোভাবেই তোমার অস্তিত্ব টের না পায়।
রায়হান মেহেকের হাতটা শক্ত করে ধরে আবেগি গলায় বললো,
- আমি জানি তুমি এটা করতে পারবে। শুধু মনে রেখো, এই কাজ শেষ হলে তুমি কিন্তু আমার হবে। আমি তোমাকে এই নরক থেকে বের করে নিয়ে যাবো।
মেহেক আলতো করে হাতটা সরিয়ে নিল। তার মনে তখন অন্য হিসেব। মেহেক এখন আর কারোরই হতে চায় না। না নিকোলাসের, না রায়হানের। মেহেক ত কেবল চায় ধ্বংস দেখতে।
দুপুরে মেহেক বাড়িতে ফিরলো, তার হাতে ছিল নিকোলাসের পছন্দের ওয়াইন। কিন্তু তার মনের ভেতরে ছিল সেই গোপন ম্যাপ আর পাসওয়ার্ড চুরির কথা। বাড়িতে ঢুকতেই দেখলো নিকোলাস বারান্দায় বসে তার জন্যই অপেক্ষা করছে। মেহেক যেয়ে বসলো নিকোলাসের সামনে।
সন্ধ্যায় স্টাডি রুমের আবছা আলোয় নিকোলাস তখন তার ল্যাপটপের নীল স্ক্রিনে ডুবে ছিল। মেহেক খুব নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল। তার হাতে থাকা ওয়াইনের গ্লাসটি টেবিলের এক কোণে রেখে মেহেক নিকোলাসের চেয়ারের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। দুহাতে নিকোলাসের গলা জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ে আলতো করে মুখ ঘষলো মেহেক।
নিকোলাস এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে মেহেকের হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে টেনে নিল। মেহেক অভিমানে মুখ ফুলালো।
- এই স্ক্রিনটার দিকে তুমি যেভাবে তাকিয়ে থাকো নিক সেভাবে যদি আমার দিকে তাকাতে নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবতে পারতাম আজ। উফ আমার খুব হিংসে হচ্ছে।
নিকোলাস ল্যাপটপটা অর্ধেক নামিয়ে দিয়ে চেয়ার ঘুরিয়ে মেহেকের মুখোমুখি হলো। তারপর মেহেকের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিকোলাসের গলায় তখন নেশার চেয়েও গাঢ় এক আবেগ।
- ভুল বলছো মিস্ট্রেস। এই পৃথিবীতে, এমনকি এই মহাবিশ্বে তোমার ঊর্ধ্বে আমার কাছে আর কিছুই নেই। তুমি যদি আজ বলো এই পুরো আমি টাকেই শেষ করে ফেলতে আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা করব না। আমার জান তোমার পায়ের কাছে এনে ফেলব । তুমি চাইলে তোমার সামনে এই নিকোলাস মাথা নত করতেও রাজি, কারণ আমার এই পাথুরে হৃদয়ে শুধু তোমারই রাজত্ব।
মেহেক মনে মনে শিউরে উঠল। লোকটা কতোটা ভয়ংকর হতে পারে যে অবলীলায় মাথা নত করার কথা বলছে! মেহেক মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
- মুখে বলা সহজ নিক, কিন্তু কাজে? এই যে তোমার এতো গোপন কোড, এতো পাসওয়ার্ড এগুলো কি আমাকে বিশ্বাস করে বলতে পারো?
নিকোলাস একটু হাসল। তারপর মেহেককে নিজের কোলের কাছে টেনে নিয়ে কিবোর্ডের দিকে হাত বাড়াল। নিকোলাস মেহেকের চোখের দিকে তাকিয়েই আঙুলগুলো দ্রুত চালিয়ে পাসওয়ার্ডটা টাইপ করল।
'M-E-H-E-K-D-I-E-0-0-7'
পাসওয়ার্ডটা দেখে মেহেকের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
মেহেক মনে মনে ভাবল - মেহেক ডাই? অর্থাৎ ও চায় আমি ওর ভালোবাসায় মরে যাই, নাকি ও আমাকে মেরে ফেলতে চায়?'
তবুও পাসওয়ার্ডটা স্ক্রিনে ফুটে উঠতেই মেহেক সেটা নিজের মস্তিষ্কের কোষে গেঁথে নিল। নিকোলাস এবার ল্যাপটপটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে মেহেকের কোমরে হাত রাখল।
- আজ থেকে এই ল্যাপটপ বা এই ঘর কোনো কিছুই তোমার জন্য নিষিদ্ধ নয়। আমি চাই তুমি জানো, এই নিকোলাস বাইরে যতোই পাথুরে হোক না কেন, তোমার কাছে সে শুধুই এক আজন্ম তৃষ্ণার্ত প্রেমিক। তুমিই আমার মুক্তি, জান।
মেহেক নিকোলাসের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজল। মেহেক অনুভব করতে পারল নিকোলাসের হৃদস্পন্দন যা এখন শুধু তার জন্যই দ্রুত চলছে।
মেহেক মনে মনে বলল - তুমি ঠিকই বলেছো নিক, তুমি আমার সামনে মাথা নত করেছো। আর এটাই তোমার সবচেয়ে বড় ভুল। আজ যে চাবিকাঠি তুমি আমার হাতে তুলে দিলে, তা দিয়ে আমি তোমার ধ্বংসের দরজাটা খুলবো।
..........
রাত প্রায় ১ টা
নিকোলাস যখন মেহেক কে কোলে তুলে নিয়ে বেডরুমের দিকে এগোতে লাগল, মেহেক নিকোলাসের গলার মালায় মুখ লুকিয়ে এক নারকীয় তৃপ্তির হাসি হাসল।
....…......….....…...…
পরদিন সকালেই মেহেক সুযোগ বুঝে রায়হানকে পাসওয়ার্ডটি মেসেজ করে দিল। পাসওয়ার্ড পেয়ে রায়হান যেন হাতে স্বর্গ পেল।
এবার নিকোলাসের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
নিকোলাস একজন জাত অপরাধী, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সবসময় সজাগ থাকে। সকালে মেহেকের চোখে এক অদ্ভুত বিজয়ের ঝিলিক আর একটু বেশি চঞ্চলতা নিকোলাসের মস্তিষ্কের কোনো এক কোণে খটকা তৈরি করল। নিকোলাস দিনভর লক্ষ্য করল, মেহেক যেন মনে মনে কোনো হিসেব মেলাচ্ছে।
মাঝরাতে যখন পুরো বাড়ি নিস্তব্ধতায় ডুবে ছিল, নিকোলাস তখন বিছানা ছেড়ে উঠল।
নিকোলাস পাশে শুয়ে থাকা মেহেকের শান্ত মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, মেহেক কি তাকে সত্যিই ভালোবাসে, নাকি এটা কোনো মায়া? সেই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে নিকোলাস নিঃশব্দে স্টাডি রুমে গিয়ে ল্যাপটপটা খুলল। তার মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছিল। সে এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে পাসওয়ার্ডটি বদলে দিয়ে নতুন এক জটিল কোড সেট করল।
নিকোলাস বিড়বিড় করে বলল,
- ভালোবাসা একদিকে মিস্ট্রেস, আর জীবন বাঁচানো আরেকদিকে। তোমাকে আমি অন্ধ বিশ্বাস করতে চাই, কিন্তু আমার অন্ধকারের জগতটা যে বড় নিষ্ঠুর।
পরের দিন বিকেলে একটি নির্জন জায়গায় রায়হান ল্যাপটপ নিয়ে বসল নিকোলাসের সার্ভারে ঢোকার জন্য। কিন্তু বারবার 'Wrong Password' লেখাটি দেখে তার মাথা গরম হয়ে গেল। রায়হান পাগলের মতো টাইপ করতে লাগল, কিন্তু কাজ হলো না।
রায়হান ক্ষোভে ফে*টে পড়ে দেয়ালে ঘুষি মারল। তার হাত ফে*টে র*ক্ত বের হতে লাগল।
রায়হান মনে মনে চিৎকার করে বলতে লাগল
- নিকোলাস! আপনি এতোটা ধূর্ত? মেহেক নিজের জীবন বাজি রেখে পাসওয়ার্ড জোগাড় করল, আর আপনি শেষ মুহূর্তে সব পাল্টে দিলেন? আপনাকে আমি নিজ হাতে শেষ করব! দ্যাটস মাই প্রমিস মিস্টার নিকোলাস অলদ্রিন।
...….…..….....….....
মাঝ রাত
নিকোলাস একটানে মেহেককে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। মেহেক চুপ থাকলো।রাতের নিস্তব্ধতায় নিকোলাস যখন মেহেককে বুকের মাঝে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, তখন মেহেক তার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। কিন্তু সেই স্পন্দনে ভালোবাসার চেয়েও যেন এক আদিম হিংস্রতা মিশে আছে। নিকোলাস মেহেকের চুলে আঙুল চালাতে চালাতে হঠাৎ খুব নিচু গম্ভীর স্বরে বলতে লাগল
- মিস্ট্রেস , আমি ছোটবেলা থেকেই খুব একা। বাবা-মায়ের স্নেহ বা কারো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এসব আমার ভাগ্যে কোনোদিন ছিল না। তাই আমি ঘৃণা দিয়েই নিজের জগত গড়েছি। কেউ আমাকে ভালোবাসলো কি না, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু...
নিকোলাস একটু থামল। মেহেকের কানের কাছে মুখ নিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, যা শুনে মেহেকের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল।
- কেউ যদি ভালোবেসে আমাকে ধ্বংস করার খেলায় নামে, তবে তার পরিণাম হয় অবর্ণনীয়। আমি তাকে এমন এক নারকীয় যন্ত্রণার স্বাদ দিই, যা মৃত্যু চাইলেও তার কাছে ধরা দেয় না। আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা হলে আমি তার কলিজা ছিঁড়ে নিতেও দ্বিতীয়বার ভাবি না। তুমি আমার পাশে আছো তো, মিস্ট্রেস?
মেহেক এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। তার মনে হলো নিকোলাস কি সব জেনে গেছে? মেহেক তার ভয়কে আড়াল করে কোনোমতে বলল,
- এসব কী বলছো নিক? আমি তো তোমারই।
কিন্তু নিকোলাসের ওই রহস্যময় হাসি মেহেককে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। মেহেক বুঝতে পারল, এই মানুষটি যতোটা আবেগি, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি নিষ্ঠুর।
চলবে,,,
(🙂💔)