পর্ব-২: শুরু হলো অদ্ভুত এক অনুভূতি
সকালের নরম বাতাসে বাগানের ফুলগুলো দুলছে। পুরো বাড়ি এখনো অতিথিদের কোলাহলে মুখর। মেহরীন বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
"আল্লাহ! আজ যেন আর ওই ছেলেটার সঙ্গে দেখা না হয়।"
কথাটা বলেই নিজেই হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত একটা কণ্ঠ-
-"আমার কথা বলছেন নাকি?"
চমকে ঘুরে দাঁড়াতেই সামনে আরিয়ান। দুজনেই কয়েক সেকেন্ড চুপ।
তারপর মেহরীন ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"আপনি মানুষের পেছনে পেছনে ঘোরেন নাকি?" আরিয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
-"না। তবে মনে হচ্ছে আপনি যেখানেই যান, আমিও সেখানেই চলে আসি।"
-"এটা কিন্তু আমার দোষ না।"
-"আমি কি বললাম আপনার দোষ?"
-"আপনার কথা শুনলেই রাগ লাগে।"
-"রাগ হলে কী করবেন?"
-"কথা বলব না।"
-"তাহলে তো পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসবে।"
মেহরীন চোখ বড় বড় করে তাকাল।
-"মানে?"
-"আপনি চুপ থাকলে সবাই বেঁচে যাবে।"-"আপনি খুব অসভ্য!"
-"ধন্যবাদ।"
-"আমি কিন্তু প্রশংসা করিনি।"
-"তবুও ধন্যবাদ।"
মেহরীন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেল। আরিয়ান তাকিয়ে রইল।
নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
দুপুরে সবাই ঠিক করল কাছের নদীর ধারে ঘুরতে যাবে। মেহরীন ইচ্ছে করেই জানালার পাশের সিটে বসে পড়ল।
দুটি মাইক্রোবাসে সবাই উঠে বসল।
কিছুক্ষণ পর-"এক্সকিউজ মি... এই সিটটা কি খালি?"
মাথা তুলে দেখল...
আরিয়ান!
মেহরীন বিরক্ত হয়ে বলল,
-"এতগুলো সিট থাকতে এখানে কেন?"
-"জানালার পাশে বসতে ভালো লাগে।"
-"আমারও লাগে।"
-"তাহলে দুজনেই বসি।"
-"অসম্ভব।"
ঠিক তখনই রিদওয়ান দৌড়ে এসে বলল,
-"ভাইয়া, এখানে বসো না।"
আরিয়ান হেসে অন্য সিটে চলে গেল।
মেহরীন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।কিন্তু কেন যেন মনে হলো...
লোকটা চলে যাওয়ায় গাড়িটা একটু বেশিই চুপচাপ।
নদীর ধারে পৌঁছে সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত।
মেহরীন একা একা হাঁটছে।
হঠাৎ তার ওড়নাটা বাতাসে উড়ে গিয়ে গাছের ডালে আটকে গেল।
সে বারবার চেষ্টা করেও নামাতে পারছে না।
ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল আরিয়ান।
-"একটু সরে দাঁড়ান।"
-"দরকার নেই। আমি পারব।"
-"আপনি পারবেন, সেটা দেখছি। গত পাঁচ মিনিট ধরে চেষ্টা করছেন।"
মেহরীন মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আরিয়ান ডালটা নিচে টেনে খুব সাবধানে ওড়নাটা নামিয়ে দিল।
ওড়নাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-"এই নিন।"
মেহরীন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
-"...ধন্যবাদ।"
আরিয়ান অবাক।
-"ওহ! আপনি ধন্যবাদও দেন?"
মেহরীন আবার আগের রূপে ফিরে গেল।
-"বেশি ভাববেন না।"-"আমি তো কিছুই ভাবছি না।"
-"তাহলে হাসছেন কেন?"
-"কারণ আপনি রাগলে দেখতে মিষ্টি লাগে।"
মেহরীনের গাল হালকা লাল হয়ে উঠল। সে দ্রুত অন্যদিকে তাকাল।
না... নিজের অনুভূতি সে কিছুতেই প্রকাশ করবে না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল রিদওয়ান। সে মুচকি হেসে বলল,
-"এই গল্পটা মনে হচ্ছে অনেক দূর যাবে..."
আরিয়ান শুনে হেসে বলল,
-"কোন গল্প?"
-"কিছু না ভাইয়া। সময় হলে বুঝে যাবেন।"
আরিয়ান কিছু না বলে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
কেন যেন আজ তার বারবার মনে হচ্ছে...
মেহরীনের সঙ্গে ঝগড়া না করলে দিনটাই যেন অসম্পূর্ণ।
পর্ব ২এর শেষ অংশ
একই দলে, একই ঝামেলা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
পরদিন সকাল।
রহমান ভিলার ড্রয়িংরুমে সবাই বসে গল্প করছে। আজ ঠিক হয়েছে, দুপুরে সবাই মিলে কাছের একটি রিসোর্টে পিকনিক করবে।
মেহরীন সোফার এক কোণে বসে মোবাইল দেখছে।
ঠিক তখনই তার কাজিন তানহা এসে পাশে বসে কানে কানে বলল,
"শোন, কালকে যে ছেলেটার সাথে তোর ঝগড়া হলো, সে কিন্তু তোকে বারবার দেখছিল!"
মেহরীন চোখ বড় করে তাকাল।
-"তুই সকালে উঠে স্বপ্ন দেখেছিস?"
- "না রে, আমি নিজের চোখে দেখেছি।"
- "দেখলে দেখলি। আমার কী?"
তানহা মুচকি হেসে বলল,
- "কিছু না। তবে তোদের ঝগড়া দেখতে আমার বেশ ভালো লাগে!"
মেহরীন একটা কুশন ছুড়ে মারল।
- "চুপ কর!"
পুরো ঘর হেসে উঠল।
ওদিকে...
রিদওয়ান এসে আরিয়ানের পাশে বসল।
- "ভাইয়া, একটা কথা বলব?"- "বল।"
- "মেহরীন আপুর সঙ্গে আর ঝগড়া কইরো না।"
- "কেন?"
-"কারণ তোমরা ঝগড়া করলে আমার খুব হাসি পায়।" আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
- "তুই অদ্ভুত ছেলে!"
দুপুরে সবাই রিসোর্টে পৌঁছে গেল। বড়রা রান্নার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। ছোটরা ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছে। ঠিক তখন মেহরীনের মামা বললেন,
- "আরিয়ান, মেহরীন... তোমরা দুজন বাজার থেকে কিছু জিনিস নিয়ে এসো। এখানে একটা দোকান আছে।" দুজন একসঙ্গে বলে উঠল,
- "আমি ওর সঙ্গে যাব না!"
চারপাশে সবাই থমকে গেল। তারপর একসঙ্গে হেসে উঠল। মামা হাসতে হাসতে বললেন,
- "এই জন্যই তো তোমাদের একসঙ্গে পাঠাচ্ছি!" দুজন একে অপরের দিকে বিরক্ত চোখে তাকাল।
রাস্তা দিয়ে হাঁটছে দুজন। একজন ডানে, আরেকজন বাঁয়ে। মাঝখানে যেন এক হাত দূরত্ব। আরিয়ান নীরবতা ভাঙল।- "আপনি কি সব সময় এত রাগ করে থাকেন?"
- "না। শুধু বিশেষ কিছু মানুষকে দেখলেই রাগ হয়।"
- "বাহ! আমি তাহলে বিশেষ মানুষ!"
"নিজেকে নিয়ে এত ভাবা ভালো না।"
-"আপনি তো আমার কথা বেশ মন দিয়ে ভাবছেন!"
মেহরীন থেমে গেল।
"আমি?"
-"হুম। না হলে এত উত্তর কোথা থেকে আসে?"
মেহরীন মুখ ফিরিয়ে হাঁটা শুরু করল।
মনে মনে বলল,
"এই লোকটার সঙ্গে তর্কে জেতা অসম্ভব!"
দোকানে পৌঁছে দুজন তালিকা মিলিয়ে জিনিস নিচ্ছে।
দোকানদার হেসে বললেন,
- "ভাই, ভাবিকে একটা আইসক্রিমও নিয়ে যান।"
মুহূর্তেই দুজন একসঙ্গে বলে উঠল,
-"উনি আমার..."
কথা শেষ করার আগেই থেমে গেল।
দোকানদার হেসে বললেন,
-"আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি। এখনো রাগ করে আছেন!"
মেহরীনের মুখ লাল হয়ে গেল।
সে দ্রুত দোকানের বাইরে বেরিয়ে গেল।
আরিয়ানও বিব্রত হয়ে মাথা চুলকাল।
ফিরে আসার পথে...মেহরীন হঠাৎ একটা ছোট্ট বাচ্চাকে কাঁদতে দেখল। বাচ্চাটা তার মায়ের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিল।
- "কাঁদো না। আমরা তোমার আম্মুকে খুঁজে দেব।" আরিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার মনে হলো...
রাগী মেয়েটার ভেতরে এত মায়া! কিছুক্ষণ পর তারা বাচ্চাটার মাকে খুঁজে পেল। মহিলা চোখে পানি নিয়ে বললেন,
- "আল্লাহ তোমাদের ভালো রাখুক।"
মেহরীন শুধু হেসে মাথা নাড়ল।
কোনো বাড়তি কথা বলল না।
ফিরে আসতে আসতে আরিয়ান বলল,
-"আজ একটা জিনিস বুঝলাম।"
"কী?"
- "আপনি শুধু ঝগড়া করতে জানেন না। মানুষকেও খুব ভালোবাসেন।"
মেহরীন একবার তার দিকে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
- "সব মানুষের সামনে সব অনুভূতি দেখাতে নেই।"
এই প্রথম...
আরিয়ান উত্তর খুঁজে পেল না। সে শুধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে হলো...এই হাসিখুশি, জেদি মেয়েটার ভেতরে আরও অনেক অজানা
গল্প লুকিয়ে আছে।
দূরে দাঁড়িয়ে তানহা আর রিদওয়ান একে অপরের দিকে
তাকিয়ে মুচকি হাসল।
রিদওয়ান ফিসফিস করে বলল,
- "দেখে নিস, এদের গল্প অনেক দূর যাবে।"
তানহা হেসে উত্তর দিল,
- "কিন্তু কেউ কাউকে এত সহজে বুঝতে দেবে না।"
চলবে...
সেতু আক্তার
অভিমানেই প্রেম